রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার শুরু, এখনো কারাগারে সাংবাদিকরা
ফজলে রাব্বি
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ৪৪
ছবি: ফেসবুক
১৫ ডিসেম্বর ২০২৫। আগের রাতেই বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে। পুলিশের ভাষ্য- টেলিভিশন আলোচনায় দেওয়া বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন’ করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয় তাকে। কয়েক দফা শুনানির পর কারাগারে পাঠানো হয়। ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়। তিনি এখনো জেলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘অযৌক্তিক অভিযোগে’ কারাগারে যেতে হয়েছে মঞ্জুর আলম পান্নাসহ অনেককে। এখনো বিনা বিচারে কারাবন্দি আছেন অনেক সংবাদকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও গুণিজনরা। লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্তসহ অনেক সাংবাদিককে জুলাই হত্যা মামলা কিংবা হত্যার উসকানি দেওয়ার মামলায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। অনেক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার না করলেও তাদের হত্যা মামলার আসাসি করে রাখা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ৪৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন; তাদের মধ্যে ২৬৬ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
বৈশ্বিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ শতাধিক সাংবাদিককে বিচারাধীন মামলায় আটক করে রাখা হয়েছে।
সাংবাদিক হয়রারি ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ইন্টরন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট, আইএফজে এবং নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো বৈশ্বিক সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। ইউনূস সরকারের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধরন নিয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, “মত প্রকাশ তো দূরের কথা এখন সাংবাদিকদের জীবন রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।” বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সক্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির এই সব ঘটনা জানা।
২০০৬ এর পর ২০২৬। ২০ বছর পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় প্রজন্মের হাত ধরে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমানের হাত ধরে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পাবে রাজপথে এই প্রতিশ্রুতি বিএনপি বারবার দিয়েছে।
ক্ষমতার বাইরে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের পুরোটা সময় সাগর-রুনী হত্যার বিচার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। এখন, তারা ক্ষমতাসীন। সঙ্গত কারনেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের ভয়হীন পরিবেশ বিএনপি নিশ্চিত করবে- এই প্রত্যাশা সবার। নিকট অতীতে সংবাদকর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ সরকারের অতি তোষণের অভিযোগ আছে। তারপরও সাংবাদিকতার মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় আছে সরকারের।
এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবু সাঈদ খান চরচাকে বলেন, “সাংবাদিকতায় দলকানা আচরণ কোনো অবস্থাতে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরে রাখাও অগ্রহণযোগ্য। যদি কারো বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লেজুরবৃত্তির অভিযোগ থাকে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য-প্রমান থাকে তাহলে প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
ফাইল ছবি
দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় এক হাজার ছয়টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব মামলার বড় অংশই পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মামলা জট কমাতে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখছেন সাংবাদিক মাসুদ কামাল। একই সাথে তিনি বলেন, “গত আঠারো মাসে মবের মাধ্যমে হযরানি ও হত্যা মামলার মতো বানোয়াট মামলায় কারাগারে পাঠানো সাংবাদিকদের অবিলম্বে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জামিন দিতে হবে।” এ বিষয়ে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রত্যাশা করেন তিনি।
২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক চাপ কমানোর কথাও আছে সেখানে। রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ সেই অঙ্গীকারের একটি অংশ পূরণের ইঙ্গিত দেয়। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্যোগসহ নানা ধরনের মানবিক উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে নয়া সরকার। কিন্তু আটক সাংবাদিকদের দ্রুত জামিন বা মামলা পুনর্বিবেচনার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, “আঠারো মাসে শুধু সাংবাদিক না, অনেক সাংস্কৃতিক কর্মীও ইউনূস সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাহরিয়ার কবিরসহ অনেক সিনিয়র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরে রাখা হয়েছে। তাদের যদি কোন অপরাধ থাকে তার বিচার করেন। কিন্তু মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করেন। এই সরকারের কাছে এইটা ন্যূনতম প্রত্যাশা।”
সরকার কাজ শুরু করছে মাত্র এক সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে হয়তো তারা সাংবাদিকদের নিয়ে ভাববার সময় পায়নি বলে ধরে নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। একই সাথে, খবরের মানুষদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে নতুন সরকার দেরি করবে না বলেও মনে করছেন তারা।
এক্ষেত্রে আবু সাঈদ খান বলেন, “যদিও বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র এক সপ্তাহ এবং তাদের নীতি নির্ধারণে সময়ের প্রয়োজন, তবুও আমি মনে করি যারা সরাসরি কোনো অপরাধের সাথে জড়িত নন, তাদের বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করা উচিত। সরকারের উচিত হবে না সাংবাদিকদের দলদাস হিসেবে ব্যবহার করার পুরনো ট্রেন্ড বজায় রাখা।”
মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে বিএনপির আগের ইতিহাস মোচনের দায় আছে বলেও সতর্ক করেছেন অনেক সাংবাদিক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সাংবাদিক নির্যাতনের একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। ২০০৪ সালে খুলনায় বোমা হামলায় নিহত হন সাংবাদিক মানিক সাহা। সে সময় রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট বাংলাদেশকে সাংবাদিকদের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো এবং দায়মুক্তিরও সংস্কৃতির সমালোচনা করেছিল।
এবার, ক্ষমতায় আসার আগেই কয়েকটি গণমাধ্যমের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব খাটানো এবং সম্পাদকীয় নীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে। এতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরক্ষোভাবে নানা দুর্দশায় পড়ছেন পেশাদার সাংবাদিকরা। আবু সাঈদ খান বলেন, এর জন্য সাংবাদিকদেরও দায় রয়েছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো চরমভাবে বিভক্ত। অতীতে নির্মল সেন বা কামাল লোহানীর মতো সাংবাদিকরা ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের হলেও সাংবাদিকদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে এক পক্ষ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে আছে, অন্য পক্ষ কার্যকর কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না। সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় এই বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।”
২০ বছর পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা বিএনপি ন্যায় পরায়নতার দিকেই হাঁটবে বলে প্রতাশ্যা করছেন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। সরকারের সমালোচকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে শক্তিশালী হয় গণতান্ত্রিক সরকার।
রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হবে-সমালোচনামূলক কণ্ঠ কতটা নিরাপদ, সাংবাদিকরা কতটা ভয়হীনভাবে কাজ করতে পারেন, এবং আইনের শাসন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ হয়-তার ওপর। আটক সাংবাদিকদের দ্রুত জামিন বা ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় মুক্তির উদ্যোগ শুধু পেশাগত দাবি নয়; আগামী দিনে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত বলে মনে করছেন অনেকে।
ছবি: ফেসবুক
১৫ ডিসেম্বর ২০২৫। আগের রাতেই বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে। পুলিশের ভাষ্য- টেলিভিশন আলোচনায় দেওয়া বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন’ করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয় তাকে। কয়েক দফা শুনানির পর কারাগারে পাঠানো হয়। ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়। তিনি এখনো জেলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘অযৌক্তিক অভিযোগে’ কারাগারে যেতে হয়েছে মঞ্জুর আলম পান্নাসহ অনেককে। এখনো বিনা বিচারে কারাবন্দি আছেন অনেক সংবাদকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও গুণিজনরা। লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্তসহ অনেক সাংবাদিককে জুলাই হত্যা মামলা কিংবা হত্যার উসকানি দেওয়ার মামলায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। অনেক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার না করলেও তাদের হত্যা মামলার আসাসি করে রাখা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ৪৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন; তাদের মধ্যে ২৬৬ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
বৈশ্বিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ শতাধিক সাংবাদিককে বিচারাধীন মামলায় আটক করে রাখা হয়েছে।
সাংবাদিক হয়রারি ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ইন্টরন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট, আইএফজে এবং নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো বৈশ্বিক সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। ইউনূস সরকারের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধরন নিয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, “মত প্রকাশ তো দূরের কথা এখন সাংবাদিকদের জীবন রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।” বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সক্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির এই সব ঘটনা জানা।
২০০৬ এর পর ২০২৬। ২০ বছর পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় প্রজন্মের হাত ধরে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমানের হাত ধরে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পাবে রাজপথে এই প্রতিশ্রুতি বিএনপি বারবার দিয়েছে।
ক্ষমতার বাইরে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের পুরোটা সময় সাগর-রুনী হত্যার বিচার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। এখন, তারা ক্ষমতাসীন। সঙ্গত কারনেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের ভয়হীন পরিবেশ বিএনপি নিশ্চিত করবে- এই প্রত্যাশা সবার। নিকট অতীতে সংবাদকর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ সরকারের অতি তোষণের অভিযোগ আছে। তারপরও সাংবাদিকতার মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় আছে সরকারের।
এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবু সাঈদ খান চরচাকে বলেন, “সাংবাদিকতায় দলকানা আচরণ কোনো অবস্থাতে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরে রাখাও অগ্রহণযোগ্য। যদি কারো বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লেজুরবৃত্তির অভিযোগ থাকে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য-প্রমান থাকে তাহলে প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
ফাইল ছবি
দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় এক হাজার ছয়টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসব মামলার বড় অংশই পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মামলা জট কমাতে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখছেন সাংবাদিক মাসুদ কামাল। একই সাথে তিনি বলেন, “গত আঠারো মাসে মবের মাধ্যমে হযরানি ও হত্যা মামলার মতো বানোয়াট মামলায় কারাগারে পাঠানো সাংবাদিকদের অবিলম্বে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জামিন দিতে হবে।” এ বিষয়ে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতির প্রত্যাশা করেন তিনি।
২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক চাপ কমানোর কথাও আছে সেখানে। রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ সেই অঙ্গীকারের একটি অংশ পূরণের ইঙ্গিত দেয়। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্যোগসহ নানা ধরনের মানবিক উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে নয়া সরকার। কিন্তু আটক সাংবাদিকদের দ্রুত জামিন বা মামলা পুনর্বিবেচনার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, “আঠারো মাসে শুধু সাংবাদিক না, অনেক সাংস্কৃতিক কর্মীও ইউনূস সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাহরিয়ার কবিরসহ অনেক সিনিয়র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরে রাখা হয়েছে। তাদের যদি কোন অপরাধ থাকে তার বিচার করেন। কিন্তু মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করেন। এই সরকারের কাছে এইটা ন্যূনতম প্রত্যাশা।”
সরকার কাজ শুরু করছে মাত্র এক সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে হয়তো তারা সাংবাদিকদের নিয়ে ভাববার সময় পায়নি বলে ধরে নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। একই সাথে, খবরের মানুষদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে নতুন সরকার দেরি করবে না বলেও মনে করছেন তারা।
এক্ষেত্রে আবু সাঈদ খান বলেন, “যদিও বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র এক সপ্তাহ এবং তাদের নীতি নির্ধারণে সময়ের প্রয়োজন, তবুও আমি মনে করি যারা সরাসরি কোনো অপরাধের সাথে জড়িত নন, তাদের বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করা উচিত। সরকারের উচিত হবে না সাংবাদিকদের দলদাস হিসেবে ব্যবহার করার পুরনো ট্রেন্ড বজায় রাখা।”
মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নে বিএনপির আগের ইতিহাস মোচনের দায় আছে বলেও সতর্ক করেছেন অনেক সাংবাদিক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সাংবাদিক নির্যাতনের একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। ২০০৪ সালে খুলনায় বোমা হামলায় নিহত হন সাংবাদিক মানিক সাহা। সে সময় রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট বাংলাদেশকে সাংবাদিকদের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো এবং দায়মুক্তিরও সংস্কৃতির সমালোচনা করেছিল।
এবার, ক্ষমতায় আসার আগেই কয়েকটি গণমাধ্যমের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব খাটানো এবং সম্পাদকীয় নীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে। এতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরক্ষোভাবে নানা দুর্দশায় পড়ছেন পেশাদার সাংবাদিকরা। আবু সাঈদ খান বলেন, এর জন্য সাংবাদিকদেরও দায় রয়েছে। তিনি বলেন, “বর্তমানে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো চরমভাবে বিভক্ত। অতীতে নির্মল সেন বা কামাল লোহানীর মতো সাংবাদিকরা ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের হলেও সাংবাদিকদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে এক পক্ষ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে আছে, অন্য পক্ষ কার্যকর কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না। সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় এই বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।”
২০ বছর পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা বিএনপি ন্যায় পরায়নতার দিকেই হাঁটবে বলে প্রতাশ্যা করছেন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। সরকারের সমালোচকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে শক্তিশালী হয় গণতান্ত্রিক সরকার।
রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হবে-সমালোচনামূলক কণ্ঠ কতটা নিরাপদ, সাংবাদিকরা কতটা ভয়হীনভাবে কাজ করতে পারেন, এবং আইনের শাসন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ হয়-তার ওপর। আটক সাংবাদিকদের দ্রুত জামিন বা ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় মুক্তির উদ্যোগ শুধু পেশাগত দাবি নয়; আগামী দিনে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত বলে মনে করছেন অনেকে।