হবিগঞ্জ-১ আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবার ভোটের মাঠে না থাকলেও দলটির ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন পেতে পারেন পাবেন রেজা কিবরিয়া ।
নবীগঞ্জের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলেও তাদের সমর্থকদের কাছে টানতে চেষ্টা করছেন বিএনপি ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী দুই পক্ষই। তাদের ভাষ্য, হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোটাররা যে প্রার্থীকে বেশি ভোট দেবে যাবে, সেই প্রার্থী এগিয়ে থাকবেন।
তবে মাঠে রেজা কিবরিয়ার পক্ষে অনেক বললেও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার কারণে ‘অনেকটা চাপে পড়েছেন’, এমনটাই শোনা গেল ওই নবীগঞ্জ ও বাহুবলের ভোটারদের মুখে।
গতকাল রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুই উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে অন্তত ১৬ জন নারী-পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া যায়। ভোটের মাঠে প্রার্থী পাঁচজন থাকলেও আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে মূলত রেজা কিবরিয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সুজাত মিয়াকে ঘিরে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রচারে এগিয়ে বিএনপি ও বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীই।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক যুক্তরাজ্যপ্রবাসী নেতা সুজাত মিয়া ও তার পক্ষে কাজ করায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ নেতা-কর্মী। এসবের মধ্যেই নিজের পক্ষের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থী।
তবে ভোটারদের কারো কারো ভাষ্যমতে, রেজা কিবরিয়া পারিবারিক পরিচয় বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন অনেকেই। কিবরিয়ার গ্রামের বাড়ি নবীগঞ্জ উপজেলার জলালশাপ গ্রামে। এলাকায় আলোচনায় আছে, বিএনপি সরকার গঠন করলে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা রেজা কিবরিয়া মন্ত্রী হতে পারেন।
রেজা কিবরিয়াঅর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ সালের সরকারে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে।
এ এম এস কিবরিয়া বিএনপি আমলে ২০০৫ সালে হবিগঞ্জে বোমা হামলায় নিহত হন।
রেজা কিবরিয়া ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে গণফোরামে যোগ দেন। পরে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ভোট করেন।
কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন রেজা। পরে সেই দল ছাড়তে হয়েছিল তাকে।
২০২১ সালে ডাকসুর সাবেক সভাপতি নুরুল হক নুরের দল বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ গঠন হলে সেখানে আহ্বায়ক করা হয় রেজা কিবরিয়াকে।
পরে ভেঙে দুই টুকরো হয় গণঅধিকার পরিষদ। তারপর থেকে এ দলের একাংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন রেজা কিবরিয়া, ছিলেন বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে। গত বছর সেই দলও ছাড়েন তিনি। আমজনতার দলেরও আহ্বায়ক ছিলেন রেজা কিবরিয়া।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফিরোজ মিয়া বলেন, “আমরা এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই, যার পরিচয়ে আমরা সারা দেশে পরিচয় দিতে পারি।”
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সদ্য দলে যোগ দেওয়া নেতা রেজা কিবরিয়া। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিরাজুল ইসলাম। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন শেখ সুজাত মিয়া। এ ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জাসদের কাজী তোফায়েল আহমেদ ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ বদরুর রেজা।
বাহুবল বাজারের ব্যবসায়ী সৈয়দ হুমায়ুন কবীর বলেন, “যিনি এলাকার উন্নয়ন করার যোগ্যতা রাখেন বা গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে তাকাবেন, দলমত–নির্বিশেষে এমন প্রার্থীকে ভোট দেব।”
নবীগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামের নজির মিয়া মনে করেন, যোগ্যতায় পার্থক্য থাকলেও মূল লড়াই বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহীর মধ্যে। তিনি বলেন, “এলাকায় শান্তি থাকুক, উন্নয়ন হোক, এমনটা আমরা চাই। যার দ্বারা মানুষের উপকার হবে এবং মানুষকে বুঝবে। আমরা তাকেই এমপি হিসেবে দেখতে চাই।”
বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়া বলেন, “স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এখানে ব্যক্তির চেয়ে ধানের শীষ প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্রোহী প্রার্থী অবাধে গ্রামে গ্রামে প্রচুর টাকা ছড়াচ্ছেন। কারও চরিত্র হনন করা ও মিথ্যাচারে জর্জরিত করা উচিত নয়। আমি মানুষকে বলেছি, একবার সুযোগ দিতে। আমি পাঁচ বছরে তাদের ৫০ বছরের উন্নয়ন দেব। অবহেলিত জনপদের উন্নয়ন ও শিক্ষা নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদে গিয়ে সেই পরিকল্পনা কাজে লাগাতে চাই।”
স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া বলেন, “যিনি জনগণের পাশে থাকবেন, তাকে মানুষ ভোট দেবেন। এ মাঠে প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তি গুরুত্ব পাবেন। আশা করি, মানুষ আমাকে বেছে নেবেন। আমি কাজ করা মানুষ, কাজ করতে চাই।”
অন্য প্রার্থীরাও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ধানের শীষের ভোট ভাগ হবে-এমন হিসাব কষে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষকে বলছি, আমরা যদি নির্বাচিত হতে পারি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ উপহার দেব।”