স্মরণ
মাহবুব জামান

চলে গেলেন দোহা ভাই। হঠাৎ বলব না—বেশ কিছুদিন ভুগেছেন। কিন্তু, সবাই জেনে ওঠার আগেই আশ্রয় নিলেন নীলফামারীতে, তার পৈত্রিক বাড়ির কবরস্থানে।
ছাত্রনেতা সামসুদ্দোহা—উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি।
আইয়ুব স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সাইফউদ্দিন মানিক আর সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা। মানিক ভাইয়ের নামে হুলিয়া তাই ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দোহা ভাই–ই ছাত্র ইউনিয়নের বজ্রকণ্ঠ।
দোহা ভাইকে প্রথম দেখেছি মধুর ক্যান্টিনে ১৯৬৬ সালের কোনো এক সময়। মধুর কান্টিন তখনো পুরাতন ভবনের আমতলার কাছে। আমরা ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি হয়েই শুনি সেলিম-মুকুল-মাহবুবউল্লাহ–হুমায়ুন চারজন মেধাবী ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছে কলেজ থেকে। তারা বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন তঘমায়ে খিদমত (টিকে) পাওয়া অধ্যাপক জালাল উদ্দিন। উনি আইয়ুব খানের চেয়েও কড়া ছিলেন।
সেসময় ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগ–ছাত্র ইউনিয়ন নামে ছাত্র সংগঠন করা যেত না। ছাত্রলীগ করত অভিযাত্রী নামে আর আমরা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম অগ্রদূত নামে। তাও প্রতি পদে পদে ছিল বাধা।
ছাত্র ইউনিয়নের তখন ক্রান্তিকাল। সবেমাত্র দিখণ্ডিত হয়েছে—মতিয়া গ্রুপ আর মেনন গ্রুপ। সংগঠনের প্রাদেশিক সম্মেলনে মানিক ভাই সভাপতি আর দোহা ভাই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। ওই সময় দোহা ভাইয়ের সঙ্গে দেখাই হয়নি বলা যায়। আমরা তাকে কাছাকাছি দেখলাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়। দেখলাম তার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং শুনলাম জ্বালাময়ী বক্তৃতা।
একাত্তরে আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আমরা আগরতলা-তেজপুর হয়ে মুন্সিগঞ্জে। আর দোহা ভাই পশ্চিম দিনাজপুর থেকে রংপুর–নীলফামারী।
স্বাধীনতার পর আমাদের কাজের ক্ষেত্র পাল্টে গেল। আমরা ছাত্র আন্দোলন–যুব আন্দোলনে। দোহা ভাই কমিউনিস্ট পার্টিতে। কিন্তু আবার কাছাকাছি হলাম ১৯৮৬ সালে, পার্লামেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে নীলফামারীতে দাঁড়িয়েছেন দোহা ভাই। আমাদের কয়েকজনের ওপর দায়িত্ব পড়ল নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনার। জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তারা তখন ক্ষমতায়। স্রোতের বিপরীতে লড়াই। তারুণ্য আর ক্ষেতমজুরদের মধ্যে আমরা স্থান করে নিতে পারলাম। উঠান বৈঠক, হাট সভা, বাড়ি বাড়ি যাওয়া—পরিস্থিতি ক্রমেই ঘুরতে থাকল। আমরা ক্রমশ মনে শক্তি পাওয়া শুরু করলাম।
পরিস্থিতি এমন হলো যে ওরা মরিয়া হয়ে উঠল। শুরু হলো নানা ধরনের উসকানি। নির্বাচনের চার দিন আগে ওরা হামলা করল আমাদের অফিস। আহত হলো অনেকেই—মাথায় তীব্র আঘাত পাওয়া আমাকে মরণাপন্ন আস্থায় ঢাকায় নিয়ে আসা হলো।
তখন তো আর এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। সৈয়দপুর থেকে বিমানে ঢাকায় এসে আমি থাকলাম চিকিৎসায়।
কিন্তু, বিপত্তি ঘটল অন্যখানে। রাতে কয়েক বোতল রক্ত দিতে হয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই আমি বি-ভাইরাস জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হলাম। সেই চিকিৎসা চলল প্রায় তিন মাস। তখনকার সময়ে বি-ভাইরাস খুবই বিপজ্জনক ছিল। হাসপাতাল থেকে বলল—এর পরিণতি লিভার সিরোসিস—তার মানে আয়ুষ্কাল তিন থেকে ছয় মাস। আমি অবশ্য এখনো বেঁচে আছি, দোহা ভাই চলে গেলেন!
যা হোক, নির্বাচনী ফলাফল হলো। দোহা ভাই বিপুল ভোটে জিতলেন। ফরহাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচজনের একটা অনবদ্য টিম হয়েছিল সংসদে। ফরহাদ ভাইয়ের বক্তৃতা তো ক্যাসেট টেপ হয়ে বিক্রিও হয়েছে। কিন্তু, সেই সংসদ তো বেশি দিন টেকেনি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ধস নামায় এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনও এলোমেলো হয়ে গেল।
দোহা ভাই চলে গেলেন গণফোরামে। সেখান থেকে মণি সিংহ–ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট। তারপর লেখালেখি—বেশ কিছু প্রকাশনা বেরিয়েছে। শেষ দিনগুলো খুব ভালো যায়নি। কিন্তু আমাদের কাছে দোহা ভাই মানে ঊনসত্তর, দোহা ভাই মানে ষাটের দশক! বিদায় অভিবাদন, দোহা ভাই।
লেখক: ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা

চলে গেলেন দোহা ভাই। হঠাৎ বলব না—বেশ কিছুদিন ভুগেছেন। কিন্তু, সবাই জেনে ওঠার আগেই আশ্রয় নিলেন নীলফামারীতে, তার পৈত্রিক বাড়ির কবরস্থানে।
ছাত্রনেতা সামসুদ্দোহা—উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি।
আইয়ুব স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সাইফউদ্দিন মানিক আর সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা। মানিক ভাইয়ের নামে হুলিয়া তাই ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দোহা ভাই–ই ছাত্র ইউনিয়নের বজ্রকণ্ঠ।
দোহা ভাইকে প্রথম দেখেছি মধুর ক্যান্টিনে ১৯৬৬ সালের কোনো এক সময়। মধুর কান্টিন তখনো পুরাতন ভবনের আমতলার কাছে। আমরা ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি হয়েই শুনি সেলিম-মুকুল-মাহবুবউল্লাহ–হুমায়ুন চারজন মেধাবী ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছে কলেজ থেকে। তারা বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন তঘমায়ে খিদমত (টিকে) পাওয়া অধ্যাপক জালাল উদ্দিন। উনি আইয়ুব খানের চেয়েও কড়া ছিলেন।
সেসময় ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগ–ছাত্র ইউনিয়ন নামে ছাত্র সংগঠন করা যেত না। ছাত্রলীগ করত অভিযাত্রী নামে আর আমরা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম অগ্রদূত নামে। তাও প্রতি পদে পদে ছিল বাধা।
ছাত্র ইউনিয়নের তখন ক্রান্তিকাল। সবেমাত্র দিখণ্ডিত হয়েছে—মতিয়া গ্রুপ আর মেনন গ্রুপ। সংগঠনের প্রাদেশিক সম্মেলনে মানিক ভাই সভাপতি আর দোহা ভাই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। ওই সময় দোহা ভাইয়ের সঙ্গে দেখাই হয়নি বলা যায়। আমরা তাকে কাছাকাছি দেখলাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়। দেখলাম তার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং শুনলাম জ্বালাময়ী বক্তৃতা।
একাত্তরে আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আমরা আগরতলা-তেজপুর হয়ে মুন্সিগঞ্জে। আর দোহা ভাই পশ্চিম দিনাজপুর থেকে রংপুর–নীলফামারী।
স্বাধীনতার পর আমাদের কাজের ক্ষেত্র পাল্টে গেল। আমরা ছাত্র আন্দোলন–যুব আন্দোলনে। দোহা ভাই কমিউনিস্ট পার্টিতে। কিন্তু আবার কাছাকাছি হলাম ১৯৮৬ সালে, পার্লামেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে নীলফামারীতে দাঁড়িয়েছেন দোহা ভাই। আমাদের কয়েকজনের ওপর দায়িত্ব পড়ল নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনার। জাতীয় পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তারা তখন ক্ষমতায়। স্রোতের বিপরীতে লড়াই। তারুণ্য আর ক্ষেতমজুরদের মধ্যে আমরা স্থান করে নিতে পারলাম। উঠান বৈঠক, হাট সভা, বাড়ি বাড়ি যাওয়া—পরিস্থিতি ক্রমেই ঘুরতে থাকল। আমরা ক্রমশ মনে শক্তি পাওয়া শুরু করলাম।
পরিস্থিতি এমন হলো যে ওরা মরিয়া হয়ে উঠল। শুরু হলো নানা ধরনের উসকানি। নির্বাচনের চার দিন আগে ওরা হামলা করল আমাদের অফিস। আহত হলো অনেকেই—মাথায় তীব্র আঘাত পাওয়া আমাকে মরণাপন্ন আস্থায় ঢাকায় নিয়ে আসা হলো।
তখন তো আর এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। সৈয়দপুর থেকে বিমানে ঢাকায় এসে আমি থাকলাম চিকিৎসায়।
কিন্তু, বিপত্তি ঘটল অন্যখানে। রাতে কয়েক বোতল রক্ত দিতে হয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই আমি বি-ভাইরাস জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হলাম। সেই চিকিৎসা চলল প্রায় তিন মাস। তখনকার সময়ে বি-ভাইরাস খুবই বিপজ্জনক ছিল। হাসপাতাল থেকে বলল—এর পরিণতি লিভার সিরোসিস—তার মানে আয়ুষ্কাল তিন থেকে ছয় মাস। আমি অবশ্য এখনো বেঁচে আছি, দোহা ভাই চলে গেলেন!
যা হোক, নির্বাচনী ফলাফল হলো। দোহা ভাই বিপুল ভোটে জিতলেন। ফরহাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচজনের একটা অনবদ্য টিম হয়েছিল সংসদে। ফরহাদ ভাইয়ের বক্তৃতা তো ক্যাসেট টেপ হয়ে বিক্রিও হয়েছে। কিন্তু, সেই সংসদ তো বেশি দিন টেকেনি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ধস নামায় এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনও এলোমেলো হয়ে গেল।
দোহা ভাই চলে গেলেন গণফোরামে। সেখান থেকে মণি সিংহ–ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট। তারপর লেখালেখি—বেশ কিছু প্রকাশনা বেরিয়েছে। শেষ দিনগুলো খুব ভালো যায়নি। কিন্তু আমাদের কাছে দোহা ভাই মানে ঊনসত্তর, দোহা ভাই মানে ষাটের দশক! বিদায় অভিবাদন, দোহা ভাই।
লেখক: ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা