অনেক প্রতিবন্ধকতা, ভোট নিয়ে আগ্রহ নেই হিজড়াদের

অনেক প্রতিবন্ধকতা, ভোট নিয়ে আগ্রহ নেই হিজড়াদের
সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিবন্ধকতার ফলে অনেক হিজড়া জনগোষ্ঠী নিজেদের এলাকায় ভোট দিতে যাচ্ছে না। ছবি: চরচা

এবার ভোট দিতে বাড়িতে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু এখন আর যাওয়ার পরিস্থিতি নাই। কারণ বাড়িতে চাচা, চাচী, ফুপুরাসহ অনেক আত্মীয় স্বজন আসবে। বেশি মানুষ আসলে আমাদের অনেক টিটকারি মারা কথা শুনতে হয়। এসব ভালো লাগে না। ভোট দিতেও যাব না।” বলছিলেন বৃষ্টি হিজড়া (৩৫)।

শুধু তিনি একা নন, সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিবন্ধকতার ফলে অনেক হিজড়া জনগোষ্ঠী নিজেদের এলাকায় ভোট দিতে যাচ্ছে না।

বিজয় সরণি ও গুলিস্তান এলাকায় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় হিজড়া জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে। ভোট উৎসবে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নানা প্রতিবন্ধকতা তাদের সেই উৎসবের অংশ হতে দিচ্ছে না।

তারা জানান, নিজেদের এলাকায় ভোট দিতে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের বাজে ব্যবহার ও কথাবার্তা। অনেকে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে খারাপ আচরণের শিকার হয়েছেন। সে কারণেই জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহই পাচ্ছেন না তারা।

তাদের দাবি, সমাজে স্বাভাবিকভাবে মূলধারার মানুষদের সঙ্গে বাঁচতে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা চান তারা। এ ছাড়া হিজড়া হিসেবে সব নাগরিক অধিকারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন নীতিমালা চূড়ান্ত করে। সেই অনুসারে, ক্রোমোজোমের ত্রুটি বা জেনেটিক কারণে যে ব্যক্তিদের নারী বা পুরুষ কোনো শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, তারা হিজড়া। এই নীতিমালার আওতায় সমাজে যারা হিজড়া বলে পরিচিত এবং নিজেকে হিজড়া হিসেবে পরিচয় দিতে যিনি অস্বস্তি বোধ করেন না, তিনিই হিজড়া। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে হিজড়ার সংখ্যা সাড়ে ১০ হাজার। তবে বেসরকারি সংস্থাদের মতে এই সংখ্যা ৫০ হাজারের কাছাকাছি। তবে ২০২৬ সালে নির্বাচন কমিশনের মতে, দেশে হিজড়া ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ২২০ জন।

নিজের জীবন নিয়ে বৃষ্টি হিজড়া বলেন, “আমার জন্ম বরিশালে। পড়াশোনা ইন্টার পর্যন্ত করেছি। জন্মের পর মাত্র ১২ বছর বয়সে দাদি আমাকে ঢাকায় রেখে যান। তারপর থেকেই গুরুমায়ের কাছে মানুষ হয়েছি। শুরুতে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় তাদের সঙ্গে ঘুরেছি। এখন বিজয় সরণিতে নিয়মিত টাকা তুলি। এভাবেই চলছে জীবন।”

নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি কিছু ভাবছেন না বৃষ্টি হিজড়া, “আমাদের খুব বেশি কিছু চাওয়ার নাই। তবে আমারা যারা হিজড়া, তারা ভোটার আইডি কার্ডের পরিচয়ে সব নাগরিক সেবা পেতে চাই। আমাদের বিভিন্ন চাকরিতে আগে ৩ শতাংশ কোটা ছিল, সেটা এখন ১ শতাংশ। আগেই চাকরি পাইনি। বর্তমানে সেটা আরো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা যেন সব ধরনের কাজ করতে পারি, কেউ যেন হিজড়া বলে তাড়িয়ে না দেয়, সেটিই চাই।”

হিজড়া জনগোষ্ঠীর কষ্টের কথাও জানালেন বৃষ্টি, “আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট ঢাকায় থাকার। কারণ আমাদের পরিচয় শুনলে বাড়িওয়ালা ভাড়া দিতে চায় না। আর ভাড়া দিতে চাইলেও অনেক বেশি টাকা চায়। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজের জন্য গেলেও লিঙ্গ পরিচয় জানার পর আর সেটি করতে দেয় না।”

ক্রোমোজোমের ত্রুটি বা জেনেটিক কারণে যে ব্যক্তিদের নারী বা পুরুষ কোনো শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, তারা হিজড়া। ছবি: চরচা
ক্রোমোজোমের ত্রুটি বা জেনেটিক কারণে যে ব্যক্তিদের নারী বা পুরুষ কোনো শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, তারা হিজড়া। ছবি: চরচা

পরিবারের সঙ্গে থাকাটা খুব মিস করেন। তবে পরিবার ছেড়েছেন পরিবারের খারাপ ব্যবহার সহ্য করতে না পেরেই, “আমরা তো পরিবারের সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু সেটার সুযোগ নেই। পরিবারের লোকজনের ব্যবহারেই বাধ্য হয়ে চলে এসেছি। এখন হিজড়ারাই আমাদের পরিবার-সমাজ, সবকিছুই।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় জন্ম হলেও কয়েক বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন রিনা খান। তার কথা, ‘‘আমরা কি শখে বাড়ি থেকে চলে এসেছি? আর কেউ শখ করে শাড়ি-চুড়ি পরে টাকা চেয়ে বেড়ায় না। বাধ্য হয়ে আমরা এই পথে। অনেক জায়গায় কাজের চেষ্টা করেও হয়নি।’’

নিজের জীবনের গল্পটা রিনা খানের এমনই, ‘‘আমি আরও ৫ বছর আগে মিরপুরের একটা গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেছিলাম পুরুষ পরিচয়ে। পরে এক সপ্তাহ কাজ না করতেই তারা বুঝতে পারে আমি পুরুষ নই। সেখানে ম্যানেজার কুপ্রস্তাব দেয়। পরে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে আসতে হয়েছে। আমি চাই নতুন যে সরকার আসবে, নির্বাচনের পর তারা আমাদের নিয়ে দেশের মানুষের ধারণা বদলানোর কাজ করবে।”

ভোট দিতে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এবার ভোট দিতে যাব না। কারণ ভোট দিয়ে আর কী হবে? আমাদের নিয়ে কেউ ভাবে না। তবে নতুন সরকার যাতে অন্য মানুষদের মতো হিজড়াদেরও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে, চাই সেটাই।’’

মিরপুরের ৬০ ফিটে প্রায় ১ বছরের বেশি সময় ধরে বাস করছেন বর্ষা। তিনি হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনধারণের বড় একটা সমস্যার কথাই তুলে ধরেছেন, ‘‘ঢাকা আসার পর বাড্ডা এলাকায় উঠেছিলাম। আগের জায়গায় তাদের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় সেই জায়গা ছেড়ে এসেছি। তবে ঢাকায় আমাদের প্রধান সংকট হলো বাসা ভাড়া নেওয়া। কেউ থাকতে দিতে চায় না।’’

তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে কর্মসংস্থান চান, ‘‘আমরা চাই হিজড়াদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সরকার কাজ করবে। আমরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে চাইলেও সেটা অনেকে গ্রহণ করে না। তাই হিজড়াদের জন্য একটি বড় গার্মেন্টস করে দিলে সেখানে সবাই কাজ করতে পারবে। আবার একসঙ্গে থাকতেও পারবে।”

সম্পর্কিত