Advertisement Banner

বাজেটে কর প্রত্যাহার, তবু কি কম্পিউটার ক্রেতাদের স্বস্তি মিলবে?

কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডেটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু।

বাজেটে কর প্রত্যাহার, তবু কি কম্পিউটার ক্রেতাদের স্বস্তি মিলবে?
কম্পিউটার। ছবি: চরচা

বাজারে সরবরাহ সংকট এবং চড়ামূল্যে কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ র‍্যামের দামে নজর রাখছিলেন সামি আল জাবের। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কম্পিউটার পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহারের খবর তার জন্য কিছুটা স্বস্তির। দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ভুগতে থাকা সাধারণ ব্যবহারকারীদের মতো তিনিও অপেক্ষায় আছেন–অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে।

একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সামি চরচাকে বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে র‍্যামের সংকট, দাম তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশও বেড়েছে। এখন শুল্ক প্রত্যাহারের সুফল কবে পাব, তার অপেক্ষায় আছি।”

তার এই মন্তব্যেই প্রতিফলিত হয়, বর্তমান বাজার বাস্তবতায়। আর তা হলো, শুধু কর কমালেই যে সঙ্গে সঙ্গে দাম কমবে, তা নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আরও বহু অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক উপাদান।

গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, মনিটরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব এসেছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে প্রযুক্তি খাতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমার একটি স্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে পারে।

তবে আমদানিকারকদের ভাষ্য, সম্ভাব্য দাম কমা পুরোপুরি নির্ভর করছে বাস্তব বাজার পরিস্থিতির ওপর। অর্থাৎ, শুধু কর কমানোই চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করে না। বরং আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যের দাম, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণ কৌশলও বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে করছাড়ের সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন আমরা বাজেটে দেখতে পেয়েছি। আগের চেয়ে অনেকটা কম দামেই সবাই কম্পিউটার কিনতে পারবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের দামের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।”

জহিরুলের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ নীতিগত পরিবর্তন সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “এসব পণ্যের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন এবং এসএসডি আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছাড়া সব ধরনের রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করছি।”

এ ছাড়া কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডেটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। এই পদক্ষেপগুলো প্রযুক্তিপণ্যের ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাজেটে, কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস খাতের দেশীয় বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে কম্পিউটার, কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের জন্য উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন খাত আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।

দাম কত কমবে?

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থমন্ত্রী ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে কর কাঠামো সহজ করার প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত বাজেট প্রযুক্তিপণ্যকে আরও সাশ্রয়ী করার একটি নীতিগত দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি এসব করছাড় কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় থাকে, তাহলে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসতে পারে।

অ্যাপলের কম্পিউটার। ছবি: রয়টার্স
অ্যাপলের কম্পিউটার। ছবি: রয়টার্স

আমদানিকারক, বিক্রেতাসহ সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ল্যাপটপের দাম গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। অর্থাৎ, বর্তমানে যে ল্যাপটপের দাম ১ লাখ টাকা, তা ৮৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ডেস্কটপ কম্পিউটারের দাম প্রায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ফলে ৫০ হাজার টাকার একটি ডেস্কটপের দাম কমে প্রায় ৪৪ থেকে ৪৬ হাজার টাকায় নেমে আসতে পারে।

রাজধানীর মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের এফ এম টেকের সত্ত্বাধিকারী মোখতার হোসেন চরচাকে বলেন, “কর-ছাড়ে প্রভাব পড়বে ল্যাপটপের দামে। আমি আশা করি অফিশিয়াল ল্যাপটপ এবং গ্রে মার্কেটের (আমদানি) ল্যাপটপের দামের পার্থক্য কমে আসবে। ডেস্কটপের দামের প্রভাব হয়তো কম হবে। কারণ র‍্যাম আর চিপের মার্কেট তো অস্থির।”

অতীতে উচ্চ করের কারণে ল্যাপটপ ও কম্পিউটার পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল, যা সাধারণ ব্যবহারকারী, ফ্রিল্যান্সার ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নতুন বাজেটে এই চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং আমদানি খরচ কমে আসবে, যার প্রভাব সরাসরি খুচরা দামে পড়ার কথা।

র‍্যামের দাম কমতে পারে বছর শেষে

গত বছরের শেষ প্রান্তে এসে র‍্যামের বাজার দরে যে ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়, তা এখনো চলছে। এর পেছনে রয়েছে এআইভিত্তিক কম্পিউটার ও ডেটা সেন্টারগুলোতে উচ্চ প্রযুক্তির র‍্যামের বাড়তি চাহিদা। প্রযুক্তিবিদরা তখন দাবি করেছিলেন, চিপ সংকটের আশঙ্কা কিংবা বছরের শেষ সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাতের কারণে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এই দাম বাড়ার ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও রয়েছে।

ল্যাপটপ। ছবি: রয়টার্স
ল্যাপটপ। ছবি: রয়টার্স

আমদানিকারকরা বলছেন, এই সংকটের শেষ হতে সময় লাগতে পারে চলতি বছরের শেষ নাগাদ। ফলে কম্পিউটার পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা সহসাই মিলছে না। বরং কিছুটা সময় নিয়ে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে।

বিসিএস সভাপতি জহিরুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “পৃথিবীতে একটা নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে যে, এআই বেসড ডেস্কটপ ও সার্ভার ব্যবহার। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সার্ভার ম্যানুফ্যাকচার যারা করে, তাদের অর্ডারের পরিমাণ অনেক। এরা বড় বড় কোম্পানি। ফলে নরমাল কনজিউমার মার্কেটে পণ্য সরবরাহ করতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। আমার ধারণা এটা এক বছর যাবে।”

সব মিলিয়ে, শুল্ক প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত কম্পিউটার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে সময়, বাজার স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি–এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সম্পর্কিত