মোহামেডান–আবাহনী ম্যাচ যেভাবে আকর্ষণ হারাল

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
মোহামেডান–আবাহনী ম্যাচ যেভাবে আকর্ষণ হারাল

সোমবার বাংলাদেশ ফুটবল লিগে মোহামেডান–আবাহনী ম্যাচ ছিল। এই বাক্যটা লিখে মনে হচ্ছে, এই প্রজন্মের কাছে ম্যাচটা হলেও কী, আর না হলেও কী! বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল লিগ নিয়ে এমনিতেই একমাত্র ফুটবল–সংশ্লিষ্ট ছাড়া আর কারও মাথা ব্যথা নেই। এমনকি হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম, কিউবা মিচেলদের আকর্ষণে জাতীয় দলের ম্যাচ দেখতে যেসব ফুটবলপ্রেমী রোমাঞ্চ অনুভব করেন, লিগ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই তাদেরও। কিন্তু মোহামেডান ও আবাহনী—এই দুটি নাম শুনলেই হয়তো এখনো একটা প্রজন্মের অনেকেই কিছুটা সচকিত হয়ে ওঠে। এই দুটি নামের সঙ্গে যে তাদের বহু নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে!

মোহামেডান দল। ছবিটি ১৯৮৭ মৌসুমের
মোহামেডান দল। ছবিটি ১৯৮৭ মৌসুমের

দেশের এই দুই দল যখন মুখোমুখি হয় মাঠে, তখন সেই প্রজন্মের কেউ কেউ হয়তো খোঁজে ম্যাচে কে জিতল, কে হারল। তারা সেই অতীতের দিনগুলোকে মনে মনে ফেরানোর চেষ্টা করেন, অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি তাদের রোমাঞ্চিত করে। কিন্তু কিছুতেই সেই অনুভূতি ফিরিয়ে আনা যায় না। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে তারা ভাবেন সেই কথাটা, যে দিন গেছে, তা কি একেবারেই গেছে?

সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে এ দেশে ফুটবল বিপুল জনপ্রিয় ছিল। ভাগ্যক্রমে ওই তিন দশক ফুটবল কিছু তারকাও পেয়েছিল। ব্যাপারটা যেন হঠাৎ করেই হাতে প্রচুর ধন সম্পত্তি পেয়ে যাওয়ার মতো কিছু ছিল। নিজেদের অর্জন করতে হয়নি, তৈরি করতে হয়নি। তাই সেটি টিকিয়ে রাখার দায় ছিল না কারওরই। কেউই ভাবেননি, যে সম্পদ দৈবক্রমে পাওয়া, সেটিকে টিকিয়ে রাখতে সৃজনশীল হতে হবে, নতুন কিছুর উদ্ভাবন ঘটাতে হবে। আবাহনী ও মোহামেডান দল দুটি সময়ের সঙ্গে কখনোই সৃজনশীল হতে পারেনি।

মোহামেডানের বয়স ৯০। আবাহনীর ৫০–এর বেশি। সময়ের বিচারে দুটিই পুরোনো ক্লাব। বলতে গেলে দেশের ফুটবলের ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের ফুটবল বলতে এই দুই ক্লাবের কথাই প্রথমে মনে হবে সবার। সে হিসেবে, এ দুটি ক্লাব বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড।

১৯৮৭ মৌসুমের আবাহনী।
১৯৮৭ মৌসুমের আবাহনী।

কিন্তু এ যুগে মোহামেডানের মতো ক্লাবের নিজস্ব ভেন্যু দূর থাক, অনুশীলনের জন্য কোনো উন্নতমানের মাঠই নেই। এই মাঠ, সেই মাঠ, কখনো ধূপখোলা, কখনো পল্টন ময়দান করে বেড়াতে হয় তাদের ফুটবল দলকে। আবাহনীর একটা বিশাল মাঠ আছে ঠিকই, কিন্তু সেই মাঠে গেলে বোঝার উপায় নেই, দেশের অন্যতম শীর্ষ ফুটবল ক্লাবের মাঠ সেটি।

আবাহনী–মোহামেডান নিয়ে উন্মাদনা বিষাদময় পরিস্থিতিও তৈরি করত
আবাহনী–মোহামেডান নিয়ে উন্মাদনা বিষাদময় পরিস্থিতিও তৈরি করত

ক্লাব সংস্কৃতি বলতে যেটি বোঝায়, এই দুই ক্লাবের কোনোটিই তা তৈরি করতে পারেনি। দুটি ক্লাবই নির্ভরশীল অনুদানের ওপর। চাঁদা তুলে চলে তাদের কার্যক্রম। খেলোয়াড় তৈরির কোনো প্রকল্প নেই, নিজেদের বাণিজ্যিকভাবে লাভবান করে তোলার কোনো সৃজনশীল কাঠামো নেই। এই দুটি ক্লাব গত ৫০ বছরে নতুন খেলোয়াড় তৈরির পদ্ধতিগত কোনো উদ্যোগ নেয়নি, ভাবা যায়!

সেই পুরোনো দিনে কী ফেরা যাবে?
সেই পুরোনো দিনে কী ফেরা যাবে?

যুগের সঙ্গে চলতে হয়, নচেৎ হারিয়ে যেতে হয়—এই সাধারণ কথাটা কি কখনো মাথায় খেলেছে আবাহনী কিংবা মোহামেডানের? ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নেওয়ার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। আচ্ছা, নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যখন দেশের ফুটবল জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে, আবাহনী–মোহামেডান লড়াইয়ে যখন দর্শক, আকর্ষণ সবই একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে, তখন তাদের উদ্যোগ কী ছিল, কেউ মনে করতে পারেন?

ফুটবল তো একটা বাজারজাত করার পণ্য। বাজারে যদি ক্রেতার মন কাড়া না যায়, ক্রেতাকে যদি নিজেদের গুরুত্ব না বোঝানো যায়, তাহলে হারিয়ে যেতে হয়। আবাহনী, মোহামেডান ঠিক সেভাবেই হারিয়ে গেছে।

বৈপ্লবিক কোনো উদ্যোগ ছাড়া এই দুই দলের লড়াইয়ে আকর্ষণ ফেরানো কঠিন, বাস্তবতা এটিই। কিন্তু এ যুগে এসেও তেমন কিছু কি তারা করছে? এই দুটি ক্লাব কি একবারও ভাবে না, যে প্রজন্ম এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের মন জয় করতে না পারলে, একসময় আবাহনী, মোহামেডানকে সেই ভাগ্যই বরণ করতে হবে, যে ভাগ্য বরণ করেছে দেশের আজাদ, ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডারার্সের মতো অনেক বড় বড় ক্লাবকে। এখন আবাহনী, মোহামেডান কী করবে, সেটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যাপার।

সম্পর্কিত