হামিদ রায়হান

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি-এ কথা মনে হতে থাকে বারবার, যেন এ কুয়াশার ভেতর দিয়েই সব শুরু হয়। ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ার রাস্তাগুলো তখনো আধা-ঘুমে, পুরনো শিরীষ গাছগুলোর পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের প্রথম আলোয় চকচক করছে, আবার মিলিয়েও যাচ্ছে। ঠিক যেমন করে নির্বাচন এলেই পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর বিবৃতি আলো ছড়ায় হঠাৎ, উজ্জ্বল। পরে, তা ধীরে ধীরে নিভে যায়। এ দৃশ্যের মধ্যেই বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন দাঁড়িয়ে আছে-ঝাপসা, অস্পষ্ট। এরপরও, উপেক্ষা করা যায় না এমন এক সতর্ক দৃষ্টির নিচে। পশ্চিমাদের ভাষায় ‘Free, fair and credible election’-এ শব্দগুলো শুনলে মনে হতে পারে কবিতার কোনো লাইন। আসলে তা নয়। এগুলো কাঠামো, নিয়ম, শর্ত।
অবাধ মানে ভোট দিতে গিয়ে ভয় যেন পিছু না নেয়, সুষ্ঠু মানে প্রশাসন যেন কারো দিকে হেলে না পড়ে, আর বিশ্বাসযোগ্য মানে ফলাফল যেন নিজেই নিজের পক্ষে কথা বলতে পারে। এ তিনটি শব্দ একসঙ্গে উচ্চারিত হলে, পশ্চিমা কূটনীতিকদের মনে একের পর এক ছবি ভেসে ওঠে-স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিরোধী দল, আর ভোটের দিন নিরাপদ ব্যালট বাক্স। তাদের কাছে নির্বাচন মানে কেবল একটি দিন নয়; এটি দীর্ঘ এক যাত্রা, যা অনেক পূর্বে শুরু হয় এবং অনেক পরে গিয়ে থামে।
এ ধারণার ভেতর দিয়েই আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের দিকে তাকায়। চোখ আলাদা, চশমা আলাদা, কিন্তু দৃষ্টির দিক প্রায় একই। আমেরিকা কথা বলে সোজাসাপ্টা ভাষায়-গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অংশগ্রহণ-এ শব্দগুলো যেন তাদের কূটনৈতিক বাক্যের মেরুদণ্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটু ধীরে হাঁটে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাবে-নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা।
যুক্তরাজ্য ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশকে দেখে এক ধরনের পরিচিত আবহে। শেষ পর্যন্ত তার কথাও গিয়ে মিশে যায় একই সুরে-গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। কখনো এ ভাষা আসে লিখিত বিবৃতিতে, কখনো ভিসা নীতিতে, কখনো নিঃশব্দ আলোচনায়-যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি কথা বলে।
এ সব কথা, এসব দৃষ্টি, ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মানবাধিকার, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-এ তিনটি বিষয় যেন বারবার ফিরে আসে, ফিরে আসে প্রশ্ন হয়ে। রাজনৈতিক কর্মীরা কি কথা বলতে পারছে? সাংবাদিকরা কি লিখতে পারছে? মানুষ কি নিজের মত প্রকাশ করতে পারছে? প্রশ্নগুলো নতুন নয়, এগুলো স্মৃতি থেকে উঠে আসে-আগের নির্বাচনগুলোর স্মৃতি, বিতর্ক, উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ, নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা। অতীত যেন বর্তমানের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশব্দে। এ উদ্বেগ কখনো কেবল উদ্বেগ হয়ে থাকে না। তা রূপ নেয় নীতিতে, সিদ্ধান্তে। নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নীতি, কূটনৈতিক চাপ-এসব শব্দ ঢাকার রাজনৈতিক আলোচনায় ঢুকে পড়ে। এগুলো খুব জোরে বলা হয় না, কিন্তু শোনা যায়। বার্তাটা স্পষ্ট-নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রতিধ্বনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও শোনা যাবে। তবু এ পুরো চিত্রের পেছনে আরেকটি মানচিত্র আছে-ভূরাজনীতির।
বঙ্গোপসাগর, অঞ্চল, কৌশল-এসব শব্দ পশ্চিমা বিশ্লেষণে ঘুরে ফিরে আসে। বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, তাই তার নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অস্থিরতা মানে অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তা মানে হিসাবের গোলমাল-এ ভাবনাটুকু পশ্চিমারা মাথায় রেখেই তাকায়।
এখানেই এসে থামে না গল্প; বরং জটিল হয়। পশ্চিমাদের প্রত্যাশার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে বাংলাদেশের সার্বভৌম বাস্তবতা। সরকার বলে, নির্বাচন অভ্যন্তরীণ বিষয়, সংবিধানের আলোয় পরিচালিত হবে। পশ্চিমারা ভাবে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এখন আর শুধু দেশের ভেতরের কথা নয়। দুটো ভাবনার মাঝখানে তৈরি হয় এক নীরব টান, যা খুব কমই প্রকাশ্যে আসে, কিন্তু সব আলোচনার ভেতরে থাকে।
ঢাকা অবশ্য তার নিজের ছন্দে চলে। রাস্তায় যানজট, দেয়ালে পোস্টার, চায়ের দোকানে আলোচনা। আর এর ওপর দিয়ে ভেসে থাকে সেই দৃষ্টি-ওয়াশিংটনের, ব্রাসেলসের, লন্ডনের। কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে, আলো বাড়ে, কিন্তু পুরো ছবি এখনো স্পষ্ট নয়। এ নির্বাচন কীভাবে লেখা হবে পশ্চিমাদের চোখে, ইতিহাসের পাতায়, তা এখনো অজানা। শুধু অপেক্ষা, আর সেই অপেক্ষার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক শহর, এক দেশ।
মানবাধিকার, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-এই তিনটি শব্দ ঘুরে ফিরে আসে, বারবার আসে, যেন দূরের কোনো কূটনৈতিক ঘড়ির কাঁটা এক জায়গায় আটকে আছে। পশ্চিমাদের উদ্বেগের এ তিন স্তম্ভ একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, আলাদা করা যায় না। ঠিক যেমন ভোরের আলো, কুয়াশা আর শিশির আলাদা করে ধরা যায় না। তারা প্রশ্ন তোলে। প্রশ্ন তোলাই যেন তাদের অভ্যাস। রাজনৈতিক কর্মীরা কি নির্বিঘ্নে সভা করতে পারছে, নাকি কোথাও অদৃশ্য কোনো দেয়াল আছে। সাংবাদিকরা কি ভয় ছাড়াই লিখতে পারছে, নাকি প্রতিটি বাক্যের আগে থেমে যেতে হচ্ছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ কি স্বাধীন, নাকি চোখ আছে, নজর আছে, নীরব উপস্থিতি আছে। এ প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কখনোই নতুন ছিল না। এগুলো জন্ম নিয়েছে স্মৃতি থেকে, সেই স্মৃতি যা পশ্চিমা বিশ্লেষকদের নোটবুকে এখনো তাজা, এখনো কালির গন্ধ ছাড়ায়।
২০১৪, ২০১৮-এই সংখ্যাগুলো শুধু সাল নয়, এগুলো অনুভূতি, বিতর্ক, দ্বিধা। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয়, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার খবর-সব মিলিয়ে এক ধরনের অসমাপ্ত গল্প। এ গল্পই বর্তমানের ভেতরে ঢুকে পড়ে, বর্তমানকে ভারী করে তোলে। তাই শঙ্কা তৈরি হয়, শঙ্কা জমতে থাকে, আর সেই শঙ্কা শুধু কথায় থাকে না, ধীরে ধীরে নীতিতে রূপ নেয়। নীতির ভাষা কখনো নরম, কখনো কঠিন, কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নীতি, কূটনৈতিক চাপ-এই শব্দগুলো উচ্চারিত হয় কম, কিন্তু শোনা যায় বেশি।
আমেরিকার ঘোষিত ভিসা নীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে, কারণ সেসব সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত, সরাসরি প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকে পড়ে। ইউরোপীয় দেশগুলোও উন্নয়ন সহযোগিতা আর বাণিজ্যিক সুবিধার কথা বলতে গিয়ে গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে আনে-শান্তভাবে, ভদ্রভাবে, কিন্তু স্পষ্টভাবে। এসব চাপ কখনো প্রকাশ্যে আসে, কখনো নিঃশব্দ থাকে। তবু বার্তাটি পরিষ্কারই থাকে-নির্বাচনের মান নিয়ে আপস মানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খাতায় একটি দাগ।
এ পুরো দৃশ্যপট বোঝার জন্য শুধু ঢাকার রাজনীতি দেখলেই হয় না, মানচিত্র খুলে দেখতে হয় বড় মানচিত্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা-এই বড় খেলায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি, নড়াচড়া করলে বোঝা যায়, থেমে থাকলেও বোঝা যায়। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগত, এ কথাটা পশ্চিমারা বারবার মনে রাখে। তাই নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহ কেবল আদর্শিক নয়; এর ভেতরে আছে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হিসাব। একটি অস্থিতিশীল বাংলাদেশ মানে অনিশ্চয়তা-এ ধারণাটা তাদের মাথায় ঘুরতে থাকে, বারবার ঘুরতে থাকে। আর ঠিক এখানেই এসে দাঁড়ায় সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি, প্রশ্নের ভেতর প্রশ্ন-পশ্চিমাদের প্রত্যাশা বনাম বাংলাদেশের সার্বভৌম বাস্তবতা।
বাংলাদেশের সরকার বারবার বলে, নির্বাচন অভ্যন্তরীণ বিষয়, সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এই বক্তব্যের পেছনে আছে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, নিজের মতো করে টিকে থাকার গল্প। অন্যদিকে পশ্চিমারা ভাবে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার এখন আর এক দেশের ভেতরে আটকে থাকে না, বৈশ্বিক হয়ে গেছে, সীমান্ত মানে কাগজের রেখা। এ দুটো ভাবনার মাঝখানে তৈরি হয় এক নীরব টানাপোড়েন। কথায় কম, অনুভবে বেশি-যা সিদ্ধান্তের স্তরে গিয়ে গভীর ছাপ ফেলে।
এ টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে চলে, কখনো আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে, কখনো সাবধানে, পা ফেলবার আগে চারপাশ দেখে। ঢাকার ব্যস্ত রাজপথে যেমন একসঙ্গে রিকশা, বাস আর গাড়ি চলে, তেমনি এ নির্বাচনকে ঘিরে চলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি আর জনমানুষের প্রত্যাশা-সব একসঙ্গে, সব একসাথে। পশ্চিমাদের দৃষ্টি সেই চলমান দৃশ্যের ওপর স্থির থাকে-কখনো কূটনৈতিক জানালার কাঁচের আড়াল থেকে, কখনো বিবৃতির কাগজে, কখনো নীরব আলোচনার টেবিলে, যেখানে কথার চেয়ে নীরবতাই বেশি ওজন।
এরপরও যে প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে থাকে, অসমাপ্ত বাক্যের মতো-এ নির্বাচন কি পশ্চিমাদের চোখে ‘Free, fair and credible’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, নাকি অতীতের স্মৃতিগুলো আবার নতুন করে ফিরে আসবে। উত্তর এখনো লেখা হয়নি। সময় এগোয়, কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে, দৃশ্যপট একটু একটু করে পরিষ্কার হয়। আর বিশ্ব তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের দিকে, অপেক্ষার নীরবতায়, নিঃশ্বাস আটকে রাখা এক মুহূর্তে।
হামিদ রায়হান: লেখক ও গবেষক

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি-এ কথা মনে হতে থাকে বারবার, যেন এ কুয়াশার ভেতর দিয়েই সব শুরু হয়। ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ার রাস্তাগুলো তখনো আধা-ঘুমে, পুরনো শিরীষ গাছগুলোর পাতায় জমে থাকা শিশির সূর্যের প্রথম আলোয় চকচক করছে, আবার মিলিয়েও যাচ্ছে। ঠিক যেমন করে নির্বাচন এলেই পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর বিবৃতি আলো ছড়ায় হঠাৎ, উজ্জ্বল। পরে, তা ধীরে ধীরে নিভে যায়। এ দৃশ্যের মধ্যেই বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন দাঁড়িয়ে আছে-ঝাপসা, অস্পষ্ট। এরপরও, উপেক্ষা করা যায় না এমন এক সতর্ক দৃষ্টির নিচে। পশ্চিমাদের ভাষায় ‘Free, fair and credible election’-এ শব্দগুলো শুনলে মনে হতে পারে কবিতার কোনো লাইন। আসলে তা নয়। এগুলো কাঠামো, নিয়ম, শর্ত।
অবাধ মানে ভোট দিতে গিয়ে ভয় যেন পিছু না নেয়, সুষ্ঠু মানে প্রশাসন যেন কারো দিকে হেলে না পড়ে, আর বিশ্বাসযোগ্য মানে ফলাফল যেন নিজেই নিজের পক্ষে কথা বলতে পারে। এ তিনটি শব্দ একসঙ্গে উচ্চারিত হলে, পশ্চিমা কূটনীতিকদের মনে একের পর এক ছবি ভেসে ওঠে-স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিরোধী দল, আর ভোটের দিন নিরাপদ ব্যালট বাক্স। তাদের কাছে নির্বাচন মানে কেবল একটি দিন নয়; এটি দীর্ঘ এক যাত্রা, যা অনেক পূর্বে শুরু হয় এবং অনেক পরে গিয়ে থামে।
এ ধারণার ভেতর দিয়েই আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের দিকে তাকায়। চোখ আলাদা, চশমা আলাদা, কিন্তু দৃষ্টির দিক প্রায় একই। আমেরিকা কথা বলে সোজাসাপ্টা ভাষায়-গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অংশগ্রহণ-এ শব্দগুলো যেন তাদের কূটনৈতিক বাক্যের মেরুদণ্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটু ধীরে হাঁটে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাবে-নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা।
যুক্তরাজ্য ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশকে দেখে এক ধরনের পরিচিত আবহে। শেষ পর্যন্ত তার কথাও গিয়ে মিশে যায় একই সুরে-গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। কখনো এ ভাষা আসে লিখিত বিবৃতিতে, কখনো ভিসা নীতিতে, কখনো নিঃশব্দ আলোচনায়-যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি কথা বলে।
এ সব কথা, এসব দৃষ্টি, ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মানবাধিকার, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-এ তিনটি বিষয় যেন বারবার ফিরে আসে, ফিরে আসে প্রশ্ন হয়ে। রাজনৈতিক কর্মীরা কি কথা বলতে পারছে? সাংবাদিকরা কি লিখতে পারছে? মানুষ কি নিজের মত প্রকাশ করতে পারছে? প্রশ্নগুলো নতুন নয়, এগুলো স্মৃতি থেকে উঠে আসে-আগের নির্বাচনগুলোর স্মৃতি, বিতর্ক, উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ, নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা। অতীত যেন বর্তমানের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশব্দে। এ উদ্বেগ কখনো কেবল উদ্বেগ হয়ে থাকে না। তা রূপ নেয় নীতিতে, সিদ্ধান্তে। নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নীতি, কূটনৈতিক চাপ-এসব শব্দ ঢাকার রাজনৈতিক আলোচনায় ঢুকে পড়ে। এগুলো খুব জোরে বলা হয় না, কিন্তু শোনা যায়। বার্তাটা স্পষ্ট-নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রতিধ্বনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও শোনা যাবে। তবু এ পুরো চিত্রের পেছনে আরেকটি মানচিত্র আছে-ভূরাজনীতির।
বঙ্গোপসাগর, অঞ্চল, কৌশল-এসব শব্দ পশ্চিমা বিশ্লেষণে ঘুরে ফিরে আসে। বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, তাই তার নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অস্থিরতা মানে অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তা মানে হিসাবের গোলমাল-এ ভাবনাটুকু পশ্চিমারা মাথায় রেখেই তাকায়।
এখানেই এসে থামে না গল্প; বরং জটিল হয়। পশ্চিমাদের প্রত্যাশার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে বাংলাদেশের সার্বভৌম বাস্তবতা। সরকার বলে, নির্বাচন অভ্যন্তরীণ বিষয়, সংবিধানের আলোয় পরিচালিত হবে। পশ্চিমারা ভাবে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এখন আর শুধু দেশের ভেতরের কথা নয়। দুটো ভাবনার মাঝখানে তৈরি হয় এক নীরব টান, যা খুব কমই প্রকাশ্যে আসে, কিন্তু সব আলোচনার ভেতরে থাকে।
ঢাকা অবশ্য তার নিজের ছন্দে চলে। রাস্তায় যানজট, দেয়ালে পোস্টার, চায়ের দোকানে আলোচনা। আর এর ওপর দিয়ে ভেসে থাকে সেই দৃষ্টি-ওয়াশিংটনের, ব্রাসেলসের, লন্ডনের। কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে, আলো বাড়ে, কিন্তু পুরো ছবি এখনো স্পষ্ট নয়। এ নির্বাচন কীভাবে লেখা হবে পশ্চিমাদের চোখে, ইতিহাসের পাতায়, তা এখনো অজানা। শুধু অপেক্ষা, আর সেই অপেক্ষার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক শহর, এক দেশ।
মানবাধিকার, ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা-এই তিনটি শব্দ ঘুরে ফিরে আসে, বারবার আসে, যেন দূরের কোনো কূটনৈতিক ঘড়ির কাঁটা এক জায়গায় আটকে আছে। পশ্চিমাদের উদ্বেগের এ তিন স্তম্ভ একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, আলাদা করা যায় না। ঠিক যেমন ভোরের আলো, কুয়াশা আর শিশির আলাদা করে ধরা যায় না। তারা প্রশ্ন তোলে। প্রশ্ন তোলাই যেন তাদের অভ্যাস। রাজনৈতিক কর্মীরা কি নির্বিঘ্নে সভা করতে পারছে, নাকি কোথাও অদৃশ্য কোনো দেয়াল আছে। সাংবাদিকরা কি ভয় ছাড়াই লিখতে পারছে, নাকি প্রতিটি বাক্যের আগে থেমে যেতে হচ্ছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ কি স্বাধীন, নাকি চোখ আছে, নজর আছে, নীরব উপস্থিতি আছে। এ প্রশ্নগুলো নতুন নয়, কখনোই নতুন ছিল না। এগুলো জন্ম নিয়েছে স্মৃতি থেকে, সেই স্মৃতি যা পশ্চিমা বিশ্লেষকদের নোটবুকে এখনো তাজা, এখনো কালির গন্ধ ছাড়ায়।
২০১৪, ২০১৮-এই সংখ্যাগুলো শুধু সাল নয়, এগুলো অনুভূতি, বিতর্ক, দ্বিধা। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয়, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার খবর-সব মিলিয়ে এক ধরনের অসমাপ্ত গল্প। এ গল্পই বর্তমানের ভেতরে ঢুকে পড়ে, বর্তমানকে ভারী করে তোলে। তাই শঙ্কা তৈরি হয়, শঙ্কা জমতে থাকে, আর সেই শঙ্কা শুধু কথায় থাকে না, ধীরে ধীরে নীতিতে রূপ নেয়। নীতির ভাষা কখনো নরম, কখনো কঠিন, কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নীতি, কূটনৈতিক চাপ-এই শব্দগুলো উচ্চারিত হয় কম, কিন্তু শোনা যায় বেশি।
আমেরিকার ঘোষিত ভিসা নীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলে, কারণ সেসব সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত, সরাসরি প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকে পড়ে। ইউরোপীয় দেশগুলোও উন্নয়ন সহযোগিতা আর বাণিজ্যিক সুবিধার কথা বলতে গিয়ে গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে আনে-শান্তভাবে, ভদ্রভাবে, কিন্তু স্পষ্টভাবে। এসব চাপ কখনো প্রকাশ্যে আসে, কখনো নিঃশব্দ থাকে। তবু বার্তাটি পরিষ্কারই থাকে-নির্বাচনের মান নিয়ে আপস মানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খাতায় একটি দাগ।
এ পুরো দৃশ্যপট বোঝার জন্য শুধু ঢাকার রাজনীতি দেখলেই হয় না, মানচিত্র খুলে দেখতে হয় বড় মানচিত্র। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা-এই বড় খেলায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি, নড়াচড়া করলে বোঝা যায়, থেমে থাকলেও বোঝা যায়। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগত, এ কথাটা পশ্চিমারা বারবার মনে রাখে। তাই নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহ কেবল আদর্শিক নয়; এর ভেতরে আছে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার হিসাব। একটি অস্থিতিশীল বাংলাদেশ মানে অনিশ্চয়তা-এ ধারণাটা তাদের মাথায় ঘুরতে থাকে, বারবার ঘুরতে থাকে। আর ঠিক এখানেই এসে দাঁড়ায় সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি, প্রশ্নের ভেতর প্রশ্ন-পশ্চিমাদের প্রত্যাশা বনাম বাংলাদেশের সার্বভৌম বাস্তবতা।
বাংলাদেশের সরকার বারবার বলে, নির্বাচন অভ্যন্তরীণ বিষয়, সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এই বক্তব্যের পেছনে আছে ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, নিজের মতো করে টিকে থাকার গল্প। অন্যদিকে পশ্চিমারা ভাবে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার এখন আর এক দেশের ভেতরে আটকে থাকে না, বৈশ্বিক হয়ে গেছে, সীমান্ত মানে কাগজের রেখা। এ দুটো ভাবনার মাঝখানে তৈরি হয় এক নীরব টানাপোড়েন। কথায় কম, অনুভবে বেশি-যা সিদ্ধান্তের স্তরে গিয়ে গভীর ছাপ ফেলে।
এ টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে চলে, কখনো আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে, কখনো সাবধানে, পা ফেলবার আগে চারপাশ দেখে। ঢাকার ব্যস্ত রাজপথে যেমন একসঙ্গে রিকশা, বাস আর গাড়ি চলে, তেমনি এ নির্বাচনকে ঘিরে চলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি আর জনমানুষের প্রত্যাশা-সব একসঙ্গে, সব একসাথে। পশ্চিমাদের দৃষ্টি সেই চলমান দৃশ্যের ওপর স্থির থাকে-কখনো কূটনৈতিক জানালার কাঁচের আড়াল থেকে, কখনো বিবৃতির কাগজে, কখনো নীরব আলোচনার টেবিলে, যেখানে কথার চেয়ে নীরবতাই বেশি ওজন।
এরপরও যে প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে থাকে, অসমাপ্ত বাক্যের মতো-এ নির্বাচন কি পশ্চিমাদের চোখে ‘Free, fair and credible’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, নাকি অতীতের স্মৃতিগুলো আবার নতুন করে ফিরে আসবে। উত্তর এখনো লেখা হয়নি। সময় এগোয়, কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে, দৃশ্যপট একটু একটু করে পরিষ্কার হয়। আর বিশ্ব তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের দিকে, অপেক্ষার নীরবতায়, নিঃশ্বাস আটকে রাখা এক মুহূর্তে।
হামিদ রায়হান: লেখক ও গবেষক

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট