Advertisement Banner

বাজেটে কম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বেশি: সিপিডি

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাজেটে কম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বেশি: সিপিডি
গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাজেট সংলাপ ২০২৬’-এ সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এই গবেষণা সংস্থার ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিভিউ অব বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট’ (আইআরবিডি) বিশ্লেষণটি উপস্থাপন করেন। ছবি: সংগৃহীত

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তি আয়কর কাঠামোয় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, নতুন কর কাঠামোয় তুলনামূলক কম ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি বাড়ানো হয়েছে, অথচ উচ্চ আয়ের করদাতাদের ক্ষেত্রে কর দায় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম রাখা হয়েছে।

আজ রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বার্তা সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সম্পর্কে সিপিডি বলেছে, ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ (যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি) একটি উচ্চাভিলাষী আর্থিক অবস্থান প্রদর্শন করে। তবে গত বছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপির মাত্র ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছিল, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের নিম্ন সক্ষমতারই ইঙ্গিত দেয়।

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা ৮টি মেগা প্রকল্পের একটিও সময়মতো শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ব্যক্তিগত আয়কর কাঠামোর ক্ষেত্রে সিপিডি বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরেছে। তারা দেখিয়েছে যে, বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের তুলনায় নিম্ন আয়ের মানুষদের ওপর আনুপাতিকভাবে করের বোঝা বেশি বেড়েছে।

সিপিডি বলেছে, সরকারের সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ থেকে একটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দাবি প্রকাশ করে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী গত অর্থবছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে সিপিডি ভাষ্য, সরকার রাজস্ব সংগ্রহে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার পরিমাণ ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিপিডির নিজস্ব প্রাক্কলন বলছে, গত অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আদায় হতে পারে মাত্র ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এর অর্থ হলো এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হতে হবে প্রায় ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

গবেষণা সংস্থাটি মানবসম্পদ খাতে সরকারি ব্যয়কে নতুন করে অগ্রাধিকার দেওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১২৪ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেছে, উভয় খাতেই দীর্ঘস্থায়ী বাজেট ব্যবহারের দুর্বলতা রয়েছে। যেমন: স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যবহারের হার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ৮০ শতাংশ থেকে নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।

সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে (এসএসএনপি) বরাদ্দ ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে সিপিডি লক্ষ করেছে যে, পেনশন ব্যবস্থাপনা ও কৃষি ভর্তুকি মিলেই মোট সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটের ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ চলে যায়, যা মূলত সরাসরি দরিদ্রদের লক্ষ্য করে নেওয়া কর্মসূচি নয়।

১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সরকারি অঙ্গীকার রয়েছে, সে বিষয়ে সিপিডি দেখেছে, কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট প্রধান চারটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ মোট ব্যয়ের অংশ হিসেবে হয় কমেছে, নয়তো স্থবির হয়ে আছে। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি কমানো হয়েছে, যেখানে বরাদ্দ ৯০৯ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৩২৯ কোটি টাকা করা হয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণ ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালেও উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটে মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপের অনুপস্থিতিও চিহ্নিত করেছে সিপিডি।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘টেকসই কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণের প্রথম বড় সুযোগ এই বাজেট।’ তবে এর সফলতা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সম্পর্কিত