Advertisement Banner

আইআরজিসি কি ইরানের সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আইআরজিসি কি ইরানের সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে ইরানের সামরিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ফলে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী এই বাহিনী এখন আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই আইআরজিসি কোথা থেকে এসেছে? এর বর্তমান অবস্থা কী? এটি কি কোনো অভ্যুত্থানের চেষ্টা করতে পারে, বা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ধারণা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে? নাকি তারা শেষ পর্যন্ত ইরানের বর্তমান সরকার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে কাজ করবে?

আইআরজিসির উৎস

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত আরবি ভাষার সংবাদপত্র আল হুররার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নির্দেশে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সমান্তরালে একটি নতুন বাহিনী গঠন করা হয়। এই বাহিনীর প্রধান কাজ ছিল নতুন শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা এবং বিপ্লবকে বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়া।

এই বাহিনীটি পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নামে পরিচিত হয়। ফারসি ভাষায় একে বলা হয় ‘সেপাহ-এ পাসদারান-এ এঙ্গেলাব-এ এসলামি’।

আইআরজিসির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোসেন সাজেগারা মার্কিন সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “শুরুতে আইআরজিসিকে একটি জনগনের বাহিনী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বাহিনীতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার পেশাদার সদস্য এবং তার প্রায় দশগুণ আধা-পেশাদার সদস্য থাকবে, যারা যুদ্ধকালীন সময়ে দেশের প্রতিরক্ষায় নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল গার্ড বা সুইজারল্যান্ড ও ইসরায়েলের মতো দেশের নাগরিকভিত্তিক প্রতিরক্ষা বাহিনী ছিল এর অনুপ্রেরণা।”

আইআরজিসির ভূমিকায় পরিবর্তন

মোসেনের ভাষ্য, “তবে সময়ের সঙ্গে এই সংগঠনটির চরিত্র বিকৃত হতে থাকে। এটি ধীরে ধীরে তিনটি ধাপে তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে যায়। প্রথমত, ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর আইআরজিসি বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে সংস্কার আন্দোলনের সময় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ভিন্নমত দমনে আইআরজিসিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়ে আসেন। তৃতীয়ত, ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে সংগঠনটি সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।”

অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি, ইরাক যুদ্ধের পর পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইআরজিসি একটি আলাদা শাখা গঠন করে। ওই সংস্থাটি এখনো সড়ক, বাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করে। পাশাপাশি তারা ইরানে পণ্য বিশেষ করে তেল পাচার করে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও দক্ষ হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকাশ পাওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলো যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার প্রেক্ষাপটেই এই পাচার কার্যক্রম আরও বাড়ে।

ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির এর জ্যেষ্ঠ ফেলো বেহনাম বেন তালেবুর মতে, বর্তমানে আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আর প্রকৃত হিসাব সম্ভবত এর দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।

আইআরজিসির সামরিক শাখাগুলোতে বর্তমানে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে। আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজের সদস্য সংখ্যা অন্তত ২৫ লাখ বলে দাবি করা হয়।

মোসেন ভাষ্য, “আইআরজিসি পরিচালিত কুদস ফোর্সের হাজার হাজার স্থায়ী সদস্য রয়েছে। এটি কার্যত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এর কর্মকাণ্ড বহু আন্তর্জাতিক সংঘাতের জন্য দায়ী এবং ইরানের ভেতরে আইআরজিসির কিছু অংশও এ নিয়ে অসন্তুষ্ট।”

বেহনাম বেন তালেবুরের মতে, কুদস ফোর্সের মাধ্যমে ইরান লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েশেন ও গাজা উপত্যকায় প্রধানত শিয়া মুসলিম বেসামরিক বাহিনীর একটি জোট গড়ে তোলে। এর ফলে আইআরজিসি ইরানের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

আইআরজিসির যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা

মোসেন দ্য ইকোনমিস্টকে বলেছেন, “বছরের পর বছর ধরে আইআরজিসি ইরানজুড়ে বিশেষ সেল গঠন ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। নানা কারণে সরকারি কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও একটি সূত্রের মতে প্রায় ৩০ হাজারের মতো বিশেষ সেল এখনো যুদ্ধ, নাশকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে সক্ষম।”

আইআরজিসি তাদের শীর্ষ পর্যায়েও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ নেতাদের হত্যার পর প্রতিটি কমান্ডারের জন্য তিনজন পর্যন্ত সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইআরজিসির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোসেন বলেছেন, “আইআরজিসিকে একটি প্রচলিত সেনাবাহিনীর মতো সুসংগঠিত কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত বলে ভাবা ভুল হবে। যদিও আইআরজিসির পলিটিক্যাল ব্যুরোর মতো ইউনিটের প্রতিবেদন মাধ্যমে এটি সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে চূড়ান্ত কমান্ড কেন্দ্র থাকে নেতার কার্যালয়ের মধ্যেই। এই কাঠামোটি জটিল, এবং আইআরজিসি তার একটি অংশমাত্র। তাই এই সংগঠনের পক্ষে অভ্যুত্থান ঘটানোর কল্পনা করা কঠিন।”

তবে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, আইআরজিসি একটি তথাকথিত ‘মোজাইক’ কৌশল অনুসরণ করে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময় ইরাকে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দ্রুত ভেঙে পড়া এবং ২০০৯ সালে ইরানে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করার অভিজ্ঞতা থেকে এই কৌশলের উদ্ভব। এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামোর লক্ষ্য হলো—যদি কোনো সময় প্রদেশগুলো রাজধানী তেহরান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, অথবা সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তবুও আইআরজিসি যেন দেশীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের পর বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে এই কৌশল আরও পরিমার্জন করা হয়।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা অনুসরণ করলেও আঞ্চলিক কমান্ডারদের কিছু স্বাধীনতা রয়েছে। যেমন কখন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালানো হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়া। ইরানের প্রতিটি প্রদেশের জন্য মোট ৩১টি কমান্ড রয়েছে, এবং প্রায় প্রতিটি এলাকায় ছোট ছোট শাখা রয়েছে, যেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রতিবাদ দ্রুত দমন করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে।

এদিকে, লোভ ও দুর্ব্যবস্থাপনার কারণেও আইআরজিসি বিপর্যস্ত উল্লেখ করে মোসেন বলেন, “দুর্নীতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর ভেতর ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, যা আইআরজিসির বড় অংশকে প্রভাবিত করেছে। শীর্ষ পর্যায়ের জেনারেলদের দুর্নীতি ও তাদের নেটওয়ার্কের কারণে সংগঠনের নিম্নস্তরের সদস্যদের আনুগত্য কমে গেছে। জনগণের বিরুদ্ধে সরাসরি আইআরজিসিকে দাঁড় করানো তাদের ভেতরে অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে। কুদস ফোর্সের বিদেশি অভিযানগুলোর কিছু অংশও অভ্যন্তরীণভাবে জনপ্রিয় নয়।”

আইআরজিসি কী বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখবে?

মোসেনের মতে, আইআরজিসির বড় অংশের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে, এমনকি গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও একটি প্রবল ধারণা রয়েছে যে তাদের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ভেলায়াত-এ ফকিহ ব্যবস্থাকে রক্ষা করা নয়। বরং ইরানের ভূখণ্ড ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব। এই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আইআরজিসির আনুগত্যকে একটি ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কাউন্সিল’-এর দিকে ফেরানো সম্ভব হতে পারে।

মোসেন সাজেগারার পরামর্শ, এই কাউন্সিলে চারটি প্রধান রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। এরমধ্যে রয়েছে প্রজাতন্ত্রপন্থী, রাজতন্ত্রপন্থী, জাতিগত গোষ্ঠী এবং বর্তমান সরকার ও ভেলায়াত-এ ফকিহ সমর্থকরা। অন্যথায় গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে।

এই কাউন্সিল একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে পারে, যা দেশ পরিচালনা করবে। এরপর আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে একটি গণভোটের আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে নাকি ভেঙে দেওয়া হবে।

সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার কাছে এমন একটি কাউন্সিল গঠনের ক্ষমতা রয়েছে, যা সংসদের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।

প্রশ্ন হলো- তাকে কি এমন নাটকীয় পদক্ষেপ নিতে রাজি করানো সম্ভব? তা সম্ভব হতে পারে যদি, উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কাউন্সিল গঠন ও পরবর্তী পদক্ষেপগুলোকে জোরালোভাবে সামনে আনে। এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নেতা শুধু জনগণের চাপই নয় বরং শাসন কাঠামো ও আইআরজিসিসহ সামরিক বাহিনীর বড় অংশ থেকেও চাপের মুখে পড়তে পারেন।

মোসেন দ্য ইকোনমিস্টকে বলেছেন, অনেকে যুক্তি দিতে পারেন, আইআরজিসি বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে এতটাই জড়িত যে তারা এমন মৌলিক পরিবর্তন মেনে নেবে না। গত এক বছরের সংঘাতগুলোও যেন তাদের একনায়ক ও বিদ্যমান ব্যবস্থার পক্ষে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। তবে এই বন্ধনগুলো যতটা শক্তিশালী মনে হয়, ততটা নাও হতে পারে।

তার ভাষ্য, ছয় মাস আগে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা যায়, আইআরজিসির প্রায় অর্ধেক সদস্য তাদের সদস্যপদকে কেবল একটি চাকরি হিসেবে দেখে। ভালো চাকরি পেলে তারা তা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। বাকি অর্ধেক, যারা আদর্শিক বা রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত, তাদের বড় অংশই কমান্ডারদের দুর্নীতি, নেতৃত্বের ভুল নীতি এবং জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে অসন্তুষ্ট।

আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ওপর নির্ভর করে ব্যাপক ভাঙন বা দলত্যাগের আশাকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইরানের রাজতন্ত্রপন্থীরা উসকে দিতে পারে। তবে এটি সম্ভবত অতিরিক্ত আশাবাদী ধারণা। অবশ্য বর্তমান রাজনৈতিক বন্দি, সংস্কারপন্থী নেতৃবৃন্দ এবং আইআরজিসি কমান্ডারদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমঝোতা কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে। এটি যুদ্ধ-পরবর্তী একটি স্থিতিশীল ও প্রতিবেশীবান্ধব ইরানের পথে একটি বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে।

তবে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কর্মকর্তার একটি মূল গোষ্ঠী রয়েছে, যারা কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং যাদের পদমর্যাদা ও সম্পদ সরাসরি এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, এই গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

সম্পর্কিত