চরচা ডেস্ক

ভূরাজনীতিতে নতুন করে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নাম। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে শত বছর ধরে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার বিরোধ চলে আসছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দেশ দুটির সম্পর্ক অনেকটাই শান্ত।
তবে হঠাৎ করে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এই বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের ওপর নিজেদের অধিকারের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিলেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ‘পুনর্দখল’ করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বারস্থ হতে পারেন। ট্রাম্পের সাথে তার সুসম্পর্ক এবং যুক্তরাজ্যের সাথে ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে এই ইস্যুটি এখন বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
ট্রাম্প এবং মিলেই বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছেন। আর্জেন্টিনার এই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পপন্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক সমাবেশগুলোর এক নিয়মিত মুখ। ট্রাম্প এর আগে লিবার্টি অ্যাডভান্সেস পার্টির কট্টর-ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতা মিলেইকে ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, পেন্টাগন ফকল্যান্ড বিরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতা পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ে ব্রিটিশ সমালোচনার কারণে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মিলেইয়ের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ব্রিটেনের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষোভ কি এই সমীকরণ বদলে দিতে পারে?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিতর্কটি আসলে কী?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি বা বিদেশি অঞ্চল। এই দ্বীপপুঞ্জের প্রধান দুটি দ্বীপ হলো পূর্ব ফকল্যান্ড এবং পশ্চিম ফকল্যান্ড।
দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এখানে জনসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ২০০ জনের মতো। তবে প্রতি গ্রীষ্মে প্রায় দশ লাখ পেঙ্গুইন এই দ্বীপগুলোতে বাসা বাঁধে।
আর্জেন্টিনা এই দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে। তাদের যুক্তি হলো, ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্পেনীয় রাজপরিবারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তারা এই দ্বীপগুলোর মালিকানা লাভ করেছে।

তবে ১৬৯০ সালে ইংরেজ নাবিক জন স্ট্রং এই ভূখণ্ডে অবতরণ করেন এবং তার পৃষ্ঠপোষক ভাইকাউন্ট ফকল্যান্ডের নামানুসারে এর নামকরণ করেন। এরপর থেকে যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং স্পেন–সব দেশই বিভিন্ন সময়ে এই দ্বীপে বসতি স্থাপন করেছে।
যুক্তরাজ্য ১৮৩৩ সাল থেকে এই দ্বীপপুঞ্জ শাসন করে আসছে। সেখানে তাদের দীর্ঘকালীন উপস্থিতি এবং দ্বীপবাসীদের স্পষ্ট ব্রিটিশপন্থী অবস্থানকে তারা নিজেদের দাবির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডের বাসিন্দারা একটি গণভোটের আয়োজন করেন, যেখানে ১ হাজার ৫১৭ জনের মধ্যে ১ হাজার ৫১৩ জনই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার পক্ষে ভোট দেন।
তবে আর্জেন্টাইনরা এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশদের একটি উপনিবেশিক শক্তি হিসেবে গণ্য করে।
১৯৮২ সালের এপ্রিলে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার এই বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রচেষ্টায় তা দখল করে নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্বীপপুঞ্জটি পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সামরিক টাস্কফোর্স পাঠান, যা ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। মজার বিষয় হলো, মিলেই দীর্ঘকাল ধরে রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ থ্যাচারকে তার রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে মেনে আসছেন।
যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে জয়লাভ করে, যেখানে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়েছিলেন।
মিলেই সম্প্রতি কী বলেছেন?
বামপন্থী হিসেবে পরিচিত মিলেইয়ের পূর্বসূরিরা নিয়মিতভাবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার দাবির কথা পুনর্ব্যক্ত করতেন। অন্যদিকে মিলেই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জোরালো আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে শুরুতে বিরোধীরা তাকে এই বলে সমালোচনা করেছিলেন যে, তিনি এই ইস্যুতে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন না।
২০২৪ সালে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে মিলেই সেইসব রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করেন যারা কোনো ফলাফল অর্জন ছাড়াই সার্বভৌমত্ব নিয়ে গর্ব করেন।
তবে গত সপ্তাহে একটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন যে, ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনা আগের চেয়েও অনেক বেশি অগ্রগতি অর্জন করছে।

তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন দেশের অভ্যন্তরে মিলেইয়ের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমেরিকা সোসাইটি/কাউন্সিল অফ দ্য আমেরিকাস-এর জনসমর্থন জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৬১ শতাংশ আর্জেন্টাইন নাগরিক মিলেইয়ের কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এটিই তার সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তার হার।
ধারণা করা হচ্ছে, নিজের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতেই হয়তো মিলেই আবার ফকল্যান্ড ইস্যু নিয়ে নতুন করে কথা বলছেন।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মিলেইয়ের সাম্প্রতিক এই মন্তব্যগুলো আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রকাশ্যে তার সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। তেহরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াশিংটনকে সহায়তা না করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ট্রাম্প তাকে অভিযুক্ত করেছেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর এবং স্টারমার যখন শুরুতে ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান—তখন ট্রাম্প ব্রিটিশ নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তিনি ‘উইনস্টন চার্চিল’ নন।
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস এবং রানি কামিলা ২৭ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান টার্নার এই সফরকে দুই মিত্র দেশের মধ্যে একটি অনন্য বন্ধুত্বকে নতুন করে ঝালাই করা এবং প্রাণবন্ত করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কোনো পক্ষ নেওয়া এড়িয়ে চলে এসেছে। যদিও তারা স্বীকার করে যে অঞ্চলটি ব্রিটিশ শাসনাধীন।
তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পেন্টাগন একটি স্মারক তৈরি করেছে যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যথেষ্ট সহায়ক না হওয়া মিত্র দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে কিছু বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—যুদ্ধের কড়া সমালোচক স্পেনকে ন্যাটো থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দশক আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ব্রিটেনকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শুরুতে তারা আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে, তারা ব্রিটেনের সামরিক অভিযানের জন্য স্যাটেলাইট ইমেজসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের তাদের সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি লাখ লাখ গ্যালন এভিয়েশন ফুয়েল (বিমানের জ্বালানি), ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল।
প্রায় ৪৪ বছর আগে, ১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল ঐতিহাসিক ফকল্যান্ড যুদ্ধ চলাকালীন, যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে এই ধরনের সমর্থনের বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহের শুরুতে দ্বীপপুঞ্জের মর্যাদা নিয়ে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে এমন ইঙ্গিতকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
মিলেই কি ফকল্যান্ড পুনরুদ্ধারে ট্রাম্পকে ব্যবহার করতে পারেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প ও মিলেইয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ফকল্যান্ড বিরোধের যেকোনো সমাধান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যকে রাজি করানোর ওপরই নির্ভর করে।
ওয়াশিংটন ডিসির স্টিমসন সেন্টারের লাতিন আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক বেঞ্জামিন গেডান আল জাজিরাকে বলেন, “এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের যেকোনো নিষ্পত্তির জন্য অবশ্যই আলোচনার প্রয়োজন হবে, আর তার অর্থ হলো ব্রিটিশদের রাজি করানো, আমেরিকানদের নয়।”
গেডান ব্যাখ্যা করেন যে, ট্রাম্প মিলেইয়ের একজন বিরাট ভক্ত এবং তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাকে সাহায্য করেছেন।
২০২৫ সালে আর্জেন্টিনার গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা নির্বাচনের আগে, ট্রাম্প প্রশাসন আর্জেন্টাইন পেসোকে স্থিতিশীল করতে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি মুদ্রা বিনিময় সুবিধা প্রদান করেছিল।
গেডান আরও যোগ করেন, “তবে বর্তমান ক্ষেত্রে, ফকল্যান্ড বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত করার জন্যই করা হয়েছে।”

ভূরাজনীতিতে নতুন করে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নাম। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে শত বছর ধরে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার বিরোধ চলে আসছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দেশ দুটির সম্পর্ক অনেকটাই শান্ত।
তবে হঠাৎ করে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এই বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের ওপর নিজেদের অধিকারের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিলেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ‘পুনর্দখল’ করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বারস্থ হতে পারেন। ট্রাম্পের সাথে তার সুসম্পর্ক এবং যুক্তরাজ্যের সাথে ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে এই ইস্যুটি এখন বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
ট্রাম্প এবং মিলেই বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছেন। আর্জেন্টিনার এই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পপন্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক সমাবেশগুলোর এক নিয়মিত মুখ। ট্রাম্প এর আগে লিবার্টি অ্যাডভান্সেস পার্টির কট্টর-ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতা মিলেইকে ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আল-জাজিরা জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, পেন্টাগন ফকল্যান্ড বিরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতা পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ নিয়ে ব্রিটিশ সমালোচনার কারণে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মিলেইয়ের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ব্রিটেনের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষোভ কি এই সমীকরণ বদলে দিতে পারে?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিতর্কটি আসলে কী?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি বা বিদেশি অঞ্চল। এই দ্বীপপুঞ্জের প্রধান দুটি দ্বীপ হলো পূর্ব ফকল্যান্ড এবং পশ্চিম ফকল্যান্ড।
দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এখানে জনসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ২০০ জনের মতো। তবে প্রতি গ্রীষ্মে প্রায় দশ লাখ পেঙ্গুইন এই দ্বীপগুলোতে বাসা বাঁধে।
আর্জেন্টিনা এই দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে। তাদের যুক্তি হলো, ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্পেনীয় রাজপরিবারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তারা এই দ্বীপগুলোর মালিকানা লাভ করেছে।

তবে ১৬৯০ সালে ইংরেজ নাবিক জন স্ট্রং এই ভূখণ্ডে অবতরণ করেন এবং তার পৃষ্ঠপোষক ভাইকাউন্ট ফকল্যান্ডের নামানুসারে এর নামকরণ করেন। এরপর থেকে যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স এবং স্পেন–সব দেশই বিভিন্ন সময়ে এই দ্বীপে বসতি স্থাপন করেছে।
যুক্তরাজ্য ১৮৩৩ সাল থেকে এই দ্বীপপুঞ্জ শাসন করে আসছে। সেখানে তাদের দীর্ঘকালীন উপস্থিতি এবং দ্বীপবাসীদের স্পষ্ট ব্রিটিশপন্থী অবস্থানকে তারা নিজেদের দাবির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডের বাসিন্দারা একটি গণভোটের আয়োজন করেন, যেখানে ১ হাজার ৫১৭ জনের মধ্যে ১ হাজার ৫১৩ জনই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার পক্ষে ভোট দেন।
তবে আর্জেন্টাইনরা এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশদের একটি উপনিবেশিক শক্তি হিসেবে গণ্য করে।
১৯৮২ সালের এপ্রিলে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার এই বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রচেষ্টায় তা দখল করে নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্বীপপুঞ্জটি পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সামরিক টাস্কফোর্স পাঠান, যা ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। মজার বিষয় হলো, মিলেই দীর্ঘকাল ধরে রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ থ্যাচারকে তার রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে মেনে আসছেন।
যুক্তরাজ্য শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে জয়লাভ করে, যেখানে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়েছিলেন।
মিলেই সম্প্রতি কী বলেছেন?
বামপন্থী হিসেবে পরিচিত মিলেইয়ের পূর্বসূরিরা নিয়মিতভাবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার দাবির কথা পুনর্ব্যক্ত করতেন। অন্যদিকে মিলেই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জোরালো আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে শুরুতে বিরোধীরা তাকে এই বলে সমালোচনা করেছিলেন যে, তিনি এই ইস্যুতে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন না।
২০২৪ সালে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে মিলেই সেইসব রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করেন যারা কোনো ফলাফল অর্জন ছাড়াই সার্বভৌমত্ব নিয়ে গর্ব করেন।
তবে গত সপ্তাহে একটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন যে, ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনা আগের চেয়েও অনেক বেশি অগ্রগতি অর্জন করছে।

তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন দেশের অভ্যন্তরে মিলেইয়ের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমেরিকা সোসাইটি/কাউন্সিল অফ দ্য আমেরিকাস-এর জনসমর্থন জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৬১ শতাংশ আর্জেন্টাইন নাগরিক মিলেইয়ের কর্মকাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এটিই তার সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তার হার।
ধারণা করা হচ্ছে, নিজের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতেই হয়তো মিলেই আবার ফকল্যান্ড ইস্যু নিয়ে নতুন করে কথা বলছেন।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মিলেইয়ের সাম্প্রতিক এই মন্তব্যগুলো আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রকাশ্যে তার সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। তেহরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াশিংটনকে সহায়তা না করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য ট্রাম্প তাকে অভিযুক্ত করেছেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর এবং স্টারমার যখন শুরুতে ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান—তখন ট্রাম্প ব্রিটিশ নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তিনি ‘উইনস্টন চার্চিল’ নন।
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস এবং রানি কামিলা ২৭ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান টার্নার এই সফরকে দুই মিত্র দেশের মধ্যে একটি অনন্য বন্ধুত্বকে নতুন করে ঝালাই করা এবং প্রাণবন্ত করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কোনো পক্ষ নেওয়া এড়িয়ে চলে এসেছে। যদিও তারা স্বীকার করে যে অঞ্চলটি ব্রিটিশ শাসনাধীন।
তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পেন্টাগন একটি স্মারক তৈরি করেছে যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যথেষ্ট সহায়ক না হওয়া মিত্র দেশগুলোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে কিছু বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—যুদ্ধের কড়া সমালোচক স্পেনকে ন্যাটো থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দশক আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ব্রিটেনকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শুরুতে তারা আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে, তারা ব্রিটেনের সামরিক অভিযানের জন্য স্যাটেলাইট ইমেজসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের তাদের সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি লাখ লাখ গ্যালন এভিয়েশন ফুয়েল (বিমানের জ্বালানি), ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল।
প্রায় ৪৪ বছর আগে, ১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল ঐতিহাসিক ফকল্যান্ড যুদ্ধ চলাকালীন, যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে এই ধরনের সমর্থনের বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত সপ্তাহের শুরুতে দ্বীপপুঞ্জের মর্যাদা নিয়ে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে এমন ইঙ্গিতকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
মিলেই কি ফকল্যান্ড পুনরুদ্ধারে ট্রাম্পকে ব্যবহার করতে পারেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প ও মিলেইয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ফকল্যান্ড বিরোধের যেকোনো সমাধান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যকে রাজি করানোর ওপরই নির্ভর করে।
ওয়াশিংটন ডিসির স্টিমসন সেন্টারের লাতিন আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক বেঞ্জামিন গেডান আল জাজিরাকে বলেন, “এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের যেকোনো নিষ্পত্তির জন্য অবশ্যই আলোচনার প্রয়োজন হবে, আর তার অর্থ হলো ব্রিটিশদের রাজি করানো, আমেরিকানদের নয়।”
গেডান ব্যাখ্যা করেন যে, ট্রাম্প মিলেইয়ের একজন বিরাট ভক্ত এবং তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাকে সাহায্য করেছেন।
২০২৫ সালে আর্জেন্টিনার গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা নির্বাচনের আগে, ট্রাম্প প্রশাসন আর্জেন্টাইন পেসোকে স্থিতিশীল করতে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি মুদ্রা বিনিময় সুবিধা প্রদান করেছিল।
গেডান আরও যোগ করেন, “তবে বর্তমান ক্ষেত্রে, ফকল্যান্ড বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত করার জন্যই করা হয়েছে।”