সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

আইপিও হলো শেয়ারবাজারের ফুসফুস–ইংরেজিতে Initial Public Offering, যা বাংলায় বলা হয় প্রাথমিক গণআহ্বান। আইপিওর মাধ্যমে কোনো শিল্প/প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের নিকট থেকে ঝামেলামুক্ত পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে। ফেরত দেওয়া কিংবা সুদ দেওয়ার বালাই নেই। জনগণের টাকা রাষ্ট্রের উন্নয়নকাজে ব্যয় করা হয়। জিডিপি বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাপী আইপিওর তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে বহু রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নযন সংঘটিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রেলওয়ের ব্যাপক উন্নতির বড় অবদান এই পুঁজির। বলা বাহুল্য যে, এই পুঁজি সংগ্রহের প্রতিষ্ঠান হলো স্টক এক্সচেঞ্জ, যার দুটো স্তর-প্রাথমিক স্তর, যাকে আইপিও বলে, দ্বিতীয়টি হলো স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিংফ্লোর, যেখানে বিধিবিধান অনুযায়ী শেয়ার ট্রেডাররা শেয়ার লেনদেন করেন।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী আইপিওর তৎপরতা কমেছে। কেন, তা পরে বলছি। ধনতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা যুক্তরাষ্ট্র গত শতাব্দীর ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি থেকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকার ভুক্তির সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের এসইপির প্রধান এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে বলছেন, Make IPO great again। ইতিমধ্যেই আইপিওর অনুকূলে হাওয়া বইছে।
এই জুনে ইলন মাস্ক তার স্পেস এক্স কোম্পানির জন্য এ পর্যন্ত বিশ্বের সর্ববৃহৎ আইপিওর মাধ্যমে ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছেন। খুব শিগগিরই আরও কয়েকটি বড় কোম্পানি আইপিওতে আসবে। বিশ্বের সামগ্রিকভাবে আইপিও কমে আসার কারণ একটু পরে ব্যাখ্যা করছি। এখন নিজ দেশের কথায় আসি। গত এক বছরের বেশি সময়ের ভেতর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কোনো আইপিও আসেনি। স্বাধীনতার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালুর পর আশির দশকে আইপিওর মার্কেট খুব রমরমা ছিল। সে সময় বিশ্বব্যাপী প্রিভিইলাইজেশন আন্দোলন খুব জোরদার হয়েছিল। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতষ্ঠিানের আংশিক শেয়ার ছেড়েছিল। প্রত্যেকটি আইপিওতে কয়েকগুণ বেশি আবেদন পড়েছিল। কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পনি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছিল।
১৯৯২ সালে ৯২-৯৩ সালের বাজেট পেশের সময় ঘোষণা করা হলো–বিদেশিরা স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগ করতে পারবে। অবশ্য সরাসরি ‘বিদেশি’ না বলে ‘অনাবাসিক’ কথাটা ব্যবহার করা হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান স্টক মার্কেট সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। তা সত্ত্বেও একটা পদক্ষেপ বোধ হয় ভুল হয়েছিল। আইপিওতে আনা অনাবাসিকদের বিনিয়োগ একটা সিলিং দেওয়া উচিত ছিল। এর অভাবে বাংলাদেশের টাকা হংকংয়ে গিয়ে ডলারে রূপান্তরিত হয়ে যদুমধু যেকোনো কোম্পানিতে ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগ হতে লাগল। সাইফুর রহমান ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর লকইন দিলেন। অর্থাৎ, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই শেয়ার বিক্রি করা যাবে না। সরকার বদল হলো।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল। আওয়ামী লীগের গায়ে তখন সমাজতন্ত্রের লেবাস পরা ছিল। আওয়ামী ঘরানার অর্থনীতিবিদরা সে সময় বাধ্য করলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে লকইন উঠিয়ে নিতে। ব্যস আর যায় কোথায়! শেয়ারবাজারে নেমে এল ভয়াবহ ধস। এই ধসের মূল নায়ক স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু সদস্য, অসৎ বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা। এর পর স্টক এক্সচেঞ্জ দ্বিতীয় স্ক্যামের শিকার হলো ২০০৯-১০ সালে। এবারে খলনায়ক হিসেবে যুক্ত হলো কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ইব্রাহিম খালেদ সাহেবের রিপোর্টটি পড়লে যথাযথ অবস্থা জানা যাবে। তিনি লিখেছেন–দুপুরে ব্যাংকে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যেত না। সবাই নিজস্ব ট্রেডিং হলে বসে শেয়ার ট্রেডিং দেখছেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রত্যেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটা লোলুপ দৃষ্টি ছিল শেয়ারবাজারের দিকে। এর অন্যতম কারণ হলো–আইপিওর বিনা ব্যয়ে আন্ডাররাইটিং ফি সংগ্রহ করা এবং বিনিয়োগকারীদের বিও অ্যাকাউন্ট খোলা। বস্তুত ব্যাংকের অতি উৎসাহের ফলে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যপদের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে অবশ্য বীমা কোম্পানিগুলোও পিছিয়ে ছিল না। একটা ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ অবশ্যই একটি ব্যাংক, একটি বীমা কোম্পানি ও একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হতে হবে এবং প্রতিপক্ষের হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন অতিথি কর্তা রাখা হবে।
যা হোক, শেয়ারবাজারের এই দুই বিপর্যয়ের ফলে সাধারণ বিনিযোগকারীদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তাদের সরল মনে আগমন তাদেরই ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলল। ২০১৩ সালে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিমিউচিয়ালাইজেশন করা হয়। সোজা কথায় সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এবার অন্য রকমের সমস্যা দেখা দিল। নতুন পণ্ডিতরা নতুন নতুন নিয়মকানুন চালু করতে লাগলেন, যা শেয়ারবাজারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। যেমন–আইপিওতে আবেদন করতে আবেদনের টাকা ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা থাকতে হবে। কোনো সুস্থ মস্তিস্কে এ রকম চিন্তা আসতে পারে না। এখন অবশ্য এই কালাকানুনটি নেই।
১৯৮৬-৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতি মাসে অন্তত একটি করে কোম্পানি আইপিওতে আসত। কোনো রোড শো লাগেনি, স্টক এক্সচেঞ্জ শোতে কাজ হয়েছে। নতুন সাহেবরা এসে আন্তর্জাতিক রোড শো করলেন। যদিও একটি কোম্পানিও আসেনি। মাঝেমধ্যে সেমিনার হয়। সেখানে কেউ কেউ বলেন যে, আইপিওতে যেতে অনেক সমস্যা। আসলে আইসি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সার্কুলার জারি করে সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে। একজন মুখ্য কর্মকর্তা তো সার্কুলার মাস্টার জেনারেল বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন যে, তার সার্কুলার সামলাতেই আমরা বেসামাল।
প্রতি বছর বাজেট পেশের আগে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও বেশ কিছু দাবি উপস্থাপন করে। তবে এবারের বাজেটে কোনো টোটকা চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি সরকার। পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে বলে সরকার জানিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ভেতর একটি অতীব মূল্যবান কথা হলো–ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ইকুইটিতে রূপান্তর করতে হবে। প্রায় শুরু থেকেই বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী, তথা উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে আগ্রহী। ব্যাংকগুলো ও মূলধন ঋণ দিতে অতি উৎসাহ দেখিয়ে আসছে। ফলে ঋণখেলাপির এই করুণ অবস্থা। ব্যাংকগুলোয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মূলধন থেকে ঋণ প্রদান ব্যাংকগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারলে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা সহজ হবে। অবশ্য যুগপৎ উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এমনও দেখা গেছে যে, কোনো কোনো শিল্পগোষ্ঠী অধিক মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানকে রেখে কম মুনাফা অর্জনকারীকে আইপিওতে নিয়ে আসেন। অতএব বিষয়টির দুদিক পর্যালোচনা করার ব্যাপার।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে; বাংলাদেশে প্রথম অনাবিসক ও বিদেশিদের পোর্টফলিও বিনিয়োগে অনুমতি দেওয়া হয়। তখন যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছিল, সেসব অত্যন্ত উদার ও আন্তর্জাতিক নিয়মাবলীর অনুকরণে। অতএব ভালো কোম্পানির শেয়ার ছাড়লে বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই আসবে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিধিবিধিন তৈরি করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করাই ভালো। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের কথা। এ ব্যাপারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য এবং একাধিকবারের চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান বলেছেন, এতে সিন্ডিকেট তৈরি হবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না চালানোই ভালো।
শুরুতেই বলেছি বিশ্বব্যাপী আইপিও সংকটের কথা। এবার এর ব্যাখ্যার প্রয়োজন। আইপিওর মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ করে রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি করা হয়। এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ফিন্যান্সিয়ালিজম বা অর্থবাদের ওপর। বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ এখন স্টক এক্সচেঞ্জকে সক্রিয় করে তুলেছে। আর সেই হারে আইপিওর সংখ্যা কমে আসছে। নিকোলাস শ্যাকসন-এর বই ‘The Finance Curse: How global finance is making us all poorer’ থেকে কয়েক লাইন উল্লেখ করছি–Finance turns away from its traditional role serving society and creating wealth and towards after more profitable activities to extract wealth from other parts of the economy. It also becomes politically powerful, shaping laws and rules and even society to suit society.
বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) ব্যাপারটি নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কেননা সেখানে কিছু পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে এই দুই প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

আইপিও হলো শেয়ারবাজারের ফুসফুস–ইংরেজিতে Initial Public Offering, যা বাংলায় বলা হয় প্রাথমিক গণআহ্বান। আইপিওর মাধ্যমে কোনো শিল্প/প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের নিকট থেকে ঝামেলামুক্ত পুঁজি সংগ্রহ করে থাকে। ফেরত দেওয়া কিংবা সুদ দেওয়ার বালাই নেই। জনগণের টাকা রাষ্ট্রের উন্নয়নকাজে ব্যয় করা হয়। জিডিপি বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাপী আইপিওর তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে বহু রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নযন সংঘটিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রেলওয়ের ব্যাপক উন্নতির বড় অবদান এই পুঁজির। বলা বাহুল্য যে, এই পুঁজি সংগ্রহের প্রতিষ্ঠান হলো স্টক এক্সচেঞ্জ, যার দুটো স্তর-প্রাথমিক স্তর, যাকে আইপিও বলে, দ্বিতীয়টি হলো স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিংফ্লোর, যেখানে বিধিবিধান অনুযায়ী শেয়ার ট্রেডাররা শেয়ার লেনদেন করেন।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী আইপিওর তৎপরতা কমেছে। কেন, তা পরে বলছি। ধনতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা যুক্তরাষ্ট্র গত শতাব্দীর ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি থেকে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকার ভুক্তির সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের এসইপির প্রধান এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে বলছেন, Make IPO great again। ইতিমধ্যেই আইপিওর অনুকূলে হাওয়া বইছে।
এই জুনে ইলন মাস্ক তার স্পেস এক্স কোম্পানির জন্য এ পর্যন্ত বিশ্বের সর্ববৃহৎ আইপিওর মাধ্যমে ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছেন। খুব শিগগিরই আরও কয়েকটি বড় কোম্পানি আইপিওতে আসবে। বিশ্বের সামগ্রিকভাবে আইপিও কমে আসার কারণ একটু পরে ব্যাখ্যা করছি। এখন নিজ দেশের কথায় আসি। গত এক বছরের বেশি সময়ের ভেতর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কোনো আইপিও আসেনি। স্বাধীনতার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালুর পর আশির দশকে আইপিওর মার্কেট খুব রমরমা ছিল। সে সময় বিশ্বব্যাপী প্রিভিইলাইজেশন আন্দোলন খুব জোরদার হয়েছিল। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতষ্ঠিানের আংশিক শেয়ার ছেড়েছিল। প্রত্যেকটি আইপিওতে কয়েকগুণ বেশি আবেদন পড়েছিল। কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পনি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছিল।
১৯৯২ সালে ৯২-৯৩ সালের বাজেট পেশের সময় ঘোষণা করা হলো–বিদেশিরা স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগ করতে পারবে। অবশ্য সরাসরি ‘বিদেশি’ না বলে ‘অনাবাসিক’ কথাটা ব্যবহার করা হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান স্টক মার্কেট সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। তা সত্ত্বেও একটা পদক্ষেপ বোধ হয় ভুল হয়েছিল। আইপিওতে আনা অনাবাসিকদের বিনিয়োগ একটা সিলিং দেওয়া উচিত ছিল। এর অভাবে বাংলাদেশের টাকা হংকংয়ে গিয়ে ডলারে রূপান্তরিত হয়ে যদুমধু যেকোনো কোম্পানিতে ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগ হতে লাগল। সাইফুর রহমান ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর লকইন দিলেন। অর্থাৎ, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই শেয়ার বিক্রি করা যাবে না। সরকার বদল হলো।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল। আওয়ামী লীগের গায়ে তখন সমাজতন্ত্রের লেবাস পরা ছিল। আওয়ামী ঘরানার অর্থনীতিবিদরা সে সময় বাধ্য করলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে লকইন উঠিয়ে নিতে। ব্যস আর যায় কোথায়! শেয়ারবাজারে নেমে এল ভয়াবহ ধস। এই ধসের মূল নায়ক স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু সদস্য, অসৎ বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা। এর পর স্টক এক্সচেঞ্জ দ্বিতীয় স্ক্যামের শিকার হলো ২০০৯-১০ সালে। এবারে খলনায়ক হিসেবে যুক্ত হলো কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ইব্রাহিম খালেদ সাহেবের রিপোর্টটি পড়লে যথাযথ অবস্থা জানা যাবে। তিনি লিখেছেন–দুপুরে ব্যাংকে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যেত না। সবাই নিজস্ব ট্রেডিং হলে বসে শেয়ার ট্রেডিং দেখছেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রত্যেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটা লোলুপ দৃষ্টি ছিল শেয়ারবাজারের দিকে। এর অন্যতম কারণ হলো–আইপিওর বিনা ব্যয়ে আন্ডাররাইটিং ফি সংগ্রহ করা এবং বিনিয়োগকারীদের বিও অ্যাকাউন্ট খোলা। বস্তুত ব্যাংকের অতি উৎসাহের ফলে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যপদের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে অবশ্য বীমা কোম্পানিগুলোও পিছিয়ে ছিল না। একটা ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ অবশ্যই একটি ব্যাংক, একটি বীমা কোম্পানি ও একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হতে হবে এবং প্রতিপক্ষের হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন অতিথি কর্তা রাখা হবে।
যা হোক, শেয়ারবাজারের এই দুই বিপর্যয়ের ফলে সাধারণ বিনিযোগকারীদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তাদের সরল মনে আগমন তাদেরই ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলল। ২০১৩ সালে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিমিউচিয়ালাইজেশন করা হয়। সোজা কথায় সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এবার অন্য রকমের সমস্যা দেখা দিল। নতুন পণ্ডিতরা নতুন নতুন নিয়মকানুন চালু করতে লাগলেন, যা শেয়ারবাজারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। যেমন–আইপিওতে আবেদন করতে আবেদনের টাকা ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা থাকতে হবে। কোনো সুস্থ মস্তিস্কে এ রকম চিন্তা আসতে পারে না। এখন অবশ্য এই কালাকানুনটি নেই।
১৯৮৬-৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতি মাসে অন্তত একটি করে কোম্পানি আইপিওতে আসত। কোনো রোড শো লাগেনি, স্টক এক্সচেঞ্জ শোতে কাজ হয়েছে। নতুন সাহেবরা এসে আন্তর্জাতিক রোড শো করলেন। যদিও একটি কোম্পানিও আসেনি। মাঝেমধ্যে সেমিনার হয়। সেখানে কেউ কেউ বলেন যে, আইপিওতে যেতে অনেক সমস্যা। আসলে আইসি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সার্কুলার জারি করে সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে। একজন মুখ্য কর্মকর্তা তো সার্কুলার মাস্টার জেনারেল বলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন যে, তার সার্কুলার সামলাতেই আমরা বেসামাল।
প্রতি বছর বাজেট পেশের আগে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও বেশ কিছু দাবি উপস্থাপন করে। তবে এবারের বাজেটে কোনো টোটকা চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি সরকার। পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে বলে সরকার জানিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ভেতর একটি অতীব মূল্যবান কথা হলো–ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ইকুইটিতে রূপান্তর করতে হবে। প্রায় শুরু থেকেই বেশির ভাগ বিনিয়োগকারী, তথা উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে আগ্রহী। ব্যাংকগুলো ও মূলধন ঋণ দিতে অতি উৎসাহ দেখিয়ে আসছে। ফলে ঋণখেলাপির এই করুণ অবস্থা। ব্যাংকগুলোয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মূলধন থেকে ঋণ প্রদান ব্যাংকগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারলে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা সহজ হবে। অবশ্য যুগপৎ উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এমনও দেখা গেছে যে, কোনো কোনো শিল্পগোষ্ঠী অধিক মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানকে রেখে কম মুনাফা অর্জনকারীকে আইপিওতে নিয়ে আসেন। অতএব বিষয়টির দুদিক পর্যালোচনা করার ব্যাপার।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে; বাংলাদেশে প্রথম অনাবিসক ও বিদেশিদের পোর্টফলিও বিনিয়োগে অনুমতি দেওয়া হয়। তখন যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছিল, সেসব অত্যন্ত উদার ও আন্তর্জাতিক নিয়মাবলীর অনুকরণে। অতএব ভালো কোম্পানির শেয়ার ছাড়লে বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই আসবে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিধিবিধিন তৈরি করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করাই ভালো। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের কথা। এ ব্যাপারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য এবং একাধিকবারের চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান বলেছেন, এতে সিন্ডিকেট তৈরি হবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না চালানোই ভালো।
শুরুতেই বলেছি বিশ্বব্যাপী আইপিও সংকটের কথা। এবার এর ব্যাখ্যার প্রয়োজন। আইপিওর মাধ্যমে পুঁজি সংগ্রহ করে রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি করা হয়। এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ফিন্যান্সিয়ালিজম বা অর্থবাদের ওপর। বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ এখন স্টক এক্সচেঞ্জকে সক্রিয় করে তুলেছে। আর সেই হারে আইপিওর সংখ্যা কমে আসছে। নিকোলাস শ্যাকসন-এর বই ‘The Finance Curse: How global finance is making us all poorer’ থেকে কয়েক লাইন উল্লেখ করছি–Finance turns away from its traditional role serving society and creating wealth and towards after more profitable activities to extract wealth from other parts of the economy. It also becomes politically powerful, shaping laws and rules and even society to suit society.
বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) ব্যাপারটি নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কেননা সেখানে কিছু পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে এই দুই প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলাম লেখক