মেরিনা মিতু

ঈদের ছুটি শেষে কর্মদিবসের প্রথম দিনই খবর আসে–পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন। সোমবার জমা দেওয়া তার পদত্যাগপত্র একই দিন গ্রহণও করা হয়। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে তিন মাসের মাথায় একজন পূর্ণমন্ত্রীর এমন আকস্মিক বিদায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে–এই পদত্যাগ কি মন্ত্রীর ইচ্ছায়, নাকি প্রধানমন্ত্রীর?
যদিও দীপেন দেওয়ান পদত্যাগের কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন, সরকারের প্রেস উইং থেকেও একই ব্যখা দেয়া হয়েছে, তবে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এর পেছনে আঞ্চলিক রাজনীতি, সাংগঠনিক রেষারেষি এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে মতবিরোধের ভূমিকা আছে।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের সম্পর্কের টানাপোড়েনও বড় করে সামনে এসেছে। নেতারা বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে টানাপোড়ন দীর্ঘদিনের হলেও সম্প্রতি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই তার মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
খুবই দুঃখজনক যে, সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এর বিচারের ভার দেশপ্রেমী পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল চেয়েছিলেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারকে পরিষদের চেয়ারম্যান করতে। আর মন্ত্রীর চাওয়া ছিল মনীষ দেওয়ান, যিনি আবার তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এমন গুঞ্জন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা ছিল। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের খবরের পর থেকে এমন অনেক গুঞ্জনই চলছে। আদৌ কী হয়েছিল?
দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিশ্চিত শুধু নয়, বিষয়টি আরও খোলাসা করেন মনীষ দেওয়ান নিজেই। আজ মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, “রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের সুপারিশকে কেন্দ্র করেই পদত্যাগ করতে হয়েছে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে।”
মনীষ দেওয়ান একইসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লিখেছেন, “এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্যকথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তাঁর মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন শুধুমাত্র একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন আমাকে।” তিনি লেখেন, “পার্বত্য মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন, দীপেন তালুকদার দিপু, সভাপতি, জেলা বিএনপিকে। যিনি জুলাই আন্দোলনে ছয় মাস রাঙামাটি থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন–এটি রাঙামাটিবাসী সকলেই অবগত আছেন।”
মনীষ দেওয়ান আরও লেখেন, “খুবই দুঃখজনক যে, সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এর বিচারের ভার দেশপ্রেমী পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।”
নিজের পরিচয় দিয়ে ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লেখেন, “আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৭ ডিসেম্বর ’৭১-এ রাঙামাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী, ’৭১-এ শহীদ জিয়ার সহযোদ্ধা, ৩৬ জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা।”
ফেসবুক পোস্টে দেওয়া বক্তব্য নিজের বলে চরচাকে নিশ্চিত করেন মনীষ দেওয়ান। চরচাকে তিনি বলেন, “মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন জল্পনাকল্পনা করছেন। আসল ঘটনা খোলাসা করার জন্য আমি এই পোস্ট দিয়েছি। তার (দীপেন দেওয়ান) ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে।”
নিজের নাম সুপারিশের ব্যাপারে মনীষের ব্যাখ্যা
মনীষ দেওয়ান চরচাকে বলেন, “দীপেন দেওয়ান কখনোই আমার ফেভারে ছিলেন না। মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি আমাকে আরও পাত্তা দিতেন না। ইভেন বিজুর সময় আমার ফোনও ধরেন নাই। আমি তখন দেখলাম, আমি তো কোথাও নেই। তারপর আমি ঢাকায় গিয়ে মহাসচিবের কাছে দীপেন দেওয়ানের নামে কমপ্লেইন করেছি। একরকম বলা যায় যে, মহাসচিবের হস্তক্ষেপে পর দীপেন দেওয়ান আমাকে ডেকে নিয়ে বলছেন যে, আপনি কি চেয়ারম্যান হতে চান? আপনার নাম দিব?”
ফেসবুকে কে কী লিখল, সেটা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্যও নেই। তবে আমি রাজপথে ছিলাম কি না, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলের নেতা-কর্মীরা সবাই জানেন।
মনীষ বলেন, “দীপেন তো নিজেই চায়নি আমাকে চেয়ারম্যান করতে। উলটো ওনার স্ত্রীর প্রেশারে একজন, আর ওনার সাথে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা আরেকজন–এই দুজনের মধ্যে একজনকে চেয়ারম্যান করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। আমার নাম তো নিলেন মহাসচিবের হস্তক্ষেপে।”
মীর হেলালের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে মনীষ দেওয়ান বলেন, “এদিকে মীর হেলাল ইতিমধ্যে ধূর্ততার সাথে তার পছন্দের লোকের সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে করে ফেলেছেন এবং একদিক থেকে তিনিই এগিয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে তখন দীপেন দেওয়ানকে বলেছেন, চেয়ারম্যান হিসেবে দীপন তালুকদার দীপুর নাম সুপারিশ করতে। এর মধ্যে ৩১ তারিখ রাতে দীপেন দেওয়ানকে জানানো হয় যে, প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন পদত্যাগ করতে। তিনি তার কোনো কথাই শোনেননি। আমি সেটা পরের দিন জানলাম। দীপেন আমাকে বলল, অবস্থা তো খুব খারাপ। পরে সেদিন সন্ধ্যায় গিয়ে আমি এসব বিস্তারিত সব জানলাম।”
মনীষ দেওয়ানের ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চরচাকে বলেন, “আমি দেখিনি। ফেসবুকে কে কী লিখল, সেটা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্যও নেই। তবে আমি রাজপথে ছিলাম কি না, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলের নেতা-কর্মীরা সবাই জানেন।”
পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন কি না–জানতে চাইলে দীপন তালুকদার বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যেখানে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটি গ্রহণ করতে আমি সব সময় প্রস্তুত।”
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়ে দীপন তালুকদার বলেন, “আমি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানি না। পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।”

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর হেলালকে নিয়ে আপত্তি কেন?
বিএনপির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে অস্বস্তিতে ছিলেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এই মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কয়েকজন বিএনপি নেতা ও সাধারণ মানুষের। তারাও জানান, এই মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ এই প্রথম এবং বিষয়টি নিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তাঁরা মনে করেন, এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদ পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরই প্রাপ্য।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির এক নেতা চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন। দায়িত্বের কিছু অংশ সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালনা করেছেন বা প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ ছুটি নিয়েছেন। তাই সরকারের পক্ষ থেকেও অসুস্থতার জন্য (দীপেন দেওয়ান) মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন– এমন ব্যাখাই দেওয়াটা হাস্যকর।”
আরেক নেতা বলেন, একটা সুযোগ হাতছাড়া হলো। অনেক কষ্টে এই অঞ্চল থেকে একজন মন্ত্রী পেয়েছিল পাহাড়ি সম্প্রদায়। এর আগে কখনো এই এলাকা থেকে কেউ পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন না। পাহাড়িদের জন্য অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। রাঙামাটি থেকে মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির নেতা-কর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছিল।
উনি (দীপেন দেওয়ান) দুদিক থেকেই চাপে ছিলেন। একদিকে মীর হেলালের যে বলয়, যে সিন্ডিকেট, সেটির চাপ। অন্যদিকে মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মেনে না নেওয়া পাহাড়িদের চাপ। তারা তাদের কমিউনিটির উন্নতির ক্ষেত্রে মীর হেলালকে বিশ্বাস করতে পারে না। এটা নিয়ে দীপেন দেওয়ানের ওপর অনেক প্রেশার ছিল। তিনিও তার কমিউনিটির লোকদের খুশি করতে সে রকম ভাবমূর্তি দেখাতেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পেলেও সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের সুশীল সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে রাজনীতি করা এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “উনি (দীপেন দেওয়ান) দুদিক থেকেই চাপে ছিলেন। একদিকে মীর হেলালের যে বলয়, যে সিন্ডিকেট, সেটির চাপ। অন্যদিকে মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মেনে না নেওয়া পাহাড়িদের চাপ। তারা তাদের কমিউনিটির উন্নতির ক্ষেত্রে মীর হেলালকে বিশ্বাস করতে পারে না। এটা নিয়ে দীপেন দেওয়ানের ওপর অনেক প্রেশার ছিল। তিনিও তার কমিউনিটির লোকদের খুশি করতে সে রকম ভাবমূর্তি দেখাতেন।”

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দূরত্বের প্রকাশ বিজুর দিনে
স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন বছরের শুরুতে বিজু উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন। কিন্তু তাকে সেখানে স্বাগত না জানিয়ে বরং অবহেলা করা হয়।
স্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “বিজুর দিনে প্রতিমন্ত্রীকে কোনো সংবর্ধনা বা উৎসবে যতটুকু আতিথিয়েতা দেখানো হয়, সেটাও দেখানো হয়নি। মন্ত্রী সাহেবের বাড়িতে ওনাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে এক কাপ চাও দেওয়া হয়নি। একরকম তুচ্ছ বিহেভিয়ার করেছিলেন।”
দীপন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ আরেক নেতা চরচাকে বলেন, “প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যখন মীর হেলালকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখনই দীপেন দেওয়ান নিজে এটা নিয়ে প্রথমে আপত্তি তুলেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন এটা কী হলো। এটা তো পাহাড়ী নিয়মের বাইরে হলো। আমি ওনাকে বলেছিলাম যে, দল ও সরকারের সিদ্ধান্তে আপত্তি না জানিয়ে তিনি যেন মিস্টার হেলালকে ওনার বেটার অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে একসাথে একটা দুর্দান্ত টিমওয়ার্ক করে এগিয়ে যান। তিনি আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন–সেটাই করবেন।”
প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সচিবের কার্যালয় থেকে ফাইল প্রথমে প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয় এবং সেটিই অনুসরণ করা হয়েছে।
স্বাধীন কর্তৃত্বে হস্তক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। তাদের দাবি, শুরুতে প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে সীমিত পর্যায়ের এই মতভেদ এক মাসের মধ্যেই দ্বন্দ্বে রূপ নেয় এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও প্রকট হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল–মন্ত্রণালয়ের ফাইল নিষ্পত্তি নিয়ে ক্ষমতার প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল মন্ত্রণালয়ের সচিবকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন যে, তার অনুমোদন ছাড়া কোনো ফাইল যেন সরাসরি মন্ত্রীর কাছে না যায়।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজানুর রহমান এমন কোনো নির্দেশনা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সচিবের কার্যালয় থেকে ফাইল প্রথমে প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয় এবং সেটিই অনুসরণ করা হয়েছে।”
সরকারের কার্যবিধি বা ‘রুলস অব বিজনেস’ অনুযায়ী, একটি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নির্বাহী কর্তৃত্ব মন্ত্রীর হাতে থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন বাধ্যতামূলক নয়। প্রশাসনের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত সচিব ফাইল প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে পাঠালেও মন্ত্রী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক ওই কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে মন্ত্রী তার প্রতিমন্ত্রীকে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব বণ্টন করে দেন। এরপর উভয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।”
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সেই সমন্বয় কাঠামো কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তাদের অভিযোগ, দীপেন দেওয়ান মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বতন্ত্র ভূমিকা রাখতে চাইলেও প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করতেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট দীপেন দেওয়ান বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে অস্বস্তির কথা জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করার পরামর্শ দেন। এতে দীপেন দেওয়ান সন্তুষ্ট ছিলেন না।

পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ
এরই মধ্যে গতকাল দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও তাকে পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতা-কর্মীরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় নয়, বরং চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন নেতা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো চরচাকে বলেন, “তিনি (দীপেন দেওয়ান) শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন, তা মানতে পারি না। অন্য কারণ আছে বলে মনে করি। ওনার পদত্যাগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন বলে আমার বিশ্বাস।”
দীর্ঘদিন যাবত যারা ফ্যাসিস্টকে লালন-পালন করে আসছে, তাদের ষড়যন্ত্রে আজকে দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের রাঙামাটি জেলা সভাপতি মমতাজ মিয়া চরচাকে বলেন, “দীপেন দেওয়ান অত্যন্ত ভালো মানুষ। এখানে পাহাড়ি-বাঙালি মিলেমিশে থাকুক–এটা কেউ কেউ চায় না। একজন ভালো মানুষকে জোর করে চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। আমরা চাই ওনার পদত্যাগ গ্রহণ না করে তাকে পার্বত্যবাসীর সেবা করার সুযোগ দেওয়া হোক।”
কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য সাজাইমং মারমা চরচাকে বলেন, “দীর্ঘদিন যাবত যারা ফ্যাসিস্টকে লালন-পালন করে আসছে, তাদের ষড়যন্ত্রে আজকে দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।”
জেলা বিএনপি নেতা মানস মুকুর চাকমা ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বেলাল হোসেন সাকুও জানান, তারা পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে পুনরায় বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা সেই পদত্যাগপত্রে দীপেন বলেন, “দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাধিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে আমার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি।”
মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কয়েকজন বিএনপি নেতা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “পাহাড়ে মন্ত্রী হিসেবে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, পাহাড়ে পাহাড়ে যাওয়া আসা…এ সমস্ত কিছু (কাজ) শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ঠিক প্রোপারলি করতে পারছিলেন না। সেজন্যই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। আর তিনি তো দল থেকে পদত্যাগ করেননি, এমপি হিসেবেও না, শুধু মন্ত্রিত্ব থেকে করেছেন।”
দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব ছিল না। আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো ছিল। আমার বাবা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, বিচার বিভাগে কর্মরত থাকাকালে দীপেন চাচার সহকর্মী ছিলেন।
শারীরিক অসুস্থতার বাইরে অন্য কোনো কারণ আছে কি না–জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন চরচাকে বলেন, “শারীরিক অসুস্থতার কথাই জানি। এর বাইরে অন্য কিছু জানি না।”
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা আছে জানিয়ে দীপেন দেওয়ান চরচাকে বলেন, “আমি তো দল করি, দলের স্বার্থই এখানে বড়। তবে আমি যেখানে (পার্বত্য অঞ্চল) রাজনীতি করি, সেখানকার স্বার্থও দেখতে হবে। সব মিলেয়ে আমার খারাপ লাগছে, তবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বুঝবেন। ওনার প্রতি আমার আস্থা আছে। হয়তো ওনাকে (প্রধানমন্ত্রী) ভুল বোঝানো হয়েছে।”
তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব ছিল না। আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো ছিল। আমার বাবা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, বিচার বিভাগে কর্মরত থাকাকালে দীপেন চাচার সহকর্মী ছিলেন।”
মীর হেলাল আরও বলেন, “আমাদের মধ্যে কখনো কোনো বিরোধ ছিল না। পদত্যাগের খবর শোনার পর আমি তাকে ফোন করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু যোগাযোগ করতে পারিনি। তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে শুনেছি। তবে কেন পদত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।”
বিচারক থেকে মন্ত্রী
তেষট্টি বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তিনি শুধু জয়ীই হননি, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই মন্ত্রিসভায় বিএনপির আরেক নেতা মীর হেলাল প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
আইন পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা দীপেন দেওয়ান ২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি দ্রুতই দলীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ২০১০ সালে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরে জাতীয় পর্যায়েও দায়িত্ব পান। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে দীপেন দেওয়ান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয়। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পারিবারিক সূত্রেও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের উপজাতি বিষয়ক উপদেষ্টা। সেই সূত্রে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে।

ঈদের ছুটি শেষে কর্মদিবসের প্রথম দিনই খবর আসে–পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন। সোমবার জমা দেওয়া তার পদত্যাগপত্র একই দিন গ্রহণও করা হয়। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে তিন মাসের মাথায় একজন পূর্ণমন্ত্রীর এমন আকস্মিক বিদায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে–এই পদত্যাগ কি মন্ত্রীর ইচ্ছায়, নাকি প্রধানমন্ত্রীর?
যদিও দীপেন দেওয়ান পদত্যাগের কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন, সরকারের প্রেস উইং থেকেও একই ব্যখা দেয়া হয়েছে, তবে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এর পেছনে আঞ্চলিক রাজনীতি, সাংগঠনিক রেষারেষি এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে মতবিরোধের ভূমিকা আছে।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের সম্পর্কের টানাপোড়েনও বড় করে সামনে এসেছে। নেতারা বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে টানাপোড়ন দীর্ঘদিনের হলেও সম্প্রতি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই তার মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
খুবই দুঃখজনক যে, সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এর বিচারের ভার দেশপ্রেমী পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।
প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল চেয়েছিলেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারকে পরিষদের চেয়ারম্যান করতে। আর মন্ত্রীর চাওয়া ছিল মনীষ দেওয়ান, যিনি আবার তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এমন গুঞ্জন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা ছিল। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের খবরের পর থেকে এমন অনেক গুঞ্জনই চলছে। আদৌ কী হয়েছিল?
দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিশ্চিত শুধু নয়, বিষয়টি আরও খোলাসা করেন মনীষ দেওয়ান নিজেই। আজ মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, “রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের সুপারিশকে কেন্দ্র করেই পদত্যাগ করতে হয়েছে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে।”
মনীষ দেওয়ান একইসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা। ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লিখেছেন, “এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্যকথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তাঁর মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন শুধুমাত্র একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন আমাকে।” তিনি লেখেন, “পার্বত্য মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন, দীপেন তালুকদার দিপু, সভাপতি, জেলা বিএনপিকে। যিনি জুলাই আন্দোলনে ছয় মাস রাঙামাটি থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন–এটি রাঙামাটিবাসী সকলেই অবগত আছেন।”
মনীষ দেওয়ান আরও লেখেন, “খুবই দুঃখজনক যে, সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এর বিচারের ভার দেশপ্রেমী পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।”
নিজের পরিচয় দিয়ে ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লেখেন, “আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৭ ডিসেম্বর ’৭১-এ রাঙামাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী, ’৭১-এ শহীদ জিয়ার সহযোদ্ধা, ৩৬ জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা।”
ফেসবুক পোস্টে দেওয়া বক্তব্য নিজের বলে চরচাকে নিশ্চিত করেন মনীষ দেওয়ান। চরচাকে তিনি বলেন, “মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন জল্পনাকল্পনা করছেন। আসল ঘটনা খোলাসা করার জন্য আমি এই পোস্ট দিয়েছি। তার (দীপেন দেওয়ান) ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে।”
নিজের নাম সুপারিশের ব্যাপারে মনীষের ব্যাখ্যা
মনীষ দেওয়ান চরচাকে বলেন, “দীপেন দেওয়ান কখনোই আমার ফেভারে ছিলেন না। মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি আমাকে আরও পাত্তা দিতেন না। ইভেন বিজুর সময় আমার ফোনও ধরেন নাই। আমি তখন দেখলাম, আমি তো কোথাও নেই। তারপর আমি ঢাকায় গিয়ে মহাসচিবের কাছে দীপেন দেওয়ানের নামে কমপ্লেইন করেছি। একরকম বলা যায় যে, মহাসচিবের হস্তক্ষেপে পর দীপেন দেওয়ান আমাকে ডেকে নিয়ে বলছেন যে, আপনি কি চেয়ারম্যান হতে চান? আপনার নাম দিব?”
ফেসবুকে কে কী লিখল, সেটা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্যও নেই। তবে আমি রাজপথে ছিলাম কি না, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলের নেতা-কর্মীরা সবাই জানেন।
মনীষ বলেন, “দীপেন তো নিজেই চায়নি আমাকে চেয়ারম্যান করতে। উলটো ওনার স্ত্রীর প্রেশারে একজন, আর ওনার সাথে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা আরেকজন–এই দুজনের মধ্যে একজনকে চেয়ারম্যান করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। আমার নাম তো নিলেন মহাসচিবের হস্তক্ষেপে।”
মীর হেলালের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গে মনীষ দেওয়ান বলেন, “এদিকে মীর হেলাল ইতিমধ্যে ধূর্ততার সাথে তার পছন্দের লোকের সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে করে ফেলেছেন এবং একদিক থেকে তিনিই এগিয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে তখন দীপেন দেওয়ানকে বলেছেন, চেয়ারম্যান হিসেবে দীপন তালুকদার দীপুর নাম সুপারিশ করতে। এর মধ্যে ৩১ তারিখ রাতে দীপেন দেওয়ানকে জানানো হয় যে, প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন পদত্যাগ করতে। তিনি তার কোনো কথাই শোনেননি। আমি সেটা পরের দিন জানলাম। দীপেন আমাকে বলল, অবস্থা তো খুব খারাপ। পরে সেদিন সন্ধ্যায় গিয়ে আমি এসব বিস্তারিত সব জানলাম।”
মনীষ দেওয়ানের ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চরচাকে বলেন, “আমি দেখিনি। ফেসবুকে কে কী লিখল, সেটা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্যও নেই। তবে আমি রাজপথে ছিলাম কি না, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলের নেতা-কর্মীরা সবাই জানেন।”
পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন কি না–জানতে চাইলে দীপন তালুকদার বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যেখানে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটি গ্রহণ করতে আমি সব সময় প্রস্তুত।”
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের বিষয়ে দীপন তালুকদার বলেন, “আমি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানি না। পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।”

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর হেলালকে নিয়ে আপত্তি কেন?
বিএনপির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে অস্বস্তিতে ছিলেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এই মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কয়েকজন বিএনপি নেতা ও সাধারণ মানুষের। তারাও জানান, এই মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ এই প্রথম এবং বিষয়টি নিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তাঁরা মনে করেন, এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদ পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরই প্রাপ্য।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির এক নেতা চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন। দায়িত্বের কিছু অংশ সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালনা করেছেন বা প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ ছুটি নিয়েছেন। তাই সরকারের পক্ষ থেকেও অসুস্থতার জন্য (দীপেন দেওয়ান) মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন– এমন ব্যাখাই দেওয়াটা হাস্যকর।”
আরেক নেতা বলেন, একটা সুযোগ হাতছাড়া হলো। অনেক কষ্টে এই অঞ্চল থেকে একজন মন্ত্রী পেয়েছিল পাহাড়ি সম্প্রদায়। এর আগে কখনো এই এলাকা থেকে কেউ পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন না। পাহাড়িদের জন্য অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। রাঙামাটি থেকে মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির নেতা-কর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছিল।
উনি (দীপেন দেওয়ান) দুদিক থেকেই চাপে ছিলেন। একদিকে মীর হেলালের যে বলয়, যে সিন্ডিকেট, সেটির চাপ। অন্যদিকে মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মেনে না নেওয়া পাহাড়িদের চাপ। তারা তাদের কমিউনিটির উন্নতির ক্ষেত্রে মীর হেলালকে বিশ্বাস করতে পারে না। এটা নিয়ে দীপেন দেওয়ানের ওপর অনেক প্রেশার ছিল। তিনিও তার কমিউনিটির লোকদের খুশি করতে সে রকম ভাবমূর্তি দেখাতেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পেলেও সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের সুশীল সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে রাজনীতি করা এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “উনি (দীপেন দেওয়ান) দুদিক থেকেই চাপে ছিলেন। একদিকে মীর হেলালের যে বলয়, যে সিন্ডিকেট, সেটির চাপ। অন্যদিকে মীর হেলালকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মেনে না নেওয়া পাহাড়িদের চাপ। তারা তাদের কমিউনিটির উন্নতির ক্ষেত্রে মীর হেলালকে বিশ্বাস করতে পারে না। এটা নিয়ে দীপেন দেওয়ানের ওপর অনেক প্রেশার ছিল। তিনিও তার কমিউনিটির লোকদের খুশি করতে সে রকম ভাবমূর্তি দেখাতেন।”

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দূরত্বের প্রকাশ বিজুর দিনে
স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন বছরের শুরুতে বিজু উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন। কিন্তু তাকে সেখানে স্বাগত না জানিয়ে বরং অবহেলা করা হয়।
স্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “বিজুর দিনে প্রতিমন্ত্রীকে কোনো সংবর্ধনা বা উৎসবে যতটুকু আতিথিয়েতা দেখানো হয়, সেটাও দেখানো হয়নি। মন্ত্রী সাহেবের বাড়িতে ওনাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে এক কাপ চাও দেওয়া হয়নি। একরকম তুচ্ছ বিহেভিয়ার করেছিলেন।”
দীপন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ আরেক নেতা চরচাকে বলেন, “প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যখন মীর হেলালকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখনই দীপেন দেওয়ান নিজে এটা নিয়ে প্রথমে আপত্তি তুলেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন এটা কী হলো। এটা তো পাহাড়ী নিয়মের বাইরে হলো। আমি ওনাকে বলেছিলাম যে, দল ও সরকারের সিদ্ধান্তে আপত্তি না জানিয়ে তিনি যেন মিস্টার হেলালকে ওনার বেটার অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে একসাথে একটা দুর্দান্ত টিমওয়ার্ক করে এগিয়ে যান। তিনি আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন–সেটাই করবেন।”
প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সচিবের কার্যালয় থেকে ফাইল প্রথমে প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয় এবং সেটিই অনুসরণ করা হয়েছে।
স্বাধীন কর্তৃত্বে হস্তক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিনের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। তাদের দাবি, শুরুতে প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে সীমিত পর্যায়ের এই মতভেদ এক মাসের মধ্যেই দ্বন্দ্বে রূপ নেয় এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও প্রকট হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল–মন্ত্রণালয়ের ফাইল নিষ্পত্তি নিয়ে ক্ষমতার প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল মন্ত্রণালয়ের সচিবকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন যে, তার অনুমোদন ছাড়া কোনো ফাইল যেন সরাসরি মন্ত্রীর কাছে না যায়।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজানুর রহমান এমন কোনো নির্দেশনা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সচিবের কার্যালয় থেকে ফাইল প্রথমে প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয় এবং সেটিই অনুসরণ করা হয়েছে।”
সরকারের কার্যবিধি বা ‘রুলস অব বিজনেস’ অনুযায়ী, একটি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নির্বাহী কর্তৃত্ব মন্ত্রীর হাতে থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন বাধ্যতামূলক নয়। প্রশাসনের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত সচিব ফাইল প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে পাঠালেও মন্ত্রী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক ওই কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে মন্ত্রী তার প্রতিমন্ত্রীকে নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব বণ্টন করে দেন। এরপর উভয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।”
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সেই সমন্বয় কাঠামো কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তাদের অভিযোগ, দীপেন দেওয়ান মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বতন্ত্র ভূমিকা রাখতে চাইলেও প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করতেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট দীপেন দেওয়ান বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে অস্বস্তির কথা জানান। তবে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করার পরামর্শ দেন। এতে দীপেন দেওয়ান সন্তুষ্ট ছিলেন না।

পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ
এরই মধ্যে গতকাল দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও তাকে পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতা-কর্মীরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় নয়, বরং চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন নেতা তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো চরচাকে বলেন, “তিনি (দীপেন দেওয়ান) শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন, তা মানতে পারি না। অন্য কারণ আছে বলে মনে করি। ওনার পদত্যাগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন বলে আমার বিশ্বাস।”
দীর্ঘদিন যাবত যারা ফ্যাসিস্টকে লালন-পালন করে আসছে, তাদের ষড়যন্ত্রে আজকে দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের রাঙামাটি জেলা সভাপতি মমতাজ মিয়া চরচাকে বলেন, “দীপেন দেওয়ান অত্যন্ত ভালো মানুষ। এখানে পাহাড়ি-বাঙালি মিলেমিশে থাকুক–এটা কেউ কেউ চায় না। একজন ভালো মানুষকে জোর করে চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। আমরা চাই ওনার পদত্যাগ গ্রহণ না করে তাকে পার্বত্যবাসীর সেবা করার সুযোগ দেওয়া হোক।”
কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য সাজাইমং মারমা চরচাকে বলেন, “দীর্ঘদিন যাবত যারা ফ্যাসিস্টকে লালন-পালন করে আসছে, তাদের ষড়যন্ত্রে আজকে দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।”
জেলা বিএনপি নেতা মানস মুকুর চাকমা ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বেলাল হোসেন সাকুও জানান, তারা পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে পুনরায় বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে
প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা সেই পদত্যাগপত্রে দীপেন বলেন, “দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাধিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে আমার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি।”
মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কয়েকজন বিএনপি নেতা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “পাহাড়ে মন্ত্রী হিসেবে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, পাহাড়ে পাহাড়ে যাওয়া আসা…এ সমস্ত কিছু (কাজ) শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ঠিক প্রোপারলি করতে পারছিলেন না। সেজন্যই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। আর তিনি তো দল থেকে পদত্যাগ করেননি, এমপি হিসেবেও না, শুধু মন্ত্রিত্ব থেকে করেছেন।”
দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব ছিল না। আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো ছিল। আমার বাবা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, বিচার বিভাগে কর্মরত থাকাকালে দীপেন চাচার সহকর্মী ছিলেন।
শারীরিক অসুস্থতার বাইরে অন্য কোনো কারণ আছে কি না–জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন চরচাকে বলেন, “শারীরিক অসুস্থতার কথাই জানি। এর বাইরে অন্য কিছু জানি না।”
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা আছে জানিয়ে দীপেন দেওয়ান চরচাকে বলেন, “আমি তো দল করি, দলের স্বার্থই এখানে বড়। তবে আমি যেখানে (পার্বত্য অঞ্চল) রাজনীতি করি, সেখানকার স্বার্থও দেখতে হবে। সব মিলেয়ে আমার খারাপ লাগছে, তবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বুঝবেন। ওনার প্রতি আমার আস্থা আছে। হয়তো ওনাকে (প্রধানমন্ত্রী) ভুল বোঝানো হয়েছে।”
তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব ছিল না। আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো ছিল। আমার বাবা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, বিচার বিভাগে কর্মরত থাকাকালে দীপেন চাচার সহকর্মী ছিলেন।”
মীর হেলাল আরও বলেন, “আমাদের মধ্যে কখনো কোনো বিরোধ ছিল না। পদত্যাগের খবর শোনার পর আমি তাকে ফোন করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু যোগাযোগ করতে পারিনি। তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে শুনেছি। তবে কেন পদত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।”
বিচারক থেকে মন্ত্রী
তেষট্টি বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তিনি শুধু জয়ীই হননি, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই মন্ত্রিসভায় বিএনপির আরেক নেতা মীর হেলাল প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
আইন পেশা থেকে রাজনীতিতে আসা দীপেন দেওয়ান ২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি দ্রুতই দলীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ২০১০ সালে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরে জাতীয় পর্যায়েও দায়িত্ব পান। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে দীপেন দেওয়ান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয়। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পারিবারিক সূত্রেও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের উপজাতি বিষয়ক উপদেষ্টা। সেই সূত্রে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে।