চরচা ডেস্ক

সৌদি আরব ও পাকিস্তান মধ্যেকার ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এসএমডিএ) এক লহমায় বদলে দিয়েছে মধ্যপ্রচ্যের চালচিত্র। শুধু মধ্যপ্রাচ্য বললে ভুল হবে, এর সাথে যোগ হবে দক্ষিণ এশিয়া। দক্ষিণ এশিয়া মানে আসলে ভারত। এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। আমেরিকা-ভারত-পাকিস্তান বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কীভাবে দেখছে সেটাই এখানে বোঝার চেষ্টা করব।
লন্ডন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স শুরু করেছে এভাবে, কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর আরব দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে আতঙ্কা ক্রমে বাড়ছে। দোহায় আরব ও মুসলিম দেশগুলো একটা বৈঠকও করেছে। বিষয় নিরাপত্তা। সেখানে মিশর প্রস্তাব দিয়েছে, ন্যাটোর আদলে আরব দেশগুলো একটি জোট করুক। যে জোট কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা বলেই মনে করবে। এই প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়নি। কিন্তু এর পরপরই এই কাজটি করে দেখাল সৌদি আরব ও পাকিস্তান।
পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সৌদি আরবের আকাশে প্রবেশ করলে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান তাকে স্বাগত জানায়। এরপর তিনি লাল গালিচা ও পূর্ণ রাজকীয় প্রটোকলের উষ্ণ অভ্যর্থনা পান। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (যিনি এমবিএস নামে অধিক পরিচিত) সঙ্গে শাহববাজ শরিফ একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি দুই দেশের কয়েক দশকের পুরনো বন্ধুত্বের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যাদের সম্পর্ক প্রায় আট দশক ধরে চলে আসছে।
বিশ্লেষকেরা রয়টার্সকে বলেছেন, এ চুক্তির মধ্য দিয়ে রিয়াদের অর্থশক্তি ও ইসলামাবাদের বিশাল পারমাণবিক ক্ষমতার দারুণ মেলবন্ধন হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামাবাদকে বিভিন্নভাবে অর্থসহায়তা দেবে রিয়াদ। বিনিময়ে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে রিয়াদের পাশে দাঁড়াবে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ রয়টার্সকে বলেছেন, এ চুক্তির ‘আওতায়’ পারমাণবিক অস্ত্র নেই। অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র-সম্পর্কিত কোনো ধারা নেই। তবে খাজা মুহাম্মদ আসিফ মুখে যতই বলুন পারমাণবিক অস্ত্র নেই, আসল বিষয়টি লুকিয়ে আছে এখানে। কারণ আগ্রাসী ইসরায়েলকে রুখতে এই অস্ত্র সৌদি আরবের জন্য জরুরি। প্রথমে ইরান, পরে কাতারের হামলায় এমবিএস এটা বুঝেছেন, তাদের মাটিতে যত মার্কিন সৈন্যই থাকুক না কেন, তা তাদের ইসরায়েলি হামলা থেকে বাঁচাতে পারবে না। এক সৌদি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে রয়টার্সকে এটার একটা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি একটি ব্যাপক প্রতিরক্ষা চুক্তি। সব ধরনের সামরিক উপায় এর অন্তর্ভুক্ত।’
লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আল হাসান রয়টার্সকে বলেন, ‘সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পারমাণবিক শক্তিধর ইসরায়েলের তুলনায় কৌশলগত ও প্রচলিত সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা দেশটি এ চুক্তির মধ্য দিয়ে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে।’
চুক্তি তো হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান কীভাবে পাশে দাঁড়াবে সৌদি আরবের? পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। পারমাণবিক শক্তিধর। প্রতিবেশি দেশ ভারতের সাথে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা আছে। গত বছর হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি দেশটিকে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের নিশানায় আঘাত করার সুযোগ করে দেবে।’ ফলে সৌদি আরবের পাশে নানাভাবে পাকিস্তানের দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। তাই আমেরিকার চাপ উপেক্ষা করে পাকিস্তান এমবিএস-এর পাশে কতটা দাঁড়াতে পারবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো আসফান্দিয়ার মীরের কথা বিবেচনায় নেওয়া যায়। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তান এর আগে স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বজায় রেখেছিল। কিন্তু সেগুলো ৭০-এর দশকে ভেঙে যায়। এমনকি চীনের সঙ্গে ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের কোনো আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।’
ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সিডনির দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কিত নিরাপত্তা গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলছেন, এই চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গেও একই ধরনের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্থাপন করতে পারে।
এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে ডন। পাকিস্তানের এই ইংরেজি দৈনিকটি ২০ সেপ্টেম্বর তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসলামাবাদ এবং রিয়াদের বাইরেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। যদিও এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে সাথে হলে তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে এর পাশাপাশি পাকিস্তানের পারমাণবিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনাও তৈরি হয়েছে।
ডন লিখেছে, ‘পাকিস্তান এর আগেও সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে, যার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার সিয়াটো ও সেন্টো চুক্তি উল্লেখযোগ্য, যা পাকিস্তানকে সরাসরি পশ্চিমা শিবিরে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এই মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটগুলোতে পাকিস্তান একটি গৌণ খেলোয়াড় ছাড়া আর কিছু ছিল না। তবে রিয়াদের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ভিন্ন, কারণ আজ পাকিস্তানের একটি যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং অনেক উন্নত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রয়েছে। এই বছরের শুরুতে ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষের পর দেশটির সামরিক সক্ষমতার প্রতিপত্তি আরও জোরদার হয়েছে, যা এই বার্তা দিয়েছে যে পাকিস্তান একটি অনেক বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এই সমস্ত বিষয়, সেই সঙ্গে কাতারে ইসরায়েলের দায়িত্বজ্ঞানহীন হামলা সম্ভবত সৌদিদের এই চুক্তিটি চূড়ান্ত করার জন্য সঠিক সময় হিসেবে উদ্বুদ্ধ করেছে।’
ডন সম্পাদকীয়তে আরও বলছে, পশ্চিমা মিডিয়ায় অনেক জল্পনা-কল্পনা চলছে যে পাকিস্তান-সৌদি চুক্তি রিয়াদের কাছে এই দেশের পারমাণবিক অস্ত্র সহজলভ্য করে দেবে। এর কারণ সম্ভবত কিছু সৌদি কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে এই চুক্তি ‘সব ধরনের সামরিক উপায়কে অন্তর্ভুক্ত করে’। …এ বিষয়ে যেকোনো উদ্বেগ অবিলম্বে প্রশমিত করা উচিত। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের সুস্পষ্টভাবে বলা উচিত যে, পাকিস্তানের নীতি অনুসারে, পারমাণবিক অস্ত্রগুলো কেবল একটি প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বেকার সিনিয়র ফেলো এবং এর উপসাগরীয় ও জ্বালানি নীতি বিষয়ক বার্নস্টাইন প্রোগ্রামের পরিচালক সাইমন হেন্ডারসন এ ব্যাপারে একটা বিরাট লেখা প্রকাশ করেছেন। তার লেখার শিরোনাম, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি কি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের যুক্ততা থাকতে পারে?’ অর্থাৎ পশ্চিমাদের উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তিনি লিখেছেন, এই চুক্তিকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতীকী মনে হচ্ছে। কারণ রিয়াদ পাকিস্তানের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতের একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার। তা সত্ত্বেও এই চুক্তির প্রভাব আঞ্চলিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার, পারমাণবিক শক্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত আমেরিকার কূটনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
সাইমন হেন্ডারসন বলছেন, কেউ কেউ অনুমান করছেন যে, এখন সৌদি আরবের কাছে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ১৯৯৮ সাল থেকে পাকিস্তান আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করেছে, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নিক্ষেপ করা সম্ভব। তিনি আরও বলছেন, রিয়াদের নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বছরের পর বছর ধরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৮ সালে যুবরাজ মুহাম্মদ ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘সৌদি আরব কোনো পারমাণবিক বোমা অর্জন করতে চায় না। তবে যদি ইরান একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, আমরাও নিসন্দেহে যত দ্রুত সম্ভব একই পথে চলব।’ আর ২০২২ সালে দুবাইয়ের একটি সম্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যদি ইরান একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র পায়, তাহলে সব শর্ত বাতিল হয়ে যাবে।’
সাইমন হেন্ডারসন লিখেছেন, ধারণা করা হয় যে সৌদি আরবের একটি সেন্ট্রিফিউজ সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্টের পরিকল্পনা রয়েছে এবং দেশটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। নির্ভরযোগ্য পশ্চিমা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, সৌদি আরব ছিল আবদুল কাদির খানের (পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির জনক) চতুর্থ ও অপ্রকাশিত গ্রাহক। এই প্রয়াত পাকিস্তানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী ইরান, লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে সেন্ট্রিফিউজ সরঞ্জাম বিক্রি করেছিলেন।
সৌদি আরবের পারমাণবিক অস্ত্রের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ আরও পুরনো, যা ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হয়, যখন দেশটি চীন থেকে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম দূরপাল্লার ডং ফেং–৩ ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই চুক্তির কথা জানতে পারেন কেবল তখনই, যখন সৌদি মরুভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের উৎক্ষেপণস্থলে ট্রাকে করে পরিবহন করা হয়।
সাইমন হেন্ডারসন মতে, পাকিস্তান-সৌদি চুক্তি ওয়াশিংটনের জন্যও উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ তা যা ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এটি ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরকেও বাধাগ্রস্ত করবে। যা ভারত ও ইসরায়েলকে সৌদি আরব ও জর্ডানের মাধ্যমে একটি সমুদ্র ও স্থল বাণিজ্য পথ দিয়ে সংযুক্ত করার জন্য নকশা করা হয়েছে।
তবে পাকিস্তান-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি আমেরিকা বা ইসরায়েলের মতো ভারতও চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিজের মতামত কলামে শুভজিৎ রায় লিখেছেন, এই চুক্তিটি বেশ কিছু সময় ধরেই আলোচনায় ছিল। সম্প্রতি কাতারে ইসরায়েলের হামলার পরে এটি সই হয়েছে। ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি আগের চেয়েও নড়বড়ে মনে হওয়ায়, এটি একটি পারমাণবিক-শক্তিধর দেশের সঙ্গে কোনো আরব দেশের প্রথম বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি।
সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতেরও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও গভীর হয়েছে। তাই ভারতের সরকার তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় সতর্ক ছিল। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ভারত সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। আর সৌদি আরব ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ৪২.৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল ১১.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আমদানি ছিল ৩১.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত ২২ এপ্রিল পাহালগামের হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরবে ছিলেন এবং তার স্বাগতিকরা দ্রুত এই ঘটনার নিন্দা জানায়। পরে সৌদি পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালীন সময়ে এক অঘোষিত সফরে আসেন।
অতীতে সৌদি আরব জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল করার বিষয়ে খুব কড়া সমালোচনা করেনি। এছাড়াও, তারা ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানালেও, বালাকোট হামলার নিন্দা জানায়নি।
কিন্তু সেই সমীকরণ থাকবে কিনা এটা নিয়েই ভারতের চিন্তা। ভারতের বিরোধী দলের রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সৌদি আরবের মতো পরীক্ষিত বন্ধুকে ‘শত্রু’ পাকিস্তানের দিকে এভাবে ঠেলে দেওয়ার জন্য মোদী সরকারকে দায়ী করছেন। তাদের বক্তব্য, উগ্র হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী ও তার দল বিজেপি রাজনৈতিক সুবিধা লাভের সহজ পথ হিসেবে দেশের ভেতরে মুসলিম বিদ্বেষের পথ বেছে নিয়েছে। আর সেই বিদ্বেষ দেশ ছাপিয়ে গিয়ে পড়ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব মুলুকেও। ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব গভীরতর করাটা এখন আরবরা ভালো চোখে দেখে না। গাজায় গণহত্যা চালালেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যেভাবে বিজেপির মিডিয়া সেল বা তাদের সমর্থকের উগ্রভাবে সমর্থন দিচ্ছে–তারও একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে।
সব দেশে মুসলিম বিদ্বেষ, বাইরে অন্ধ ইসরায়েল আনুগত্য মোদির নেতৃত্বে ভারতকে আরবের পরীক্ষিত বন্ধুদের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সৌদি আরব-পাকিস্তান ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সৌদি আরব ও পাকিস্তান মধ্যেকার ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এসএমডিএ) এক লহমায় বদলে দিয়েছে মধ্যপ্রচ্যের চালচিত্র। শুধু মধ্যপ্রাচ্য বললে ভুল হবে, এর সাথে যোগ হবে দক্ষিণ এশিয়া। দক্ষিণ এশিয়া মানে আসলে ভারত। এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। আমেরিকা-ভারত-পাকিস্তান বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কীভাবে দেখছে সেটাই এখানে বোঝার চেষ্টা করব।
লন্ডন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স শুরু করেছে এভাবে, কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর আরব দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে আতঙ্কা ক্রমে বাড়ছে। দোহায় আরব ও মুসলিম দেশগুলো একটা বৈঠকও করেছে। বিষয় নিরাপত্তা। সেখানে মিশর প্রস্তাব দিয়েছে, ন্যাটোর আদলে আরব দেশগুলো একটি জোট করুক। যে জোট কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা বলেই মনে করবে। এই প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়নি। কিন্তু এর পরপরই এই কাজটি করে দেখাল সৌদি আরব ও পাকিস্তান।
পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সৌদি আরবের আকাশে প্রবেশ করলে এফ-১৫ যুদ্ধবিমান তাকে স্বাগত জানায়। এরপর তিনি লাল গালিচা ও পূর্ণ রাজকীয় প্রটোকলের উষ্ণ অভ্যর্থনা পান। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (যিনি এমবিএস নামে অধিক পরিচিত) সঙ্গে শাহববাজ শরিফ একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি দুই দেশের কয়েক দশকের পুরনো বন্ধুত্বের জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যাদের সম্পর্ক প্রায় আট দশক ধরে চলে আসছে।
বিশ্লেষকেরা রয়টার্সকে বলেছেন, এ চুক্তির মধ্য দিয়ে রিয়াদের অর্থশক্তি ও ইসলামাবাদের বিশাল পারমাণবিক ক্ষমতার দারুণ মেলবন্ধন হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামাবাদকে বিভিন্নভাবে অর্থসহায়তা দেবে রিয়াদ। বিনিময়ে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে রিয়াদের পাশে দাঁড়াবে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ রয়টার্সকে বলেছেন, এ চুক্তির ‘আওতায়’ পারমাণবিক অস্ত্র নেই। অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র-সম্পর্কিত কোনো ধারা নেই। তবে খাজা মুহাম্মদ আসিফ মুখে যতই বলুন পারমাণবিক অস্ত্র নেই, আসল বিষয়টি লুকিয়ে আছে এখানে। কারণ আগ্রাসী ইসরায়েলকে রুখতে এই অস্ত্র সৌদি আরবের জন্য জরুরি। প্রথমে ইরান, পরে কাতারের হামলায় এমবিএস এটা বুঝেছেন, তাদের মাটিতে যত মার্কিন সৈন্যই থাকুক না কেন, তা তাদের ইসরায়েলি হামলা থেকে বাঁচাতে পারবে না। এক সৌদি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে রয়টার্সকে এটার একটা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি একটি ব্যাপক প্রতিরক্ষা চুক্তি। সব ধরনের সামরিক উপায় এর অন্তর্ভুক্ত।’
লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আল হাসান রয়টার্সকে বলেন, ‘সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পারমাণবিক শক্তিধর ইসরায়েলের তুলনায় কৌশলগত ও প্রচলিত সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা দেশটি এ চুক্তির মধ্য দিয়ে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে।’
চুক্তি তো হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান কীভাবে পাশে দাঁড়াবে সৌদি আরবের? পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। পারমাণবিক শক্তিধর। প্রতিবেশি দেশ ভারতের সাথে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা আছে। গত বছর হোয়াইট হাউসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি দেশটিকে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের নিশানায় আঘাত করার সুযোগ করে দেবে।’ ফলে সৌদি আরবের পাশে নানাভাবে পাকিস্তানের দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। তাই আমেরিকার চাপ উপেক্ষা করে পাকিস্তান এমবিএস-এর পাশে কতটা দাঁড়াতে পারবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো আসফান্দিয়ার মীরের কথা বিবেচনায় নেওয়া যায়। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তান এর আগে স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বজায় রেখেছিল। কিন্তু সেগুলো ৭০-এর দশকে ভেঙে যায়। এমনকি চীনের সঙ্গে ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের কোনো আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।’
ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সিডনির দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কিত নিরাপত্তা গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলছেন, এই চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গেও একই ধরনের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্থাপন করতে পারে।
এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে ডন। পাকিস্তানের এই ইংরেজি দৈনিকটি ২০ সেপ্টেম্বর তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ইসলামাবাদ এবং রিয়াদের বাইরেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। যদিও এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে সাথে হলে তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে এর পাশাপাশি পাকিস্তানের পারমাণবিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনাও তৈরি হয়েছে।
ডন লিখেছে, ‘পাকিস্তান এর আগেও সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে, যার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার সিয়াটো ও সেন্টো চুক্তি উল্লেখযোগ্য, যা পাকিস্তানকে সরাসরি পশ্চিমা শিবিরে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এই মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটগুলোতে পাকিস্তান একটি গৌণ খেলোয়াড় ছাড়া আর কিছু ছিল না। তবে রিয়াদের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ভিন্ন, কারণ আজ পাকিস্তানের একটি যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং অনেক উন্নত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রয়েছে। এই বছরের শুরুতে ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষের পর দেশটির সামরিক সক্ষমতার প্রতিপত্তি আরও জোরদার হয়েছে, যা এই বার্তা দিয়েছে যে পাকিস্তান একটি অনেক বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এই সমস্ত বিষয়, সেই সঙ্গে কাতারে ইসরায়েলের দায়িত্বজ্ঞানহীন হামলা সম্ভবত সৌদিদের এই চুক্তিটি চূড়ান্ত করার জন্য সঠিক সময় হিসেবে উদ্বুদ্ধ করেছে।’
ডন সম্পাদকীয়তে আরও বলছে, পশ্চিমা মিডিয়ায় অনেক জল্পনা-কল্পনা চলছে যে পাকিস্তান-সৌদি চুক্তি রিয়াদের কাছে এই দেশের পারমাণবিক অস্ত্র সহজলভ্য করে দেবে। এর কারণ সম্ভবত কিছু সৌদি কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে এই চুক্তি ‘সব ধরনের সামরিক উপায়কে অন্তর্ভুক্ত করে’। …এ বিষয়ে যেকোনো উদ্বেগ অবিলম্বে প্রশমিত করা উচিত। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের সুস্পষ্টভাবে বলা উচিত যে, পাকিস্তানের নীতি অনুসারে, পারমাণবিক অস্ত্রগুলো কেবল একটি প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বেকার সিনিয়র ফেলো এবং এর উপসাগরীয় ও জ্বালানি নীতি বিষয়ক বার্নস্টাইন প্রোগ্রামের পরিচালক সাইমন হেন্ডারসন এ ব্যাপারে একটা বিরাট লেখা প্রকাশ করেছেন। তার লেখার শিরোনাম, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি কি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের যুক্ততা থাকতে পারে?’ অর্থাৎ পশ্চিমাদের উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তিনি লিখেছেন, এই চুক্তিকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতীকী মনে হচ্ছে। কারণ রিয়াদ পাকিস্তানের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতের একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার। তা সত্ত্বেও এই চুক্তির প্রভাব আঞ্চলিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার, পারমাণবিক শক্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত আমেরিকার কূটনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
সাইমন হেন্ডারসন বলছেন, কেউ কেউ অনুমান করছেন যে, এখন সৌদি আরবের কাছে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ১৯৯৮ সাল থেকে পাকিস্তান আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করেছে, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নিক্ষেপ করা সম্ভব। তিনি আরও বলছেন, রিয়াদের নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বছরের পর বছর ধরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৮ সালে যুবরাজ মুহাম্মদ ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘সৌদি আরব কোনো পারমাণবিক বোমা অর্জন করতে চায় না। তবে যদি ইরান একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, আমরাও নিসন্দেহে যত দ্রুত সম্ভব একই পথে চলব।’ আর ২০২২ সালে দুবাইয়ের একটি সম্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যদি ইরান একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র পায়, তাহলে সব শর্ত বাতিল হয়ে যাবে।’
সাইমন হেন্ডারসন লিখেছেন, ধারণা করা হয় যে সৌদি আরবের একটি সেন্ট্রিফিউজ সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্টের পরিকল্পনা রয়েছে এবং দেশটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছে। নির্ভরযোগ্য পশ্চিমা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, সৌদি আরব ছিল আবদুল কাদির খানের (পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির জনক) চতুর্থ ও অপ্রকাশিত গ্রাহক। এই প্রয়াত পাকিস্তানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী ইরান, লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে সেন্ট্রিফিউজ সরঞ্জাম বিক্রি করেছিলেন।
সৌদি আরবের পারমাণবিক অস্ত্রের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ আরও পুরনো, যা ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হয়, যখন দেশটি চীন থেকে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম দূরপাল্লার ডং ফেং–৩ ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই চুক্তির কথা জানতে পারেন কেবল তখনই, যখন সৌদি মরুভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাদের উৎক্ষেপণস্থলে ট্রাকে করে পরিবহন করা হয়।
সাইমন হেন্ডারসন মতে, পাকিস্তান-সৌদি চুক্তি ওয়াশিংটনের জন্যও উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ তা যা ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এটি ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরকেও বাধাগ্রস্ত করবে। যা ভারত ও ইসরায়েলকে সৌদি আরব ও জর্ডানের মাধ্যমে একটি সমুদ্র ও স্থল বাণিজ্য পথ দিয়ে সংযুক্ত করার জন্য নকশা করা হয়েছে।
তবে পাকিস্তান-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি আমেরিকা বা ইসরায়েলের মতো ভারতও চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিজের মতামত কলামে শুভজিৎ রায় লিখেছেন, এই চুক্তিটি বেশ কিছু সময় ধরেই আলোচনায় ছিল। সম্প্রতি কাতারে ইসরায়েলের হামলার পরে এটি সই হয়েছে। ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি আগের চেয়েও নড়বড়ে মনে হওয়ায়, এটি একটি পারমাণবিক-শক্তিধর দেশের সঙ্গে কোনো আরব দেশের প্রথম বড় ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি।
সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতেরও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও গভীর হয়েছে। তাই ভারতের সরকার তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় সতর্ক ছিল। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ভারত সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। আর সৌদি আরব ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ৪২.৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল ১১.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আমদানি ছিল ৩১.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত ২২ এপ্রিল পাহালগামের হামলার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরবে ছিলেন এবং তার স্বাগতিকরা দ্রুত এই ঘটনার নিন্দা জানায়। পরে সৌদি পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালীন সময়ে এক অঘোষিত সফরে আসেন।
অতীতে সৌদি আরব জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল করার বিষয়ে খুব কড়া সমালোচনা করেনি। এছাড়াও, তারা ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানালেও, বালাকোট হামলার নিন্দা জানায়নি।
কিন্তু সেই সমীকরণ থাকবে কিনা এটা নিয়েই ভারতের চিন্তা। ভারতের বিরোধী দলের রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সৌদি আরবের মতো পরীক্ষিত বন্ধুকে ‘শত্রু’ পাকিস্তানের দিকে এভাবে ঠেলে দেওয়ার জন্য মোদী সরকারকে দায়ী করছেন। তাদের বক্তব্য, উগ্র হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী ও তার দল বিজেপি রাজনৈতিক সুবিধা লাভের সহজ পথ হিসেবে দেশের ভেতরে মুসলিম বিদ্বেষের পথ বেছে নিয়েছে। আর সেই বিদ্বেষ দেশ ছাপিয়ে গিয়ে পড়ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব মুলুকেও। ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব গভীরতর করাটা এখন আরবরা ভালো চোখে দেখে না। গাজায় গণহত্যা চালালেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যেভাবে বিজেপির মিডিয়া সেল বা তাদের সমর্থকের উগ্রভাবে সমর্থন দিচ্ছে–তারও একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে।
সব দেশে মুসলিম বিদ্বেষ, বাইরে অন্ধ ইসরায়েল আনুগত্য মোদির নেতৃত্বে ভারতকে আরবের পরীক্ষিত বন্ধুদের থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সৌদি আরব-পাকিস্তান ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।