Advertisement Banner

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছবি তুলতেন কেমন?

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছবি তুলতেন কেমন?
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

বাংলাসাহিত্য, শিল্পকলা, থিয়েটার, মুদ্রণশিল্প, সংগীত, খেলাধুলা, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফিতে কলকাতার রায় পরিবারের অবদান চির স্মরণীয় হলেও—বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চার গোড়ার দিকে এই পরিবারের অবদানের কথা খুব বেশি শোনা যায় না। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী যে বাংলায় প্রসেস ক্যামেরায় হাফটোন ব্লক তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রপথিকের ভূমিকা রেখেছেন তা শুনে অনেকে চোখ কপালে তোলেন। আমরা শুধু জানি, তিনি একজন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, বাংলা মুদ্রণশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। নেই ফটোগ্রাফিতে তার অবদানের আলাপ। তার ১৬৩তম জন্মদিন উপলক্ষে সেই আলাপই করা যাক।

উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম ১৮৬৩ সনে—বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের মসূয়া গ্রামে। তার পিতার নাম কালীনাথ রায়। কালীনাথ ছেলের নাম রেখেছিলেন কামদারঞ্জন। তার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স তখন জমিদার হরিকিশোর চৌধুরী তাকে দত্তক নেন এবং নাম রাখেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ১৮৮০ সনে প্রবেশিকা পাশ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৮৪ সনে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট থেকে বিএ পর্ব শেষ করেন। একই বছর যোগ দেন ব্রাহ্মসমাজে। বিয়ে করেন ব্রাহ্মনেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা বিধুমুখী দেবীকে। উপেন্দ্রকিশোরের প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৮৮৩ সনে। তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘সেকালের কথা’, ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’ অন্যতম। ১৯১৩ সন থেকে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। বাংলা শিশু-কিশোরসাহিত্যে এই পত্রিকার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তিনি খুব ভালো বেহালা বাজাতেন। পাখোয়াজ, বাঁশি ও হারিমোনিয়ামের হাতও ছিল পাকা। সংগীতবিষয়ক বেশ কয়েকটি প্রবন্ধেরও রচয়িতা তিনি। তিনি যে ভালো ছবিও আঁকতেন তার নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার বিভিন্ন রচনায়। নিজের রচনাবলির ছবি তো আঁকতেনই—এঁকেছেন অন্যের রচনার জন্যও। যেমন, এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নদী’ কবিতার জন্য সাতটি ছবি।

সেসময় বইয়ে ছবি ছাপানোর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ‘হাফটোন’ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি নানা ধরনের ডায়াফর্ম ও রে-স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র তৈরি এবং ডুয়োটাইপ ও রে-টিন্ট পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। শুধু তাই নয়— ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় লেখা তার এবিষয়ক গবেষণা-প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ১৯১০ সনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ কোম্পানি। এই কোম্পানির মাধ্যমেই ভারতবর্ষে প্রসেস-শিল্পের বিকাশ ঘটে।

ফটোগ্রাফি ও চিত্রকর্মের প্রতিচ্ছবি বইয়ের পাতায় যথাযথ ও সুলভে ছাপানোর জন্য উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে হাফটোন ব্লকের ব্যবহার শুরু হয়। এই হাফটোন ব্লক তৈরি করতে প্রসেস ক্যামেরার প্রয়োজন। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এই বিশেষ ক্যামেরা নিয়ে আমৃত্যু বিস্তর গবেষণা করেছেন। বিলেতের ‘পেনরোজ পিকটোরিয়াল অ্যানুয়াল’ (১৮৯৫-১৯৮২) পত্রিকায় তার ইংরেজিতে লেখা মোট নয়টি গবেষণাপত্র ছাপা হয় (১৮৯৭-১৯১২)। প্রবন্ধগুলো হলো, ‘ফোকাসিং দ্য স্ক্রিন’ (১৮৯৭), ‘দ্য থিউরি অব হাফটোন ডট’ (১৮৯৮), ‘দ্য হাফটোন থিউরি গ্রাফিক্যালি এক্সপ্লেইন্ড’ (১৮৯৯), ‘অটোমেটিক অ্যাডজাস্টমেন্ট অব দ্য হাফটোন স্ক্রিন’ (১৯০১), ‘হাউ মেনি ডটস?’ (১৯০১), ‘ডিফ্র্যাকশন ইন হাফটোন থিউরি’ (১৯০২-৩), ‘মোর অ্যাবাউট হাফটোন থিউরি’ (১৯০৩), ‘দ্য সিক্সটি ডিগ্রি ক্রস-লাইন স্ক্রিন’ (১৯০৫-৬) এবং ‘মাল্টিপল স্টপস’ (১৯১১-১২)। এছাড়াও ‘জার্নাল অব ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’তে ছাপা হয় ‘হাফটোন ফটোগ্রাফি’ এবং ‘স্ক্রিন অ্যান্ড দেয়ার ইউজেস’ শিরোনামের দুটো প্রবন্ধ। ১৮৯০ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যে এই জার্নালে ছাপা হওয়া মৌলিক গবেষণাপত্রের রচয়িতা হিসেবে উপেন্দ্রকিশোরই ছিলেন একমাত্র ভারতীয়।

জীবন কম ছবিও তোলেননি। ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় নিজের তোলা ফটোগ্রাফ ছাপিয়েছেন। এই পত্রিকাতেই ছাপা (১৯১৩) হয় মাকড়শার একটি ম্যাক্রো ফটোগ্রাফ! তার আগে বঙ্গদেশে ম্যাক্রো-ফটোগ্রাফিচর্চা বা ম্যাক্রো ছবি ছাপা হয়েছিল কিনা জানা নেই। অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২-১৯৫০) ছিলেন একাধারে দার্শনিক, কবি, আধ্যাত্মিক সাধক এবং রাজনৈতিক বিপ্লবী। এই অরবিন্দ ঘোষ যখন কারামুক্ত হন তখন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার জন্য তার একটি ঐতিহাসিক ছবি তুলেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণবিষয়ক গবেষণার জন্য তিনি একাধিকবার স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ফ্রিৎজ ক্যাপ নামের এক জার্মান আলোকচিত্রী ঢাকায় ফটো স্টুডিও খুলেছিলেন। এটিই ছিল ঢাকার প্রথম ফটো-স্টুডিও। ঢাকার অনেক দুর্লভ ছবি ক্যাপের তোলা। কলকাতায় দুটি, দার্জিলিংয়ে একটি এবং ঢাকায় একটি— ফ্রিৎজ ক্যাপ পরিচালিত এই চারটি স্টুডিওর কথা জানা যায়। যাহোক, সম্ভবত এই জার্মান ভদ্রলোকের সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর যোগাযোগ ছিল। প্রসেস ক্যামেরায় হাফটোন ব্লক তৈরি বিষয়ে ‘পেনরোজ পিকটোরিয়াল অ্যানুয়াল’ পত্রিকায় প্রকাশিত কমপক্ষে দুটি গবেষণা প্রবন্ধে উপেন্দ্রকিশোর ফ্রিৎজ ক্যাপের তোলা দুটি ছবি ব্যবহার করেছেন। ছবিগুলোর ব্লক তৈরি করেছিলেন লেখক নিজেই। দুজনেই ‘ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ফটোগ্রাফি নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের লেখা কমপক্ষে দুটি বাংলা প্রবন্ধ রয়েছে, ‘হাফটোন-ছবি’ ও ‘ফটোগ্রাফীর চর্চা’। ফটোগ্রাফিতে সৌন্দর্য চর্চার ক্ষেত্রে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীকে পথিকৃৎ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষক সিদ্ধার্থ ঘোষ। ১৯০৫ সনে প্রকাশিত ‘ফটোগ্রাফীর চর্চা’ প্রবন্ধে উপেন্দ্রকিশোর বলছেন, ‘দেখার মতো দেখা হইলে ইহা খুবই আশাজনক। কিন্তু অধিকাংশ স্থলে ফটোগ্রাফীর চর্চা যেরূপ নিতান্ত সখ মিটাইবার জন্য উদ্দেশ্যবিহীন হালকাভাবে হইতে দেখা যায়, তাহা মালমসলা বিক্রেতা ভিন্ন আর কাহারও পক্ষেই শুভলক্ষণ নহে।’ তার সে আশঙ্কা সত্য হয়েছে। দেখার মতো করে দেখছেন না আলোকচিত্রীরা, তারা দৃষ্টিকে প্রসারিত করায় মন না দিয়ে ক্যামেরা ও ক্যামেরা সরঞ্জাম বৃদ্ধিতে মনোযোগী। যাহোক, সম্ভবত বঙ্গদেশে উপেন্দ্রকিশোরই প্রথম আলোকচিত্রীকে চিত্রশিল্পীর কাতারে দাঁড় করাতে চাইলেন। তবে ফটোগ্রাফি নিয়ে তার কোনো বাংলা বই আমরা পাইনি। আশার কথা হলো, তার ফটোগ্রাফি নিয়ে লেখা ইংরেজি প্রবন্ধগুলোকে ২০২৩ সনে বই আকারে প্রকাশ করেছে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (এসেস অন হাফ-টোন ফটোগ্রাফি)।

সত্যজিৎ তার ঠাকুরদা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘উপেন্দ্রকিশোরের মধ্যে বৈজ্ঞানিক ও শিল্পীর মহৎ সমন্বয় ঘটেছিল।’ এই কথার সত্যতা পাওয়া যায় উপেন্দ্রকিশোরের বহুমুখী কাজের মধ্যে— বিশেষ করে তার ফটোগ্রাফিচর্চায়। তার সময় পর্যন্তও ফটোগ্রাফি ল্যাবরেটরি থেকে বের হতে পারছিল না। এর প্রধান কারণ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব—ফটোগ্রাফি কি আদৌ শিল্প? সেসমময় ফটোগ্রাফি নিয়ে যারা লিখছিলেন তাদের মধ্যেও এই সঙ্কোচ ছিল।

সম্ভবত বঙ্গদেশে উপেন্দ্রকিশোরই প্রথম যিনি আলোকচিত্রীকে চিত্রশিল্পী হিসেবে দেখলেন। ফটোগ্রাফিকে বিজ্ঞান ও কলাকৌশলের গণ্ডি থেকে টেনে বের করতে চাইলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ‘চিত্রবিদ্যায় যেমন কবিত্ব ও সৌন্দর্যচর্চার অবকাশ থাকে, ইহাতেও (ফটোগ্রাফি) সেইরূপ।’

তথ্যসূত্র:

প্রবন্ধ সংগ্রহ (১) - সিদ্ধার্থ ঘোষ

ছবি তোলা : বাঙালির ফোটোগ্রাফি-চর্চা - সিদ্ধার্থ ঘোষ

সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান - সাহিত্য সংসদ,

যখন ছোট ছিলাম - সত্যজিৎ রায়

A Biographical Dictionary of 19th Century Photographers in South and South-East Asia - John Falconer

বাংলাপিডিয়া - এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ

ফটোগ্রাফি ডিকশনারি - সুদীপ্ত সালাম

বাংলা ফটোগ্রাফিসাহিত্যের ধারা - সুদীপ্ত সালাম

সম্পর্কিত