মানুষ ঘুমের মধ্যে কেন কথা বলে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মানুষ ঘুমের মধ্যে কেন কথা বলে?
প্রতীকী ছবি/ এআই

ঘুমের মধ্যে কথা বলেন অনেকেই। গবেষণা বলছে, প্রতি ৩ জনের ২ জনই ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। কেউ পুরো বাক্য বলেন, কেউ বা ভাঙা ভাঙা শব্দ বলেন।

সম্প্রতি আমেরিকার ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক আচরণগত ঘুম চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. মিশেল ড্রেরাপের বক্তব্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘুমের মধ্যে বলা কথা পূর্ণাঙ্গ বাক্যের মতো না হয়ে অগোছালো শব্দের মতো শোনায়। অনেকের কাছে বিষয়টি মজার। কারও কাছে এটি বিরক্তিকর কিংবা বিব্রতকর বা বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। অবশ্য ঘুমের মধ্যে কথা বলা নিয়ে সাধারণত চিন্তার কিছু নেই।

তবে ডা. মিশেল ড্রেরাপের মতে, মাঝে মাঝে এটি গুরুতর ঘুমজনিত সমস্যা বা অপ্রকাশিত স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা আসলে কী?

ডা. মিশেল ড্রেরাপ বলেছেন, ঘুমের মধ্যে কথা বলা সোমনিলোকুই নামেও পরিচিত। এর মানে হলো ঘুমের সময় জোরে বা শান্তভাবে কথা বলা।

তার মতে, ঘুমের সময় মানুষ ফিসফিস করে বা সাধারণ আওয়াজে কথা বলতে পারে। আবার পুরো শব্দ বা উত্তর চিৎকারও করতে পারে। এ ছাড়াও পূর্ণ, বোধগম্য বাক্য বলা এবং পুরো কথোপকথনও চালাতে পারেন কেউ কেউ, এমনকি অনেকে অর্থহীন শব্দের সঙ্গে অন্যান্য শব্দ মিশিয়ে কথা বলেন।

ডা. মিশেল ড্রেরাপ বলেন, যেকোনোভাবেই কথা বলা হোক না কেন, যিনি কথা বলেন, তিনি সাধারণত এটি বুঝতে পারেন না, যতক্ষণ না কথা বলার সময় জেগে ওঠেন বা পরে অন্য কেউ তাকে এটি জানায়।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা এক ধরনের প্যারাসোমনিয়া বা ঘুমের সময় ঘটে এমন ব্যাঘাতমূলক ঘুম-সম্পর্কিত সমস্যা।

ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানো বা ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত খাবার খাওয়ার সমস্যার মতো অন্যান্য প্যারাসোমনিয়ায় যেমন স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে, সে ধরনের ঝুঁকি কথা বলার ক্ষেত্রে নেই। এটি খুব বেশি হলে আশপাশের মানুষেন জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে।

ঘুমের মধ্যে কথা কেন বলে ?

ঘুম একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া। সাধারণত একটি ঘুমের চক্র প্রায় ৯০ মিনিটের হয় এবং পুরোপুরি সতেজ ও তরতাজা অনুভব করতে দিনে চার থেকে পাঁচটি ঘুমের চক্র দরকার।

প্রতিটি চক্রে মস্তিষ্ক চারটি ঘুমের ধাপ অতিক্রম করে। আর এই ধাপগুলোর যেকোনো একটিতে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও ঘুমের মান নষ্ট হতে পারে।

ডা. মিশেল ড্রেরাপ বলেন, “বেশিরভাগ প্যারাসোমনিয়াকে জাগ্রত অবস্থা ও ঘুমের মধ্যবর্তী এক ধরনের মিশ্র অবস্থা বলে মনে করা হয়। তাই ঘুমের ধারা বিঘ্নিত হলে বা ঘুম নষ্ট হলে ঘুমের মধ্যে কথা বলার সম্ভাবনা বাড়ে।”

এর মানে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় এমন যেকোনো কারণই ঘুমের মধ্যে কথা বলার জন্য দায়ী হতে পারে। যেমন , জেট ল্যাগ (দূরপাল্লার ভ্রমণের পর শরীরের সময়ের হিসেব গুলিয়ে যাওয়া), ঘুমের অভাব, স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা), উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কিংবা অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে।

ডা. মিশেল ড্রেরাপ আরও বলেন, “কিছু প্রমাণ আছে যে কখনও কখনও ঘুমের মধ্যে কথা বলা স্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তবে সবসময় এমনটি হয় না।”

বেশিরভাগ স্বপ্ন দেখা হয় ঘুমের গভীর র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম) পর্যায়ে। কিন্তু ঘুমের মধ্যে কথা বলা যেকোনো ধাপেই হতে পারে। আবার অন্যান্য প্যারাসোমনিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা উপসর্গ হিসেবেও ঘুমের মধ্যে কথা বলার সমস্যা হতে পারে।

প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত

ডা. মিশেল ড্রেরাপ আরও বলেন, আরইএম পর্যায়ে ঘুমের সমস্যায় (আরবিডি) আক্রান্ত ব্যক্তিরা অজান্তে তাদের স্বপ্নের মতো আচরণ শুরু করে। তাদের মস্তিষ্ক ঘুমের সময় পেশী শিথিল ও অচল রাখার যে কাজটি করে, তা ঠিকমতো কাজ না করায় তারা কথা বলতে, চিৎকার করতে, ঘুষি মারতে, লাফাতে, হাঁটতে বা দৌড়াতেও পারে।

একইভাবে, ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানো বা নাইট টেরর হওয়ার সময়ও মানুষ কথা বলতে পারে।

যদি প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কেউ হঠাৎ ঘুমের মধ্যে কথা বলা শুরু করে, অথবা তাতে তীব্র ভয়, চিৎকার বা সহিংস আচরণ দেখা যায়, তাহলে অবশ্যই একজন ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

এটি কী বন্ধ করা সম্ভব?

অনেক প্যারাসোমনিয়া বা ঘুমজনিত সমস্যার মূল কারণ ঘুমের ব্যাঘাত। তাই ঘুমের মধ্যে কথা বলা কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ঘুমের মান উন্নত করা এবং যতটা সম্ভব বিঘ্ন কমানো।

বিশেষজ্ঞরা জানান, যারা ঘুমের মধ্যে কথা বলেন, তাদের ঘুমের মান সাধারণত অন্যদের তুলনায় কম থাকে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের মান উন্নত হলে ঘুমের মধ্যে কথা বলাও কমে আসার সম্ভাবনা থাকে।

প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত

ডা. মিশেল ড্রেরাপ ঘুমের মান উন্নত করতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেগুলো হলো-

  • নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি মেনে চলা।
  • প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য রাখা।
  • ঘুমানোর আগে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট শান্ত ও স্ক্রিনবিহীন সময় রাখা।
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো।
  • ঘুমানোর কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা।
  • ঘরকে শান্ত ও অন্ধকার রাখা।
  • শোবার ঘরের তাপমাত্রা ১৫ থেকে ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

ডা. মিশেল ড্রেরাপের পরামর্শ, যদি ঘুমের মান উন্নত করার পরও ঘুমের মধ্যে কথা বলা না কমে, বা ঘুমানোর সময় অস্বাভাবিক কোনো আচরণ লক্ষ্য করেন, তবে রাতভর ঘুমের পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে। এতে ঘুমের সময় মস্তিষ্ক ও শরীরে কী ঘটছে তা বিস্তারিত জানা যায়।

ঘুমের পরীক্ষায় মস্তিষ্কের তরঙ্গ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হাত-পায়ের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে অস্বাভাবিক বা ঘুম ব্যাঘাতকারী আচরণও বিশ্লেষণ করা হয়।

সম্পর্কিত