কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন খাতে জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজ সোমবার রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি)-এর থ্রিডি হলে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: কৃষি উন্নয়নের রূপরেখা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়। এগ্রিকালচারিস্টস’ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজিত হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থসংস্থান ও ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আক্তারুজ্জামান খান। প্রধান আলোচক ছিলেন দীপ্ত টেলিভিশনের হেড অব নিউজ এস. এম. আকাশ। আলোচনায় অংশ নেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. আবদুর রহিম এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ আবদুস সালাম। সভাপতিত্ব করেন এ্যাবের আহ্বায়ক কৃষিবিদ ড. কামরুজ্জামান কায়সার। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্যসচিব কৃষিবিদ শাহাদত হোসেন বিপ্লব।
মূল প্রবন্ধে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতের কয়েকটি ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু, ক্ষুদ্র কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, ডাল, তেলবীজ ও ভুট্টা চাষে স্বল্পসুদে ঋণ, সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আম সংরক্ষণের হিমাগার নির্মাণ, উত্তরবঙ্গকে আধুনিক কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ বরাদ্দ এবং কৃষি উপকরণ আমদানিতে ভ্যাট ও শুল্ক ছাড়।
তবে প্রবন্ধে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং বন ও পরিবেশ খাতে মোট ৩৩ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও জাতীয় বাজেটে কৃষির অংশ ধারাবাহিকভাবে কমছে। নতুন অর্থবছরে তা প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
সেমিনারে কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য চারটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ; পচনশীল কৃষিপণ্যের অপচয় কমাতে আধুনিক কোল্ড চেইন ও হিমাগার নির্মাণ; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণের নিশ্চয়তা; এবং স্মার্ট কৃষি, বাজার তথ্য ও আবহাওয়া সেবাসহ ডিজিটাল কৃষির জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ।
প্রবন্ধে বাজেট বাস্তবায়নের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আহরণে ঘাটতির কারণে কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, সরকারি সহায়তা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে দুর্বল তদারকি ও অনিয়ম, আন্তর্জাতিক বাজারে সার, বীজ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও অকার্যকারিতা।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষি বীমা সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃষি, অর্থ, পানি সম্পদ ও ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতের ভূমিকা অপরিসীম। এ কারণে দেশের কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তনে বিএনপি সরকারের সুদূরপ্রসারী ও নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে। সেই টেকসই উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী ভাবনাকে বিবেচনায় রেখেই এই জনকল্যাণমূলক বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ ও কৃষি বিপ্লবের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিএনপি সব সময় বিশ্বাস করে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। ঘোষিত বাজেটে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষা, সার, বীজ ও কীটনাশকে ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি দেশের কৃষি উন্নয়নে কৃষিবিদদের নিরলসভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।