Advertisement Banner

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি: তারা নীরব কেন?

জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি: তারা নীরব কেন?
বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশটি যে শর্তারোপ করেছে তা অপমানজনক। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অসম বাণিজ্য চুক্তির কারণেই সম্ভবত রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্থায়ী ছাড়পত্র নিতে হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৩ দিন আগে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গোপন বাণিজ্য চুক্তি করে। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে পারষ্পরিক বাণিজ্যে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান গ্যাপ পূরণ করা। এটি পূরণ করার জন্য আমেরিকা থেকে বাংলাদেশকে অধিক পণ্য আমদানি করতে হবে।

গ্যাপ পূরণ করার জন্য তাদের কাছ থেকে বেশি পণ্য ক্রয়ের চাপ আমেরিকা দিতেই পারে, কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশটি যে শর্তারোপ করেছে তা অপমানজনক। চুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রতিপন্ন হয়, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বের ওপর আমেরিকার বিধিসম্মত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই এই চুক্তি। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির কারণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ১৪টি যাত্রীবাহী বোয়িং বিমান ক্রয়ের কার্যাদেশ দিয়েছে। প্রতি বছর কোন পণ্য কী পরিমাণ টেন্ডার ছাড়া কিনতে হবে তাও চুক্তিতে নির্ধারণ করা আছে।

সাত সমুদ্র তের নদী অতিক্রম করে চড়া দামের আমেরিকান পণ্য আনতে পরিবহণ খরচও বেশি দিতে হবে। এতেও আপত্তি নেই। তবে আপত্তি হচ্ছে, সরকার বিভিন্ন অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে আর ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে পারবে না। ভর্তুকি দিতে হলে আমেরিকাকে আগে জানাতে হবে। আপত্তি হচ্ছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের দেশীয় কোম্পানিকে যে সকল সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকি তা কেন আমেরিকান কোম্পানিকেও দিতে হবে। অন্যান্য দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকেও কেন মেনে চলতে হবে? কেন আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের মান পরীক্ষা করতে পারব না? পরীক্ষা করতে না পারলে শুকরের মাংস আর গরুর মাংসের পার্থক্য বুঝব কী করে? বাংলাদেশ আমেরিকা ব্যতীত নতুন করে আর কোন দেশ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি কিনতে পারবে না। বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তিও করতে পারবে না।

অর্থাৎ চুক্তির প্রায় প্রতিটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। অথচ এমন একটি চুক্তি ভারতের সঙ্গে হলে লং মার্চ হতো, বায়তুল মোকাররমের উত্তর পাশ কেঁপে ওঠত, ভারতীয় শাড়ি আর কাশ্মিরের শাল পোড়ানো হতো। এ কথার অর্থ এই নয় যে ভারতের সঙ্গে অন্যায্য চুক্তি হলে প্রতিবাদ করা যাবে না। সবক্ষেত্রেই আমরা ন্যায্য এবং বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষাকারী চুক্তি চাই। জাতীয় স্বার্থহরণকারী চুক্তি নয়।

১৯৭২ সালে সম্পাদিত ‘মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি’ নিয়ে ‘গোয়েবলসীয় প্রচারণা’য় দেশের জনগণও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, মৈত্রী চুক্তি হচ্ছে ‘গোলামীর চুক্তি’। আমিও তাই মনে করতাম।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে অনেকগুলো চুক্তি হয়েছে। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ডানেরা ভারতের সঙ্গে করা সব চুক্তিকে ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার না এলে জানাই যেত না যে, ভারতের সঙ্গে করা কোন চুক্তিই দেশ বিরোধী নয়।

১৯৭২ সালে সম্পাদিত ‘মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি’ নিয়ে ‘গোয়েবলসীয় প্রচারণা’য় দেশের জনগণও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, মৈত্রী চুক্তি হচ্ছে ‘গোলামীর চুক্তি’। আমিও তাই মনে করতাম। আমার ভুল ভাঙে ১৯৯৩ সনে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ‘বাংলাদেশ- এরা অব শেখ মুজিবুর রহমান’ বইটি পড়ে। মওদুদ আহমেদ বইটিতে ‘মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি’র চুলচেরা বিশ্লেষণপূর্বক দেশের স্বার্থ বিরোধী কিছু নেই মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সাংবাদিকেরা বারবার জিজ্ঞেস করে জানতে চেয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে ভারতের সঙ্গে করা কোনো চুক্তি দেশের স্বার্থ বিরোধী কি-না। প্রথম প্রথম উত্তর ছিল, চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। পরবর্তীকালে জবাব আসে, দুই দেশের পারষ্পরিক স্বার্থেই সব চুক্তি করা হয়েছে, কোনো চুক্তি দেশ বিরোধী নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারত কিছু চুক্তি একতরফা সিদ্ধান্তে বাতিল করেছে।

কারণ এই সকল চুক্তির অধীনে শুধু বাংলাদেশ উপকৃত হচ্ছিল। ভারতের চুক্তি বাতিলের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকেরা আবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করেন, ‘ভারত তাদের দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করতে পারলে আমরা কেন বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোন চুক্তি বাতিল করছি না?’ বাতিল করবে কী করে, অন্তর্বর্তী সরকার কমিটির মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি খুঁজে পায়নি।

“চোরার পুত চোরারা, দেশটারে লুইট্যা পুইট্যা খাইয়া আর কিছু রাখছোস যে বেইচ্যা দুইটা পয়সা পামু?”

‘ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ মোতাবেক কাশ্মীরের তৎকালীন হিন্দু মহারাজা হরি সিং চাইছিলেন স্বাধীন থাকতে। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীরকে স্বাধীন থাকতে দিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পরপরই পশতুন উপজাতির ছদ্মাবরণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করে বসে। পাকিস্তানকে ঠেকাতে মহারাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করলে ভারত বৈধতার প্রশ্নে স্বাধীন কাশ্মীরে সৈন্য পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। অগত্যা হরি সিং ভারতে যোগ দেন, কিন্তু ততদিনে পাকিস্তান কাশ্মীরের প্রায় অর্ধেক দখল করে নেয়।

ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত প্রস্তাবে গণভোট, পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনার উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান কাশ্মীর থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকার করায় গণভোট আর হয়নি। ১৯৬২ সালে চীন কাশ্মীরের ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে তাদের দেশের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। তাই কাশ্মীর দখলের দায় শুধু ভারতের নয়, এই দায় পাকিস্তান এবং চীনেরও।

অস্বীকার করা যাবে না, ভারত পদ্মা নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি আটকে দিয়েছে। এই বাঁধের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু সেখানে দুই দেশের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৯৫১ সাল থেকে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ তৈরির সমীক্ষা শুরু করে ভারত। ১৯৬১ সালে বাঁধ নির্মাণ শুরু এবং ১৯৭০ সালে শেষ। দুঃখজনক হচ্ছে, পাকিস্তান আমলে এই বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ হয়নি, বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়নি। মাওলানা ভাসানী ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে লং মার্চ করেছেন বাংলাদেশ আমলে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি পর থেকেই মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে দেশ বিক্রির অভিযোগ শোনা গেছে। শেরে বাংলা ফজলুল হক যিনি লাহোরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ করলেন তিনিই মুসলিম লীগের কাছে হয়ে গেলেন ‘ভারতের দালাল’।

এই গালির জবাব দিতে গিয়ে বরিশালের ভাষায় শেরে বাংলা বলেছিলেন, ‘চোরার পুত চোরারা, দেশটারে লুইট্যা পুইট্যা খাইয়া আর কিছু রাখছোস যে বেইচ্যা দুইটা পয়সা পামু?’ ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার নির্বাচনে মুসলিম লীগ জয়ী হলো, নেতৃত্ব দিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সেই সোহরাওয়ার্দী হয়ে গেলেন ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর’। শুধু শেরে বাংলা আর সোহরাওয়ার্দী নন, যারাই মুসলিম লীগ বিরোধী ছিলেন তাদের সকলেই ভারতের দালাল।

ভারতের সঙ্গে সই করা বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে যেসব রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী সমালোচনামুখর, তাদের সবাই না হলেও বেশির ভাগ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি নিয়ে নীরবতা পালন করছেন। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী জামায়াত-এনসিপি সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চুক্তি নিয়ে একটি কথাও বলেনি। এর পেছনে রহস্যটা কি?

লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্পর্কিত