রিলস বা শর্ট-ভিডিও দেখার অভ্যাস কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
রিলস বা শর্ট-ভিডিও দেখার অভ্যাস কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে
প্রতীকী ছবি/ফ্রিপিক

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজ- সবকিছুই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ৩০ সেকেন্ডের শর্ট ভিডিওতে দেখা যায়। এগুলো ‘রিলস’ নামে পরিচিত। অতিরিক্ত রিলস দেখার কারণে মানুষের একদিকে মানুষের মনোযোগ কমে যাচ্ছে সেইসঙ্গে জ্ঞানগত দক্ষতারও অবনতি হচ্ছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) সাইকোলজিক্যাল বুলেটিনে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণ এই বিষয়টির প্রভাব খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণটির তথ্য তুলে ধরেছে।

রিলস বা শর্ট ভিডিও মস্তিষ্কে কেমন প্রভাব ফেলে?

মার্কিন সাময়িকীতে নিউরোইমেজে প্রকাশিত শর্ট-ভিডিও আসক্তির প্রভাব বিষয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীতে পরিবর্তন আনতে পারে।

ডুমস্ক্রলিং (নেতিবাচক কনটেন্ট বারবার দেখা) আসক্তির কারণে বাস্তব জীবনের নানা ঘটনার ওপর সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া, ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা হ্রাস পাওয়া, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ধীর হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। আচরণগত বিশ্লেষণ ও ব্রেন ইমেজিং থেকে এই চিত্র উঠে এসেছে।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে একটি গবেষণায় প্রায় ১ লাখ অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণে করা হয়েছে । এতে দীর্ঘ সময় ধরে স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও (এসএফভি) দেখার সামগ্রিক নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।

গবেষণায় বলা হয়, শর্ট-ভিডিও বেশি দেখার ফলে মনোযোগ ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া কনটেন্ট বেশি দেখার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ও মানসিক চাপ বৃদ্ধিরও শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

রিলস কীভাবে মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটায়

ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের ফরিদাবাদের ফোর্টিস হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সমীর ভারগব জানান, রিলস ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন বা তাৎক্ষণিক তুষ্টি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।

তিনি বলেন, শর্ট ভিডিও কনটেন্ট মানুষের মন, মনোযোগ এবং আবেগগত স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। প্রযুক্তিকে তিনি দায়ী না করলেও, রিলস কীভাবে মানবমস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে তা ব্যাখ্যা করেন।

প্রতীকী ছবি/ফ্রিপিক
প্রতীকী ছবি/ফ্রিপিক

ডা. সমীরবলেন, রিলস বা শর্ট ভিডিও কনটেন্টকে বিশ্রামের উপায় হিসেবে নিয়মিত ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক ‘খুব বেশি উত্তেজনাময় পরিবেশের’ সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।

তিনি বলেন, নিয়মিত রিলস দেখেন এবং যারা মাঝেমধ্যে দেখেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে সিদ্ধান্ত ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত মস্তিষ্কের অংশগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

তার ভাষ্য, রিলস দেখার কারণে মানুষ আকস্মিক, অস্থির হয়ে উঠছে এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের চেয়ে তাৎক্ষণিক আনন্দের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কিছু গবেষণায় মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন দেখা গেছে, কারণ মস্তিষ্ক কয়েক সেকেন্ড পরপরই ফোকাস বদলায়।

তাছাড়া এই রিলস আসক্তি মানুষের ঘুম নষ্ট করে দেয়, যা তার স্মৃতি ও মেজাজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

‘মস্তিষ্কের পচন’ কী রোধ করা সম্ভব?

২০২৪ সালে অক্সফোর্ড বর্ষসেরা শব্দ নির্বাচিত হয়েছে ‘ব্রেন রট’, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘মস্তিষ্কে পচন’। একজন ব্যক্তির মানসিক কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার অবনতি বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়।

ডা. সমীর জানান, একটা ভালো খবর হলো, মানুষের মস্তিষ্ক নমনীয়। অভ্যাস ও আচরণের ধারাবাহিকতা ঠিক করেই মস্তিষ্ক পরিবর্তন সম্ভব।

তিনি বলেন, এই পরিবর্তন আনার জন্য রিলস দেখা পুরোপুরি ছাড়তে হবে এমন নয়।

রিলস যেন আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য ডা. সমীর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রথমত, তিনি ধীরে ধীরে স্ক্রিন টাইম কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন: খাওয়ার সময়, পড়াশোনার সময়, কথা বলার সময় বা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখলে বিরাট পরিবর্তন আসতে পারে। তার মতে, এতে রিলস দেখার প্রবণতা কমবে এবং মস্তিষ্কের উত্তেজনা কমে যাবে। প্রয়োজনে পেশাদার কারও সহায়তাও নেওয়ার জন্য বলেছেন তিনি।

দ্বিতীয়ত, স্ক্রিন টাইমের বিকল্প খুঁজতে বলেছেন ডা.সমীর। এজন্য বই পড়া, বাইরে সময় কাটানো, খেলাধুলা করা বা নিজের শখের কোনো কাজ করে সময় কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সবশেষে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছেন ডা. সমীর। তিনি বলেন, অনেকেই একাকিত্ব, বিরক্তি বা দুশ্চিন্তার কারণে স্ক্রল করেন। এর পরিবর্তে হাঁটতে বের হতে বা ডায়েরিতে নিজের অনুভূতি লিখতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সম্পর্কিত