বারোয়ারি নির্বাচন কড়া নাড়ছে দরজায়। সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। অভাবের দেশে জনসেবকের ঘাটতি নেই। সবাই আটঘাট বেঁধে নামছেন। মানিক মিয়া অ্যাভেনিউর দশতলা দালানে ঢোকার টিকিট পেতে সবাই মরিয়া। টিকিট মাত্র ৩০০টি। ভেতরে ঢুকতে চান হাজার হাজার লোক। মানুষ তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচন করবে। যিনি বেশি ভোট পাবেন, তিনি ওই দালানে ঢুকতে পারবেন। সেই ভোটের আয়োজন হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে নির্বাচন হবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম পক্ষে।
জাতীয় সংসদের আয়ু পাঁচ বছর। দেশে এর আগে সংসদ নির্বাচন হয়েছে বারোটি। এর মধ্যে ছয়টি মারা গেছে অকালে। বাকি ছয়টি পুরো মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। তার মানে, অকাল মৃত্যুর হার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। কী এমন দুরারোগ্য রোগ যে, সংসদ জন্মের পর থেকেই ধুঁকতে থাকে এবং মাঝপথেই তার দম ফুরিয়ে যায়? রোগটা আমরা মোটামুটি ধরতে পারি।
সংসদে বেশির ভাগ লোক একা একা যান না। তারা যান দলে-বলে। নির্বাচনে কোনো দল হারতে চায় না। তারপরও কেউ হারে, কেউ জেতে। যে হেরে যায়, সে হার স্বীকার করে না। যে জেতে, সে-ও যে সবসময় ভালো খেলে জেতে, তা-ও নয়। খেলায় অনেক ‘ফাউল’ হয়। রেফারির কাজ করে নির্বাচন কমিশন। সেটি সব সময় নিরপেক্ষ থাকে না। কোনো দলের প্রতি অনুরাগ আর কোনো দলের প্রতি বিরাগ দেখিয়ে রেফারি নির্বাচনি খেলাটি প্রশ্নবিদ্ধ করে। এভাবেই আমরা পার করেছি ৫৪ বছর।
এর বাইরেও কথা আছে। যে কয়টি সংসদ পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেনি, তার কারণ, তারা জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চলে গিয়েছিল। আবার কিছু নির্বাচন এমন ছিল যে, একটি দল কারচুপি বা ভোট চুরি করে জোর করে সংসদের দখল নিয়েছিল। একটা পর্যায়ে এসে মানুষ আর সেটি মেনে নিতে চায়নি। বিদ্রোহ করেছে। বিদ্রোহের জোয়ারে ভেসে গেছে ক্ষমতার মসনদ।
মাঝপথে এসে সংসদের ভেঙে পড়া কিংবা আঁতুড়েই মারা যাওয়া, এ নিয়ে দলগুলোর বোধোদয় হয়েছে বা জ্ঞানচক্ষু খুলেছে, এমনটা দেখা যায় না। ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলে তারা তারস্বরে চেঁচিয়ে বলে–তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন–দেশ সুন্দরভাবে চলছে, মানুষের মধ্যে কোনো অভিযোগ বা ক্ষোভ নেই, ক্ষমতাসীনেরা আর দশজন মানুষের মতো নন, তারা ফেরেশতা হয়ে গেছে। এর মধ্যে গুটিকয়েক লোক চক্রান্ত করে ঠিক করল, এত ভালো ভালো না, এই সরকারকে ফেলে দিতে হবে। তারা বিস্তর টাকাপয়সা খরচ করে রাস্তায় লোক নামিয়ে ফেরেশতাতুল্য একটা সরকারের পতন ঘটিয়ে দিল। ব্যাপারটি কি এতই সরল?
হেরে গেলে সবাই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আওড়ায়। ভেবে দেখে না, কোথাও তার কোনো ভুল হয়েছে কি না। অথবা ভুল বুঝতে পারলেও সেটি স্বীকার করে না। মনে করে, ভুল স্বীকার করা মানে দুর্বলতা। একবার যদি বলে ‘ভুল করেছি’, তাহলে রাজনীতি বুঝি শেষ হয়ে যাবে। তাই দেখা যায়, একটার পর একটা ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে একটি দল দশকের পর দশক পার করে দিচ্ছে।
নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ততই বাড়ছে। দলগুলোর কথাবার্তা শুনে আর আচরণ দেখে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে – নির্বাচন কি আদৌ হবে? অন্তর্বর্তী সরকার জোরগলায় বলছে নির্বাচন সময়মতোই হবে। অনেকেই তাতে আস্থা রাখতে পারছেন না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থান। একজন যদি চলেন উত্তর মেরুতে, আরেকজন হাঁটেন দক্ষিণ মেরুতে।
দেশের মূলধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দল চায় বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা। এটি পেতে হলে নির্বাচন ছাড়া গতি নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের চালচিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকার থাকা সত্ত্বেও তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক শূন্যতা। কেবল একটি নির্বাচনের মাধ্যমেই এই শূন্যতা পূরণ হওয়া সম্ভব। নির্বাচনের যত দেরি হবে, রাজনৈতিক সংকট ততই বাড়বে। পরিস্থিতি একবার নাগালের বাইরে চলে গেলে সেটির পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি সামলাতে যে ন্যূনতম ঐকমত্য দরকার, সেটি হচ্ছে না। অথচ এই ঐকমত্য ছাড়া আমাদের গতি নেই। তাহলে আমরা কি জেনে বুঝে নিজেরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ছি? হয়তো তা-ই। আমরা সবাই সব কিছুতে জিততে চাই।
একটা ভালো নির্বাচন হল দেশে স্থিতি আসবে। বিনিয়োগের চাকা বন্ধ হয়ে গেছে। এটি সচল হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান হবে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আবার উঠে দাঁড়াবে। এসব তো সবারই চাওয়া। তারপরও আমরা ঝগড়া করছি কেন? ঝগড়া করছি কারণ, আমরা আমাদের দল, আমাদের গোষ্ঠীর বাইরে আর কাউকে নিয়ে ভাবি না। “আমি সবটা চাই”–এই প্রচণ্ড ক্ষমতালিপ্সা আমাদের পেয়ে বসেছে। দেশটা সতেরো-আঠারো কোটি মানুষের, এটা আমরা অনেকেই ভাবি না। এই জেদাজেদি, এই দলান্ধতা, এই স্বার্থপরতা আমাদের সমাজের সুকুমার বুননটাকে খাবলে খেয়ে ফেলছে। রাজনীতির এই গোষ্ঠীবাদ থেকে মুক্ত না হতে পারলে আরও দশটা নির্বাচন হলেও আমাদের মুক্তি নেই। আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই ঘুরপাক খেতে থাকব। সামনে এগোতে পারব না।
ইতিহাস আমাদের বারবার সুযোগ দিয়েছে– ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০, ২০০৭ এবং শেষবার ২০২৪ সালে। আমরা বারবার ভুল করেছি। শিক্ষা নিইনি। আমাদের কবর আমরা নিজেরাই খুঁড়ে চলেছি।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক
বারোয়ারি নির্বাচন কড়া নাড়ছে দরজায়। সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। অভাবের দেশে জনসেবকের ঘাটতি নেই। সবাই আটঘাট বেঁধে নামছেন। মানিক মিয়া অ্যাভেনিউর দশতলা দালানে ঢোকার টিকিট পেতে সবাই মরিয়া। টিকিট মাত্র ৩০০টি। ভেতরে ঢুকতে চান হাজার হাজার লোক। মানুষ তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচন করবে। যিনি বেশি ভোট পাবেন, তিনি ওই দালানে ঢুকতে পারবেন। সেই ভোটের আয়োজন হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে নির্বাচন হবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম পক্ষে।
জাতীয় সংসদের আয়ু পাঁচ বছর। দেশে এর আগে সংসদ নির্বাচন হয়েছে বারোটি। এর মধ্যে ছয়টি মারা গেছে অকালে। বাকি ছয়টি পুরো মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। তার মানে, অকাল মৃত্যুর হার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। কী এমন দুরারোগ্য রোগ যে, সংসদ জন্মের পর থেকেই ধুঁকতে থাকে এবং মাঝপথেই তার দম ফুরিয়ে যায়? রোগটা আমরা মোটামুটি ধরতে পারি।
সংসদে বেশির ভাগ লোক একা একা যান না। তারা যান দলে-বলে। নির্বাচনে কোনো দল হারতে চায় না। তারপরও কেউ হারে, কেউ জেতে। যে হেরে যায়, সে হার স্বীকার করে না। যে জেতে, সে-ও যে সবসময় ভালো খেলে জেতে, তা-ও নয়। খেলায় অনেক ‘ফাউল’ হয়। রেফারির কাজ করে নির্বাচন কমিশন। সেটি সব সময় নিরপেক্ষ থাকে না। কোনো দলের প্রতি অনুরাগ আর কোনো দলের প্রতি বিরাগ দেখিয়ে রেফারি নির্বাচনি খেলাটি প্রশ্নবিদ্ধ করে। এভাবেই আমরা পার করেছি ৫৪ বছর।
এর বাইরেও কথা আছে। যে কয়টি সংসদ পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেনি, তার কারণ, তারা জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চলে গিয়েছিল। আবার কিছু নির্বাচন এমন ছিল যে, একটি দল কারচুপি বা ভোট চুরি করে জোর করে সংসদের দখল নিয়েছিল। একটা পর্যায়ে এসে মানুষ আর সেটি মেনে নিতে চায়নি। বিদ্রোহ করেছে। বিদ্রোহের জোয়ারে ভেসে গেছে ক্ষমতার মসনদ।
মাঝপথে এসে সংসদের ভেঙে পড়া কিংবা আঁতুড়েই মারা যাওয়া, এ নিয়ে দলগুলোর বোধোদয় হয়েছে বা জ্ঞানচক্ষু খুলেছে, এমনটা দেখা যায় না। ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলে তারা তারস্বরে চেঁচিয়ে বলে–তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। ব্যাপারটা যেন এমন–দেশ সুন্দরভাবে চলছে, মানুষের মধ্যে কোনো অভিযোগ বা ক্ষোভ নেই, ক্ষমতাসীনেরা আর দশজন মানুষের মতো নন, তারা ফেরেশতা হয়ে গেছে। এর মধ্যে গুটিকয়েক লোক চক্রান্ত করে ঠিক করল, এত ভালো ভালো না, এই সরকারকে ফেলে দিতে হবে। তারা বিস্তর টাকাপয়সা খরচ করে রাস্তায় লোক নামিয়ে ফেরেশতাতুল্য একটা সরকারের পতন ঘটিয়ে দিল। ব্যাপারটি কি এতই সরল?
হেরে গেলে সবাই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আওড়ায়। ভেবে দেখে না, কোথাও তার কোনো ভুল হয়েছে কি না। অথবা ভুল বুঝতে পারলেও সেটি স্বীকার করে না। মনে করে, ভুল স্বীকার করা মানে দুর্বলতা। একবার যদি বলে ‘ভুল করেছি’, তাহলে রাজনীতি বুঝি শেষ হয়ে যাবে। তাই দেখা যায়, একটার পর একটা ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে একটি দল দশকের পর দশক পার করে দিচ্ছে।
নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ততই বাড়ছে। দলগুলোর কথাবার্তা শুনে আর আচরণ দেখে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে – নির্বাচন কি আদৌ হবে? অন্তর্বর্তী সরকার জোরগলায় বলছে নির্বাচন সময়মতোই হবে। অনেকেই তাতে আস্থা রাখতে পারছেন না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থান। একজন যদি চলেন উত্তর মেরুতে, আরেকজন হাঁটেন দক্ষিণ মেরুতে।
দেশের মূলধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দল চায় বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা। এটি পেতে হলে নির্বাচন ছাড়া গতি নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের চালচিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকার থাকা সত্ত্বেও তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক শূন্যতা। কেবল একটি নির্বাচনের মাধ্যমেই এই শূন্যতা পূরণ হওয়া সম্ভব। নির্বাচনের যত দেরি হবে, রাজনৈতিক সংকট ততই বাড়বে। পরিস্থিতি একবার নাগালের বাইরে চলে গেলে সেটির পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি সামলাতে যে ন্যূনতম ঐকমত্য দরকার, সেটি হচ্ছে না। অথচ এই ঐকমত্য ছাড়া আমাদের গতি নেই। তাহলে আমরা কি জেনে বুঝে নিজেরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ছি? হয়তো তা-ই। আমরা সবাই সব কিছুতে জিততে চাই।
একটা ভালো নির্বাচন হল দেশে স্থিতি আসবে। বিনিয়োগের চাকা বন্ধ হয়ে গেছে। এটি সচল হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান হবে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আবার উঠে দাঁড়াবে। এসব তো সবারই চাওয়া। তারপরও আমরা ঝগড়া করছি কেন? ঝগড়া করছি কারণ, আমরা আমাদের দল, আমাদের গোষ্ঠীর বাইরে আর কাউকে নিয়ে ভাবি না। “আমি সবটা চাই”–এই প্রচণ্ড ক্ষমতালিপ্সা আমাদের পেয়ে বসেছে। দেশটা সতেরো-আঠারো কোটি মানুষের, এটা আমরা অনেকেই ভাবি না। এই জেদাজেদি, এই দলান্ধতা, এই স্বার্থপরতা আমাদের সমাজের সুকুমার বুননটাকে খাবলে খেয়ে ফেলছে। রাজনীতির এই গোষ্ঠীবাদ থেকে মুক্ত না হতে পারলে আরও দশটা নির্বাচন হলেও আমাদের মুক্তি নেই। আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই ঘুরপাক খেতে থাকব। সামনে এগোতে পারব না।
ইতিহাস আমাদের বারবার সুযোগ দিয়েছে– ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০, ২০০৭ এবং শেষবার ২০২৪ সালে। আমরা বারবার ভুল করেছি। শিক্ষা নিইনি। আমাদের কবর আমরা নিজেরাই খুঁড়ে চলেছি।