Advertisement Banner

এল নিনো নয়, আসছে ‘সুপার’ এল নিনো

প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের জল যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাকে ‘এল নিনো’ বলা হয়।

এল নিনো নয়, আসছে ‘সুপার’ এল নিনো
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের জল যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাকে ‘এল নিনো’ বলা হয়। ছবি: রয়টার্স

তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় একটি ‘মেগা এল নিনো’ বা ‘সুপার এল নিনো’-র আতঙ্ক দানা বাঁধছে। এটি ১৫০ বছর আগের সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যা ছিল ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক জলবায়ু বিপর্যয়।

১৫০ বছর আগে কী ঘটেছিল?

আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৭৭-৭৮ সালে এক ভয়াবহ ‘সুপার এল নিনো’ বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল। এটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর ফলে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে যায়।

এর প্রভাবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় চরম খরা দেখা দেয়। উপমহাদেশে তখন ব্রিটিশ শাসন চলছিল এবং ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারান।

খরার পরপরই কলেরার মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সেই সময় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল, যা এই ধ্বংসলীলার মূল কারণ ছিল। তারা এখন আতঙ্কিত যে, ২০২৬ সালে ইতিহাসের সেই ভয়াবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

সুপার এল নিনো কী?

প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের জল যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাকে ‘এল নিনো’ বলা হয়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহের ধরন বদলে যায়, মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়।

ভারতের গণমাধ্যম নিউজএইটিন বলছে,প্রশান্ত মহাসাগর নিয়ে গবেষণারত গবেষকরা জানিয়েছেন যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মূলত এল নিনো তৈরির প্রধান লক্ষণ। যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০২৬ সালে একটি সুপার এল নিনো তৈরি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যুক্ত হয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে এক নতুন রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সুপার এল নিনো’ পরিভাষাটি আবহাওয়া দপ্তর বা অনেক বৈজ্ঞানিক সংস্থা সরাসরি ব্যবহার করে না; তবে এটি মূলত অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায়। ১৯৫০ সালের পর থেকে এমন ঘটনা মাত্র কয়েকবার ঘটেছে এবং মাত্র একবারই তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। মার্কিন জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, এই বছরের শেষদিকে নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে একটি শক্তিশালী বা অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো তৈরির ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে।

এল নিনোর আশঙ্কা রয়েছে। ছবি: রয়টার্স
এল নিনোর আশঙ্কা রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন ফেডারেল বিজ্ঞানীদের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সর্বশেষ ‘সুপার এল নিনো’ ইথিওপিয়ায় ভয়াবহ খরা এবং পুয়ের্তো রিকোয় জলসংকট তৈরি করেছিল। এছাড়া মধ্য-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে অত্যন্ত বিধ্বংসী হারিকেন মৌসুম সৃষ্টির মাধ্যমে এটি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল।

এল নিনো’র চরম প্রভাব

প্রতিটি এল নিনো পরিস্থিতিই অনন্য এবং অঞ্চল ও ঋতুভেদে এর প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন ও পরিবর্তনশীল হতে পারে। তবে এই চক্রটি সাধারণত অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ ও মধ্য আফ্রিকা, ভারত এবং আমাজন রেইনফরেস্টসহ দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে খরা ও প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ প্রান্ত, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ এবং দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এটি হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতিও বদলে দেয়—আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে বাধা দিলেও প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঝড়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

আশঙ্কা করা হচ্ছে এই বছরে এল নিনোর প্রভাবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আমাজন অববাহিকায় তীব্র খরা ও চরম দাবদাহ দেখা দিতে পারে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ মাসিক পত্রিকা গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৬ সালের মে-জুলাই মাসের মধ্যেই এল নিনো পরিস্থিতি ফিরে আসার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী তিন মাস সময়ের মধ্যে বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের বন্টনে উল্লেখযোগ্য তারতম্য লক্ষ্য করা যাবে।

ডব্লিউএমও-র জলবায়ু পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান উইলফ্রান মোফুমা ওকিয়া বলেন,“বছরের শুরুতে জলবায়ুর অবস্থা নিরপেক্ষ থাকলেও, বর্তমানে জলবায়ু মডেলগুলো একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে এল নিনো শুরু হতে যাচ্ছে এবং পরবর্তী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।”

তিনি আরও যোগ করেন,“মডেলগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি একটি শক্তিশালী রূপ নিতে পারে, তবে বছরের এই সময়ে বসন্তকালীন পূর্বাভাস প্রতিবন্ধকতা’র কারণে পূর্বাভাসের নিখুঁত নিশ্চয়তা পাওয়া কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। সাধারণত এপ্রিলের পর পূর্বাভাসের নির্ভুলতা আরও বৃদ্ধি পায়।”

বর্তমানে জলবায়ু গবেষকরা ২০২৬ সালে একটি সম্ভাব্য মেগা বা সুপার এল নিনোর লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন, যা ১৯ শতকের সেই বিপর্যয়ের তীব্রতাকে স্পর্শ করতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৮৭৭-৭৮ সালের চক্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণ তাপমাত্রা, যা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল এবং প্রধান মৌসুমি বায়ুর প্রবাহকে দুর্বল করেছিল। ২০২৬ সালের জন্য সাম্প্রতিক মডেলগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, যা আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে যে ২০২৭ সালের মধ্যে কৃষি এবং পানিসম্পদ আবারও একই ধরণের ধ্বংসলীলার সম্মুখীন হতে পারে।

এটি আমাদের উপমহাদেশের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ এটি মৌসুমি বায়ু এবং অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। দেশের কৃষি, পানিসম্পদ এবং অর্থনীতি মূলত মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল।

ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের বরাতে নিউজ এইটিন জানিয়েছে, ২০২৬ সালে উত্তর, মধ্য এবং পূর্ব ভারতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা চাষাবাদের মারাত্মক ক্ষতি করবে। দুর্বল মৌসুমি বায়ুর কারণে ফসলের ফলন কমে যেতে পারে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জলাধার ও ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে গিয়ে তীব্র জলসংকট দেখা দিতে পারে। ক্রমবর্ধমান গরম আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন ইতিমধ্যেই তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর এল নিনো একে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

চাষাবাদ এবং জলাধারগুলো পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টির প্রায় ৭০ শতাংশই আসে মৌসুমি বায়ু থেকে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পাশাপাশি, বর্তমান উষ্ণায়নের ধারা এবং সুপার এল নিনোর লক্ষণগুলো ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এটি বিশ্বের জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “ধারণা করা হচ্ছে, এল নিনো সক্রিয় হতে পারে মনসুনের মাঝামাঝিতে কিংবা আরও পরে—অর্থাৎ বর্ষার শেষে। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি, বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।”

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “এল নিনো এবং লা নিনা বৈশ্বিক আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে এর সরাসরি প্রভাব না থাকলেও বৈশ্বিকভাবে প্রভাব পড়তে দেখা যায়।” তিনি বলেন, “মে-জুন মাসে যদি এল নিনো শক্তিশালী হতে শুরু করে, তাহলে বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন প্রভাবিত হবে। মৌসুমি তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ আসবে।”

এই বজলুর রশিদ আরও বলেন, “ইতোমধ্যে আমরা বৈশ্বিক প্রভাব দেখছি। বর্ষা দেরিতে আসছে, রেইন স্কেল কমে যাচ্ছে।”

প্রস্তুতি এবং আগাম পদক্ষেপ

জলবায়ু-সংবেদনশীল খাত যেমন কৃষি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির জন্য ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফাইল ছবি: রয়টার্স
ফাইল ছবি: রয়টার্স

গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) মে মাসের শেষের দিকে তাদের পরবর্তী ‘ডব্লিউএমও এল নিনো/লা নিনা আপডেট’ প্রকাশ করবে, যা জুন-আগস্ট এবং পরবর্তী সময়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আরও জোরালো নির্দেশনা প্রদান করবে।

এটি ডব্লিউএমও-র ‘গ্লোবাল প্রোডিউসিং সেন্টারস ফর সিজনাল প্রেডিকশন’ এবং ডব্লিউএমও ও ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সোসাইটির বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে।

আঞ্চলিক জলবায়ু আউটলুক ফোরামগুলো আঞ্চলিক স্তরে ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাস প্রদান করে—উদাহরণস্বরূপ, সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরাম আজ মঙ্গলবার দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর পূর্বাভাস প্রকাশ করবে। জাতীয় পর্যায়ের তথ্য হালনাগাদের দায়িত্বে থাকবে প্রতিটি দেশের আবহাওয়া ও জলবিদ্যা দপ্তর।

ডব্লিউএমও সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘ডব্লিউসিএম গ্লোবাল হাইড্রোমেট উইকলি স্ক্যান’ এবং ‘ডব্লিউসিএম গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আউটলুক ব্রিফিং’-এর মতো বিশেষভাবে তৈরি প্রোগ্রাম জাতিসংঘ এবং মানবিক সংস্থাগুলোকে প্রস্তুতি ও আগাম পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করে।

ডব্লিউসিএম আগামীকাল বুধবার এপ্রিল জাতিসংঘ এবং মানবিক সংস্থাগুলোর কাছে তাদের গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আউটলুক ব্রিফিং পেশ করবে। এতে এল নিনো, অন্যান্য জলবায়ু এবং সম্ভাব্য উদ্বেগের মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।

সম্পর্কিত