আল জাজিরার প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধে আমেরিকার খরচ কত?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধে আমেরিকার খরচ কত?
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

আধুনিক যুদ্ধ কি কেবল বারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই? নাকি এটি আসলে এক বিশাল অঙ্কের খেলা! ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার চলমান সামরিক অভিযানে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় খরচ হচ্ছে প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা অনেক দেশের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি। কিন্তু ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন বাজেটের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ টাকা নয়, বরং ফুরিয়ে আসা অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত।

একটি চলমান সামরিক অভিযানের মোট খরচ কত হতে পারে, তা আগে থেকে অনুমান করা বেশ কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন যুদ্ধে আমেরিকার শেষ পর্যন্ত কত ব্যয় হবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি।

স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলছেন, “পেন্টাগন এখনো এ ধরনের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, তাই আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি। এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। আমরা একক কোনো অস্ত্রের খরচ বা নৌ-অভিযানের ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি।”

ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাব

আনাদোলু নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরির’ প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই আমেরিকার প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় হয়ে থাকতে পারে।

এ ছাড়া হামলার আগের প্রস্তুতিমূলক খরচগুলোও বেশ মোটা অংকের। বিমান ও এক ডজনেরও বেশি নৌ-জাহাজ মোতায়েন এবং আঞ্চলিক সম্পদ জড়ো করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি ডলার। সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির তথ্যমতে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়।

সরঞ্জাম ও সরঞ্জামের সংকট

আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি সরঞ্জাম হারানোর ক্ষতিও রয়েছে। কুয়েতে একটি ‘ফ্রেন্ডলি-ফায়ার’ ঘটনায় তিনটি মার্কিন ফাইটার জেট বিধ্বস্ত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আসল দুশ্চিন্তা আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে নয়, বরং সামরিক সরঞ্জামের মজুত নিয়ে।

ইরানে আমেরিকার হামলার সময়ের চিত্র। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ইরানে আমেরিকার হামলার সময়ের চিত্র। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন, “খরচের দিক থেকে এটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেট বর্তমানে এক ট্রিলিয়ন ডলারের এবং এটি বাড়িয়ে ১.৫ ট্রিলিয়ন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টিকে ভয়ানক মনে করি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এটি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এক ট্রিলিয়ন ডলার অনেক বড় অংকের টাকা হলেও আসল প্রশ্ন হলো আমেরিকার কাছে আসলে কত অস্ত্র জমা আছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬ এর মতো ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো, যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়।”

প্রিবল সতর্ক করে বলেন, “যেভাবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো হচ্ছে, তা অনির্দিষ্টকাল ধরে চালানো সম্ভব নয়। বর্তমানে যেভাবে অপারেশন চলছে তাতে হয়তো বড়জোর আরও কয়েক সপ্তাহ এভাবে আক্রমণ ঠেকিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।”

গত জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময়ও একই চিন্তা দেখা দিয়েছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল যে, আমেরিকা এবং ইসরায়েল উভয়েরই ইন্টারসেপ্টর মজুত কমে আসছে। যদিও কিছু নতুন ইন্টারসেপ্টর আনা হয়েছে, কিন্তু এই অস্ত্রগুলো বিশ্বের অন্যান্য জায়গার জন্যও বরাদ্দ থাকে।

যেমন, এগুলোর কিছু অংশ ইউক্রেনে পাঠানোর কথা ছিল, যেন তারা রাশিয়ার হামলা ঠেকাতে পারে। আবার কিছু রাখা হয়েছে এশিয়া বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য। তাই ওই অঞ্চলগুলো থেকে অস্ত্র সরিয়ে আনাটা উদ্বেগের বিষয়।

তাছাড়া, এই অস্ত্রগুলো চাইলেই হুট করে তৈরি করা যায় না। একটি প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬ মিসাইল তৈরি করা অত্যন্ত জটিল কাজ। এগুলো কারখানায় প্রতিদিন শত শত বা হাজার হাজার সংখ্যায় তৈরি হয় না বলে জানান প্রিবল।

কত সহায়তা, দিয়েছে কে

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অফ ওয়ার’ ২০২৫-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত আমেরিকা ইসরায়েলকে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে।

এর বাইরেও ইয়েমেন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের পেছনে করদাতাদের আরও ৯.৬৫ বিলিয়ন থেকে ১২.০৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১.৩৫ বিলিয়ন থেকে ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার। এই সমীক্ষায় দেখা যায়, এই অর্থায়ন প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুসারে, অপারেশন এপিক ফিউরিতে আকাশপথ, সমুদ্রপথ, স্থলপথ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মোট ২০টিরও বেশি অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, তারা ইরানের অভ্যন্তরে হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় আকাশ, সমুদ্র ও স্থলবাহিনীর ২০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে।

সেন্টকমের প্রাক্তন অপারেশন ডিরেক্টর কেভিন ডনেগান বলেন, “বর্তমানে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক ক্ষমতাকে যত দ্রুত সম্ভব দুর্বল করে দেওয়া। যেন তারা আর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। মূল উদ্দেশ্য হলো, এই আক্রমণগুলো থামানো অথবা অন্ততপক্ষে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।”

সম্পর্কিত