সিএনএনের প্রতিবেদন
চরচা ডেস্ক

এককালে তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। ছিলেন এমন এক বিপ্লবী নেতার কন্যা যার নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছিল তার রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তি।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির চূড়ায় ওঠার পরই ক্ষমতা থেকে শেখ হাসিনার নাটকীয় পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান।
২০২৪ সালে ছাত্র বিক্ষোভের সহিংস দমন-পীড়নের জন্য তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। যার ফলে তার ফাঁসির রায় হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড তখনই কার্যকর হতে পারে যদি নয়াদিল্লি তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রায় ১৫ বছর ধরে ধারাবাহিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর গতবছরের আগস্ট মাসে ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রী ভারতে পালিয়ে যান এবং তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশটির রাজধানীতে আশ্রয় নেন। এখন তিনি দুই দেশের মধ্যে এক তীব্র অচলাবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন। ঢাকা তাকে ফেরত চাইছে যাতে তাকে সেইসব অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করা যায় যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান বলেন, “জনগণের রোষ থেকে বাঁচতে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ভারতে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি সত্যিই এক অসাধারণ গল্প।”

এক রক্তাক্ত অতীত
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন শেক্সপীয়রীয় এক আখ্যান যা তার জন্মভূমির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ট্র্যাজেডি, নির্বাসন এবং ক্ষমতার এক মহাকাব্য।
জাতির জনক, ক্যারিশম্যাটিক শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে, তিনি বাংলাদেশের পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন এবং জীবনের প্রথম দিকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তবে তার পথকে সত্যিকারের রূপ দিয়েছিল ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের এক রক্তাক্ত রাত, এক নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থান।
সেদিন সেনা কর্মকর্তারা ঢাকার বাসভবনে তার বাবা, মা এবং তিন ভাইকে হত্যা করে। সেই সময় শেখ হাসিনা ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান।
এই অরাজক পরিস্থিতির মধ্যেই ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান যিনি ছিলেন তার ভবিষ্যতের প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার স্বামী। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এমন একটি আইন পাস করা হয়, যা দশকের পর দশক ধরে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের সুরক্ষা দেবে।
এক রাতের মধ্যে হাসিনার জীবন পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং তিনি ভারতে ছয় বছরের নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। এই নির্বাসনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের এই নেতার মনে ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা তৈরি করেছিল।
অবশেষে ১৯৮১ সালে যখন তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন বাংলাদেশের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ফিরিয়ে আনার জন্য সোচ্চার ছিল। তবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন যেখানে আরেকজন প্রধান ভূমিকায় থাকবেন আরেকজন নারী- খালেদা জিয়া। তিনিও আরেক ট্রাজেডির শিকার যার স্বামীও নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন।

নির্বাসন থেকে ফেরার দিনের কথা স্মরণ করে হাসিনা বলেন, “আমি যখন বিমানবন্দরে নামি, তখন আমার নিজের (আত্মীয়স্বজন) কাউকে পাইনি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।সেটাই ছিল আমার একমাত্র শক্তি।”
এইভাবেই শুরু হয় দুই বেগমের লড়াইয়ের যুগ। এই লড়াই দুই নারীরই ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের এই লড়াই ছিল দেশকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেওয়া এক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যা পরবর্তী তিন দশক ধরে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করেছে।
পালিয়ে গেলেন শেখ হাসিনা
বাবার প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করে হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। জিয়ার সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে তাকে গৃহবন্দিত্ব এবং কঠোর দমন-পীড়নের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল। অবশেষে ১৯৯৬ সালে, হাসিনা তার দলকে নির্বাচনে জয়ী করার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কাজ হিসেবে তিনি ঘোষণা দেন ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়েই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের অভিযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ একজন মুসলিম হিসেবে হাসিনা এক মেয়াদ সরকার পরিচালনা করেন। তবে পরবর্তী নির্বাচনে খালেদা জিয়ার কাছে পরাজিত হন। তবে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফিরে তিনি এক ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন। এবার তিনি আরও দৃঢ়, কম বিশ্বাসী এবং নিজের অবস্থান স্থায়ীভাবে পোক্ত করার ব্যাপারে অটল এক নেত্রী।
পরবর্তী ১৫ বছর তিনি ক্রমশ কঠোর হাতে বাংলাদেশ শাসন করেন, যার মধ্যে দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করে। একই সময়ে তিনি ভারতকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে নয়া দিল্লিকে শক্তিশালী করেন এমন এক অঞ্চলে, যেখানে প্রতিবেশী হিসেবে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ও চীন।
তবে বাংলাদেশেকে উন্নয়নের বদলে এক কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছিল যে তিনি এবং তার সরকার একদলীয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সমালোচকরা রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং গণমাধ্যম ও বিরোধী দলেকে হয়রানির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরকম চাপ বাড়তে থাকায়, হাসিনা পূর্ণাঙ্গ, প্রশ্নাতীত সমর্থনের জন্য ভারতের ওপর ভরসা করতে পারতেন বলে এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তবে দেশের অভ্যন্তরে, তার ভাবমূর্তি এক আগ্রাসী দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান বলেন, “ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি প্রচুর রক্তপাত ঘটিয়েছেন।”
দীর্ঘদিন ধরে হাসিনার প্রায় নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় ছিলেন। জনবিক্ষোভ, গ্রেপ্তার, হত্যাচেষ্টার মতো বহু ঝড় সামলে টিকে থাকার দক্ষতা তিনি বহুবার প্রমাণ করেছেন। কিন্তু গত বছর যে তরুণছাত্র ছাত্রীদের নেতৃত্বে যে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, তা ছিল ভিন্ন।
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও দ্রুতই তার পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে গর্জে ওঠে এক শক্তিশালী জনরোষ। শাসনব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম দমন-পীড়ন যেখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
কিন্তু এই রক্তপাত আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি।বরং এটিকে আরও উজ্জীবিত করেছে। জনগণের ক্ষোভ পরিণত হয়েছে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে, যা শেষ পর্যন্ত হাসিনার সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
মুবাশ্বার হাসান আরও বলেন, “হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এই ঘটনাটিতেই বোঝা যায় যে তিনি দোষী। জনগণ, রাষ্ট্রীয় বাহিনী সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল, কারণ তিনি সীমা অতিক্রম করেছিলেন। তার আদেশেই এত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।”
মৃত্যুদণ্ড
রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে নয়াদিল্লিতে হাসিনার জীবন তাঁকে প্রায় অর্ধ-শতাব্দী আগেকার নির্বাসিত জীবনেই ফিরিয়ে এনেছে। তার রাজনৈতিক জীবন যেন চক্রাকারে ঘুরছে।
হাসিনার বিচার তার অনুপস্থিতিতেই পরিচালিত হয়। তার নিজেরই প্রতিষ্ঠা করা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাপরাধ আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডে ঘোষণা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে হাসিনার বিরুদ্ধে প্রধানত যে অভিযোগগুলি আনা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল ২০২৪ এর আন্দোলনকারীদের হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা দেওয়া ফাঁসিতে ঝোলানোর নির্দেশ দেওয়া এবং অস্থিরতা দমন করার জন্য প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া।
আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে,আন্দোলনকারী ছাত্রদের হত্যার নির্দেশ তিনি (শেখ হাসিনা) নিজেই দিয়েছিলেন, আর এই বিষয়টি স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ে এজলাসে করতালি ও অশ্রুসিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
নিহত এক ছাত্রের বাবা আব্দুর রব রয়টার্সকে বলেন, “এটা আমাদের কিছুটা শান্তি দিয়েছে। কিন্তু যখন আমরা তাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে দেখবো, তখনই আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হব।”
ভারতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও তারা এই রায়ের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং ‘সকল অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত’ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শেখ হাসিনার পরিবার তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য নয়াদিল্লির প্রশংসা করেছে। হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ স্থানীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “ভারত সবসময়ই একজন ভালো বন্ধু। এই সংকটের সময়ে ভারত মূলত আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।”
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাসিনা ভারতের অন্যতম আঞ্চলিক মিত্র ছিলেন। তার সরকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা ভারত-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পূর্বে হাসিনা সরকারের প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তিনি দুই দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্তকে সুরক্ষিত রেখেছেন। তবে এখন তার সরকারের পতনের ফলে নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে, মৌলবাদী ইসলামী গোষ্ঠীগুলি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
ভারতের কূটনীতিক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক কর্মকর্তা অনিল ত্রিগুণায়েত বলেছেন যে, নয়াদিল্লি শেখ হাসিনাকে কারাগারে বা মৃত্যুদণ্ডের মুখে ঠেলে দিতে দেশে ফেরত পাঠাবে বলে তিনি মনে করেন না।
ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রী তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার এই অবস্থান ভারতের জন্য এমন একটি সম্ভাব্য যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভারতের প্রত্যর্পণ আইনে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তিতেও, ব্যতিক্রমের বিধান রয়েছে। এটি মূলত এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অপরাধ রাজনৈতিক হলে একটি রাষ্ট্র প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
অনিল ত্রিগুণায়েত বলেন, “শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভারতকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখতে হবে।”
তবে ত্রিগুণায়েত এটাও বলেছেন হাসিনার সামনে সব রাস্তা এখনো বন্ধ হয়ে যাইনি। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন, এবং তারপর হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও যেতে পারেন।
ত্রিগুণায়েত বলেন, “যেহেতু এখনও সবধরনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়নি, তাই ভারত তাকে পাঠানোর জন্য তাড়াহুড়ো করবে না।”
যেদিন হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়, সেদিনই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনতিবিলম্বে তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, “দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারতের দায়িত্ব।”
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার রায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য এক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তার দল আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ এবং দলের নেতাকর্মীও অনুপস্থিত। আর এই অবস্থায় নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশকেগভীর মেরুকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের করে আনার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং অন্যান্য ডজনখানেক ছোট দলের জন্য ভবিষ্যত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দেশের গভীর প্রোথিত এই বিভাজনগুলি সহজে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান মন্তব্য করেন, “এই পর্যায়ে বাংলাদেশ সমঝোতা থেকে অনেক দূরে।”
তিনি বলেন, হাসিনার নেতৃত্বে না হলেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারে।
এখন প্রশ্ন, হাসিনার পতন কি একটি ভয়ঙ্কর যুগের সমাপ্তি, নাকি কেবল অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়ের সূচনা?
সিএনএনর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত

এককালে তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত। ছিলেন এমন এক বিপ্লবী নেতার কন্যা যার নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছিল তার রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তি।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির চূড়ায় ওঠার পরই ক্ষমতা থেকে শেখ হাসিনার নাটকীয় পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান।
২০২৪ সালে ছাত্র বিক্ষোভের সহিংস দমন-পীড়নের জন্য তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। যার ফলে তার ফাঁসির রায় হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড তখনই কার্যকর হতে পারে যদি নয়াদিল্লি তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রায় ১৫ বছর ধরে ধারাবাহিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর গতবছরের আগস্ট মাসে ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রী ভারতে পালিয়ে যান এবং তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশটির রাজধানীতে আশ্রয় নেন। এখন তিনি দুই দেশের মধ্যে এক তীব্র অচলাবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন। ঢাকা তাকে ফেরত চাইছে যাতে তাকে সেইসব অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করা যায় যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান বলেন, “জনগণের রোষ থেকে বাঁচতে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ভারতে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি সত্যিই এক অসাধারণ গল্প।”

এক রক্তাক্ত অতীত
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন শেক্সপীয়রীয় এক আখ্যান যা তার জন্মভূমির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ট্র্যাজেডি, নির্বাসন এবং ক্ষমতার এক মহাকাব্য।
জাতির জনক, ক্যারিশম্যাটিক শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে, তিনি বাংলাদেশের পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন এবং জীবনের প্রথম দিকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তবে তার পথকে সত্যিকারের রূপ দিয়েছিল ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের এক রক্তাক্ত রাত, এক নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থান।
সেদিন সেনা কর্মকর্তারা ঢাকার বাসভবনে তার বাবা, মা এবং তিন ভাইকে হত্যা করে। সেই সময় শেখ হাসিনা ও তার বোন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান।
এই অরাজক পরিস্থিতির মধ্যেই ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান যিনি ছিলেন তার ভবিষ্যতের প্রধান প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার স্বামী। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এমন একটি আইন পাস করা হয়, যা দশকের পর দশক ধরে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের সুরক্ষা দেবে।
এক রাতের মধ্যে হাসিনার জীবন পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং তিনি ভারতে ছয় বছরের নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। এই নির্বাসনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের এই নেতার মনে ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা তৈরি করেছিল।
অবশেষে ১৯৮১ সালে যখন তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন বাংলাদেশের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ফিরিয়ে আনার জন্য সোচ্চার ছিল। তবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন যেখানে আরেকজন প্রধান ভূমিকায় থাকবেন আরেকজন নারী- খালেদা জিয়া। তিনিও আরেক ট্রাজেডির শিকার যার স্বামীও নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন।

নির্বাসন থেকে ফেরার দিনের কথা স্মরণ করে হাসিনা বলেন, “আমি যখন বিমানবন্দরে নামি, তখন আমার নিজের (আত্মীয়স্বজন) কাউকে পাইনি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।সেটাই ছিল আমার একমাত্র শক্তি।”
এইভাবেই শুরু হয় দুই বেগমের লড়াইয়ের যুগ। এই লড়াই দুই নারীরই ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের এই লড়াই ছিল দেশকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেওয়া এক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যা পরবর্তী তিন দশক ধরে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করেছে।
পালিয়ে গেলেন শেখ হাসিনা
বাবার প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করে হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। জিয়ার সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে তাকে গৃহবন্দিত্ব এবং কঠোর দমন-পীড়নের পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল। অবশেষে ১৯৯৬ সালে, হাসিনা তার দলকে নির্বাচনে জয়ী করার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কাজ হিসেবে তিনি ঘোষণা দেন ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়েই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের অভিযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ একজন মুসলিম হিসেবে হাসিনা এক মেয়াদ সরকার পরিচালনা করেন। তবে পরবর্তী নির্বাচনে খালেদা জিয়ার কাছে পরাজিত হন। তবে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফিরে তিনি এক ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন। এবার তিনি আরও দৃঢ়, কম বিশ্বাসী এবং নিজের অবস্থান স্থায়ীভাবে পোক্ত করার ব্যাপারে অটল এক নেত্রী।
পরবর্তী ১৫ বছর তিনি ক্রমশ কঠোর হাতে বাংলাদেশ শাসন করেন, যার মধ্যে দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করে। একই সময়ে তিনি ভারতকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে নয়া দিল্লিকে শক্তিশালী করেন এমন এক অঞ্চলে, যেখানে প্রতিবেশী হিসেবে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ও চীন।
তবে বাংলাদেশেকে উন্নয়নের বদলে এক কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছিল যে তিনি এবং তার সরকার একদলীয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সমালোচকরা রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং গণমাধ্যম ও বিরোধী দলেকে হয়রানির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরকম চাপ বাড়তে থাকায়, হাসিনা পূর্ণাঙ্গ, প্রশ্নাতীত সমর্থনের জন্য ভারতের ওপর ভরসা করতে পারতেন বলে এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তবে দেশের অভ্যন্তরে, তার ভাবমূর্তি এক আগ্রাসী দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান বলেন, “ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি প্রচুর রক্তপাত ঘটিয়েছেন।”
দীর্ঘদিন ধরে হাসিনার প্রায় নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় ছিলেন। জনবিক্ষোভ, গ্রেপ্তার, হত্যাচেষ্টার মতো বহু ঝড় সামলে টিকে থাকার দক্ষতা তিনি বহুবার প্রমাণ করেছেন। কিন্তু গত বছর যে তরুণছাত্র ছাত্রীদের নেতৃত্বে যে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল, তা ছিল ভিন্ন।
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও দ্রুতই তার পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে গর্জে ওঠে এক শক্তিশালী জনরোষ। শাসনব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম দমন-পীড়ন যেখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে।
কিন্তু এই রক্তপাত আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি।বরং এটিকে আরও উজ্জীবিত করেছে। জনগণের ক্ষোভ পরিণত হয়েছে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে, যা শেষ পর্যন্ত হাসিনার সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
মুবাশ্বার হাসান আরও বলেন, “হাসিনা পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এই ঘটনাটিতেই বোঝা যায় যে তিনি দোষী। জনগণ, রাষ্ট্রীয় বাহিনী সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল, কারণ তিনি সীমা অতিক্রম করেছিলেন। তার আদেশেই এত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।”
মৃত্যুদণ্ড
রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে নয়াদিল্লিতে হাসিনার জীবন তাঁকে প্রায় অর্ধ-শতাব্দী আগেকার নির্বাসিত জীবনেই ফিরিয়ে এনেছে। তার রাজনৈতিক জীবন যেন চক্রাকারে ঘুরছে।
হাসিনার বিচার তার অনুপস্থিতিতেই পরিচালিত হয়। তার নিজেরই প্রতিষ্ঠা করা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাপরাধ আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডে ঘোষণা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে হাসিনার বিরুদ্ধে প্রধানত যে অভিযোগগুলি আনা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল ২০২৪ এর আন্দোলনকারীদের হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা দেওয়া ফাঁসিতে ঝোলানোর নির্দেশ দেওয়া এবং অস্থিরতা দমন করার জন্য প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া।
আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে,আন্দোলনকারী ছাত্রদের হত্যার নির্দেশ তিনি (শেখ হাসিনা) নিজেই দিয়েছিলেন, আর এই বিষয়টি স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ে এজলাসে করতালি ও অশ্রুসিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
নিহত এক ছাত্রের বাবা আব্দুর রব রয়টার্সকে বলেন, “এটা আমাদের কিছুটা শান্তি দিয়েছে। কিন্তু যখন আমরা তাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে দেখবো, তখনই আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হব।”
ভারতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও তারা এই রায়ের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং ‘সকল অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত’ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শেখ হাসিনার পরিবার তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য নয়াদিল্লির প্রশংসা করেছে। হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ স্থানীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “ভারত সবসময়ই একজন ভালো বন্ধু। এই সংকটের সময়ে ভারত মূলত আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।”
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাসিনা ভারতের অন্যতম আঞ্চলিক মিত্র ছিলেন। তার সরকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করা ভারত-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পূর্বে হাসিনা সরকারের প্রশংসা করে বলেছিলেন যে তিনি দুই দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্তকে সুরক্ষিত রেখেছেন। তবে এখন তার সরকারের পতনের ফলে নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে, মৌলবাদী ইসলামী গোষ্ঠীগুলি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
ভারতের কূটনীতিক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক কর্মকর্তা অনিল ত্রিগুণায়েত বলেছেন যে, নয়াদিল্লি শেখ হাসিনাকে কারাগারে বা মৃত্যুদণ্ডের মুখে ঠেলে দিতে দেশে ফেরত পাঠাবে বলে তিনি মনে করেন না।
ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রী তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার এই অবস্থান ভারতের জন্য এমন একটি সম্ভাব্য যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভারতের প্রত্যর্পণ আইনে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তিতেও, ব্যতিক্রমের বিধান রয়েছে। এটি মূলত এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অপরাধ রাজনৈতিক হলে একটি রাষ্ট্র প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
অনিল ত্রিগুণায়েত বলেন, “শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভারতকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখতে হবে।”
তবে ত্রিগুণায়েত এটাও বলেছেন হাসিনার সামনে সব রাস্তা এখনো বন্ধ হয়ে যাইনি। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন, এবং তারপর হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও যেতে পারেন।
ত্রিগুণায়েত বলেন, “যেহেতু এখনও সবধরনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়নি, তাই ভারত তাকে পাঠানোর জন্য তাড়াহুড়ো করবে না।”
যেদিন হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়, সেদিনই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনতিবিলম্বে তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, “দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারতের দায়িত্ব।”
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার রায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য এক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তার দল আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ এবং দলের নেতাকর্মীও অনুপস্থিত। আর এই অবস্থায় নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশকেগভীর মেরুকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের করে আনার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং অন্যান্য ডজনখানেক ছোট দলের জন্য ভবিষ্যত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দেশের গভীর প্রোথিত এই বিভাজনগুলি সহজে সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান মন্তব্য করেন, “এই পর্যায়ে বাংলাদেশ সমঝোতা থেকে অনেক দূরে।”
তিনি বলেন, হাসিনার নেতৃত্বে না হলেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারে।
এখন প্রশ্ন, হাসিনার পতন কি একটি ভয়ঙ্কর যুগের সমাপ্তি, নাকি কেবল অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায়ের সূচনা?
সিএনএনর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত