সংকটময় সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: নির্বাচন এবং বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশের ভবিষ্যৎ

বিজয় প্রসাদ ও অতুল চন্দ্র
বিজয় প্রসাদ ও অতুল চন্দ্র
সংকটময় সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: নির্বাচন এবং বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশের ভবিষ্যৎ
শপথ নিচ্ছেন বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। ছবি: স্ক্রিনশট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২১২টি জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপির এই ভূমিধস জয় কেবল সরকারের পরিবর্তন নয়। এটি এমন এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল, যার শুরু ২০২৪ সালে ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনেরও আগে-দেশের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর একটি অংশ এবং তাদের বিদেশি সমর্থকদের পরিকল্পনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুটি প্রধান জোটই ছিল ডানপন্থী। ৩৫০ সদস্যের সংসদে মাত্র সাতজন নারী বসতে চলেছেন। প্রকাশ্য বামপন্থী প্রার্থী হিসেবে কেবল জোনায়েদ সাকি বিজয়ী হয়েছেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। আফ্রিকা ও এশিয়ায় সার্বভৌম নীতির বিস্তার ঠেকাতে সক্রিয় রয়েছে আমেরিকা-এমন দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশের পরিবর্তন সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

আমেরিকার নীতি কিন্তু দুর্বল বা ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারবিরোধী আন্দোলনের পেছনে বাস্তব অসন্তোষ ছিল বলেও স্বীকার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) অনুযায়ী, দেশে ডিগ্রিধারী বেকার তরুণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। স্নাতক তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রমশক্তির ৮৪ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে নিয়োজিত, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়ন নিয়েও ছিল অসন্তোষ। তবে বিদ্যমান অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বহিরাগত প্রভাব কাজ করেছে।

জর্জিয়া, ইউক্রেন ও মিসরে বিদেশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস বলে, মার্কিন আধিপত্যবাদ শূন্য থেকে অসন্তোষ তৈরি করে না। বরং বিদ্যমান বিভাজন চিহ্নিত করে বিরোধী শক্তিকে অর্থায়ন ও সংগঠিত করে এবং কৌশলগত সুযোগের মুহূর্তে সংস্কারের দাবি থেকে শাসন পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই রূপান্তরকে কেবল স্বতঃস্ফূর্ত গণতান্ত্রিক উত্থান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে ২০১১ সালের মিসরের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ক্ষমতাসীন সরকারকে রক্ষায় নিরাপত্তা কাঠামোর নিষ্ক্রিয়তা ইঙ্গিত দেয় যে, সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়ে গেছে। আর প্রায়ই এমনটা ঘটে বাইরের হস্তক্ষেপে।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের প্রধান আপত্তিকর বিষয় স্বৈরতন্ত্র ছিল না বরং মূল অপরাধ ছিল তাদের কৌশলগত ভারসাম্যনীতি। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর পূর্ণ সংযুক্তিতে অনীহা।

কারণ স্বৈরতন্ত্রের কারণে মিত্র সৌদি আরবে থেকে মার্কোসের আমলের ফিলিপাইনের শাসনের পতন তো ঘটায়নি না আমেরিকা।

মুহাম্মদ ইউনূস ও নিওলিবারেল ফেইট একম্পলি

নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কোনো নিষ্ক্রিয় তত্ত্বাবধায়ক ছিল না। মিসরের মোহাম্মদ এলবারাদেইর মতোই ইউনূসকে পরিবর্তনের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে দেখা হয়েছিল, দুজনেই নোবেলজয়ী। তবে এই পরিবর্তনের মূল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল পর্দার আড়ালের শক্তিগুলোর মাধ্যমে।

অবশ্য এলবারাদেইর তুলনায় ইউনূসের গ্লোবাল নর্থের (উন্নত ও ধনী দেশগুলো) আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার বৈশ্বিক মাইক্রোফাইন্যান্স নেটওয়ার্কের পাশাপাশি তিনি নির্বাচনের আগেই একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।

এই কর্মসূচির মূল ছিল ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ। এর শর্ত হিসেবে জ্বালানি ভর্তুকি তুলে নেওয়া, মুদ্রানীতি কঠোর করা, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ তখনই ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নতুন এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও দেশীয় আর্থিক গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

‘গরিবের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত হলেও ইউনূসের সময় তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বাড়েনি। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে প্রায় ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিক-যাদের বেশিরভাগই নারী, তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান।

এভাবেই অন্তর্বতী সরকারের আমলে অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয় যে পরবর্তী নির্বাচনে যেই দলই জিতুক, সেই বাস্তবতা আগেই ঠিক হয়ে থাকবে। ১২ ফেব্রুয়ারির আগেই অর্থনৈতিক নীতির সীমা নির্ধারিত হয়ে গেছে। ফলে গণতন্ত্রের বিকল্প সীমিত হয়ে পড়ে। কারণ নির্বাচনে কেবল ঠিক করা হয় কোন দল এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করবে।

বিএনপি-ওয়াশিংটন কৌশলগত পুরস্কার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাঙন

বিএনপির এই নিরঙ্কুশ জয় কেবল গণতান্ত্রিক রায় নয়। এটি দুই বছরের পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমেরিকার জন্য বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চীনকে ঘিরে তৈরি ভূরাজনৈতিক প্রতিরোধের একটি কেন্দ্রবিন্দু এবং ভারত মহাসাগরকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক পথের সঙ্গে যুক্ত করে।

শেখ হাসিনার সময় পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা বিনিয়োগ গ্রহণ করলেও সামরিক ঘাঁটি ও কোয়াড-ঘনিষ্ঠ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে চাপ সামলেছে বাংলাদেশ। বিএনপির শিকড় সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে হওয়ায় দলটি ঐতিহাসিকভাবেই আমেরিকার বাজার উদারীকরণ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযুক্তি, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল রাখা এবং ইউনূসের সময় ঠিক করা পশ্চিমা আর্থিক শর্তাবলির বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এর প্রভাব যথেষ্ট গুরুতর। যুক্তরাষ্ট্রমুখী নীতি বাংলাদেশের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করছে, ব্রিকস ও অন্যান্য অ-জোটভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সংকুচিত করছে এবং ইতোমধ্যেই ভাঙনের মুখে পড়া উপমহাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অস্থিতিশীলতার জন্ম দিচ্ছে।

তবে এই পরিকল্পিত পরিবর্তন যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, তা সম্ভবত নকশাকারীদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অস্থির। ২০০১-২০০৬ সালের পরিস্থিতির তুলনায় এবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরের তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচন করেছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ৭৭টি আসন জিতেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ঢাকা-৩-এর মতো কিছু আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষও হয়েছে।

এই ভাঙনের এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এখন দেশের প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট জামায়াতকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে।

জামায়াত এমন একটি দল, যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতও হয়েছেন। জোটের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে জামায়াত এখন বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন ও নাগরিক সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়াই মতাদর্শ নির্ধারণের অবস্থান গ্রহণ করেছে। এতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক রূপান্তর সম্ভব করতে যে তরুণ শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, তার ফলাফল হতাশাজনক। রাজপথে অর্জিত শক্তিকে নির্বাচনী সাফল্যে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে এনসিপি। নাহিদ ইসলামসহ বহু ছাত্রনেতা বিএনপিকে আরেকটি বংশানুক্রমিক দল হিসেবে অভিহিত করে জামায়াতের ১১-দলীয় জোটে যোগ দেন। ফলস্বরূপ, যে তরুণ বিপ্লবীরা সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত কঠোর ইসলামপন্থীদের সঙ্গে একই ছাতার নিচে চলে আসে।

এটি মিসরের পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি। সুসংগঠিত বামপন্থী শক্তি এবং সুস্পষ্ট শ্রেণিভিত্তিক কর্মসূচি না থাকলে জনপ্রিয় শক্তি দখল করে সেই দলই, যা নিজেকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

এদিকে, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বামপন্থী দল, যেমন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, প্রতিহিংসামূলক গ্রেপ্তার ও অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। কয়েকটি গণমাধ্যমও বন্ধ হয়েছে। শাসক বদলালেও দমন-পীড়ন এখনো রাষ্ট্রের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিদ্যমান।

বাংলাদেশ বর্তমানে এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। একদিকে সংসদে একচ্ছত্র ক্ষমতা পাওয়া বিএনপি সরকার আইএমএফ-নির্ধারিত নীতি বাস্তবায়ন করবে। একই সময়ে, নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়ে জামায়াত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করবে। সেইসঙ্গে তরুণ প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে, আর অর্থনীতিও নবউদারবাদী পুনর্গঠনের কারণে পুনর্বণ্টনের জন্য প্রায় কোনো সুযোগ রাখে নি।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সর্বশেষ ক্ষেত্র। শ্রমিক শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগঠনগুলোর কাজ শুধুমাত্র চলমান পরিস্থিতি নথিবদ্ধ করা নয় বরং তার প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া সংগঠিত করাও।

কাউন্টারপাঞ্চের এক্সক্লুসিভটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত। কাউন্টারপাঞ্চআমেরিকাভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন। সংস্থাটি বিশ্বের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিশ্লেষণ, নিবন্ধ, মতামতা প্রকাশ করে।

সম্পর্কিত