বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে বক্তব্য রেখেছেন। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কার্নির বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হলো।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স

আজ আমি বিশ্বব্যবস্থায় একটি গভীর ভাঙনের কথা বলব–যেখানে আছে একটি আরামদায়ক কল্পনার অবসান এবং এক কঠোর বাস্তবতার সূচনা। সেই বাস্তবতায় ভূরাজনীতি, বিশেষ করে প্রধান শক্তিগুলোর ভূরাজনীতি, আর কোনো সীমা বা নিয়ন্ত্রণ মানে না। তবে একই সঙ্গে আমি বলতে চাই, অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে কানাডার মতো মধ্যম শক্তিগুলো–একেবারে অসহায় নয়। মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান–এই মূল্যবোধগুলোকে ধারণ করে তারা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে।

কম শক্তিশালীদের শক্তির সূচনা হয় সততা থেকে। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে আমরা মহাশক্তিধরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক যুগে বাস করছি। যেখানে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু। যেখানে শক্তিশালীরা যা পারে তাই করে, আর দুর্বলদের সহ্য করতেই হয় যা তাদের ভাগ্যে জোটে। থুসিডাইডসের এই উক্তিটি যেন অনিবার্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তথাকথিত স্বাভাবিক যুক্তি হিসেবে।

এই যুক্তির মুখে দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রবল প্রবণতা দেখা দেয়, ঝামেলা এড়াতে মানিয়ে নেওয়া, খাপ খাইয়ে নেওয়া, আশা করা যে আনুগত্য দেখালে নিরাপত্তা মিলবে। কিন্তু তা মিলবে না। তাহলে আমাদের সামনে কী বিকল্প আছে?

১৯৭৮ সালে, চেক ভিন্নমতাবলম্বী ভ্যাকলভ হাভেল, যিনি পরে প্রেসিডেন্ট হন–‘ক্ষমতাহীনদের শক্তি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি একটি সহজ প্রশ্ন তোলেন: কমিউনিস্ট ব্যবস্থা কীভাবে টিকে ছিল? তার উত্তর শুরু হয় এক সবজিওয়ালাকে দিয়ে। প্রতিদিন সকালে এই দোকানদার তার জানালায় একটি সাইন ঝুলিয়ে দিতেন–‘বিশ্বের সব মজদুর এক হও।’ তিনি নিজে এতে বিশ্বাস করতেন না, কেউই করত না। তবু ঝামেলা এড়াতে, আনুগত্যের সংকেত দিতে, সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সে সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়ে রাখত। আর যেহেতু প্রতিটি রাস্তায় প্রতিটি দোকানদার একই কাজ করতেন, তাই ব্যবস্থা টিকে থাকত–শুধু সহিংসতার মাধ্যমে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সেইসব আচার পালনের মাধ্যমে, যেগুলো তারা মনে মনে মিথ্যা বলে জানত। হাভেল একে বলেছিলেন–মিথ্যার ভেতরে বসবাস।

ব্যবস্থার শক্তি তার সত্যে নয়, বরং সবাই মিলে এমন ভান করার ইচ্ছায় যে, সেটি সত্য। আর সেই একই জায়গাতেই তার ভঙ্গুরতা। একজন মানুষও যদি সেই ভান করা বন্ধ করে দেয়–যদি সবজিওয়ালা তার সাইনটি নামিয়ে ফেলে–তাহলেই সেই ভুল ভাঙতে শুরু করে।

বন্ধুগণ, এখন সময় এসেছে কোম্পানি ও দেশগুলোর জানালা থেকে তাদের সাইন নামিয়ে নেওয়ার। দশকের পর দশক ধরে কানাডার মতো দেশগুলো তথাকথিত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধীনে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমরা এর প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দিয়েছি, এর নীতিগুলো প্রশংসা করেছি, এর পূর্বানুমানযোগ্যতা থেকে লাভবান হয়েছি। সেই সুরক্ষার ভেতর থেকেই আমরা মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পেরেছি। আমরা জানতাম এই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গল্প আংশিকভাবে মিথ্যা।

আমরা জানতাম, শক্তিশালীরা সুবিধামতো নিজেদের নিয়মের বাইরে রাখে। জানতাম, বাণিজ্যিক নিয়মগুলো অসমভাবে প্রয়োগ হয়। জানতাম, আন্তর্জাতিক আইন কখনো কঠোরভাবে, কখনো ঢিলেঢালাভাবে প্রয়োগ হয়–এটা অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগীর পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। তবু এই কল্পনাটি ছিল উপযোগী। বিশেষ করে মার্কিন আধিপত্য কিছু বৈশ্বিক জনস্বার্থ রক্ষা করেছিল–যেমন, উন্মুক্ত সমুদ্রপথ, একটি স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা, সম্মিলিত নিরাপত্তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামোর সমর্থন। তাই আমরা জানালায় সাইন ঝুলিয়েছিলাম। আমরা আচারগুলোতে অংশ নিয়েছিলাম এবং কথাবার্তা ও বাস্তবতার ফাঁকফোকরগুলো নিয়ে সাধারণত প্রশ্ন তুলিনি।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর একাধিকবার কানাডা দখলের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর একাধিকবার কানাডা দখলের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এই সমঝোতা আর কাজ করছে না। স্পষ্ট করে বলি, আমরা এখন এক ভাঙনের মধ্যে আছি, কোনো ধীর পরিবর্তনের মধ্যে নয়। গত দুই দশকে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও ভূরাজনীতির একের পর এক সংকট চরম বৈশ্বিক সংযুক্তির ঝুঁকিগুলো উন্মোচিত করেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে মহাশক্তিগুলো অর্থনৈতিক সংযুক্তিকেই অস্ত্র বানাতে শুরু করেছে–শুল্ককে চাপের হাতিয়ার, আর্থিক অবকাঠামোকে জবরদস্তির মাধ্যম, সরবরাহ শৃঙ্খলকে শোষণের দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করছে।

যখন সংযুক্তিই আপনার অধীনতার উৎস হয়ে ওঠে, তখন পারস্পরিক লাভের মিথ্যার ভেতরে আর বাস করা যায় না। মধ্যম শক্তিগুলো যে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করত–ডব্লিউটিও, জাতিসংঘ, কপ–সমষ্টিগত সমস্যা সমাধানের পুরো কাঠামোটাই আজ হুমকির মুখে। ফলে অনেক দেশ একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে, তাদের জ্বালানি, খাদ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও বেশি কৌশলগত স্বনির্ভরতা গড়ে তুলতে হবে।

এই প্রবণতা বোধগম্য। যে দেশ নিজেকে খাওয়াতে, জ্বালানি জোগাতে বা রক্ষা করতে পারে না, তার হাতে খুব কম বিকল্প থাকে। যখন নিয়ম আপনাকে রক্ষা করে না, তখন আপনাকেই নিজেকে রক্ষা করতে হয়। কিন্তু খোলা চোখে দেখতে হবে–এর পরিণতি কী। দুর্গের পৃথিবী হবে আরও দরিদ্র, আরও ভঙ্গুর এবং কম টেকসই।

আরেকটি সত্যও আছে। যদি মহাশক্তিগুলো ক্ষমতা ও স্বার্থের নিরঙ্কুশ অনুসরণের জন্য নিয়ম ও মূল্যবোধের ভানটুকুও ত্যাগ করে, তবে লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের লাভ ক্রমেই কমে যাবে। আধিপত্যশীল শক্তিগুলো চিরকাল তাদের সম্পর্ককে অর্থে রূপান্তর করতে পারবে না। মিত্ররা অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বীমা করতে বিকল্প খুঁজবে, সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে। যে সার্বভৌমত্ব একসময় নিয়মের ওপর দাঁড়িয়েছিল, তা ক্রমেই দাঁড়াবে চাপ সহ্য করার সক্ষমতার ওপর।

এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চিরাচরিত যুক্তি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার খরচ আছে। তবে কৌশলগত স্বনির্ভরতা ও সার্বভৌমত্বের সেই খরচ ভাগাভাগি করা যায়। স্থিতিস্থাপকতায় সম্মিলিত বিনিয়োগ, সবার আলাদা আলাদা দুর্গ বানানোর চেয়ে সস্তা। যৌথ মানদণ্ড খণ্ডিতকরণ কমায়। পরিপূরকতা ইতিবাচক ফল দেয়।

তাই কানাডার মতো মধ্যম শক্তির সামনে প্রশ্নটি হলো–নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেব কি না, তা নয়। আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু দেয়াল উঁচু করেই মানিয়ে নেব, নাকি আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু করব?

কানাডা ছিল প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি, যারা এই সতর্কবার্তা শুনে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান মৌলিকভাবে বদলেছে। কানাডিয়ানরা জানে, ভৌগোলিক অবস্থান ও জোটসদস্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা দেবে–এই আরামদায়ক ধারণা আর কার্যকর নয়।

আমাদের নতুন পদ্ধতির ভিত্তি হলো, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট যাকে বলেছেন ‘মূল্যবোধভিত্তিক বাস্তববাদ’। অন্যভাবে বললে, আমরা নীতিগত ও বাস্তববাদী–দুটোই হতে চাই। নীতিগত–সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য ছাড়া বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধকরণ এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার প্রশ্নে। আর বাস্তববাদী–এই স্বীকৃতিতে যে অগ্রগতি প্রায়ই ধাপে ধাপে আসে, স্বার্থ ভিন্ন হয়, এবং সব অংশীদার আমাদের সব মূল্যবোধ ভাগ করে নেয় না।

তাই আমরা চোখ খোলা রেখে বিস্তৃত ও কৌশলগতভাবে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি। যেমন বিশ্ব আছে, তেমন করেই তার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা–যেমনটি আমরা চাই, তেমনটির জন্য বসে থাকছি না। আমরা সম্পর্কগুলো এমনভাবে সামঞ্জস্য করছি, যাতে তাদের গভীরতা আমাদের মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে। আর এই অস্থির সময়ে আমাদের প্রভাব সর্বাধিক করতে বিস্তৃত সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

আমরা আর শুধু আমাদের মূল্যবোধের শক্তির ওপর নির্ভর করছি না, আমাদের শক্তির মূল্যও বাড়াচ্ছি। সেই শক্তি আমরা ঘরেই গড়ে তুলছি। আমার সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা আয়, পুঁজিগত মুনাফা ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ওপর কর কমিয়েছি। আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্যের সব ফেডারেল বাধা তুলে দিয়েছি। জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, নতুন বাণিজ্য করিডোরসহ নানা খাতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছি। এই দশকের শেষ নাগাদ আমরা প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করছি এমনভাবে, যাতে আমাদের নিজস্ব শিল্পও শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে আমরা দ্রুত বৈদেশিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য এনেছি।

আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বে পৌঁছেছি, যার মধ্যে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ক্রয় ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়াও রয়েছে। ছয় মাসে চার মহাদেশে ১২টি বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীন ও কাতারের সঙ্গে নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব সম্পন্ন হয়েছে। আমরা ভারত, আসিয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছি।

আমরা বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে আরেকটি পথ নিচ্ছি—ভ্যারিয়েবল জিওমেট্রি। অর্থাৎ, ইস্যুভেদে ভিন্ন ভিন্ন জোট, অভিন্ন মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে আমরা ‘ইচ্ছুকদের জোট’-এর একটি মূল সদস্য এবং মাথাপিছু হিসাবে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় অন্যতম বড় অবদান রাখা দেশ। আর্কটিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছি এবং গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের তাদের একক অধিকারকে পূর্ণ সমর্থন করি। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটল।

আমরা নর্ডিক-বাল্টিক গেটসহ ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছি, জোটের উত্তর ও পশ্চিম প্রান্ত আরও সুরক্ষিত থাকবে–ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার, সাবমেরিন, বিমান এবং মাঠে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে। বরফের ওপর বুট—অর্থাৎ আর্কটিকেই উপস্থিতি।

কানাডা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করে এবং আর্কটিকে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির যৌথ লক্ষ্য অর্জনে লক্ষ্যভিত্তিক আলোচনার আহ্বান জানায়। বহুপাক্ষিক বাণিজ্যে আমরা ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছি, যা ১৫০ কোটি মানুষের একটি নতুন বাণিজ্য ব্লক তৈরি করবে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে আমরা জি৭-এর আওতায় ক্রেতা জোট গড়ছি, যাতে বিশ্ব অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত সরবরাহ থেকে সরে আসতে পারে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আমরা সমমনা গণতন্ত্রগুলোর সঙ্গে কাজ করছি, যাতে ভবিষ্যতে আমাদের আধিপত্যশীল রাষ্ট্র ও বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য হতে না হয়।

এটি সরল বহুপাক্ষিকতা নয়, আবার পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অন্ধ নির্ভরতাও নয়। এটি কার্যকর জোট গড়া—ইস্যু অনুযায়ী, এমন অংশীদারদের সঙ্গে, যাদের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত অভিন্নতা আছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরই জোট হবে।

এর মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংস্কৃতির এক ঘন সংযোগজাল তৈরি হচ্ছে, যেখান থেকে আমরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ মোকাবিলা করতে পারব। আমি বলি, মধ্যম শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে। কারণ আমরা যদি টেবিলে না থাকি, তবে আমরা মেনুতেই থাকব।

মহাশক্তিগুলো আপাতত একা চলতে পারে। তাদের বাজারের আকার আছে, সামরিক সক্ষমতা আছে, শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার মতো প্রভাব আছে। মধ্যম শক্তিগুলোর তা নেই। যখন আমরা কোনো আধিপত্যশীল শক্তির সঙ্গে শুধু দ্বিপাক্ষিকভাবে দরকষাকষি করি, তখন আমরা দুর্বল অবস্থান থেকেই করি। যা দেওয়া হয়, তা গ্রহণ করি। কে বেশি অনুগত হবে–সে প্রতিযোগিতায় নামি। এটি সার্বভৌমত্ব নয়। এটি অধীনতা মেনে নিয়ে সার্বভৌমত্বের অভিনয়।

মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই বিশ্বে, মাঝামাঝি অবস্থানের দেশগুলোর সামনে দুটি পথ–একটি, অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা; আরেকটি, একত্রিত হয়ে প্রভাবশালী একটি তৃতীয় পথ তৈরি করা। দাপুটে শক্তির উত্থান যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে না পারে যে বৈধতা, সততা ও নিয়মের শক্তি এখনো প্রবল–যদি আমরা সেগুলো একসঙ্গে প্রয়োগ করতে চাই।

কানাডার কাছে বিপুল গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত আছে। ছবি: রয়টার্স
কানাডার কাছে বিপুল গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত আছে। ছবি: রয়টার্স

এখানেই আমি আবার হাভেলের কথায় ফিরি। মধ্যম শক্তিগুলোর জন্য ‘সত্যের ভেতরে বসবাস’ মানে কী? প্রথমত, বাস্তবতাকে নাম দেওয়া। এমন ভান করা বন্ধ করতে হবে যে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখনো বিজ্ঞাপনের মতো কাজ করছে। এটাকে বলতে হবে যেমনটি এটি–মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার একটি ব্যবস্থা, যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালীরা অর্থনৈতিক সংযুক্তিকে জবরদস্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করে।

এর মানে হলো ধারাবাহিকভাবে কাজ করা–মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। এক দিক থেকে অর্থনৈতিক ভয়ভীতি নিয়ে কথা বলি, আর অন্য দিক থেকে হলে চুপ থাকি–এ মানে আমরা এখনো জানালায় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছি।

এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা যা বিশ্বাস করি বলে দাবি করি, তা গড়ে তোলা–পুরোনো ব্যবস্থা ফিরে আসার অপেক্ষায় না থাকা। এমন প্রতিষ্ঠান ও চুক্তি তৈরি করা, যা বাস্তবেই ঘোষণামতো কাজ করে। আর জবরদস্তিকে সম্ভব করে তোলে–এমন প্রভাব কমিয়ে আনা।

শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গড়া–এটাই হওয়া উচিত প্রতিটি সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্য শুধু অর্থনৈতিক বিচক্ষণতা নয়; এটি সৎ পররাষ্ট্রনীতির বস্তুগত ভিত্তি। কারণ প্রতিশোধের ঝুঁকি কমিয়েই দেশগুলো নীতিগত অবস্থান নেওয়ার অধিকার অর্জন করে।

কানাডার কাছে এমন অনেক কিছু আছে, যা বিশ্বের দরকার। আমরা একটি জ্বালানি মহাশক্তি। আমাদের কাছে বিপুল গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মজুত আছে। আমাদের জনগণ বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিতদের মধ্যে অন্যতম। আমাদের পেনশন তহবিলগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও পরিশীলিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। অর্থাৎ আমাদের আছে পুঁজি ও মেধা। আমাদের আছে এমন একটি সরকার, যার দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। আর আছে এমন মূল্যবোধ, যার প্রতি অনেকেই আকৃষ্ট।

কানাডা একটি বহুত্ববাদী সমাজ। আমাদের জনপরিসর উচ্চকণ্ঠ, বৈচিত্র্যময় ও মুক্ত। কানাডিয়ানরা টেকসই উন্নয়নের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এমন এক পৃথিবীতে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার, যা মোটেও স্থিতিশীল নয়। দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক গড়ে তোলায় আমরা বিশ্বাস করি।

আর আমাদের কাছে আরেকটি বিষয় আছে–কি ঘটছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট উপলব্ধি এবং সেই অনুযায়ী কাজ করার দৃঢ় সংকল্প। আমরা বুঝি, এই ভাঙন শুধু মানিয়ে নেওয়ার দাবি করে না; এটি দাবি করে পৃথিবী যেমনটি আছে, সে সম্পর্কে সততা। আমরা জানালা থেকে সাইন নামিয়ে নিচ্ছি। আমরা জানি, পুরোনো ব্যবস্থা আর ফিরবে না। আমাদের সেটির জন্য শোক করার দরকার নেই। নস্টালজিয়া কোনো কৌশল নয়।

তবে আমরা বিশ্বাস করি, এই ভাঙনের মধ্য থেকেই আমরা আরও বড়, আরও ভালো, আরও শক্তিশালী এবং আরও ন্যায়সঙ্গত কিছু গড়ে তুলতে পারি। এটিই মধ্যম শক্তিগুলোর কাজ–যেসব দেশের পৃথিবীতে হারানোর ভয় সবচেয়ে বেশি।

সম্পর্কিত