মানবকূলে স্বাধীনতা বিষয়ক সংকট নানামাত্রিক।
প্রথমে হয়তো একটি নির্দিষ্ট ভূমির সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী তাদের ভূমিভিত্তিক স্বাধীনতা চায়। সেটি পাওয়া হয়ে গেলেই শুরু হয় অভ্যন্তরীণ নানা ধরনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সংগ্রাম। এসবের মধ্যে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা প্রভৃতি অনেক অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত। তবে ভূমি বা জাতিভিত্তিক স্বাধীনতা লাভের তুলনায় এসব অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা আদায় করা এবং সেই স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা ঢের কঠিন।
এর কারণ, ভূমিভিত্তিক স্বাধীনতা আদায় হয় বাইরের পক্ষকে হারিয়ে। এটি তুলনামূলক সহজ কাজ। নিজেদের ভেতরকার বিভেদ এই ইচ্ছায় বাদ সাধে না। বরং একতাবদ্ধ হওয়াটা সহজ হয়ে যায়। কারণ, লক্ষ্য থাকে একটাই। কিন্তু পরে যখনই নিজেদের ভেতরকার ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীনতা নিশ্চিতের বিষয়গুলো সামনে আসে, তখন মতভেদও তীব্র হয়ে ওঠে ক্রমে। ঠিক এই পর্যায়েই আইনসিদ্ধ ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের ভূমিকাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরকারের কাজ তখন, বিচার, বিবেচনার পর প্রয়োজনীয় স্বাধীনতার বিষয়গুলো নিশ্চিতে ব্রতী হওয়া।
আর এই জায়গাতেই যত গণ্ডগোল। আগে বাইরের পক্ষ অন্যদের প্রতিপক্ষ ভেবে স্বাধীনতা দিতে চাইত না। এতে ‘আমরা’ বনাম ‘তোমরা’ শীর্ষক একটি দ্বন্দ্ব কাজ করে। ভূমিগত স্বাধীনতা নিশ্চিতের পরই সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরেকটি ‘আমরা’ বনাম ‘তোমরা’ শীর্ষক দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া শুরু করে। কারণ, অবশ্যই ক্ষমতা। এই বস্তুটির ধর্মই এমন। ফলে শাসক ও শোষক শ্রেণির শূন্যস্থান বেশিদিন শূন্য থাকে না। ঠিকই পূরণ হয়ে যায়।
একই অবস্থা আমাদের বাংলাদেশেরও। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর নতুন দেশ হিসেবে উদ্ভব ঘটে বাংলাদেশের। এর পর শুরু হয় দেশের ভেতরে নতুন শাসক ও শোষক শ্রেণির সৃষ্টিপ্রক্রিয়া। বাংলাদেশে এই কাজ সম্পন্ন হতে বেশি সময় লাগেনি। খুব দ্রুতই নতুন ক্ষমতাবান শ্রেণিটি গড়ে ওঠে এবং বছর যত গড়ায়, এই শ্রেণি পরিপুষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। বর্তমানে এই সরকার বা এর সমান্তরাল শাসক শ্রেণিটি গায়েগতরে এতটাই বেড়ে উঠেছে যে, এই শ্রেণির ভেতরে বাইরের কেউ ঢুকলেও বদলাতে বেশি সময় আর লাগে না। অনেকটা যেন কোভিড–১৯ রোগের মতো, ব্যাপক ছোঁয়াচে!
কী, শিরোনামের সঙ্গে মিলিয়ে এসব কথাকে ধান ভানতে শিবের গীত মনে হচ্ছে? চলুন তবে কিছু ঘটনা শুনে নেওয়া যাক।
প্রথম ঘটনা হলো, হুট করেই কিছুদিন আগে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এক ধরনের গোছানো বয়ান আসা শুরু করে। সেসবের সার হলো, এ দেশে সাংবাদিকতায় অনেক সমস্যা আছে, অনেক ত্রুটি–বিচ্যুতি আছে। এবং এসব ত্রুটির দোষারোপ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতেই নাকি এসব দোষে দুষ্ট সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকেরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সেসব শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের মধ্যে বেশ কথা চালাচালিও হয়। সরকারপক্ষীয়দের মূল কথা হলো, এ দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপব্যবহার হচ্ছে আসলে! আর বিরোধী পক্ষের কথা হলো, এভাবে সরকারপক্ষীয়দের কথা বলাটাই আসলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আদতে কতটা, সেই সাক্ষ্য বহন করে এবং তা খুব একটা ইতিবাচক সাক্ষ্য দেয় না!
এবার দ্বিতীয় ঘটনায় আসা যাক। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেলকে তার বাড্ডার বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে। তখন তার পরিবার অভিযোগ করেছিল, ডিবি পরিচয়ে কিছু লোক মিজানুরকে আটক করে নিয়ে গেছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা আলোচনা ও সমালোচনা। পরদিন সকাল ১০টার পর মিজানুরকে বাসায় পৌঁছে দেয় ডিবি।
দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেলকে তার বাড্ডার বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়াএদিকে সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে ১০ ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনা নিছক ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) দায়িত্বে থাকা ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম। আর মিজানুর জানিয়েছেন, ভুল–বোঝাবুঝির কারণে তাকে আনা হয়েছিল—এমন মুচলেকা তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় কিছু প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে আবার কিছু সম্পূরক প্রশ্নও ওঠে। একে একে যাওয়া যাক।
দ্বিতীয় ঘটনায় প্রথম যে প্রশ্নটি ওঠে, সেটি হলো—কেন ওয়ারেন্ট ছাড়া একজন সাংবাদিককে রাত ১২টার পর বাসা থেকে তুলে নিতে হলো? একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে, তিনি সাংবাদিক হোক বা না হোক বা যে–ই হোক। সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় যে কাউকে আটক করা যায়। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এই যে রাত ১২টার পর তুলে নেওয়ার ব্যাপারটা, এটা কতটা যৌক্তিক? পুলিশ কথাও বলতে চাইতে পারে, কিন্তু সেই ইচ্ছা রাত ১২টার পর কেন হবে? দিনের স্বাভাবিক সময়ে ভদ্রভাবে ডেকে কথা বলা যায় না? নাকি কথা বলার বদলে উদ্দেশ্য অন্য?
এই ‘অন্য’ উদ্দেশ্যটি অনুমান করা কঠিন নয়। সেটি হলো, ভয় দেখানো। তা না হলে কেন মিজানুর রহমান সোহেলের কাছ থেকে ভুল–বোঝাবুঝির নিশ্চিতকরণ মুচলেকা নিতে হলো? ভুল বুঝেছে তো পুলিশ। মুচলেকা তাহলে পুলিশের দেওয়া উচিত ছিল, না কি?
কিন্তু সেটি যেহেতু হয়নি, সেহেতু বলতে হয় আপাতদৃষ্টিতে এটি সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের অধিকার সংকোচনের একটি চেষ্টাই। সাদা চোখে এমনটা ধারণা করা দোষের কিছু না, এটি কোনো অপচেষ্টাও না। এখন সেটি করলেও কি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বা বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে হবে?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের অবস্থা অসাধারণ কিছু না আসলে। সেটি যেমন সাংবাদিকতার নীতি–নৈতিকতার দিক থেকে, তেমনি সংবাদমাধ্যমের আর্থিক অবস্থার দিক থেকেও। অর্থাৎ, মানসম্মত সাংবাদিকতার যেমন অভাব আছে, তেমনি মানসম্মত সাংবাদিকতা উপহার দেওয়ার জন্য যেসব আবশ্যকীয় উপাদানের প্রয়োজন হয়, সেসবেরও অভাব আছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও এ দেশের সাংবাদিকতার ভিতই মজবুত হয়নি। নৈতিকভাবে সৎ থেকে সাংবাদিকতা করার উদাহরণও ঢের কম। সংবাদমাধ্যম তৈরির প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে তা চালানো সাংবাদিক, সব ক্ষেত্রেই আদর্শ কোনো পরিস্থিতি দেখা যায় না খুব একটা। এখন দেশ যেমন, দেশের মানুষ যেমন, শাসন যেমন, সাংবাদিকতা তো কম–বেশি তেমনই হবে, তাই না? গোবরে পদ্মফুল–কথাটি প্রবাদ হিসেবে ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবে গোবরের মধ্যে পদ্মফুল দেখেন কয়টা?
তাই রাত ১২টার পর কখনো ‘কথা বলার জন্য’, আবার কখনো ‘ভুল বোঝাবুঝি’তে আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে সাংবাদিককে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দেশে যখন শাসক শ্রেণির ক্ষমতাবানেরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলে উদ্বেগ দেখান বা অনুযোগ করেন, তখন মনে পড়ে যায় এক বাংলা বাগধারা।
আমাদের বাংলা ভাষার এই হলো এক মজা! বাগধারা আছে নানা রকমের, সেগুলো পরিস্থিতিভেদে বেশ কার্যকরীও বটে। ‘কুমিরের কান্না’ তেমনই একটি। এর অর্থ হলো, লোক দেখানো কান্না। মানে এই মায়া আসলে সত্যিকারের মায়া নয়। ইংরেজি ভাষাতেও এই বাগধারা আছে। ক্যামব্রিজ ডিকশনারি বলছে, কুমিরের কান্না হচ্ছে এমন কান্না, যাতে সত্যিকারে দুঃখ থাকে না। এখন, আমাদের দেশের সরকারপক্ষীয় শাসকশ্রেণির অবস্থাও হয়েছে তেমনি। কুমিরের মতো তারাও কাঁদতে বেশ ভালোবাসেন। তবে সেই কান্না কপট ও উদ্দেশ্যমূলক মনে হয় আদতে। এবং এই কারণেই সেই কর্মকাণ্ড আদতে সাংবাদিকতার উন্নতিতে কোনো কাজে লাগে না।
আরএসএফ–এর ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। ছবি: পেক্সেলসএ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, সাংবাদিকতায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান আসলে কোথায়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বা আরএসএফ–এর ২০২৫ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। ১৮০টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মধ্যে আমাদের দেশের এই অবস্থান। এ বছর তাও আমরা কিছুটা এগিয়েছি বটে। গত বছরের তুলনায় ১৬ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। আগে অবস্থা আরও খারাপ ছিল। ২০২৪ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৫তম। স্কোর ছিল ২৭ দশমিক ৬৪। এই বছর স্কোর ৩৩ দশমিক ৭১।
আর বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেমন, সেই আলোচনায় আরএসএফ একটি লাইন লিখেছে। বলেছে, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই গণমাধ্যমকে কেবল নিজেদের বার্তা প্রচারের একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।’ আশা করি, এই একটি বাক্যই বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বরূপ বোঝাতে যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা থেকে আর একটি বিষয়ই যোগ করা যেতে পারে। সেটি হলো, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক—যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রেই আরএসএফ–এর এই মূল্যায়ন যথার্থ।
চলুন, এবার এই লেখার শুরুর প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। বোঝাই যাচ্ছে যে, এ দেশের ক্ষমতা কাঠামোয় একটি শাসক ও শোষক শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যাতে যেকোনো তরিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেই যেকোনো মানুষের চরিত্র বদলে যায়। দু’দিন আগেও সাধারণের পক্ষে কথা বলারাও তখন ক্ষমতার তল্পিবাহক হয়ে যায়, ক্ষমতার ভাষায় কথা বলা শুরু করে, দোষারোপ করে।
সুতরাং এমন একটি দেশে, যেখানে মানুষ নিজেদের অভ্যন্তরীণ নানামাত্রিক স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি এখনো, সেখানে শাসন সম্পর্কিত ত্রুটি আগে সারানো দরকার। ভাত দেওয়ার মুরোদ না থাকলে, শুধু কিল মারার গোঁসাই হয়ে কোনো লাভ নাই আসলে। এতে কিল মারাটাই বরং সবার সামনে কেবল ফুটে উঠবে। আর তাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে কোনো গঠনমূলক বার্তা যাবে না।
তাই আগে বরং ভাত দেওয়ার মুরোদ অর্জন করা উচিত। এ দেশের ক্ষমতাবানেরা সেটি যত দ্রুত অর্জন করতে পারেন, ততই আমাদের মতো খেটে খাওয়াদের স্বস্তি!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা