‘‘নির্বাচন কিরাম হবে সে বিষয়ে প্রশাসনই ভালো জানে। আমার মতে ভালাই হইবো। তারপর কী হইবো, সেটা বলা যাইতেছে না। যারাই ক্ষমতায় আহে, তারাই গণ্ডগোল বাধায়।” রিকশাচালক জামিল মোল্লার কণ্ঠে আশা, নাকি নিরাশা ঠিক বোঝা যায় না।
জামিল মোল্লার সঙ্গে দেখা হয় গত বৃহস্পতিবার কাঁটাবন মোড়ে। নির্বাচন নিয়ে কথা উঠতেই আলাপে আলাপে অনেক কথা উঠে এল। জামিল বললেন, “আমি ঢাকার ভোটার। তাই এলাকায় যাইতেছি না।”
ক্ষমতায় যারা যাবে, বা যারা যায় তাদের নিয়ে তার কণ্ঠে স্পষ্ট সংশয়। কিছুটা বিএনপির দিকে ঝুঁকে থাকা এই ভোটার বললেন, “বর্তমানে মানুষের ইমান-আমান ছোট হইয়া আইচে। এডাই দুনিয়ার হিসাব হইয়া গেছে। আমার ধারণা দেশটা ভালোভাবে চললে সবাই শান্তিমতো থাকতে পারি। যারাই ক্ষমতায় আহে তারাই গন্ডগোল বাধায়। সামনে ভালা হউক এডাই চাই।”
জামিল একা নন। এমন দোলাচলে আছেন রাজধানী ঢাকার পথে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত শ্রমজীবীদের অনেকেই। তাদের নির্বাচন ভাবনা জানতে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ১০ জন শ্রমজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে চরচা।
শ্রমজীবী এসব মানুষ জানান, নির্বাচন নিয়ে এক ধরেনর দ্বিধায় রয়েছেন তারা। এদের অনেকে আর্থিক সংকটে গ্রামের বাড়ি যেতে পারছেন না। আর কয়েকজন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে নির্বাচনের এক-দুদিন আগে রাজধানী ছেড়ে যাবেন।
রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষ এসেছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। জীবিকার প্রয়োজনে তারা ঢাকায় অবস্থান করলেও ভোটাধিকার প্রয়োগে অনেকে গ্রামের বাড়ি যাবেন বলে জানালেন।
রাজধানীতে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে রিকশা চালান আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, “দেশের অবস্থা ভালোই তো। নির্বাচন নিয়ে এখনো সেভাবে গণ্ডগোলের কিছু দেখতেছি না। আমি আগামী সোমবার নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে যাব। দেশ যে ভালা চালাইতে পারব, সেই ক্ষমতায় আসুক।”
people 2আজিজুল হক নামের আরেক রিকশাচালক ভোট দেবেন বলে স্থির সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। বললেন, “ভোটার যেহেতু, তাই ভোট দিতে যামু। এহন পর্যন্ত ভোট নিয়ে কোনো ঝামেল দেখতেছি না। কোনো দল চাইলে হইতেও পারে ঝামেলা। আমি নয় বা দশ তারিখে এলাকায় যামু। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আমল দেখছি। এবার জামায়াতের আমল দেখতে চাই।”
ভোলা জেলার বাসিন্দা আনিসুল হক। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা আনিসুল জানান, ভোট দিতে গ্রামে যাবেন তিনি। তবে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। বললেন, “এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি নাই। আমি চাই দ্যাশ (দেশ) ভালা ও শান্ত থাহুক। কোনো খুন-খারবি ও গুম চাই না। দ্যাশের রাস্তা মুক্ত থাক।”
সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে টাকা ছড়িয়ে ভোটের আগে প্রভাবিত করার এক ধরনের সংস্কৃতি আছে। এ ক্ষেত্রে এমন কোনো বিষয় আছে কি না, জানতে চাইলে আনিসুল বলেন, “নিজের টাকা খরচ কাইরা ভোট দিতে যামু। কারো থেকে টাকা নিতে চাই না।”
রিকশাচালক আজম আলীর চাওয়া পরিষ্কার–দেশ যেন ভালো থাকে। ঢাকায় প্রায় ১৮ বছর ধরে রিকশা চালান তিনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন তিনি। সে সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, “আমি ১৯৯১ সাল থেকে ভোট দিয়ে আইচি। কিন্তু নির্বাচন ভালো হইচে না। দেশের পরিস্থিতি বহু ভয়াবহ। আগে দেশে যা কাজ হাইছে, তার চার ভাগের এক ভাগ কাজও হয় না। দেশে একটা ভালো সরকার আসুক এবং ভালো করে চলুক এডাই চাই।”
নিজের কোনো দাবি নেই তার। আজম আলীর কণ্ঠে স্পষ্ট হতাশা। তিনি বলেন, “আমাগো কেউ কিছু দিবে না। আমি নিজে সংসার চালাব। খেটেই খাব। দেশে চাঁদাবাজি, গন্ডগোল ও খুন বেশি হইয়া গেছে–এই হলো ঘটনা। এসব না হলেই সবার জন্য ভালা হয়।”
কিশোরগঞ্জ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ও রাজধানীর রিকশাচালক সুমন মিয়া এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি বলেন, “আগে আওয়ামী লীগ নিজেগো মতো নির্বাচন করত।: এখনো একই অবস্থা দাবি করে তিনি বলেন, “সব দল অংশ নিলে ভোট দিতাম। ২০০৮ সালের পর আর ভোট দেই না। আগে আওয়ামী লীগ যা করত, এখন ইউনুস বাহিনী তাই করতেছে। এ জন্য ভোট দিতে যামু না।”
সুমন মিয়া ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন। তারপর থেকে আর দেননি। এবারও দেবেন না বলে স্পষ্ট জানালেন। কারণ হিসেবে বললেন, “কিন্তু পরে এক দল আহে (নির্বাচনে অংশ নেয়), আরেক দল আহে না। তাই আর ভোট দেই না। কারণ, তাগো নিজেগে মধ্যে গণ্ডগোল থাহে। আমি চাই, নির্বাচনে সকল দল থাক, তাইলে ভোট দিমু।”
রিকশাচালকদের মধ্যে কেউ কেউ ভোটে আগ্রহ দেখালেও ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের মধ্যে এমন আগ্রহ কম দেখা গেছে। যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ভোট দিতে নিজ এলাকায় যাবেন না বলে জানালেন। মূল কারণ হিসেবে আর্থিক সংকটের কথা বললেন।
মিরপুর, আজিমপুরসহ রাজধানীর একাধিক জায়গায় ঘুরে পাঁচজন ভ্রাম্যমাণ দোকানির সঙ্গে কথা বলে দেখা গেল, তাদের কেউই ভোট দিতে এলাকায় যেতে আগ্রহী নন।
মিরপুর-১২ এলাকার চা দোকানি আবুল হোসেনের বাড়ি বরিশাল। বললেন, “আমার দ্যাশের বাড়ি বরিশাল। এবার ভোট দিতে যামু না। কিছুদিন ধরে ব্যবসা ভালো চলতেছে না। যা বিক্রি হয়, তা দিয়ে সংসারই ঠিকমতো চলে না, বাড়ি যামু কী দিয়া।”
একই ধরনের অবস্থান জানালেন রফিকুল। আজিমপুর গোরস্তানের পাশে পান-সিগারেটের দোকান চালান তিনি। ভোটে আগ্রহ নেই তার। কেন জানতে চাইতেই বললেন, “দেশে ভোট হোক আর যা হউক, আমাগো কিছুই হয় না। যেডা করি, তাই করতে হয়। ব্যাচা-বিক্রির যা অবস্থা, তা দিয়া বাড়ি যাওয়া যাবে না। সামনে ঈদ আছে। তহন একবাড়ে বাড়ি যামু। বউ, বাচ্চা নিয়ে খাইতেই সব ট্যাকা শেষ হইয়া যায়।”
কথা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সজীবের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। বললেন, “আওয়ামী লীগের আমলে আমার কোটি টাকার ব্যবসা ছিল। কিন্তু আগুন লাগিয়ে সব শেষ করে দিয়েছে। পরে কুমিল্লা থেকে রংপুর গিয়ে নতুন করে আবার ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছি।”
ভোট দেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ছোট একটা ব্যবসা করি। ভোট দিতে এলাকায় যাব। নির্বাচন তো সঠিকভাবে হওয়া দরকার। ভালা লোকরে জনগণ ভোট দিয়ে পাস করাক, তাহলেই ভালো। দেশের টাকা চুরি না হলেই উন্নতি হবে। যদি দেশের টাকা কেউ এসে চুরি করে, তাহলে দেশ পিছিয়ে যাবে। অতীতে টাকা বিদেশে গেছে, তাই উন্নতি হয়নি। এখন যারা ক্ষমতায় আসবে, তারাও টাকা পাচার করলে কোনো উন্নতি হবে না।”
মিরপুর-১২ এলাকায় কথা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূর ইসলামের সঙ্গে। স্থিতিশীল পরিস্থিতি চান কাঁচামালের এ ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “এক বছর ধরেই ব্যবসা ওঠানামা করতেছে। বিভিন্ন সময় নানা সমস্যা হয়। নির্বাচনের পর এসব না হইলেই ভালো। আমরা চাই দেশের পরিবেশ স্বাভাবিক হোক।”
সব মিলিয়ে বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের একটাই চাওয়া–ক্ষমতায় যেই আসুক, দেশটা যেন আর অস্থিতিশীল না হয়। একইসঙ্গে তারা নিজেদের সঙ্গে কাউকে পাবেন না বলে এক ধরনের স্থির ধারণা পোষণ করেন। তবুও তাদের আশা–দেশ স্থিতিশীল হলে নিজেদের কাজটা করেই হয়তো একটু ভালো থাকতে পারবেন।