এইচআরের চাকরি থাকবে তো?

যুক্তরাষ্ট্রে গত দশ বছরে মানবসম্পদ পেশাদারদের সংখ্যা ৬৪ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালে এসে ১৩ লাখে দাঁড়িয়েছে।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এইচআরের চাকরি থাকবে তো?
সম্প্রতি অ্যামাজনের মতো বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ছাঁটাই করা ১৪ হাজার কর্মীর মধ্যেও অনেকেই এইচআর বিভাগের। ছবি: ফ্রিপিক

করপোরেট জগতে ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করছে এইচআর বা মানবসম্পদ পেশা। সারা বিশ্বেই এই পেশাজীবীদের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে তাদের কাজের পরিধিও প্রসারিত হচ্ছে। তবে এই পেশার সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে গত দশ বছরে মানবসম্পদ পেশাদারদের সংখ্যা ৬৪ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালে এসে ১৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। যেখানে দেশটিতে এ সময়ে সামগ্রিক কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ। কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়-অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও জার্মানিতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

কর্মক্ষেত্রে এই পেশার মর্যাদাও দিন দিন বাড়ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিক ব্লুম ও মের্ট আকানের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের (সিএইচআরও) বেতন অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। এমনকি সিএইচআরওরা কোম্পানির সর্বোচ্চ নেতৃত্বেও জায়গা করে নিচ্ছেন।

আমেরিকার সর্ববৃহৎ গাড়ি প্রস্তুতকারক জেনারেল মোটরসের (জিএম) প্রধান নির্বাহী মেরি বাররা আগে সংস্থাটির শীর্ষ মানবসম্পদ কর্মকর্তা ছিলেন। ডানকিন’ ব্র্যান্ডস ও শ্যানেলের মতো সংস্থার নেতৃত্বেও দায়িত্ব পেয়েছেন মানবসম্পদ পেশাজীবীরা।

এই পেশার উত্থানের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে একটি হলো-সেরা প্রতিভা ধরে রাখার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি।

নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ম্যানপাওয়ার গ্রুপের বার্ষিক বৈশ্বিক জরিপে ৭৪ শতাংশ কোম্পানি জানিয়েছে, তারা দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির মুখে। বাড়ছে বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছে নতুন দক্ষতার চাহিদা।

আরেকটি কারণ হলো, কর্মক্ষেত্রে অস্থিরতা-যা মানবসম্পদ পেশাজীবীদের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, কনসালটেন্সি কর্ন ফেরির এমিলি পেট্রোন বলেন, ‘মি টু’ আন্দোলনে কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বিষয়টি সামনে আসে। এরপর করোনা চলাকালে বাসা থেকে কাজ, কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুস্থতা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও মানবসম্পদ পেশাজীবীদের ওপর পড়ে। পরে আসে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই) উদ্যোগ-যা এই পেশাজীবীদের জন্য অসংখ্য নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি।

দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য এইচআরের অনেক কাজই এআই-এর হাতে চলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য এইচআরের অনেক কাজই এআই-এর হাতে চলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

এ ছাড়া এখন কর্মীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অনেক সচেতন। বিভিন্ন দেশের সরকার কর্মীদের জন্য যেসব নিয়মনীতি জারি করে, সে সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল। তাই প্রয়োজনে অভিযোগ করতেও তারা পিছপা হন না। এসব বিষয় ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ পেশাজীবী বা এইচআর।

তবে মানবসম্পদ পেশার এই উত্থানের জোয়ারে শিগগিরই ভাটা পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োগ ও ছাঁটাই-দুটিই কমেছে। ফলে মানবসম্পদ বিভাগের কাজও কমে এসেছে। যদিও এখন আবার ছাঁটাই বাড়ছে।

চাকরি পরামর্শ প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে ঘোষিত ছাঁটাইয়ের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়েছে-যা করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ।

প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, কাগজপত্রের কাজ বাড়লেও এইচআররা ছাঁটাইয়ের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি অ্যামাজনের মতো বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ছাঁটাই করা ১৪ হাজার কর্মীর মধ্যেও অনেকেই এইচআর বিভাগের।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। মানবসম্পদ পেশাজীবীরা এখন অনেক কোম্পানিতে কর্মীদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ এআই-বিশেষজ্ঞও নিয়োগ করছেন।

কিছু প্রতিষ্ঠান আরও এগিয়ে আইটি ও এইচআর বিভাগ একীভূত করছে-এ বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আবার সিএইচআরওরা।

দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য এইচআরের অনেক কাজই এআই-এর হাতে চলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলো সিভি যাচাইয়ের জন্য এআই ব্যবহার করছে এবং কর্মীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে চ্যাটবট তৈরি করছে।

কনসালটেন্সি ম্যাককিনসির সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, গত এক বছরে এআই-এর প্রভাবে কোন কোন বিভাগে কর্মীসংখ্যা কীভাবে বদলেছে তা জানতে চাইলে ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এইচআরে কর্মীসংখ্যা সবচেয়ে বেশি কমেছে। আর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এইচআর কর্মী বেড়েছে।

মানুষ নিয়ে কাজ করা এই পেশার জন্য যন্ত্রের উত্থান যে সুখবর নয়-তা বেশ স্পষ্ট।

সম্পর্কিত