ভাষা এলো কীভাবে

ভাষা এলো কীভাবে
শত শত বছর ধরে ভাষার উৎপত্তি নিয়ে অনেক তত্ত্ব উত্থাপিত হয়েছে। তার প্রায় সবগুলিকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ছবি: চরচা গ্রাফিক্স

প্রায় এক হাজার বছর বা তার কিছু আগে পাহাড় কেটে তৈরি এক গির্জায় একজন সন্ন্যাসী ল্যাটিস ভাষায় লেখা কিছু লিপি নিয়ে কাজ করছিলেন। সন্ন্যাসীকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। ওই মঠের অন্য সন্ন্যাসীরা টেক্সট নিয়ে সমস্যায় পড়লে যা করতেন তিনিও তাই করলেন।

টেক্সটের লাইনগুলির মধ্যে এবং শেষে কঠিন অংশগুলি নিজের ভাষায় লিখে রাখলেন। এই ‘প্রান্তিক টীকা’গুলিকে কেবল সাধারণ টীকা মনে করলে কিছুটা ভুল হবে। সেগুলো ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কারণ, ওই টীকাগুলিকে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা প্রথম শব্দ বলে মনে করা হয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনোমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ‘এমিলিয়ান গ্লস’ লেখা হয়েছিল স্পেনের লা রিওখা অঞ্চলের সুসো (Suso) মঠে, যা সেন্ট এমিলিয়ানাস (স্প্যানিশে মিলান) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ওই মঠকে বলা হয়, ‘লা কুনা দেল কাস্তেইয়ানো’, অর্থাৎ ‘কাস্তিলিয়ানের দোলনা’। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান ও একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। ১৯৭৭ সালে স্পেন সেখানে স্প্যানিশ ভাষার হাজার বছর পূর্তি উদযাপন করেছিল।

প্রথম লেখার মিথ

ইকোনোমিস্ট লিখেছে, সুপারহিরোর উত্থানের গল্প মানুষ পছন্দ করে। তেমনি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ভাষা (স্প্যানিশ); যে ভাষায় ৫০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ কথা বলে এবং এই সবকিছুর শুরু হয়েছিল একজন সন্ন্যাসীর কাজের মাধ্যমে-এমন গল্পও মানুষ পছন্দ করে।

ভাষা কোনো ব্যক্তি নয়, যার একটি নাম, জন্মতারিখ এবং জন্মস্থান থাকে। বরং তারা একটি প্রজাতির মতো, যা বহু বছর ধরে অন্য একটি প্রজাতি ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়।

ভাষার উৎপত্তি নিয়ে এই গল্পগুলি আসলে বিশৃঙ্খলার ওপর শৃঙ্খলা আরোপের একটি তাগিদ। একটি লেখাকে একটি ভাষার সূচনা বলে মনে করাটা একটি শিশুর প্রথম ছবিকেই তার জীবনের শুরু বলে ভাবা।

আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একটি ভাষার প্রথম লিখিত নথি হল একটি স্বতন্ত্র প্রজাতির প্রথম জীবাশ্মের চিহ্নের মতো। এমনকি এটিকে সেই মুহূর্ত বলে ভুল করা উচিত নয় যখন প্রজাতিটির উদ্ভব হয়েছিল।

ভাষা কোনো ব্যক্তি নয়, যার একটি নাম, জন্মতারিখ এবং জন্মস্থান থাকে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ভাষা কোনো ব্যক্তি নয়, যার একটি নাম, জন্মতারিখ এবং জন্মস্থান থাকে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ভাষা কীভাবে, কখন শুরু হয়েছিল

নৃতাত্ত্বিক অধ্যাপক বার্নার্ড ক্যাম্পবেল তার ‘হিউম্যানকাইন্ড এমার্জিং’ বইয়ে সোজাসাপটাভাবে বলেছিলেন, ভাষা কীভাবে বা কখন শুরু হয়েছিল, তা আমরা স্রেফ জানি না-এবং কখনই জানবও না।

ভাষার বিকাশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো সাংস্কৃতিক ঘটনা কল্পনা করা কঠিন। তবুও, মানবজাতির আর কোনো বিষয় নেই যার উৎপত্তির বিষয়ে এত সংশয় রয়েছে।

তবে প্রমাণের এই অনুপস্থিতি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে জল্পনা-কল্পনাকে মোটেই নিরুৎসাহিত করেনি। বরং শত শত বছর ধরে অনেক তত্ত্ব উত্থাপিত হয়েছে-এবং তার প্রায় সবগুলিকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে এবং উপহাসও করা হয়েছে।

ভাষা কীভাবে শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে পাঁচটি প্রাচীন এবং সাধারণ তত্ত্ব তুলে ধরে আমরিকান ওয়েবসাইট থটকো ডটকম বলেছেন, প্রতিটি তত্ত্বই ভাষা সম্পর্কে আমরা যা জানি, তার কেবল খুব ছোট্ট একটি অংশের ব্যাখ্যা করে।

বো-ওয়াও তত্ত্ব

এই তত্ত্ব অনুসারে, আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন তাদের চারপাশের প্রাকৃতিক শব্দ অনুকরণ করতে শুরু করেছিল, তখন ভাষার সূচনা হয়েছিল। প্রথম কথাগুলি ছিল অনুমিতিমূলক। যেমন ‘মু’ (গরুর ডাক), ‘মিউ’ (বিড়ালের ডাক), ‘স্প্ল্যাশ’, ‘কুক্কু’ (কোকিলের ডাক) এবং ব্যাঙের ডাকের মতো প্রতিধ্বনিমূলক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত।

তাহলে এই তত্ত্বের সমস্যা কী? সমস্যা হলো, খুব কম শব্দই অনুমিতিমূলক, এবং এই শব্দগুলি এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় পরিবর্তিত হয়। একটি কুকুরের ডাক ব্রাজিলে ‘আউ আউ’, আলবেনিয়ায় ‘হ্যাম হ্যাম’ এবং চীনে ‘ওয়াং ওয়াং’ শোনা যায়। তাছাড়া অনেক অনুমিতিমূলক শব্দ সাম্প্রতিক কালের সৃষ্টি, এবং সবগুলিই প্রাকৃতিক শব্দ থেকে উদ্ভূত নয়।

ডিং-ডং তত্ত্ব

দার্শনিক প্লেটো এবং পিথাগোরাস সমর্থিত এই তত্ত্বটি মনে করে যে পরিবেশের বস্তুগুলির সার্বিক গুণাবলীর প্রতিক্রিয়ায় কথার সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হয়, মানুষ যে প্রাথমিক শব্দগুলি তৈরি করেছিল, তা তাদের চারপাশের বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

লা-লা তত্ত্ব

ডেনিশ ভাষাবিদ অটো ইয়েসপারসেন পরামর্শ দিয়েছিলেন যে ভাষা সম্ভবত প্রেম, খেলাধুলা এবং (বিশেষ করে) গানের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দগুলি থেকে বিকশিত হয়েছে।

ডেভিড ক্রিস্টাল তার ‘হাউ ল্যাঙ্গুয়েজ ওয়ার্কস’ বইয়ে লিখেছেন এই তত্ত্বটি “...ভাষার আবেগগত এবং যৌক্তিক দিকগুলির ভেতরের পার্থক্য নিয়ে...” ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ।

একটি ভাষার প্রথম লিখিত নথি হল একটি স্বতন্ত্র প্রজাতির প্রথম জীবাশ্মের চিহ্নের মতো। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
একটি ভাষার প্রথম লিখিত নথি হল একটি স্বতন্ত্র প্রজাতির প্রথম জীবাশ্মের চিহ্নের মতো। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পুহ-পুহ তত্ত্ব

এই তত্ত্বটি মনে করে যে কথার উৎপত্তি আবেগসূচক অব্যয় থেকে হয়েছে। যেমন ব্যথা বা যন্ত্রণার স্বতঃস্ফূর্ত চিৎকার (উফ!) বা বিস্ময়ের অভিব্যক্তি (‘ওহ’) এবং অন্যান্য আবেগ।

তবে, কোনো ভাষাতেই খুব বেশি আবেগসূচক অব্যয় নেই। ক্রিস্টাল উল্লেখ করেছেন, এভাবে ব্যবহৃত শব্দ, নিঃশ্বাস গ্রহণ এবং অন্যান্য শব্দগুলি “ধ্বনিবিজ্ঞানে পাওয়া স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে খুব কমই সম্পর্ক রাখে।”

ইয়ো-হি-হো তত্ত্ব

এই তত্ত্ব বলছে, ভাষা ভারী শারীরিক শ্রমের কারণে সৃষ্ট গোঙানি, আর্তনাদ এবং নাক ডাকার শব্দ থেকে বিকশিত হয়েছিল।

যদিও এই ধারণাটি ভাষার কিছু ছন্দময় বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু শব্দ কোথা থেকে আসে, তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এটি খুব বেশি দূর যেতে পারে না।

আমেরিকান ভাষাবিদ পিটার ফার্ব তার ‘ওয়ার্ড প্লে: হোয়াট হ্যাপেনস হোয়েন পিপল টক’ বইয়ে লিখেছেন, এই সমস্ত তত্ত্বের ‘গুরুতর ত্রুটি রয়েছে, এবং ভাষার গঠন এবং আমাদের প্রজাতির বিবর্তন সম্পর্কে বর্তমান জ্ঞানের পরীক্ষায় এর কোনোটিই টিকে থাকতে পারে না।’

কিন্তু এর মানে কি এই, যে ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অসম্ভব? ভাষাবিদ ক্রিস্টিন কেনিয়ালি তার ‘দ্য ফার্স্ট ওয়ার্ড’ বইয়ে বলেছেন, ‘ভাষা কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন শাখা জুড়ে এক বহুমাত্রিক গুপ্তধনের সন্ধান’ চলছে এবং এটি ‘আজকের বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা’।

আমরা কী কখনও ভাষার উৎপত্তি আবিষ্কার করতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তরে বার্নার্ড ক্যাম্পবেলের কথার প্রতিধ্বনি তুলে বলতে হয়, ভাষা কীভাবে বা কখন শুরু হয়েছিল, তা আমরা স্রেফ জানি না-এবং কখনো জানব না।

সম্পর্কিত