গাজার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীতে পাকিস্তান কি যোগ দেবে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
গাজার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীতে পাকিস্তান কি যোগ দেবে
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকা প্রস্তাবিত যে প্রস্তাবটি গাজায় একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ (আইএসএফ) গঠনের পথ তৈরি করেছে, তাতে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে এখন দেশ-বিদেশে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবের সমর্থন জানিয়ে ভোট দিয়েছে পাকিস্তান। তবে একইসঙ্গে জানিয়েছে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পরিষ্কার নয় তারা। এ কারণে পাকিস্তান সেই বাহিনীতে যোগ দেবে কি না–তা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

জটিল কূটনৈতিক হিসেবের সামনে ইসলামাবাদ

জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ স্বীকার করেছেন, তারা আমেরিকাকে ধন্যবাদ দিলেও প্রস্তাবে পাকিস্তানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষ করে গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, বোর্ড অব পিসের ক্ষমতা এবং আইএসএফের ভূমিকা পরিষ্কার নয়।

তবে সেপ্টেম্বরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা সমর্থন করেছিল পাকিস্তান। দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম বড় সামরিক বাহিনী থাকায় অনেকে মনে করছেন, গাজা আন্তর্জাতিক বাহিনীতে পাকিস্তান বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান এখন অত্যন্ত সতর্কভাবে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে। আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মূল মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দেশের ভেতরের জনমতও তাদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলবে।

মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব জর্ডান, মিসর, সৌদি আরবসহ বহু মধ্যপ্রাচ্য দেশের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে বৈঠক করেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান সম্প্রতি ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট করেছে, যা পাকিস্তানকে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোটে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আমেরিকা সফর, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বৈঠক–এসব ইঙ্গিত দেয় যে, দেশটি এখন বৈশ্বিক কূটনৈতিক মঞ্চে আবার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠছে।

সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত কতটা সংবেদনশীল

ইসরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দেশটির পাসপোর্টে স্পষ্টভাবে লেখা–ইসরায়েলে ভ্রমণ নিষিদ্ধ। ফলে গাজায় যদি কোনোভাবে পাকিস্তানকে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়, তা দেশটির ভেতরে বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

অনেক বিশ্লেষক বলছেন, পাকিস্তান যদি আইএসএফে যোগ দেয়, তবে এটি মানবিক সহায়তা, যুদ্ধবিরতি রক্ষা এবং বেসামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সীমিত দায়িত্বে থাকতে পারে। সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় অন্য দেশগুলো করবে–এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।

আইন ও নিরাপত্তাগত অস্পষ্টতা

জাতিসংঘের প্রস্তাবনায় এখনো পরিষ্কার নয় আইএসএফের কাঠামো কী হবে, কোন দেশের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে, বা গাজায় নিরস্ত্রীকরণ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। হামাস ইতিমধ্যে বলেছে, তারা কোনো আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান বা নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা মেনে নেবে না।

এদিকে আমেরিকা ইতিমধ্যে গাজা সীমান্তের কাছে একটি সমন্বয় কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যৎ আইএসএফ অপারেশনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

অর্থনীতি ও জোটের চাপ

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন তাদের আইএসএফে যোগ দিতে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান তার প্রভাবশালী মিত্রদের অনুরোধ সহজে ফিরিয়ে দিতে পারে না।

তবে অনেকেই মনে করছেন, পাকিস্তান সিদ্ধান্ত নেবে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, সংসদ এবং সামরিক বাহিনী–সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকবে।

গাজার শান্তিরক্ষা বাহিনীতে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ হবে কি না, এ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে বিষয়টি শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ধর্মীয় অনুভূতি এবং অর্থনৈতিক হিসাব– সবকিছুর ওপর নির্ভর করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহেই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে।

সম্পর্কিত