পূর্ণিমা চৌহান

গত দুই মাসে বাংলাদেশে উগ্র জনতার হামলায় অন্তত দুটি সুফি মাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ১১ এপ্রিল। ওই দিন দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলা কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ জনের একদল উত্তেজিত জনতা হামলা চালায় এবং এক পীরকে (আধ্যাত্মিক নেতা) পিটিয়ে হত্যা করে। এর কিছুদিন পর গত ১৪ মে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত হযরত শাহ আলী বাগদাদীর শতাব্দী প্রাচীন মাজারে ভাঙচুর চালায় আরেকটি দল। সেখানে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাজারের ভেতরে থাকা লোকজনকে মারধরও করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এই দুটি হামলার পেছনেই দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জড়িত। শুরু থেকেই জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসলেও বিভিন্ন প্রমাণ এখন সরাসরি দলটির দিকেই ইঙ্গিত করছে–যারা বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে।
মিরপুরের মাজারে গত ১৪ মে’র হামলার পর ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে জড়িত। সম্প্রতি গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী জামায়াতের স্থানীয় সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান স্বীকার করেছেন যে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন তার নির্বাচনী প্রচারে কাজ করেছিলেন। একইভাবে, কুষ্টিয়ায় পীর হত্যার ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের (জামায়াতের ছাত্রসংগঠন) সাবেক এক জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে।
সুফিবাদ ও কট্টরপন্থার দ্বন্দ্ব
সুফি সাধক, মাজার আর তাদের ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোর ওপর যখনই হামলা চালানো হয়, তখন উগ্র ডানপন্থীরা দাবি করে যে, ‘তৌহিদী জনতা’ এই কাজ করেছে। আসলে উগ্র ডানপন্থীরা সুফিবাদের উদার ও সর্বজনীন রূপটিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। তাদের কট্টর মতাদর্শের কাছে এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। মাজার জিয়ারত করা, ওলি-আউলিয়াদের অসিলায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা কিংবা কাওয়ালির মতো আধ্যাত্মিক গান গাওয়ার এই সুফি চর্চাগুলোকে তারা ‘বিদআত’ (ইসলামের নামে নতুন কুসংস্কার) এবং ‘শিরক’ (আল্লাহর সাথে অংশীদার করা) বলে মনে করে।
সুফিবাদীরা মূলত আধ্যাত্মিক উদারতায় বিশ্বাসী এবং তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে চলে। ফলে এসব মাজারে মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও আনাগোনা থাকে। আর ঠিক এই কারণেই, কট্টরপন্থীরা সুফিবাদকে তাদের নিজস্ব সংকীর্ণ মতবাদের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জামায়াতের দ্বিমুখী অবস্থান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দেশজুড়ে মাজার, সুফি প্রতিষ্ঠান এবং আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর ওপর সহিংস হামলা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এই হামলাগুলোর বেশ কয়েকটিতে জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির নেতা-কর্মী ও শীর্ষ নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অথচ ইতিহাসের পাতায় দলটির ভূমিকা ছিল ভিন্ন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছিল। পরে দলটির তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তারা সাজাপ্রাপ্ত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতারা দাবি করেছিলেন যে, দলটি তাদের আগের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করার কথা জানান এবং দেশে শরিয়া আইন চালুর চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দেন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা দাবি করেছিলেন যে, তারা এখন একটি উদার ও সর্বজনীন আদর্শ ধারণ করছে, যা বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারকেও স্বীকৃতি দেবে। এর প্রমাণ হিসেবে একজন হিন্দু প্রার্থীকে জামায়াতের টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগও দেওয়া হয়। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, জামায়াত এখনো সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সহিংস হামলা চালানো অব্যাহত রেখেছে।

আদর্শ বনাম রাজনৈতিক কৌশল
মতাদর্শগত দিক থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি কট্টরপন্থী সুন্নি ইসলামিক রাজনৈতিক দল, যা মূলত মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত। স্বাভাবিকভাবেই এই দলটি সুফিবাদ, মাজার সংস্কৃতি এবং পীরকেন্দ্রিক ধর্মীয় রীতিনীতির ঘোর বিরোধী। তাদের এই আদর্শিক বিরোধ অবশ্য নতুন কিছু নয়। তবে এই বিরোধ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখনই মূল সংকট তৈরি হয়।
বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সুফি ও মাজারগুলোর ওপর এই হামলাগুলোকে ধর্মীয় ক্ষোভের একটি আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় একই ধরনের কৌশল, একই বক্তব্য এবং সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়–এগুলো কি আসলেই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী আদর্শিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে? ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এই সহিংসতা কেন বাংলাদেশে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে? তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো–মাজারগুলোতে ভাঙচুর, লুটপাট, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো প্রশাসনের একদম চোখের সামনে কীভাবে ঘটছে?
ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর অভিযোগ জামায়াতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই 'ইসলাম রক্ষা', 'নৈতিকতা বজায় রাখা' কিংবা 'ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা'র মতো বিষয়গুলো সামনে আনা হয়। কিন্তু এই ধরনের ভাষা যখন সমাজে সহিংসতা উসকে দেয়, তখন বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা তখন জননিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বস্তুত ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে সাধারণ মানুষকে মাঠে নামানোটা এখন দলটির একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো একটি স্পর্শকাতর অভিযোগ তোলার মাধ্যমে। এরপর চলে সুসংগঠিতভাবে লোক জড়ো করা এবং উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান। গত কয়েক মাসে এটি একটি চেনা ছক বা প্যাটার্নে রূপ নিয়েছে।
মব পলিটিক্স ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
বাংলাদেশে ইদানীং ‘মব জাস্টিস’ বা দল বেঁধে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে এটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। সুফি ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ড. ইউনূসের ১৭ মাসের শাসনামলে দেশের অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬৮ জন।
বেশির ভাগ হামলার ধরনই ছিল চরম উগ্র। বুলডোজার দিয়ে মাজার গুঁড়িয়ে দেওয়া, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট করা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শেরপুরের মুর্শিদপুর দরবার শরিফ লুট করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে 'নূরা পাগলা' নামের এক সুফি দরবেশের কবর খুঁড়ে তার মরদেহ পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার বেশির ভাগ রিপোর্টে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির পাশাপাশি সরাসরি জামায়াত নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটের হযরত শাহ পরানের মাজারের শত বছরের পুরনো ওরস উৎসব বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের পরোক্ষ মদদে একদল মাদ্রাসা ছাত্র সেখানে এই তাণ্ডব চালায়।
সহিংসতা এত ব্যাপক আকার ধারণ করলেও ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১১টি মামলা হয়েছে এবং সেসব মামলার তদন্তেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। হামলার স্পষ্ট ভিডিও প্রমাণ ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

মাজার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর এই ধারাবাহিক হামলা আসলে সমাজের ভেতরে বাড়তে থাকা এক ধরনের চরম অসহিষ্ণুতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। এটি স্পষ্ট যে, এই হামলাকারীরা কোনো না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের আশ্রয় পাচ্ছে, যাদের সাথে জামায়াত বা তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। বারবার একই রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নাম আসায় ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে নেতৃত্বের এক ধরনের পরোক্ষ সায় রয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সামনেই যখন দিনের পর দিন এসব হামলা চলে এবং প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে, তখন জনগণের মনে আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, রাজনৈতিক চাপ আর বিচারহীনতার প্রশ্রয়েই অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ?
কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যদি বারবার উগ্র জনতাকে উসকে দিয়ে জোরপূর্বক নিজেদের চিন্তাভাবনা সবার ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়, তবে তা পুরো দেশের সামাজিক ভিত্তিকেই ধসিয়ে দেয়। মাজারগুলোর ওপর চলমান এই হামলাগুলো কিন্তু স্রেফ সাধারণ কোনো ধর্মবিরোধ নয়; এগুলো আসলে আঘাত করছে বাংলাদেশের বহু বছরের চেনা সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মূলে।
আর ঠিক এই কারণেই এই হামলাগুলোর পেছনে বারবার জামায়াতে ইসলামীর নাম উঠে আসছে। দলটির কট্টর মতাদর্শ, তৃণমূলের বিশাল নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে লোক জড়ো করার পুরনো কৌশল–সব মিলিয়ে সন্দেহের তীর বারবার তাদের দিকেই যাচ্ছে। হয়তো প্রতিটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি হাত থাকার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া কঠিন, কিন্তু মাঠপর্যায়ে যারা ধরা পড়ছে বা যাদের নাম গণমাধ্যমে আসছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের এই সন্দেহকে আরও জোরালো করে তুলছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সমাজে যখন একবার এই ‘মব কালচার’ বা দল বেঁধে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ডালপালা মেলে, তখন তা আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আজ যা একটি মাজারের ওপর হামলা, কাল তা হয়তো অন্য কোনো ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী, ভিন্ন ধর্ম বা সাধারণ মানুষের ওপর চরম আঘাত হিসেবে নেমে আসবে। তাই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি এখনই এই সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেয়, তবে এই ধ্বংসের খেলা কোনোদিনই থামবে না।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত লেখা থেকে অনূদিত

গত দুই মাসে বাংলাদেশে উগ্র জনতার হামলায় অন্তত দুটি সুফি মাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ১১ এপ্রিল। ওই দিন দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলা কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ জনের একদল উত্তেজিত জনতা হামলা চালায় এবং এক পীরকে (আধ্যাত্মিক নেতা) পিটিয়ে হত্যা করে। এর কিছুদিন পর গত ১৪ মে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত হযরত শাহ আলী বাগদাদীর শতাব্দী প্রাচীন মাজারে ভাঙচুর চালায় আরেকটি দল। সেখানে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাজারের ভেতরে থাকা লোকজনকে মারধরও করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এই দুটি হামলার পেছনেই দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জড়িত। শুরু থেকেই জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসলেও বিভিন্ন প্রমাণ এখন সরাসরি দলটির দিকেই ইঙ্গিত করছে–যারা বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে।
মিরপুরের মাজারে গত ১৪ মে’র হামলার পর ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে জড়িত। সম্প্রতি গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী জামায়াতের স্থানীয় সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান স্বীকার করেছেন যে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন তার নির্বাচনী প্রচারে কাজ করেছিলেন। একইভাবে, কুষ্টিয়ায় পীর হত্যার ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের (জামায়াতের ছাত্রসংগঠন) সাবেক এক জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে।
সুফিবাদ ও কট্টরপন্থার দ্বন্দ্ব
সুফি সাধক, মাজার আর তাদের ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোর ওপর যখনই হামলা চালানো হয়, তখন উগ্র ডানপন্থীরা দাবি করে যে, ‘তৌহিদী জনতা’ এই কাজ করেছে। আসলে উগ্র ডানপন্থীরা সুফিবাদের উদার ও সর্বজনীন রূপটিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। তাদের কট্টর মতাদর্শের কাছে এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। মাজার জিয়ারত করা, ওলি-আউলিয়াদের অসিলায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা কিংবা কাওয়ালির মতো আধ্যাত্মিক গান গাওয়ার এই সুফি চর্চাগুলোকে তারা ‘বিদআত’ (ইসলামের নামে নতুন কুসংস্কার) এবং ‘শিরক’ (আল্লাহর সাথে অংশীদার করা) বলে মনে করে।
সুফিবাদীরা মূলত আধ্যাত্মিক উদারতায় বিশ্বাসী এবং তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে চলে। ফলে এসব মাজারে মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও আনাগোনা থাকে। আর ঠিক এই কারণেই, কট্টরপন্থীরা সুফিবাদকে তাদের নিজস্ব সংকীর্ণ মতবাদের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জামায়াতের দ্বিমুখী অবস্থান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দেশজুড়ে মাজার, সুফি প্রতিষ্ঠান এবং আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর ওপর সহিংস হামলা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এই হামলাগুলোর বেশ কয়েকটিতে জামায়াতে ইসলামী এবং দলটির নেতা-কর্মী ও শীর্ষ নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অথচ ইতিহাসের পাতায় দলটির ভূমিকা ছিল ভিন্ন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছিল। পরে দলটির তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তারা সাজাপ্রাপ্ত হন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতারা দাবি করেছিলেন যে, দলটি তাদের আগের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করার কথা জানান এবং দেশে শরিয়া আইন চালুর চেষ্টা না করার প্রতিশ্রুতি দেন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা দাবি করেছিলেন যে, তারা এখন একটি উদার ও সর্বজনীন আদর্শ ধারণ করছে, যা বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারকেও স্বীকৃতি দেবে। এর প্রমাণ হিসেবে একজন হিন্দু প্রার্থীকে জামায়াতের টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগও দেওয়া হয়। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, জামায়াত এখনো সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সহিংস হামলা চালানো অব্যাহত রেখেছে।

আদর্শ বনাম রাজনৈতিক কৌশল
মতাদর্শগত দিক থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি কট্টরপন্থী সুন্নি ইসলামিক রাজনৈতিক দল, যা মূলত মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত। স্বাভাবিকভাবেই এই দলটি সুফিবাদ, মাজার সংস্কৃতি এবং পীরকেন্দ্রিক ধর্মীয় রীতিনীতির ঘোর বিরোধী। তাদের এই আদর্শিক বিরোধ অবশ্য নতুন কিছু নয়। তবে এই বিরোধ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখনই মূল সংকট তৈরি হয়।
বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সুফি ও মাজারগুলোর ওপর এই হামলাগুলোকে ধর্মীয় ক্ষোভের একটি আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় একই ধরনের কৌশল, একই বক্তব্য এবং সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়–এগুলো কি আসলেই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী আদর্শিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে? ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এই সহিংসতা কেন বাংলাদেশে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে? তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো–মাজারগুলোতে ভাঙচুর, লুটপাট, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো প্রশাসনের একদম চোখের সামনে কীভাবে ঘটছে?
ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর অভিযোগ জামায়াতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই 'ইসলাম রক্ষা', 'নৈতিকতা বজায় রাখা' কিংবা 'ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা'র মতো বিষয়গুলো সামনে আনা হয়। কিন্তু এই ধরনের ভাষা যখন সমাজে সহিংসতা উসকে দেয়, তখন বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা তখন জননিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বস্তুত ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে সাধারণ মানুষকে মাঠে নামানোটা এখন দলটির একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো একটি স্পর্শকাতর অভিযোগ তোলার মাধ্যমে। এরপর চলে সুসংগঠিতভাবে লোক জড়ো করা এবং উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান। গত কয়েক মাসে এটি একটি চেনা ছক বা প্যাটার্নে রূপ নিয়েছে।
মব পলিটিক্স ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
বাংলাদেশে ইদানীং ‘মব জাস্টিস’ বা দল বেঁধে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে এটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। সুফি ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ড. ইউনূসের ১৭ মাসের শাসনামলে দেশের অন্তত ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬৮ জন।
বেশির ভাগ হামলার ধরনই ছিল চরম উগ্র। বুলডোজার দিয়ে মাজার গুঁড়িয়ে দেওয়া, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট করা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শেরপুরের মুর্শিদপুর দরবার শরিফ লুট করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে 'নূরা পাগলা' নামের এক সুফি দরবেশের কবর খুঁড়ে তার মরদেহ পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার বেশির ভাগ রিপোর্টে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির পাশাপাশি সরাসরি জামায়াত নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটের হযরত শাহ পরানের মাজারের শত বছরের পুরনো ওরস উৎসব বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের পরোক্ষ মদদে একদল মাদ্রাসা ছাত্র সেখানে এই তাণ্ডব চালায়।
সহিংসতা এত ব্যাপক আকার ধারণ করলেও ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১১টি মামলা হয়েছে এবং সেসব মামলার তদন্তেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। হামলার স্পষ্ট ভিডিও প্রমাণ ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

মাজার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর এই ধারাবাহিক হামলা আসলে সমাজের ভেতরে বাড়তে থাকা এক ধরনের চরম অসহিষ্ণুতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। এটি স্পষ্ট যে, এই হামলাকারীরা কোনো না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের আশ্রয় পাচ্ছে, যাদের সাথে জামায়াত বা তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। বারবার একই রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নাম আসায় ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে নেতৃত্বের এক ধরনের পরোক্ষ সায় রয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সামনেই যখন দিনের পর দিন এসব হামলা চলে এবং প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে, তখন জনগণের মনে আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, রাজনৈতিক চাপ আর বিচারহীনতার প্রশ্রয়েই অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কোন পথে হাঁটছে বাংলাদেশ?
কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যদি বারবার উগ্র জনতাকে উসকে দিয়ে জোরপূর্বক নিজেদের চিন্তাভাবনা সবার ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়, তবে তা পুরো দেশের সামাজিক ভিত্তিকেই ধসিয়ে দেয়। মাজারগুলোর ওপর চলমান এই হামলাগুলো কিন্তু স্রেফ সাধারণ কোনো ধর্মবিরোধ নয়; এগুলো আসলে আঘাত করছে বাংলাদেশের বহু বছরের চেনা সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মূলে।
আর ঠিক এই কারণেই এই হামলাগুলোর পেছনে বারবার জামায়াতে ইসলামীর নাম উঠে আসছে। দলটির কট্টর মতাদর্শ, তৃণমূলের বিশাল নেটওয়ার্ক এবং ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে লোক জড়ো করার পুরনো কৌশল–সব মিলিয়ে সন্দেহের তীর বারবার তাদের দিকেই যাচ্ছে। হয়তো প্রতিটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি হাত থাকার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া কঠিন, কিন্তু মাঠপর্যায়ে যারা ধরা পড়ছে বা যাদের নাম গণমাধ্যমে আসছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের এই সন্দেহকে আরও জোরালো করে তুলছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সমাজে যখন একবার এই ‘মব কালচার’ বা দল বেঁধে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ডালপালা মেলে, তখন তা আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আজ যা একটি মাজারের ওপর হামলা, কাল তা হয়তো অন্য কোনো ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী, ভিন্ন ধর্ম বা সাধারণ মানুষের ওপর চরম আঘাত হিসেবে নেমে আসবে। তাই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি এখনই এই সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেয়, তবে এই ধ্বংসের খেলা কোনোদিনই থামবে না।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত লেখা থেকে অনূদিত