চরচা ডেস্ক

আহা, জার্মানির এবারের বিশ্বকাপ দলে যদি ব্রাজিলের ‘ফেনোমেনন’ রোনালদোর মতো কেউ সত্যিই থাকতেন!
জার্মানির সঙ্গে ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার কীভাবে প্রাসঙ্গিক হলেন? প্রশ্নটা আপনার মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। ‘ফেনোমেনন’ রোনালদো প্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন এবারের জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াডের খেলোয়াড় জেমি লেভেলিংয়ের কারণে।
এবার জার্মানি ৯ নম্বর জার্সিটা দিয়েছে তাঁকে। তা জানতে পেরে লেভেলিং কী করলেন? ইনস্টাগ্রামে স্টোরিতে দিলেন নিজের একটা ছবি, শুধু ছবিটাতে চুলের স্টাইল এডিট করে ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদোর সেই বিখ্যাত চুল বসিয়ে দিলেন। ওই যে, মাথার বাকি অংশের চুল ছেঁটে ফেলে শুধু সামনের দিকে কয়েক গাছি চুল রেখে যে স্টাইলটা করেছিলেন রোনালদো, সেটা আর কী!
নিছক মজা করেই যে পোস্টটা দিয়েছেন লেভেলিং, তা নিশ্চয়ই আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না! তবে মজার এই পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল করে দেয় জার্মান ফরোয়ার্ডকে।
একই সঙ্গে জার্মানির একটা আফসোসও জাগিয়ে দিল আর কী! রোনালদো না হোক, ওই মানের কাছাকাছিও একজন স্ট্রাইকার যদি জার্মানির থাকতেন!

কেন আলোচনাটা আসছে? যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে চলতে থাকা বিশ্বকাপে এবার শিরোপার সম্ভাবনার প্রশ্নে জার্মানি যে ফ্রান্স-স্পেন-ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার চেয়ে পিছিয়ে, তার একটা বড় কারণ প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরানোর মতো, নিয়মিত গোলের ভরসা হওয়ার মতো একজন স্ট্রাইকারের অনুপস্থিতি।
বিশ্বকাপ সম্ভাবনার প্রশ্নে কী আছে আর কী নেই-এর বিশ্লেষণে জার্মানি দেখছে, তাদের ফ্লোরিয়ান ভিয়ের্তস আছে। জামাল মুসিয়ালা আছে। ইয়োশুয়া কিমিখ আছে। এমনকি অবসর থেকে ইউটার্ন নিয়ে সোজা একাদশে জায়গার ব্যাপারেও কোচের নিশ্চয়তা পেয়ে যাওয়া গোলকিপার মানুয়েল ন্যয়ারও আছেন। কিন্তু জার্মানির একজন মিরোস্লাভ ক্লোসা নেই, নিদেনপক্ষে একজন মারিও গোমেজও নেই। কাই হাভার্টস আছেন, একাদশেও নিয়মিতই খেলবেন, কিন্তু তার অন্য অনেক গুণ থাকলেও তাকে অন্তত বক্সে ঝড় তোলা স্ট্রাইকার তো বলা যায় না!
কেন জার্মানি বিশ্বকাপ জিতবে, কেন জিতবে না – সেই বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপও এতটুকুই।
২.
খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়, বিশ্বকাপে জার্মানি মানে ছিল মেশিনের মতো নিশ্চয়তা - শিরোপা না জিতুক, অন্তত টুর্নামেন্টের শেষদিকেও জার্মানি প্রাসঙ্গিক থাকবেই! ২০১৪-তে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতল, তার আগের দুই বিশ্বকাপেও সেমিফাইনাল খেলেছে। তার আগে ২০০২-এ তো ফাইনালই খেলেছে, ব্রাজিলের কাছে – আরও নির্দিষ্ট করে বললে ‘ফেনোমেনন’ রোনালদোর কাছেই – হেরে হলো রানার্সআপ। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বাদ পড়েছে জার্মানি, এমন রেকর্ড খুঁজতে আপনাকে পিছিয়ে যেতে হতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে!
তবে এর সবই ২০১৮ বিশ্বকাপের আগের কথা। ব্রাজিলের মাটিতে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই যে জার্সিতে পঞ্চম তারা বসিয়ে ব্রাজিলকে ধরে ফেলার মিশন শুরু হলো জার্মানির, সে মিশন বারবার শুরুর আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই জার্মানির পতনের মধ্যে হয়তো ঐতিহাসিক কৌতুকও খুঁজে নেওয়া গেছে, চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপেও গ্রুপেই জার্মানির বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়া হতবাক করেছে দলটাকে অপছন্দ করা দর্শককেও।
এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপের ফরম্যাটটাই এমন যে, গ্রুপ পর্বে বাদ পড়তে হলে বরং বেশি কষ্ট করতে হবে জার্মানিকে। গ্রুপের সেরা দুই দল তো পরের রাউন্ডে যাবেই, ১২ গ্রুপের তৃতীয় হওয়ার দলগুলোর মধ্যেও ৮টি যাবে রাউন্ড অব ৩২-তে। ওই ৩২ দলের মধ্যে জার্মানি না থাকার সম্ভাবনা আর ব্যস্ত দিনে বিজয় সরণিতে জ্যাম না পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় সমান!
কিন্তু জার্মানি তো আর গ্রুপ পর্ব পেরোনোর জন্য বিশ্বকাপে যাচ্ছে না। লক্ষ্য যেখানে পাঁচ শিরোপায় ব্রাজিলকে ধরে ফেলা, জার্মানি সে জন্য কতটা প্রস্তুত?
৩.
কেন জার্মানি বিশ্বকাপ জিততে পারে?
কে আছে আর কে নেই-এর হিসাবে ‘আছে’র তালিকায় প্রথম দুটি নাম দেখে নিন। ফ্লোরিয়ান ভিয়ের্তস। জামাল মুসিয়ালা। সময়ের সেরা প্রতিভার ছোট্ট তালিকায়ও যে দুই নাম আপনাকে রাখতেই হবে! দুজনের ‘প্রোফাইল’ও কী দারুণকে এক অন্যের সঙ্গে মিলে যায়! মুসিয়ালা জায়গা তৈরি করেন, ভিয়ের্তস ফাঁকা জায়গা ধরে আক্রমণ করেন। মুসিয়ালার ড্রিবলিং ভয়ংকর, তো ভিয়ের্তসের পাসিং আর ভিশন।

দুজনকে ঘিরেই অনিশ্চয়তাও আছে। মুসিয়ালার ফিটনেস এমনই যে, দুদিন আগে লিভারপুল-ডর্টমুন্ডের কিংবদন্তি জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ আর জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলের মিডফিল্ডার টমাস মুলার পর্যন্ত বলে ফেললেন, মুসিয়ালাকে শুরু থেকেই একাদশে রাখা ঠিক হবে না। অন্যদিকে ভিয়ের্তস সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে রেকর্ড ফি-তে লিভারপুলে গেলেও ঠিক নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি।
তবে সে শঙ্কা এক পাশে রেখে যদি শুধু প্রতিভার বিচারে যান, জার্মানির আক্রমণের অলিন্দ-নিলয়ই জার্মানির শিরোপার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেন। শুধু প্রতিভাকে বিশ্বকাপের মঞ্চে অনূদিত করার অপেক্ষা।
দ্বিতীয় কারণ, বিশ্বকাপে জার্মানির সাম্প্রতিক অতীত। সর্বশেষ দুই বিশ্বকাপে ব্যর্থতাকে অপমান হিসেবে দেখা জাত্যাভিমানি জার্মানরা এবার গল্পটা আবার নতুন করে লেখার জন্য কতটা উন্মুখ থাকবেন, সেটা অনুমান করে নেওয়া কঠিন কিছু নয়। সে পথে এবার অভিজ্ঞ নয়্যারেরও উপস্থিতি জার্মানির ডিফেন্সের জন্য বড় ভরসা।

ডাগআউটে ইউলিয়ান নাগেলসমানের উপস্থিতি অবশ্য জার্মানির বিশ্বকাপ জেতা কিংবা না জেতা – দুটিরই কারণ হয়ে যেতে পারে। শুধু নিজের দলের শক্তি নয়, প্রতিপক্ষের দুর্বলতার হিসাবেও ট্যাকটিকস বদলান এই বিশ্বকাপে কনিষ্ঠতম কোচ নাগেলসমান। মাঝে মাঝে পরীক্ষা-নিরীক্ষাটা বেশি হয়ে যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিশ্বকাপের মতো ৭ ম্যাচের (এবার ৮) টুর্নামেন্টে ছোট্ট ভুলই যেখানে সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, সেখানে নাগেলসমানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল শঙ্কা বাড়ায়। আবার উল্টো দিকে নাগেলসমানের ছোট্ট অদলবদলই নকআউট পর্বে কঠিন হয়ে পড়া কোনো ম্যাচে জার্মানির জন্য হয়ে যেতে পারে জয়ের চাবি!
৪.
শুধু নাগেলসমানই নন, জার্মানি এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে রহস্যময় দল হয়ে ওঠার একটা বড় কারণ এটাই যে, তাদের যাহাই শক্তি, তাহাই দুর্বলতা! ভিয়ের্তস-মুসিয়ালার কথা আগেই বলা হলো। নয়্যারের ফেরাও তেমনই এক সম্ভাবনা আর শঙ্কা দুটিই জাগিয়ে তোলা ঘটনা। একদিকে নয়্যার মানে গোলপোস্টে নিচে নির্ভরতা, অন্যদিকে হঠাৎ করে বিশ্বকাপের আগে নয়্যারকে ফেরানোতে জার্মানির ড্রেসিংরুমে গণ্ডগোলের শঙ্কা। নয়্যারের অবসরের পর থেকে জার্মানির ‘নাম্বার ওয়ান’ হয়ে ওঠা অলিভার বাউমান বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এসে হঠাৎ নিজেকে বেঞ্চে আবিষ্কার করে খুশি হওয়ার তো কোনো কারণ নেই! এরই মধ্যে সেটা প্রকাশ্যে জানিয়েও দিয়েছেন বাউমান!

জার্মানির ডিফেন্স নিয়ে প্রশ্ন আছে। দল আক্রমণে উঠলে কিমিখ রাইটব্যাক থেকে মিডফিল্ডের দিকে ঢুকে যাবেন (ইনভার্টেড ফুলব্যাক), অন্যদিকে লেফটব্যাক – সেটা রাউমই হোন বা ব্রাউন - উঠে যাবেন ওপরে (ওভারল্যাপ)। কিমিখ পাল্টা আক্রমণে ওঠা প্রতিপক্ষ উইঙ্গারকে ঠেকানোর জন্য বিখ্যাত নন, লেফট ফুলব্যাক ওপরে উঠে গেলে পাল্টা আক্রমণে পেছনে জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকবে। নকআউট পর্বে ফ্রান্স কিংবা স্পেনের মতো ট্রানজিশনে ভয়ংকর দলের বিপক্ষে জার্মানির ডিফেন্স টিকতে পারবে?
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আপনি লেখার শুরুতেই পেয়েছেন। জার্মানির গোলটা করবেন কে? হাভার্টস কার্যকর ফরোয়ার্ড, তবে সেটা ফলস নাইন পজিশনে। তার পাশে গোলস্কোরিং উইঙ্গার থাকলে হাভার্টসের কার্যকারিতা আরও চোখে পড়ে। তেমন উইঙ্গার স্পেনের আছে, ফ্রান্সের আছে, কিন্তু জার্মানির মুসিয়ালা কিংবা ভিয়ের্তস অন্য অনেক কিছুর জন্য বিখ্যাত হলেও গোলস্কোরিংয়ের জন্য নন। হাভার্টস নিজেও নন। নকআউটে কোনো ম্যাচে যদি জার্মানি ৭০-৭৫ মিনিটেও গোল না পায় – কিংবা উল্টো পিছিয়ে থাকে – তখন জার্মানির গোলটা এনে দেবেন কে? হাভার্টস সে ভরসা জোগান না! ডেনিস উনদাভকে তো নাগেলসমান নিজেই ততটা ভরসা করেন না। বিশ্বকাপের শেষ দিকে এই ঘাটতি ভয়ংকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে জার্মানির রহস্য এখানেই যে, তারা শিরোপাসংখ্যায় ‘ব্রাজিল’ হয়ে যেতে পারে। আবার দেখা গেল, কোয়ার্টার ফাইনাল-সেমিফাইনালে ২০-২৫টি শট করেও গোল করতে না পারার ব্যর্থতায় বাড়ি ফিরে গেল।
সম্ভবত দ্বিতীয়টিরই সম্ভাবনা বেশি।

আহা, জার্মানির এবারের বিশ্বকাপ দলে যদি ব্রাজিলের ‘ফেনোমেনন’ রোনালদোর মতো কেউ সত্যিই থাকতেন!
জার্মানির সঙ্গে ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার কীভাবে প্রাসঙ্গিক হলেন? প্রশ্নটা আপনার মনে আসা খুবই স্বাভাবিক। ‘ফেনোমেনন’ রোনালদো প্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন এবারের জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াডের খেলোয়াড় জেমি লেভেলিংয়ের কারণে।
এবার জার্মানি ৯ নম্বর জার্সিটা দিয়েছে তাঁকে। তা জানতে পেরে লেভেলিং কী করলেন? ইনস্টাগ্রামে স্টোরিতে দিলেন নিজের একটা ছবি, শুধু ছবিটাতে চুলের স্টাইল এডিট করে ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদোর সেই বিখ্যাত চুল বসিয়ে দিলেন। ওই যে, মাথার বাকি অংশের চুল ছেঁটে ফেলে শুধু সামনের দিকে কয়েক গাছি চুল রেখে যে স্টাইলটা করেছিলেন রোনালদো, সেটা আর কী!
নিছক মজা করেই যে পোস্টটা দিয়েছেন লেভেলিং, তা নিশ্চয়ই আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না! তবে মজার এই পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল করে দেয় জার্মান ফরোয়ার্ডকে।
একই সঙ্গে জার্মানির একটা আফসোসও জাগিয়ে দিল আর কী! রোনালদো না হোক, ওই মানের কাছাকাছিও একজন স্ট্রাইকার যদি জার্মানির থাকতেন!

কেন আলোচনাটা আসছে? যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে চলতে থাকা বিশ্বকাপে এবার শিরোপার সম্ভাবনার প্রশ্নে জার্মানি যে ফ্রান্স-স্পেন-ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার চেয়ে পিছিয়ে, তার একটা বড় কারণ প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরানোর মতো, নিয়মিত গোলের ভরসা হওয়ার মতো একজন স্ট্রাইকারের অনুপস্থিতি।
বিশ্বকাপ সম্ভাবনার প্রশ্নে কী আছে আর কী নেই-এর বিশ্লেষণে জার্মানি দেখছে, তাদের ফ্লোরিয়ান ভিয়ের্তস আছে। জামাল মুসিয়ালা আছে। ইয়োশুয়া কিমিখ আছে। এমনকি অবসর থেকে ইউটার্ন নিয়ে সোজা একাদশে জায়গার ব্যাপারেও কোচের নিশ্চয়তা পেয়ে যাওয়া গোলকিপার মানুয়েল ন্যয়ারও আছেন। কিন্তু জার্মানির একজন মিরোস্লাভ ক্লোসা নেই, নিদেনপক্ষে একজন মারিও গোমেজও নেই। কাই হাভার্টস আছেন, একাদশেও নিয়মিতই খেলবেন, কিন্তু তার অন্য অনেক গুণ থাকলেও তাকে অন্তত বক্সে ঝড় তোলা স্ট্রাইকার তো বলা যায় না!
কেন জার্মানি বিশ্বকাপ জিতবে, কেন জিতবে না – সেই বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপও এতটুকুই।
২.
খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়, বিশ্বকাপে জার্মানি মানে ছিল মেশিনের মতো নিশ্চয়তা - শিরোপা না জিতুক, অন্তত টুর্নামেন্টের শেষদিকেও জার্মানি প্রাসঙ্গিক থাকবেই! ২০১৪-তে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জিতল, তার আগের দুই বিশ্বকাপেও সেমিফাইনাল খেলেছে। তার আগে ২০০২-এ তো ফাইনালই খেলেছে, ব্রাজিলের কাছে – আরও নির্দিষ্ট করে বললে ‘ফেনোমেনন’ রোনালদোর কাছেই – হেরে হলো রানার্সআপ। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বাদ পড়েছে জার্মানি, এমন রেকর্ড খুঁজতে আপনাকে পিছিয়ে যেতে হতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে!
তবে এর সবই ২০১৮ বিশ্বকাপের আগের কথা। ব্রাজিলের মাটিতে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই যে জার্সিতে পঞ্চম তারা বসিয়ে ব্রাজিলকে ধরে ফেলার মিশন শুরু হলো জার্মানির, সে মিশন বারবার শুরুর আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই জার্মানির পতনের মধ্যে হয়তো ঐতিহাসিক কৌতুকও খুঁজে নেওয়া গেছে, চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপেও গ্রুপেই জার্মানির বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়া হতবাক করেছে দলটাকে অপছন্দ করা দর্শককেও।
এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপের ফরম্যাটটাই এমন যে, গ্রুপ পর্বে বাদ পড়তে হলে বরং বেশি কষ্ট করতে হবে জার্মানিকে। গ্রুপের সেরা দুই দল তো পরের রাউন্ডে যাবেই, ১২ গ্রুপের তৃতীয় হওয়ার দলগুলোর মধ্যেও ৮টি যাবে রাউন্ড অব ৩২-তে। ওই ৩২ দলের মধ্যে জার্মানি না থাকার সম্ভাবনা আর ব্যস্ত দিনে বিজয় সরণিতে জ্যাম না পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় সমান!
কিন্তু জার্মানি তো আর গ্রুপ পর্ব পেরোনোর জন্য বিশ্বকাপে যাচ্ছে না। লক্ষ্য যেখানে পাঁচ শিরোপায় ব্রাজিলকে ধরে ফেলা, জার্মানি সে জন্য কতটা প্রস্তুত?
৩.
কেন জার্মানি বিশ্বকাপ জিততে পারে?
কে আছে আর কে নেই-এর হিসাবে ‘আছে’র তালিকায় প্রথম দুটি নাম দেখে নিন। ফ্লোরিয়ান ভিয়ের্তস। জামাল মুসিয়ালা। সময়ের সেরা প্রতিভার ছোট্ট তালিকায়ও যে দুই নাম আপনাকে রাখতেই হবে! দুজনের ‘প্রোফাইল’ও কী দারুণকে এক অন্যের সঙ্গে মিলে যায়! মুসিয়ালা জায়গা তৈরি করেন, ভিয়ের্তস ফাঁকা জায়গা ধরে আক্রমণ করেন। মুসিয়ালার ড্রিবলিং ভয়ংকর, তো ভিয়ের্তসের পাসিং আর ভিশন।

দুজনকে ঘিরেই অনিশ্চয়তাও আছে। মুসিয়ালার ফিটনেস এমনই যে, দুদিন আগে লিভারপুল-ডর্টমুন্ডের কিংবদন্তি জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ আর জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান দলের মিডফিল্ডার টমাস মুলার পর্যন্ত বলে ফেললেন, মুসিয়ালাকে শুরু থেকেই একাদশে রাখা ঠিক হবে না। অন্যদিকে ভিয়ের্তস সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে রেকর্ড ফি-তে লিভারপুলে গেলেও ঠিক নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি।
তবে সে শঙ্কা এক পাশে রেখে যদি শুধু প্রতিভার বিচারে যান, জার্মানির আক্রমণের অলিন্দ-নিলয়ই জার্মানির শিরোপার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেন। শুধু প্রতিভাকে বিশ্বকাপের মঞ্চে অনূদিত করার অপেক্ষা।
দ্বিতীয় কারণ, বিশ্বকাপে জার্মানির সাম্প্রতিক অতীত। সর্বশেষ দুই বিশ্বকাপে ব্যর্থতাকে অপমান হিসেবে দেখা জাত্যাভিমানি জার্মানরা এবার গল্পটা আবার নতুন করে লেখার জন্য কতটা উন্মুখ থাকবেন, সেটা অনুমান করে নেওয়া কঠিন কিছু নয়। সে পথে এবার অভিজ্ঞ নয়্যারেরও উপস্থিতি জার্মানির ডিফেন্সের জন্য বড় ভরসা।

ডাগআউটে ইউলিয়ান নাগেলসমানের উপস্থিতি অবশ্য জার্মানির বিশ্বকাপ জেতা কিংবা না জেতা – দুটিরই কারণ হয়ে যেতে পারে। শুধু নিজের দলের শক্তি নয়, প্রতিপক্ষের দুর্বলতার হিসাবেও ট্যাকটিকস বদলান এই বিশ্বকাপে কনিষ্ঠতম কোচ নাগেলসমান। মাঝে মাঝে পরীক্ষা-নিরীক্ষাটা বেশি হয়ে যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিশ্বকাপের মতো ৭ ম্যাচের (এবার ৮) টুর্নামেন্টে ছোট্ট ভুলই যেখানে সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, সেখানে নাগেলসমানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল শঙ্কা বাড়ায়। আবার উল্টো দিকে নাগেলসমানের ছোট্ট অদলবদলই নকআউট পর্বে কঠিন হয়ে পড়া কোনো ম্যাচে জার্মানির জন্য হয়ে যেতে পারে জয়ের চাবি!
৪.
শুধু নাগেলসমানই নন, জার্মানি এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে রহস্যময় দল হয়ে ওঠার একটা বড় কারণ এটাই যে, তাদের যাহাই শক্তি, তাহাই দুর্বলতা! ভিয়ের্তস-মুসিয়ালার কথা আগেই বলা হলো। নয়্যারের ফেরাও তেমনই এক সম্ভাবনা আর শঙ্কা দুটিই জাগিয়ে তোলা ঘটনা। একদিকে নয়্যার মানে গোলপোস্টে নিচে নির্ভরতা, অন্যদিকে হঠাৎ করে বিশ্বকাপের আগে নয়্যারকে ফেরানোতে জার্মানির ড্রেসিংরুমে গণ্ডগোলের শঙ্কা। নয়্যারের অবসরের পর থেকে জার্মানির ‘নাম্বার ওয়ান’ হয়ে ওঠা অলিভার বাউমান বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এসে হঠাৎ নিজেকে বেঞ্চে আবিষ্কার করে খুশি হওয়ার তো কোনো কারণ নেই! এরই মধ্যে সেটা প্রকাশ্যে জানিয়েও দিয়েছেন বাউমান!

জার্মানির ডিফেন্স নিয়ে প্রশ্ন আছে। দল আক্রমণে উঠলে কিমিখ রাইটব্যাক থেকে মিডফিল্ডের দিকে ঢুকে যাবেন (ইনভার্টেড ফুলব্যাক), অন্যদিকে লেফটব্যাক – সেটা রাউমই হোন বা ব্রাউন - উঠে যাবেন ওপরে (ওভারল্যাপ)। কিমিখ পাল্টা আক্রমণে ওঠা প্রতিপক্ষ উইঙ্গারকে ঠেকানোর জন্য বিখ্যাত নন, লেফট ফুলব্যাক ওপরে উঠে গেলে পাল্টা আক্রমণে পেছনে জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকবে। নকআউট পর্বে ফ্রান্স কিংবা স্পেনের মতো ট্রানজিশনে ভয়ংকর দলের বিপক্ষে জার্মানির ডিফেন্স টিকতে পারবে?
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আপনি লেখার শুরুতেই পেয়েছেন। জার্মানির গোলটা করবেন কে? হাভার্টস কার্যকর ফরোয়ার্ড, তবে সেটা ফলস নাইন পজিশনে। তার পাশে গোলস্কোরিং উইঙ্গার থাকলে হাভার্টসের কার্যকারিতা আরও চোখে পড়ে। তেমন উইঙ্গার স্পেনের আছে, ফ্রান্সের আছে, কিন্তু জার্মানির মুসিয়ালা কিংবা ভিয়ের্তস অন্য অনেক কিছুর জন্য বিখ্যাত হলেও গোলস্কোরিংয়ের জন্য নন। হাভার্টস নিজেও নন। নকআউটে কোনো ম্যাচে যদি জার্মানি ৭০-৭৫ মিনিটেও গোল না পায় – কিংবা উল্টো পিছিয়ে থাকে – তখন জার্মানির গোলটা এনে দেবেন কে? হাভার্টস সে ভরসা জোগান না! ডেনিস উনদাভকে তো নাগেলসমান নিজেই ততটা ভরসা করেন না। বিশ্বকাপের শেষ দিকে এই ঘাটতি ভয়ংকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে জার্মানির রহস্য এখানেই যে, তারা শিরোপাসংখ্যায় ‘ব্রাজিল’ হয়ে যেতে পারে। আবার দেখা গেল, কোয়ার্টার ফাইনাল-সেমিফাইনালে ২০-২৫টি শট করেও গোল করতে না পারার ব্যর্থতায় বাড়ি ফিরে গেল।
সম্ভবত দ্বিতীয়টিরই সম্ভাবনা বেশি।