এবারের ল্যুভ জাদুঘরে চুরির ঘটনা কেন ব্যতিক্রম

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এবারের ল্যুভ জাদুঘরে চুরির ঘটনা কেন ব্যতিক্রম
ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত ল্যুভ জাদুঘরে আবারও চুরির ঘটনা ঘটেছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত ল্যুভ জাদুঘরে আবারও চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের চুরি আগের যেকোনো ঘটনার চেয়ে আলাদা।

কারণ এবার কোনো চিত্রকর্ম চুরি হয়নি। এবার চুরি হয়েছে মহামূল্যবান অলংকার। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার সমান।

এবারের ল্যুভ থেকে নেপোলিয়নের আমলের গয়না চুরি আবারও প্রমাণ করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চুরির ধরন যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে চোরদের কৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাও।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, গত ১৯ অক্টোবর সকালে প্রতিদিনের মতো জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য খোলার আধ ঘণ্টা পরই একদল দুর্ধর্ষ চোর সেখানে প্রবেশ করে। তারা মাত্র চার মিনিটের মধ্যে নেপোলিয়নের আমলের আটটি গয়না চুরি করে নিয়ে যায়। তারা একটি ট্রাক-মাউন্টেড মই ব্যবহার করে মিউজিয়ামের দ্বিতীয় তলায় পৌঁছায়। পরে একটি অ্যাঙ্গেল গ্রাইন্ডার দিয়ে জানালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে।

নেপোলিয়ন তৃতীয় স্ত্রী ইউজেনির মুকুট। ছবি: ল্যুভ জাদুঘর
নেপোলিয়ন তৃতীয় স্ত্রী ইউজেনির মুকুট। ছবি: ল্যুভ জাদুঘর

চোরেরা নেপোলিয়ন তৃতীয় স্ত্রী ইউজেনির মুকুটসহ মোট নয়টি অলংকার নিতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পালানোর সময় মুকুটটি পড়ে যায়। বাকি আটটি গয়না নিয়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ায় আপাতত ল্যুভ জাদুঘরটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ল্যুভের ইতিহাসে এর আগে বেশ কয়েকবার বড় চুরির ঘটনা ঘটেছে। ১৯১১ সালে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘মোনা লিসা’ চিত্রকর্ম এই জাদুঘর থেকে চুরি হয়েছিল, যা ছিল বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া ঘটনা। তখন চোরদের মূল লক্ষ্য ছিল চিত্রকর্ম, যা বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে তার সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে। দুই বছর পর সেই চিত্রকর্ম উদ্ধার করা হয়।

বিংশ শতাব্দীতে ল্যুভে আরও কয়েকটি বড় চুরির ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা ফ্রান্স দখল করলে, তৎকালীন ফরাসি ন্যাশনাল মিউজিয়ামের পরিচালক জ্যাক জাজার্ড মোনা লিসাসহ প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মাস্টারপিস ফরাসি গ্রামাঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নাৎসিদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

এরপর ১৯৬৬ সালে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে ল্যুভ থেকে ধার করে নেওয়া গয়না চুরি হয়েছিল, যা পরে একটি মুদির ব্যাগে পাওয়া যায়। ১৯৯০ সালে চুরি হয় রেনোয়ারের একটি চিত্রকর্ম।

কিন্তু এবারের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমেরিকান শিল্প ইতিহাসবিদ নোয়াহ চার্নি বলেন, “চুরি হওয়া গয়নাগুলো উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। পুলিশ কেবল তখনই সফল হতে পারে, যদি বিপুল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে। কারণ, চোরেরা ভাঙা গয়না বিক্রি করার চেয়ে পুরস্কার পেলে বেশি লাভবান হতে পারে।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, চিত্রকর্মের মূল্য নির্ভর করে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর, কিন্তু গয়নার মূল্য নির্ভর করে সোনা, প্ল্যাটিনাম ও রত্নের উপাদানগত মানে। গয়না চুরি হলে তা ভেঙে ফেলা, রত্নগুলো পুনরায় কেটে বিক্রি করা সহজ। ফলে একবার বিকৃত হলে এগুলো আর মূল ঐতিহাসিক নিদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এমনকি অলংকার নতুন আকারে বৈধ বাজারেও বিক্রি করা যায়। এগুলোর জন্য কালোবাজারের প্রয়োজন পড়ে না।

সম্পর্কিত