রংপুরের তারাগঞ্জে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ৩৫ লাখ টাকারও বেশি অর্থে নির্মিত ‘মহিলা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি’ উদ্বোধনের পাঁচ বছর পার হলেও একটি ক্লাসেরও মুখ দেখেনি। প্রশাসনিক উদাসীনতা ও তদারকির অভাবে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তৈরি এই অবকাঠামো এখন চরম অবহেলা, চুরি এবং মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি উপজেলা প্রশাসনের বরাতে জানায়, ‘উপজেলা পরিষদ গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ১৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কারিগরি তদারকিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে তারাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ। ইকরচালী ইউনিয়নের রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে কালেক্টরেটের বামনদিঘী ইকোপার্কের ভেতরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় নারীদের ভোকেশনাল ও আয়বর্ধক নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণের পর থেকেই তালাবদ্ধ থাকা ভবনটিতে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একাধিক দেয়ালে বড় বড় ফাটল ধরেছে, দরজা জানালা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং বাথরুমের বেশিরভাগ ফিটিংস চুরি হয়ে গেছে। এমনকি পানির ট্যাংক ও সরবরাহের পাইপও উধাও। সঠিক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের চারপাশের মাটি সরে গিয়ে ভিতের কিছু অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অব্যবহৃত পড়ে থাকা এবং তদারকি না থাকায় এর পরিবেশও দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
বামনদিঘী বাজারের বাসিন্দা নাহিদুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘লাখ লাখ টাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এখানে একদিনের জন্যও কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি। এই ভবনটি এখন জনগণের টাকা অপচয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।’’ অন্যদিকে অন্ধকার নামলেই ভবনটিতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।প্রকল্পটির এমন করুণ অবস্থায় হতাশ স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীরা। স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রধান জেসমিন শেখ বলেন, ‘‘দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণে অনেক গ্রামীণ নারী উপকৃত হতে পারতেন। তা না করে ভবনটি বছরের পর বছর অব্যবহৃত ফেলে রেখে নষ্ট করা হচ্ছে। এটি দ্রুত চালু করা দরকার।’’ একই সুরে স্থানীয় সংবাদকর্মী রোহিদুল মিয়া বলেন, ‘‘জনগণের টাকা এভাবে অপচয় করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ভবন নির্মাণের পর একটি ক্লাসও নেওয়া হয়নি, অথচ এর পেছনেই সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়ে গেল।’’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনোব্বর হোসেন ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, ভবনটি সংস্কার করে নারীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা প্রশাসনের রয়েছে। তবে এই কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি। ফলে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত এই উন্নয়ন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখনো চরম অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে।