Advertisement Banner

কাগজের নোটের ছুটি! বাংলা কিউআর-এ কীভাবে হবে লেনদেন?

কাগজের নোটের ছুটি! বাংলা কিউআর-এ কীভাবে হবে লেনদেন?
ছবি: চরচা

কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘টাকা’ কবিতার কথা মনে আছে? ছোট্ট খোকন কাকার কাছে বায়না ধরে টাকার জন্য। টাকা পেয়ে খোকন অবাক হয়ে ভাবে, কড়কড়ে কাগজে হরিণ আঁকা থাকলেই তাকে টাকা বলে! হরিণ আঁকা কড়কড়ে কাগজ দিলেই দোকানি চকলেট দিয়ে দেবে! কাকা তখন সংক্ষেপে বলেন, কড়কড়ে কাগজে সরকার নিয়ম-কানুন মেনে, জলছাপ আর নম্বর দিয়ে ছাপালে তবেই কাগজ হবে টাকা। ছোট, তবে খুবই চমৎকার একটি কবিতা, পড়ে দেখতে পারেন।

যা হোক–প্রসঙ্গ কবিতা না; আজকের প্রসঙ্গ টাকা। আসলে টাকাও না। আমরা আলোচনা করবো সেই ‘টাকা’ নিয়ে যা চোখে দেখা যাবে না, কিন্তু দোকানি জিনিস দেবে, নাপিত চুল কাটবে, মুচি জুতা সেলাই করবে, পরিশোধ করা যাবে ব্যাংকের কিস্তি, স্কুলের বেতন কিংবা হাসপাতালের বিল। মানে সব ধরনের লেনদেন হবে; কিন্তু গুনতে হবে না টাকা।

কবিতার সরকার, বাস্তবে বাংলাদেশ ব্যাংক চায়–‘কাগুজে নোট’ আর লেনদেনের মাধ্যম থাকবে না। পয়লা জুলাই থেকে বাধ্যতামূলকভাবে দৈনন্দিন সব লেনদেনে ব্যবহার করতে হবে নির্দিষ্ট একটি কিউআর কোড। হাতের স্মার্টফোন ব্যবহার করে সরাসরি গ্রাহক তার ব্যাংক কিংবা এমএফএস; অর্থাৎ, বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো অ্যাকাউন্ট থেকে প্রাপককে তার টাকা পরিশোধ করবেন একটি কিউআর কোড ব্যবহার করে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলা কিউআর’। এর সাথে মিল রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ ইউনিট’-এর নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘বাংলা কিউআর বাস্তবায়ন ইউনিট’। অর্থাৎ, বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেনে সব মানুষকে সম্পৃক্ত করা গেলেই ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আফ্রিকার দেশ কেনিয়া, ভারত, চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশ ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলেছে। এর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও সাত বছর আগে–২০১৯ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম এই পলিসির ঘোষণা দেয়। আর এর পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন আসে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। মাঝে কেটে গেছে ৫ বছর! কেন এত সময় লাগল শুরু হতে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন চরচাকে বলেন, “ক্যাশলেস সোসাইটির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করলেও এই সময়টায় এ বিষয়ে ডিফোকাসড ছিল কিংবা ফোকাসটা অন্যদিকে সরিয়ে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এবার এটি বাস্তবায়নে শতভাগ আন্তরিক বাংলাদেশ ব্যাংক।”

আপনি বলতেই পারেন, এ আর নতুন কী! কিউআর কোডের মাধ্যমে কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের লেনদেন করছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিকাশ, নগদ কিংবা রকেটের মাধ্যমে। তবে গ্রাহক যেটি পারত না, তা হচ্ছে–‘ইন্টার অপারেবিলিটি’র মাধ্যমে বিকাশ থেকে নগদে অথবা অন্য এমএফএস অ্যাকাউন্টে কিংবা ব্যাংকে ট্রান্সফার করতে। তখন (এখন পর্যন্ত) বিকাশের কিউআর বিকাশের জন্য, নগদের কিউআর নগদের জন্য, এক ব্যাংকের কিউআর সেই ব্যাংকের জন্য ব্যবহার করতে হতো। মানে দোকানির দেয়ালে আলাদা কিউআর কোড লাগানো থাকত, ক্রেতা নিজের অ্যাপ অনুযায়ী ঠিক কোডটা খুঁজে বের করতেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সেই সমস্যার ইতি টানতে চাইছে। পয়লা জুলাই থেকে একটিমাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিকাশ, নগদ, রকেট বা যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ ব্যবহার করে পেমেন্ট করা যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ৩০ জুনের মধ্যে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার ও অপারেটরদের নিজস্ব কিউআর কোড সরিয়ে একক বাংলা কিউআর প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আর ট্রেড লাইসেন্সধারী সব রিটেইল মার্চেন্টকেও বাধ্যতামূলকভাবে এই চ্যানেলে যুক্ত করতে হবে। আসলে এটি জটিল কিছু না। প্রথমে নিজের ব্যাংকে গিয়ে আবেদন করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের (মাইক্রো মার্চেন্ট) জন্য লাগবে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র ও এক কপি ছবি। বড় মার্চেন্টদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জমা দিতে হবে ট্রেড লাইসেন্স, টিন বা ট্যাক্স রিটার্ন। যাচাই-বাছাই শেষে গ্রাহক তার কিউআর কোড পেয়ে যাবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন বাধ্যতামুলক করেছে। প্রক্রিয়াটিও যথাসম্ভব সহজ করা হয়েছে। তারপরও যদি কেউ এই নিয়ম না মানে, তাহলে কী হবে?

এখানেই কবিতার কাকার ‘নিয়ম-কানুন’ কথাটা ফিরে আসে–‘টাকা’ হতে গেলে যেমন সরকারের নিয়ম মানতে হয়, তেমনি  ডিজিটাল লেনদেনেও নিয়ম না মানলে শাস্তির বিধান রাখা হয়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, নির্দেশনা অমান্য করলে ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সার্ভিসেস অ্যাক্ট ২০২৪’-এর ৩৭(৫) ধারায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা জরিমানা এবং দায়ী ব্যক্তিদের তিন বছরের জেল বা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়াও অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি তথ্য জেনে রাখা দরকার। এই কোড দিয়ে ক্যাশ আউট করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কোনো মার্চেন্ট যদি এর মাধ্যমে ক্যাশ আউট কার্যক্রম চালায়, তাহলে তার কিউআর কোড বাতিল হয়ে যাবে।

বাংলা কিউআর দিয়ে আসলে কীভাবে পেমেন্ট হয়? ধরুন আপনি নাপিতের কাছে চুল কাটাতে গেছেন, বিল ১৪০ টাকা। নাপিতের দেয়ালে লাগানো বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে আপনি আপনার বিকাশ বা ব্যাংক অ্যাপ থেকে পিন দিয়ে কনফার্ম করলেন। মুহূর্তেই টাকা চলে যাবে নাপিতের অ্যাকাউন্টে। আগে এই পেমেন্ট মার্চেন্টের অ্যাকাউন্টে জমা হতে একদিন পর্যন্ত সময় লাগত। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নির্দেশ দিয়েছে–১০ লাখ টাকার নিচে বাংলা কিউআর ব্যাবহার করে করা লেনদেনে টাকা তাৎক্ষণিকভাবে মার্চেন্টের অ্যাকাউন্টে জমা হতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা উপকৃত হন।

ভালো কথা! কিন্তু যার কাছে স্মার্টফোন নেই, তিনি কী করবেন?

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আপাতত যার স্মার্টফোন নেই, এ প্রক্রিয়ায় তিনি লেনদেন করতে পারবেন না। স্মার্টফোন না থাকলে বাটন কিংবা নরমাল ফোনে এ ব্যবস্থা যেন কার্যকর হয়, তা নিয়ে কাজ চলছে।

ধরুন রহিম সাহেব, করিম সাহেবকে ৫০০০ টাকা দিতে চান। সেটি কি সম্ভব হবে? অর্থাৎ, ব্যক্তিপর্যায়ে বা পি-টু-পি লেনদেন করা যাবে বাংলা কিইউআর দিয়ে? বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, পি-টু-পি চালু হবে; তবে তার জন্য হয়তো জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এই কোড ব্যবহারে গ্রাহকের জন্য কোন ফি কিংবা চার্জ আছে?

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন চরচাকে বলেন, “ক্রেতা ১০ টাকার পণ্য ১০ টাকাই দেবে। যিনি বিক্রেতা, তিনি কিছু পেমেন্ট কম পাবেন। যেটুকু কম পেল, তা কীভাবে কমপেনসেট করা যায়, কীভাবে এই খরচটাকে সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যায়, ওটা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে।”

এ ছাড়া বাংলা কিউআর ব্যবহার করে মার্চেন্ট পেমেন্টের সংখ্যার ওপর কোনো বাধাও থাকছে না। আগে যেমন একক ব্যক্তির দৈনিক কোডভিত্তিক লেনদেনের সীমা ছিল সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা, সেই সীমা এই নিয়মে করা লেনদেনের ক্ষেত্রে রহিত করা হয়েছে। তবে ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব ঝুঁকি বিবেচনায় একক ও দৈনিক লেনদেনের সীমা নিজেরাই বসাতে পারবে।

কিন্তু নিরাপত্তা? বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ চুরি বা সাইবার হামলার প্রসঙ্গ সাম্প্রতিক সময় আবারও আলোচনায় এসেছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতেই পারে বাংলা কিউআর ব্যবহারে লেনদেন কতটা নিরাপদ। এর উত্তরে আরিফ হোসেন বলেন, “ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজির যে লিটারেসি, তার ঘাটতি আমাদের দেশে রয়েছে। সারা পৃথিবীতেই ফুল প্রুফ সিকিউর বলতে কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। আমাদের দেশে গত বছর এই ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং বা দুষ্টচক্রের মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা খোয়া গেছে। কিন্তু এটি টোটাল পেমেন্টের মাত্র ০.০০৬ শতাংশ, যা অত্যন্ত নেগলিজিবল। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক শতভাগ সতর্ক আছে এবং থাকবে।” তিনি বলেন, ১০০ কোটির কথা চিন্তা করে ডিজিটাল পেমেন্টর লক্ষ-কোটি টাকার সুবিধা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে আসাটা ঠিক হবে না।

২০১৯ সালের উদ্যোগ, ২০২১ সালে নীতিমালা তৈরি; তারপরও এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। তাতে তো লেনদেন থেমে ছিল না। তাহলে কেন হঠাৎ এটি বাস্তবায়নে এমন উদ্যোগী হয়ে উঠল কেন্দ্রীয় ব্যাংক? কারণ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব কষে দেখেছে, প্রতি বছর নগদ টাকার চাহিদা বাড়ছে প্রায় ১০ শতাংশ হারে। ফলে ব্যাংক খাতের বাড়তি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এ ছাড়া দেশে এখনও প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এই মানুষদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে চায় সরকার।

অদূর ভবিষ্যতে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ভাড়া, সেতু-এক্সপ্রেসওয়ে-ফ্লাইওভারের টোল, বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট-টেলিভিশন বিল, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি–সবকিছুতেই বাংলা কিউআর ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শহর থেকে গ্রাম–সব জায়গাকে একই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ছাতার নিচে আনতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আর এই স্বপ্নপূরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবেই বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআরকে দাঁড় করিয়েছে।

কবিতার খোকন একদিন বুঝেছিল, কড়কড়ে কাগজ সরকারের নিয়ম-কানুন মেনে না চললে তা টাকা হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকও এখন সেই একই পাঠ উল্টোভাবে শেখাতে চাইছে। কাগজ ছাড়াই, শুধু একটা স্ক্যানেই, যদি নিয়ম-কানুন আর প্রযুক্তি ঠিকঠাক কার্যকর করা যায়, তাহলে লেনদেনটাও অর্থনীতির নিয়ম মেনে পূর্ণতা পায়।

সম্পর্কিত