সংকটে দক্ষিণ আফ্রিকা

বাবা থেকেও নেই ঘরে, ভবিষ্যৎ অন্ধকারে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাবা থেকেও নেই ঘরে, ভবিষ্যৎ অন্ধকারে
প্রতীকী ছবি। ছবি: পেক্সেলস

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের দরিদ্র এলাকা খায়েলিটশার। সেখানে ভরা মজলিসে পুরুষদের এনজিও কর্মী ভিক্টর পাইক বলছিলেন, বাবা ছাড়া সন্তান এক শূন্যতার মুখোমুখি হয়। ভিক্টর ফাদার অ্য নেশন নামের একটি এনজিওর কর্মী। এই সংস্থাটি বাবাদের আরও দায়িত্বশীল বানানোর জন্য কাজ করে। ভিক্টর বলেন, ‘আমাদের জাতি ভেঙে পড়েছে কারণ এখানে বাবারা থাকেন না। আমরা এক বাবাহীন জাতি।’

পরিসংখ্যানও তাই বলছে । আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ফ্যামিলি স্টাডিজ-এর গবেষণা অনুযায়ী ৪৩টি দেশের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকাই একমাত্র দেশ, যেখানে অর্ধেকেরও কম শিশু তাদের বাবা-মা উভয়ের সঙ্গে বড় হচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় মাত্র ৩৬ শতাংশ শিশু—আর কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ জন্মদাতা বাবার সঙ্গে থাকে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাবা ছাড়া বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবনে নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে ফল খারাপ হয়। এছাড়া ভবিষ্যতে বেকারত্ব কিংবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কাও থাকে। সবচেয়ে দরিদ্র শিশুরাই বাবাহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, যদিও এখানে কারণটা স্পষ্ট নয়। তবু সাধারণ যুক্তি, আর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে—বাবা পাশে থাকলে সন্তানের জীবনে ভালো কিছুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক সমস্যার মধ্যে একটি হলো শিশুদের বাবা ছাড়াই বেড়ে ওঠার ব্যাপারটি। সন্তান জন্ম দিয়ে অনেক সময়ই বাবারা সংসার ছেড়ে চলে যান। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থবির অর্থনীতির প্রভাব। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের যুগে কালো পুরুষদের গ্রাম থেকে বাধ্যতামূলকভাবে খনিতে ও কারখানার শ্রমে নিয়োগ করা হতো। আর তাঁদের নিজ নিজ পরিবারের লোকজনকে গ্রামে ফেলে আসতে হতো। নোবেল বিজয়ী ডেসমন্ড টুটু ১৯৮৪ সালে বলেছিলেন, ‘বর্ণবাদ এক ক্যানসার, যা পরিবারের ভেতরটা ধ্বংস করছে।’

পাইক জানান, তাঁর বাবা একটি সোনার খনিতে কাজ করতেন, আর তিনি বছরে মাত্র পাঁচ দিন বাবাকে দেখতেন। খায়েলিটশার বৈঠকে উপস্থিত অনেকেই বলেন, তাঁদের বাবারা কখনো বাড়িতে ফেরেননি। একজন জানান, বড়দিনে উপহার না পাওয়ায় বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত।

কিন্তু কেন গণতন্ত্র আসার পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় বাবাহীনতার প্রবণতা আরও বেড়েছে?

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনীতিতে পরিবর্তন এলেও অর্থনীতির গঠন বদলায়নি। আবার নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠায় তাদের স্বামীদের কাছ থেকে আলাদা থাকার প্রবণতা বেড়েছে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বেড়েছে, মজুরি ব্যবধান কমেছে, আর শিশুভাতা পরিবারে কিছুটা হলেও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার এখনো সমাজে বাবাদের মূলত অর্থ উপার্জনকারী হিসেবেই দেখা হয়। অনেকেই নিজেদেরকে ‘এটিএম বাবা’ বলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পুরুষদের বিয়ের আগে লোবোলা (পণ) দিয়ে বিয়ে করতে হয়। অবৈধ সন্তান হলে তারা ক্ষতিপূরণ দিতে পারে।

যেসব বাবা তাদের সন্তানদের জীবনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চান, তাদের কাছে এসব সামাজিক রীতিনীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে বেশিরভাগ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ বেকার অথবা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে জীবিকা নির্বাহ করেন। ব্যাপক বেকারত্ব সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। ১৯৯৪ সালে যেখানে বেকারত্ব ছিল ২০ শতাংশ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ।

খায়েলিটশার ওই বৈঠকে এক অংশগ্রহণকারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে সুপারহিরো হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়—যেন আমরা সবকিছু উপার্জন করতে পারি।’

তবে বাবাহীন শিশুদের মায়েরা একা বড় করছেন, তা নয়। কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলোতে যৌথ পরিবার প্রথার প্রচলন বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার মোট জনসংখ্যা ৮২ শতাংশই কৃষ্ণাঙ্গ। আর এরমধ্যে ৬৬ শতাংশ পরিবারই যৌথভাবে বসবাস করে। সুতরাং অনেক ক্ষেত্রেই নানা-দাদি, চাচা-মামারা বাবাহীন শিশুদের লালনপালনে ভূমিকা রাখেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ সাল থেকে আরও বেশি শিশু জন্মদাতা বাবার পরিবর্তে অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে বসবাস করছে। তারা সামাজিক বাবা হিসেবে সমাজে পরিচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা অনেকে শিশুদের পড়াশোনায় সাহায্য করেন, গল্পের বই পড়ান, এমনকি আর্থিক সহায়তাও দেন।

২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেন, ‘বাবা না থাকার সমস্যা আমাদের জাতির অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি।’ তবু সরকার এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তবে এ সমস্যা সমাধানে এনজিওগুলো কাজ করছে।

ফাদার অ্য নেশন ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও বাবাদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ দিচ্ছে। হার্টলাইন্স নামে একটি এনজিও হোয়াটসঅ্যাপে বাবাদের জন্য কোচিং সার্ভিস চালু করেছে। আবার ছোট চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে ইতিবাচক পিতৃত্বের ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এসব প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে তা অনিশ্চিত। দুই বছর আগে টিকটকে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে এক দক্ষিণ আফ্রিকার কিশোর প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে তার বাবার মতোই নিজের সন্তানকে অবহেলা করবে। তবুও খায়েলিটশার বৈঠকে পাইক হাল ছাড়েননি। প্রার্থনা শেষে তিনি বলেন, ‘ঈশ্বর যেন আমাদের সাহায্য করেন, যাতে আমরা আমাদের বাবাদের ভুলগুলো আর না করি, বা পুনরাবৃত্তি না করি।’

সম্পর্কিত