ইউরোপীয় Chop থেকে বাঙালির চপ?

ইউরোপীয় Chop থেকে বাঙালির চপ?
আলুর চপ। ছবি: চরচা

বর্ষাস্নাত শেষ বিকেল কিংবা সন্ধ্যা। ছুটির দিনে আপনার সামনে রয়েছে আলুর চপ কিংবা বেগুনি বা পিঁয়াজি। সঙ্গে মুড়ি। অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও নেই আপনার। তাহলে সেই সন্ধ্যাটা আপনার।

কিংবা ধরুন শীতের সন্ধ্যা। ফুলকপির চপ কিংবা বাঁধাকপির বড়া আপনার সঙ্গী। সঙ্গে চা-ও আছে। সেই সন্ধ্যাটাও কিন্তু আপনার না হয়ে যায় না। বাঙালির জীবনের সঙ্গে চপ মিশে আছে নানাভাবে। আজকের মেট্রোপলিটন মধ্যবিত্ত ঘরে হয়তো চপের যাতায়াত একটু কমে গেছে। কিন্তু রমজান মাসে ঠিকই আবার ঘরে ওঠে। আর সবচেয়ে একান্ত হয়ে আমাদের পাতে ওঠে আলুর চপ। আলু বস্তুটা আদতে বাঙালির পাতে এনেছে পর্তুগিজরা-এ কথা অনেকেই আমরা জানি। আলুর মতো চপও কিন্তু আমাদের পাতে এসেছে সাহেবদের হাত ধরে।

পিঁয়াজি। ছবি: চরচা
পিঁয়াজি। ছবি: চরচা

হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন। ইংরেজি Chop শব্দের অর্থ তো আমরা জানি। Chop হল মেরুদণ্ড থেকে পাঁজর বরাবর লম্বাভাবে কাটা মাংসের অংশ। আর খাবারটা রান্না কীভাবে হয় সেটা আপনার ওপর নির্ভর করছে। আপনি গ্রিল করবেন নাকি সঁতে করবেন আপনার ব্যাপার। চাইলে ব্রেইজ করতে পারেন, ব্রেডক্রাম্ব লাগিয়ে ভাজতে পারেন কিংবা বেইক করতে পারেন। সাহেব অর্থাৎ ইউরোপীয়দের থেকে এবার চলুন একটু মোঘল রসুইখানার দিকে যাই। মোঘলদের রসুই ঘরে যারা রাঁধতেন তারা ছিলেন একেক জন শিল্পী। এ বলে আমায় দেখ; তো ও বলে আমি কী কম যাই? মোঘলরা যখন দিল্লিতে রাজধানী আনলো এবং পরে আবার ফিরিয়েও নিয়ে গেল তখন ওই বাবুর্চি এবং তাদের সাগরেদরা অনেকেই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়লেন। আপনারা যদি নেটফ্লিক্সে ‘রাজা, রসুই অর কাহানিয়া’ নামের ডকু-সিরিজটা দেখেন তাহলে দেখবেন, মোঘলরা যখন দুর্বল হতে শুরু করলো তখন এসব শিল্পীদের জায়গা হলো লখনৌ আর রামপুরের নবাবদের প্রাসাদে। আর নবাবি শখও-তো কম নয়। একেক দিন একেকরকম ফরমায়েশ। বাবুর্চিরাও সেসব পরিবেশন করতে করতে আরও উঁচুদরের শিল্পী হয়ে উঠতে লাগলেন। আজকের দিল্লির বিখ্যাত করিমস নামের খাবারের দোকান কিন্তু এরকম একজন শিল্পী শুরু করেছিলেন। যিনি মোঘল হেঁশেলের বাবুর্চি ছিলেন।

ইউরোপীয় পদ্ধতির ল্যাম্ব চপ। ছবি: ফ্রি পিক
ইউরোপীয় পদ্ধতির ল্যাম্ব চপ। ছবি: ফ্রি পিক

ইতিহাস নিয়ে বেশি প্যাঁচাবো না। ব্রিটিশ সাহেবরা দিন দিন ক্ষমতাশালী হয়ে পুরো উপমহাদেশ নিজেদের কব্জায় নিলো। দুর্বল হয়ে গেলেন মোগলরা। নিজেদের শহর লন্ডনের মতো করে বানাতে চাইলো কলকাতা। কিছুটা হলোও তাই। লখনৌ থেকে নবাব ওয়াজিদ আলী সাহেব ততদিনে কলকাতায় এসে পড়েছেন। নবাব সাহেবতো একা আসেননি। সব লোক-লস্কর নিয়েই এসেছিলেন। এদিকে সাহেবরা দিব্যি চপ-কাটলেট খেয়ে দিন গুজরান করছিলেন। এরমধ্যে হলো কী, নবাবি রসুইখানা ছেড়ে অনেক খানসামা আস্তানা গেঁড়ে বসলেন সাহেবদের হেঁশেলে। দিন বদলের হাওয়া। বেতনও খাসা। ইতিউতি বসবাস গড়লেন তারা। নব্য ধনিক শ্রেণীর লোকজন সাহেবদের অনুকরণে শুরু করলেন পার্টি দেওয়া। সেখানে এসব খানসামারা রান্না করতে লাগলেন। এই নব্য ধনীরা জানলেন ফালি করে কাটা মাংসের নাম ‘চপ’। তার আগে আবার আরেকটি ব্যাপার ঘটেছিলো শহর কলাকাতায়। কলকাতায় এক কালে একটা প্রবাদ ছিল– ‘জাত মারলে তিন সেন। কেশব সেন, উইলসেন এবং ইস্টিসেন।’ কেশব সেন ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবর্তকদের একজন। রেল স্টেশন-যেহেতু সেখানকার ভিড়ে জাতি-বর্ণ-ধর্ম মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার। এবং উইলসেন, অর্থাৎ উইলসনের হোটেল, যেখানে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ খাদ্য-পানীয়ের সঙ্গে সখ্য হয়। ১৮৪০ সালে অকল্যান্ড হোটেল নামে যেটি চালু হয়, সেটি এখন কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন ললিত। উইলসন সাহেব অর্থাৎ ডেভিড উইলসন হোটেলটি চালু করেছিলেন তখনকার বড় লাট লর্ড অকল্যান্ডের নামে। তবে উইলসন হোটেল নামেই সেটি পরিচিত ছিল।

১৮৯৩ সালে কবি গুরু পর্যন্ত লিখলেন-

“যদি জোটে রোজ

এমনি বিনি পয়সায় ভোজ!

ডিশের পরে ডিশ

শুধু মটন কারি ফিশ,

সঙ্গে তারি হুইস্কি সোডা

দু-চার রয়াল ডোজ!

পরের তহবিল

চোকায় উইল্‌সনের বিল৷

থাকি মনের সুখে

সদা হাস্যমুখে ৷

কে কার রাখে খোঁজ!”

বেগুনি। ছবি: চরচা
বেগুনি। ছবি: চরচা

এখন এই জাত মারার ব্যাপারটাই এক সময় বাঙালিকে দিলো চপের খোঁজ। সাহেবরা খাচ্ছে ল্যাম্ব কিংবা পর্ক বা বিফ চপ (আদতে chop শব্দটি যে আভিধানিক অর্থ প্রকাশ করে সেখানে গরু খুব একটা যায় না। একদমই যে যায় না তা নয়, একটু ঘুরিয়ে যায়)। কিন্তু তাতেতো আমাদের পূর্বপুরুষদের জাত যাবে। এদিকে সাহেবি নানা খাবারে খুশবু শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। কী করা যায়! এসব যখন ভাবছেন কেউ কেউ, তখন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ালো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা। তারা শুধু চপ কাটলেট খাচ্ছেন না। তাতে দেশীয় মশলাও যোগ করা শুরু করেছেন। এরমধ্যে আলু পৌঁছে গেছে ঘরে। এরপরতো আর মানা যাচ্ছে না। আর সবাইতো জানে চাহিদা থেকে নতুনের শুরু হয়। উদ্ভাবন হলো বাঙালির চপ। হয়তো আলুর চপই বাঙালি ‘চপ’ হিসেবে প্রথম খেয়েছে। তারপর আর থামেনি। বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ, কাঁচকলা, মাশরুম, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, নানারকম সবজি সবকিছু দিয়েই চপ বানালো। সাহবেদের চপের সাথে আকারে না মিলল না? কোন ব্যাপার না। নামটা শুধু থাকল। যা হলো তা বাঙালির বড্ড আপনার জিনিস। আর সেই জিনিস নিয়ে এখনও চলছে উদ্ভাবন।

চপ আবিষ্কার করেই বাঙালি থামল না। তাতে নানারকম পরীক্ষা চলতে লাগলো। এই যেমন বেসনে কালোজিরে দেওয়া। বেগুনি হোক বা আলুর চপ বেসনে কালো জিরে থাকলে সেটার ঘ্রাণ আর সেই কালোজিরে দাঁতের নিচে পড়লে স্বাদকোরক যা শান্তি পায়!

সম্পর্কিত