চরচা প্রতিবেদক
বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার বিখ্যাত ভিমরুলী বাজার, এর চারপাশের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমারোহ, জলময় খালে পেয়ারা অথবা আমড়ায় ঠাঁসা অসংখ্য ভাসমান ডিঙি নৌকা আর চাষী-কারবারিদের কর্মচাঞ্চল্য যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
তবে এমন প্রাণবন্ত পরিবেশ দেখে কোনো পর্যটকের পক্ষে বোঝা কঠিন হবে যে, খরা ও বিলম্বিত বর্ষাকালের কারণে প্রায় প্রতি বছরই এই অঞ্চলে পেয়ারা চাষ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতি বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ঝালকাঠি আর পিরোজপুর জেলার পেয়ারা চাষীদের উৎপাদিত পরিপক্ক পেয়ারায় ভিমরুলী বাজার এক বিশাল পেয়ারা মোকামে পরিণত হয়। এমনই এক সময়ে কথা হয় পেয়ারা চাষী অরুণকান্তি মজুমদারের সাথে।
অরুণ বলেন, “এপ্রিল-মে মাসে যখন পেয়ারা গাছে ফুল ফোটে, ঠিক তখনই খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অসহ্য গরম আর অনাবৃষ্টিতে বেশির ভাগ ফুল ঝরে যায়। জুন-জুলাই মাস যদিও ভরা বর্ষাকাল হওয়ার কথা। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ফলের আকার বাড়ে না। এমনটি গত দুই-চার বছর ধরেই চলছে।”

২০২২, ২০২৩ সাল এবং চলতি বছর, এমনই খরার কারণে তার চার একর জমিতে গড়া পেয়ারা বাগানের প্রায় অর্ধেক ফুল অকালেই ঝরে গেছে।
উপযুক্ত পরিবেশের কারণে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বরিশাল বিভাগ ‘পূর্ণমন্ডলী’, ‘সরুপকাঠি’ এবং ‘পললতা’র মতো জনপ্রিয় দেশি জাতের পেয়ারা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু সেই পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো ভারত ও পাকিস্তানের পেয়ারা চাষীরাও বিগত চার-পাঁচ বছরে প্রতিকূল আবহাওয়াসহ নানা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিশ্বব্যাপী কৃষি বাজার বিশ্লেষণ সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্লাটফর্ম ট্রিজ (Tridge) বলছে, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পেয়ারা উৎপাদনের অর্ধেক জোগান দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যদি এই তিন দক্ষিণ এশীয় দেশে পেয়ারা চাষ বাধাগ্রস্থ হয়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়ই হবে।
এমন কিছু ঘটতে পারে বলে ধারণা করেছিল সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশনের (সার্ক) এগ্রিকালচারাল সেন্টার (এসএসি), যার সদর দপ্তর ঢাকাতেই। ২০১৯ সালে এসএসি সতর্ক করেছিল, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাত গুরুতর ক্ষতির সম্মুখিন হবে।
এসএসি–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আগামীতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কবলে পড়তে যাচ্ছে।
ভিমরুলী বাজারে পেয়ারা চাষীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী বছরগুলোতেও যদি প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন কমে যায়, তবে বরিশাল আর পেয়ারার জন্য বিখ্যাত থাকবে না। চাষীদের এ উদ্বেগকে প্রাসঙ্গিক মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্বরত উদ্যানতত্ত্ববিদ জি এম এম কবির খান চরচা প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে অনুকূল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় পেয়ারা ফলনের তুলনা তুলে ধরেন।
কবির খান বলেন, “২০২২-২৩ মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ায় প্রতি হেক্টরে ৯ দশমিক শূন্য ১ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছিল। সাধারণত অনুকূল আবহাওয়ায় এই পরিমাণ ১১ টন হয়ে থাকে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় ২,৭৫০ হেক্টর জমিতে ২৫,০৮০ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছিল। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩,৩৪৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ৩১,৭৪৭ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২,৫৯৬ হেক্টর জমিতে ২৩,৬০১ টন পেয়ারা উৎপাদনের তথ্য রেকর্ড হয়েছে।

এ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে হেক্টরপ্রতি পেয়ারা উৎপাদন ৯ দশমিক ৪৯ টন, যা ২০২২–২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১২ টনে। এ হার ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৯ টনে। এ সময়কালে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হারের চেয়েও পেয়ারা চাষের পরিধিতে বড় সংকোচন ঘটেছে। এ দুই সময়কালে উৎপাদন ক্ষেত্র কমেছে যথাক্রমে ৫৯৫ ও ১৫৪ হেক্টর করে, যা প্রমাণ করে অত্র বিভাগে পেয়ারা চাষের পরিধি আর উৎপাদন কমতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আবহাওয়া ছিল পেয়ারা চাষের জন্য অনুকূল। আর ২০২২-২৩ বছরের অবস্থা ছিল ঠিক তার বিপরীত। অর্থাৎ, খরা আর অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতে পেয়ারা চাষ ব্যহত হয়েছিল।
জি এম এম কবির খান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও পেয়ারার দাম কমে যাওয়ায় চাষীরা এখন পেয়ারা থেকে সরে এসে আমড়া ও কলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—নদী ও অসংখ্য খাল দ্বারা বেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও বরিশাল বিভাগীয় জেলাগুলোতে খরা কীভাবে প্রভাব ফেলে? বরিশালের জলাধারগুলো কি লবণাক্ত?
কবির খান বলেন, “বরিশাল বিভাগের প্রায় অধিকাংশ নদী ও খাল মিঠা পানির। সেচের উৎসও পর্যাপ্ত। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বৃষ্টির অভাবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি এপ্রিল-মে মাস) মাসে পেয়ারা গাছে যখন ফুল ধরে, সেগুলো আর টিকতে পারে না। ফুল যদিও–বা ফলে পরিণত হয়, তা আর বাড়ে না পানির অভাবে।”
২০২৪ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে বরিশাল বিভাগকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের কারণে বরিশালে কৃষিনির্ভর জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
বরিশাল বিভাগের পার্শ্ববর্তী খুলনা অঞ্চলে ৬০ বছরের (১৯৬০-২০২০) বৃষ্টিপাতের তথ্য পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের রিস্ক অ্যান্ড ডিজাস্টার রিডাকশন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা। প্রবাসী এই বাংলাদেশি ২০২৪ সালে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষার পিক টাইম ধীরে ধীরে জুন থেকে জুলাইয়ে সরে যাচ্ছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।”

২০২৩ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে পরিচালিত আরেকটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন ও খরার মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সেখানাকার পেয়ারা চাষীদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেয়ারা উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর সেই যে প্রয়াগরাজ, তার আগের নাম ছিল এলাহাবাদ। কেবল ভারত নয়, এলাহাবাদী লাল পেয়ারা বিশ্বব্যপী বিখ্যাত।
উল্লেখিত গবেষণার গবেষক মোহাম্মদ মনিস আনসারি মনে করেন, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ভারতের পেয়ারা শিল্প বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তিনি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, জলবায়ু পরিবর্তনে পেয়ারা গাছে ফুল ও ফল ধরার সময়চক্রও বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে ফুলের ধরন ও ফলের উৎপাদনকাল পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ফলের মান খারাপ হচ্ছে।
মনিস বলেন, “তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে কম সময়ে ফল পেকে যাচ্ছে এবং ফলের রাসায়নিক গঠনেও পরিবর্তন ঘটছে।” এর প্রভাব পড়ছে পেয়ারাচাষীদের মানসিক স্বাস্থ্যেও। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অকালে ফুল ও ফল ঝরে পড়া বা ফলন কমে যাওয়ায় অনেক সময় পেয়ারা চাষীরা মানসিক অবসাদে ভুগে থাকেন।”
ট্রিজের (Tridge) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারত ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় টাটকা পেয়ারা উৎপাদনকারী দেশ। এর পরের অবস্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়া, চীন, মেক্সিকো, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মালাউই, মিশর, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ।
সে বছর বিশ্বের উৎপাদিত পেয়ারার ৪৩.৩ শতাংশ এসেছিল ভারত থেকে। আর পাকিস্তান ও বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়েছিল যথাক্রমে ৪.২৫ ও ২.৪৭ শতাংশ।
ভারত ও বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তানকেও আচ্ছন্ন করেছে তাপমাত্রার পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত।
২০২০ সালে পাকিস্তানের লারকানার পেয়ারা চাষীরা জানিয়েছিলেন, গ্রীষ্মকাল আগেভাগে চলে আসায় পেয়ারা চাষ মৌসুমের শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লারকানা সিন্ধু প্রদেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারা উৎপাদনকারী জেলা।
পাকিস্তানের ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লারকানায় বছরে দুবার পেয়ারার ফল ধরার মৌসুম থাকে। প্রথম মৌসুম অক্টোবরের মাঝামাঝি শুরু হয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি শেষ হয়; আর দ্বিতীয় মৌসুম নভেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হয়ে মার্চের মাঝামাঝি শেষ হয়।
প্রতিবেদনে চাষীদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, আগাম গ্রীষ্মের কারণে ফুল পুষ্ট হয়ে ফলে পরিণত হতে পারছে না।
শহীদ জুলফিকার আলী ভুট্টো কলেজ অব এগ্রিকালচারের অধ্যাপক ফয়েজ মুহম্মদ শেখ ও তার দলের এক গবেষণায় জানা যায়, কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন লারকানা জেলায় পেয়ারা চাষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
লারকানায় ২০১২ ও ২০২০ সালের পেয়ারা ফলনের তথ্য তুলনা করে ফয়েজ দেখেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বা বিলম্বিত বৃষ্টিপাতের কারণে সেখানকার পেয়ারা উৎপাদন ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
ভারতের শের-ই-কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব জম্মু–এর পিএইচডি গবেষক মোহাম্মদ মনিস আনসারি মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পেয়ারা চাষ টিকিয়ে রাখতে যথাযথ জলবায়ু অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
মনিসের মতে, জলবায়ু সহনশীল জাতের উন্নয়ন, গ্রিনহাউসের মতো সুরক্ষিত চাষ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং প্রুনিং (গাছের ডাল ও পাতা ছাঁটাই) ও ফসল ফলনের সময়সূচি পরিবর্তনের মতো কৃষি ব্যবস্থাপনা কৌশলই হতে পারে টেকসই অভিযোজনের উপায়।
বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার বিখ্যাত ভিমরুলী বাজার, এর চারপাশের দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমারোহ, জলময় খালে পেয়ারা অথবা আমড়ায় ঠাঁসা অসংখ্য ভাসমান ডিঙি নৌকা আর চাষী-কারবারিদের কর্মচাঞ্চল্য যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
তবে এমন প্রাণবন্ত পরিবেশ দেখে কোনো পর্যটকের পক্ষে বোঝা কঠিন হবে যে, খরা ও বিলম্বিত বর্ষাকালের কারণে প্রায় প্রতি বছরই এই অঞ্চলে পেয়ারা চাষ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতি বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ঝালকাঠি আর পিরোজপুর জেলার পেয়ারা চাষীদের উৎপাদিত পরিপক্ক পেয়ারায় ভিমরুলী বাজার এক বিশাল পেয়ারা মোকামে পরিণত হয়। এমনই এক সময়ে কথা হয় পেয়ারা চাষী অরুণকান্তি মজুমদারের সাথে।
অরুণ বলেন, “এপ্রিল-মে মাসে যখন পেয়ারা গাছে ফুল ফোটে, ঠিক তখনই খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অসহ্য গরম আর অনাবৃষ্টিতে বেশির ভাগ ফুল ঝরে যায়। জুন-জুলাই মাস যদিও ভরা বর্ষাকাল হওয়ার কথা। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ফলের আকার বাড়ে না। এমনটি গত দুই-চার বছর ধরেই চলছে।”

২০২২, ২০২৩ সাল এবং চলতি বছর, এমনই খরার কারণে তার চার একর জমিতে গড়া পেয়ারা বাগানের প্রায় অর্ধেক ফুল অকালেই ঝরে গেছে।
উপযুক্ত পরিবেশের কারণে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বরিশাল বিভাগ ‘পূর্ণমন্ডলী’, ‘সরুপকাঠি’ এবং ‘পললতা’র মতো জনপ্রিয় দেশি জাতের পেয়ারা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু সেই পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো ভারত ও পাকিস্তানের পেয়ারা চাষীরাও বিগত চার-পাঁচ বছরে প্রতিকূল আবহাওয়াসহ নানা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিশ্বব্যাপী কৃষি বাজার বিশ্লেষণ সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্লাটফর্ম ট্রিজ (Tridge) বলছে, ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পেয়ারা উৎপাদনের অর্ধেক জোগান দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যদি এই তিন দক্ষিণ এশীয় দেশে পেয়ারা চাষ বাধাগ্রস্থ হয়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়ই হবে।
এমন কিছু ঘটতে পারে বলে ধারণা করেছিল সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কোঅপারেশনের (সার্ক) এগ্রিকালচারাল সেন্টার (এসএসি), যার সদর দপ্তর ঢাকাতেই। ২০১৯ সালে এসএসি সতর্ক করেছিল, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাত গুরুতর ক্ষতির সম্মুখিন হবে।
এসএসি–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আগামীতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কবলে পড়তে যাচ্ছে।
ভিমরুলী বাজারে পেয়ারা চাষীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী বছরগুলোতেও যদি প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন কমে যায়, তবে বরিশাল আর পেয়ারার জন্য বিখ্যাত থাকবে না। চাষীদের এ উদ্বেগকে প্রাসঙ্গিক মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্বরত উদ্যানতত্ত্ববিদ জি এম এম কবির খান চরচা প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে অনুকূল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় পেয়ারা ফলনের তুলনা তুলে ধরেন।
কবির খান বলেন, “২০২২-২৩ মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ায় প্রতি হেক্টরে ৯ দশমিক শূন্য ১ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছিল। সাধারণত অনুকূল আবহাওয়ায় এই পরিমাণ ১১ টন হয়ে থাকে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় ২,৭৫০ হেক্টর জমিতে ২৫,০৮০ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছিল। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩,৩৪৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ৩১,৭৪৭ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২,৫৯৬ হেক্টর জমিতে ২৩,৬০১ টন পেয়ারা উৎপাদনের তথ্য রেকর্ড হয়েছে।

এ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে হেক্টরপ্রতি পেয়ারা উৎপাদন ৯ দশমিক ৪৯ টন, যা ২০২২–২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১২ টনে। এ হার ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৯ টনে। এ সময়কালে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হারের চেয়েও পেয়ারা চাষের পরিধিতে বড় সংকোচন ঘটেছে। এ দুই সময়কালে উৎপাদন ক্ষেত্র কমেছে যথাক্রমে ৫৯৫ ও ১৫৪ হেক্টর করে, যা প্রমাণ করে অত্র বিভাগে পেয়ারা চাষের পরিধি আর উৎপাদন কমতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আবহাওয়া ছিল পেয়ারা চাষের জন্য অনুকূল। আর ২০২২-২৩ বছরের অবস্থা ছিল ঠিক তার বিপরীত। অর্থাৎ, খরা আর অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতে পেয়ারা চাষ ব্যহত হয়েছিল।
জি এম এম কবির খান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও পেয়ারার দাম কমে যাওয়ায় চাষীরা এখন পেয়ারা থেকে সরে এসে আমড়া ও কলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—নদী ও অসংখ্য খাল দ্বারা বেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও বরিশাল বিভাগীয় জেলাগুলোতে খরা কীভাবে প্রভাব ফেলে? বরিশালের জলাধারগুলো কি লবণাক্ত?
কবির খান বলেন, “বরিশাল বিভাগের প্রায় অধিকাংশ নদী ও খাল মিঠা পানির। সেচের উৎসও পর্যাপ্ত। কিন্তু অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বৃষ্টির অভাবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি এপ্রিল-মে মাস) মাসে পেয়ারা গাছে যখন ফুল ধরে, সেগুলো আর টিকতে পারে না। ফুল যদিও–বা ফলে পরিণত হয়, তা আর বাড়ে না পানির অভাবে।”
২০২৪ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে বরিশাল বিভাগকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের কারণে বরিশালে কৃষিনির্ভর জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
বরিশাল বিভাগের পার্শ্ববর্তী খুলনা অঞ্চলে ৬০ বছরের (১৯৬০-২০২০) বৃষ্টিপাতের তথ্য পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের রিস্ক অ্যান্ড ডিজাস্টার রিডাকশন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা। প্রবাসী এই বাংলাদেশি ২০২৪ সালে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষার পিক টাইম ধীরে ধীরে জুন থেকে জুলাইয়ে সরে যাচ্ছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।”

২০২৩ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে পরিচালিত আরেকটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন ও খরার মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সেখানাকার পেয়ারা চাষীদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উত্তরপ্রদেশকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেয়ারা উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর সেই যে প্রয়াগরাজ, তার আগের নাম ছিল এলাহাবাদ। কেবল ভারত নয়, এলাহাবাদী লাল পেয়ারা বিশ্বব্যপী বিখ্যাত।
উল্লেখিত গবেষণার গবেষক মোহাম্মদ মনিস আনসারি মনে করেন, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ভারতের পেয়ারা শিল্প বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তিনি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, জলবায়ু পরিবর্তনে পেয়ারা গাছে ফুল ও ফল ধরার সময়চক্রও বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে ফুলের ধরন ও ফলের উৎপাদনকাল পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ফলের মান খারাপ হচ্ছে।
মনিস বলেন, “তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে কম সময়ে ফল পেকে যাচ্ছে এবং ফলের রাসায়নিক গঠনেও পরিবর্তন ঘটছে।” এর প্রভাব পড়ছে পেয়ারাচাষীদের মানসিক স্বাস্থ্যেও। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অকালে ফুল ও ফল ঝরে পড়া বা ফলন কমে যাওয়ায় অনেক সময় পেয়ারা চাষীরা মানসিক অবসাদে ভুগে থাকেন।”
ট্রিজের (Tridge) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারত ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় টাটকা পেয়ারা উৎপাদনকারী দেশ। এর পরের অবস্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়া, চীন, মেক্সিকো, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মালাউই, মিশর, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ।
সে বছর বিশ্বের উৎপাদিত পেয়ারার ৪৩.৩ শতাংশ এসেছিল ভারত থেকে। আর পাকিস্তান ও বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়েছিল যথাক্রমে ৪.২৫ ও ২.৪৭ শতাংশ।
ভারত ও বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তানকেও আচ্ছন্ন করেছে তাপমাত্রার পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত।
২০২০ সালে পাকিস্তানের লারকানার পেয়ারা চাষীরা জানিয়েছিলেন, গ্রীষ্মকাল আগেভাগে চলে আসায় পেয়ারা চাষ মৌসুমের শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লারকানা সিন্ধু প্রদেশের সবচেয়ে বড় পেয়ারা উৎপাদনকারী জেলা।
পাকিস্তানের ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লারকানায় বছরে দুবার পেয়ারার ফল ধরার মৌসুম থাকে। প্রথম মৌসুম অক্টোবরের মাঝামাঝি শুরু হয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি শেষ হয়; আর দ্বিতীয় মৌসুম নভেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হয়ে মার্চের মাঝামাঝি শেষ হয়।
প্রতিবেদনে চাষীদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, আগাম গ্রীষ্মের কারণে ফুল পুষ্ট হয়ে ফলে পরিণত হতে পারছে না।
শহীদ জুলফিকার আলী ভুট্টো কলেজ অব এগ্রিকালচারের অধ্যাপক ফয়েজ মুহম্মদ শেখ ও তার দলের এক গবেষণায় জানা যায়, কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন লারকানা জেলায় পেয়ারা চাষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
লারকানায় ২০১২ ও ২০২০ সালের পেয়ারা ফলনের তথ্য তুলনা করে ফয়েজ দেখেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বা বিলম্বিত বৃষ্টিপাতের কারণে সেখানকার পেয়ারা উৎপাদন ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
ভারতের শের-ই-কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব জম্মু–এর পিএইচডি গবেষক মোহাম্মদ মনিস আনসারি মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পেয়ারা চাষ টিকিয়ে রাখতে যথাযথ জলবায়ু অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
মনিসের মতে, জলবায়ু সহনশীল জাতের উন্নয়ন, গ্রিনহাউসের মতো সুরক্ষিত চাষ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং প্রুনিং (গাছের ডাল ও পাতা ছাঁটাই) ও ফসল ফলনের সময়সূচি পরিবর্তনের মতো কৃষি ব্যবস্থাপনা কৌশলই হতে পারে টেকসই অভিযোজনের উপায়।

বস্তিগুলোতে আগুন লাগার মূল কারণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিয়ম না মেনে সিলিন্ডার বা লাইন গ্যাসের অনিরাপদ ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার, উন্মুক্ত চুলা ও হিটারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার। উদাসীনতা ও অসাবধানতা এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেছেন তার আইনজীবী মোরশেদ হোসেন। তিনি বলেন, “কারাগারে সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তিনি কেবল সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদের মৃত্যুর প্রসঙ্গে কথা বলতে থাকেন। নুরুল মজিদের মৃত্যু অন্য নেতাদের ভীষণ চিন্ত