ময়নাতদন্ত কী, কবে থেকে শুরু

সামদানী হক নাজুম, ঢাকা
সামদানী হক নাজুম, ঢাকা
ময়নাতদন্ত কী, কবে থেকে শুরু
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ। ছবি: চরচা

ময়নাতদন্ত বা পোস্টমর্টেম খুব পরিচিত শব্দ। যার সহজ অর্থ-মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে মরদেহের ব্যবচ্ছেদ এবং নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কবে শুরু হলো

আরবি ‘মুআইনা’ শব্দ থেকে বাংলায় ‘ময়না’ শব্দটি এসেছে। এটা কিন্তু ময়না পাখির ময়না নয়। আরবি থেকে আসা ‘ময়না’ শব্দের অনেক অর্থের মধ্যে একটি হল অনুসন্ধান বা খোঁজা। আর এরসঙ্গে সংস্কৃত ‘তদন্ত’ শব্দটির যুক্ত হয়ে যোগে গঠিত হয়েছে ‘ময়নাতদন্ত’। যার অর্থ মৃত্যুর সঠিক কারণ জানার জন্য শব ব্যবচ্ছেদ।

ময়নাতদন্তের ইংরেজি হল পোস্টমর্টেম বা অটপসি। ইংরেজি পোস্ট শব্দের অর্থ হল পরে এবং ল্যাটিন মর্টেম শব্দের অর্থ হল মৃত্যু। অর্থাৎ পোস্টমর্টেম বলতে মরদেহের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকেই বোঝায়।

কখন এবং কেন করা হয় ময়নাতদন্ত?

যেকোনো মৃত্যুতেই যে ময়নাতদন্ত করতে হয়, বিষয়টি তেমন নয়। স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অর্থাৎ যে সকল মৃত্যুর কারণ সহজে অনুমেয়, এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল যে সকল মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরবর্তীতে কোনো প্রশ্ন উঠবে না সে ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের বাধ্যবাধকতা নেই। এর বিপরীতে সকল অস্বাভাবিক মৃত্যু যেমন হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যার মতো মৃত্যুতে ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক। এ ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ওই মৃত্যু কীভাবে সংগঠিত হয়েছে তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত করা হয়।

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ১৭৪ ধারার ৩ উপ-ধারায় ময়নাতদন্তের বিষয়ে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘যদি মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো সংশয় জাগে অথবা অন্য যেকোনো কারণে পুলিশ অফিসার যদি এমন করা সমীচীন বলে মনে করেন তিনি তখন পরীক্ষার জন্য মৃত দেহটিকে নিকটস্থ সিভিল সার্জন বা এই উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত উপযুক্ত মেডিকেল অফিসারের নিকট প্রেরণ করবেন।’

১৮৭২ সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারায় ময়নাতদন্তকে ‘সমর্থনমূলক সাক্ষ্য’ হিসেবে আমলে নেয় আদালত।

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

ময়নাতদন্তের নিয়ম

ময়নতদন্ত শুরুর প্রথম ধাপ হল পুলিশের তৈরি করা সুরতহাল প্রতিবেদন ভালোভাবে পড়ে নেওয়া। সুরতহাল প্রতিবেদন থেকে মেডিকেল অফিসার প্রথমেই স্পষ্ট ধারণা নেন মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে দেহটি কোন অবস্থায় পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয় সূর্যের আলোতে, আর তাই রাতে এই কার্যক্রম হয় না।

শুরুতেই মরদেহের মুখ গহ্বর, কান, নাক, পায়ুপথ ইত্যাদি বাহ্যিক পথগুলো পরীক্ষা করেন চিকিৎসক। এরপর ধারাবাহিকভাবে কাটা ছেঁড়ার মাধ্যমে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। সংগ্রহ করা নমুনা থেকে রাসায়নিক বা বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত হতে ভিসেরা পরীক্ষা করা হয়। প্রযুক্তিগত ব্যবহার প্রয়োগ করে ময়না তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর পরেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রায় শতভাগ সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।

ময়না তদন্ত শেষ করেই চিকিৎসক একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করেন। এটিকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বা পিএম রিপোর্ট বলা হয়। এই প্রতিবেদনে চিকিৎসক মৃত্যুর প্রাথমিক সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেন। যেমন আত্মহত্যা হয়ে থাকলে ‘সুইসাইডাল ইন নেচার’, হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকলে ‘হোমিসাইডাল ইন নেচার’ প্রতিবেদনের মন্তব্যের ঘরে এভাবেই নিজের মত বা ধারণা উল্লেখ করেন চিকিৎসক। কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় না। সেক্ষেত্রে ভিসারা পরীক্ষার রিপোর্টের পর মৃত্যুর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা হয়।

এছাড়াও প্রতিবেদনে মরদেহের বিস্তারিত বর্ণনাসহ, মৃত্যু সম্ভাব্য সময় এবং মৃতদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সবশেষ অবস্থার কথাও উল্লেখ থাকে। এই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তাৎক্ষনিক তৈরি করে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কবে থেকে শুরু হলো

ময়নাতদন্তের ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকেই শুরু, তবে আধুনিক প্রকৃত অর্থে ময়নাতদন্ত বলতে যা বোঝায় তার প্রচলন কয়েক শতাব্দী আগে শুরু হয়। প্রাচীন মিশরীয়রা ময়নাতদন্ত না করলেও, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণের জন্য মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করত। গ্রিক ও ভারতীয়রাও শরীর পরীক্ষা করতেন, কিন্তু তা ময়নাতদন্তের মতো ছিল না। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিকরা প্রথম মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদ করে মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা শুরু করে। পরবর্তীতে, ইউরোপীয় রেনেসাঁর সময় চিকিৎসাবিদ্যায় ময়নাতদন্তের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং আধুনিক ময়নাতদন্তের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে প্রথম কোনো মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয় বলে জানা গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছিল। তখন এর রিপোর্টে বলা হয়েছিল জুলিয়াস সিজারকে ২৩ বার ছুরিকাঘাত করা হয়েছে।

রেনেসাঁ যুগে অ্যানাটমি বা শারীরবিদ্যার নবজন্ম ঘটে। বিশেষ করে আন্দ্রেয়াস ভেসালিয়াসের কাজের মাধ্যমে। এর ফলে স্বাভাবিক অ্যানাটমি থেকে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য (যেমন: অ্যানিউরিজম) আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ৩০টি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ ‘অস্বাভাবিক অ্যানাটমি’ সম্পর্কে নোট নেন। মিকেলেঞ্জেলোও বেশ কিছু ময়নাতদন্ত করেছিলেন। এরও আগে, ১৩শ শতকে ফ্রেডরিক দ্বিতীয় আদেশ দেন যে প্রতি দুই বছরে দুইজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর দেহ চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে সরবরাহ করতে হবে, যেখানে প্রত্যেক চিকিৎসকের উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। ১৩০২ সালে বোলোনিয়ায় এক ম্যাজিস্ট্রেটের অনুরোধে পরিচালিত অটপসিই ছিল প্রথম ফরেনসিক বা আইনি ময়নাতদন্ত, যার উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যুর মধ্যে ‘দোষ’ বা অপরাধের উপাদান আছে কি না তা নির্ণয় করা। ১৫শ শতকের ফ্লোরেন্টাইন চিকিৎসক আন্তোনিও বেনিভিয়েনি মৃত্যুর ‘কারণ নির্ধারণের’ উদ্দেশ্যে ১৫টি ময়নাতদন্ত করেছিলেন এবং মৃতদের পূর্ববর্তী উপসর্গের সঙ্গে তার পাওয়া ফলাফলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ মিল খুঁজে পান।

অটপসি বা ময়নাতদন্ত পূর্ণ বিকাশে পৌঁছে জিওভান্নি মরগাগনির হাতে, যিনি আধুনিক প্যাথলজির জনক। তিনি ১৭৬১ সালে বর্ণনা করেন দেহে খালি চোখে কী দেখা যায়। তার বিশাল গ্রন্থ On the Seats and Causes of Diseases as Investigated by Anatomy–তে তিনি প্রায় ৭০০ রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসাকালীন লক্ষণের সঙ্গে মৃত্যুর পর দেহে পাওয়া অ্যানাটমিক বৈশিষ্ট্যের তুলনা করেন। মরগাগনির কাজের মাধ্যমেই বই আর ব্যাখ্যার পরিবর্তে রোগী নিজেই হয়ে ওঠে অধ্যয়নের কেন্দ্রবিন্দু। ভিয়েনার কার্ল ভন রোকিটানস্কির (১৮০৪–৭৮) হাতে ময়নাতদন্ত উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছে। ফরাসি অ্যানাটমিস্ট ও ফিজিওলজিস্ট মেরি এফ এক্স বিচা (১৭৭১–১৮০২) রোগ অধ্যয়নে বিভিন্ন টিস্যু ও জৈব-ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তবে জার্মান প্যাথলজিস্ট রুডলফ ভির্খো (১৮২১–১৯০২) সেলুলার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন—যে রোগ বোঝার মূল হলো কোষের পরিবর্তন-প্যাথলজি ও ময়নাতদন্ত উভয়ক্ষেত্রে। তিনি কেবল প্যাথলজিকাল অ্যানাটমি-অর্থাৎ রোগাক্রান্ত টিস্যুর গঠন-নির্ভর অধ্যয়নের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, প্যাথলজির ভবিষ্যৎ হলো শারীরবৃত্তীয় প্যাথলজি, অর্থাৎ জীবদেহের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগ অনুসন্ধান।

ব্রিটিশ আমলের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ময়নাতদন্তের প্রচলন হয়। শুরুতে শুধুমাত্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই ময়নাতদন্তের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সময়ের পরিক্রমায় এখন দেশের জেলা সদর হাসপাতালগুলোতেও ময়নাতদন্ত কার্যক্রম চলে। তবে ময়নাতদন্তের কার্যক্রম জেলাসদর হাসপাতালগুলোতে চললেও প্রযুক্তিগত রাসায়নিক পরীক্ষার (ভিসেরা) জন্য দেশে শুধুমাত্র একটি ল্যাবরোটরি রয়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত এই ল্যাব পরিচালনার দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ল্যাব এবং জনবল সংকটের কারণে বাংলাদেশে ভিসেরা প্রতিবেদন তৈরি করা একটি সময় সাপেক্ষ বিষয়, এর ফলে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়।

সম্পর্কিত