ফজলে রাব্বি

কোরবানির দ্বিতীয় দিনও পশু জবাই হয়েছে। অন্যবারের তুলনায় কম হলেও দুই দিনে পশু কোরবানি হয়েছে লাখ লাখ। আমলনামায় সাওয়াব হয়েছে, মাংসে মিটেছে প্রোটিনের ঘাটতি। কিন্তু চামড়া? গত কয়েক বছরের মতো এবারও এ খাতে একরাশ হতাশাই রয়ে গেছে। অথচ এ খাতে আছে বিলিয়ন ডলারের বাজারের সম্ভাবনা। কাঠামোগত সংস্কার না করে বারবার মৌসুমি দাওয়াই দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টার কারণেই এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। সেটা কেমন? দেখা যাক।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, পশু কেনাবেচার সাথে চামড়ার বাজারও দীর্ঘদিন ধরে ঈদ আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে আছে। তবে গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজার সবার আনন্দের পরিবর্তে ‘কারো আনন্দ কারো বিষাদে’ পরিণত হয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর পোস্তা মোড়ের চামড়ার বাজারে এমন চিত্রই দেখা গেল।
সরেজমিনে পুরনো সেই হতাশার দৃশ্যই সামনে এল। রিকশা কিংবা লরিতে বয়ে আনা কাঁচা চামড়া নিয়ে গভীর উদ্বগে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি তো দূরের কথা, ন্যায্য দামই মিলছে না। মসজিদ-মাদ্রাসা ও এতিমখানার পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খবরে দেখা গেছে, গরুর চামড়া মাত্র কয়েক শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ছাগলের চামড়া অনেক এলাকায় প্রায় অবিক্রিতই থেকে গেছে।
সরকার এ বছর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছিল। খাসির চামড়ায়ও কিছুটা দাম বাড়ানো হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত ১৩ মে সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে এই মূল্য ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ঈদের দিন সেই ঘোষিত দাম নিছক কাগুজে সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
চামড়া ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি মৌসুমি অস্থিরতা নয়। ব্যাংকঋণ সংকট, ট্যানারিতে নগদ টাকার ঘাটতি, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত ব্যর্থতা, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো–এই পাঁচ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সম্মিলিত ফলই আজকের সংকট।
সরকারের দাম, বাজার মানে না
প্রতি বছর ঈদের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জেলা প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ বৈঠকে চামড়ার দাম নির্ধারণ হয়। মাঠপর্যায়ে নজরদারির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। তবু বাস্তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দেখেন, পাইকার ও আড়তদাররা সমন্বিতভাবে সরকারি দরের অনেক নিচে চামড়া কেনে। বাজারের এই কাঠামোগত দুর্বলতার কেন্দ্রে রয়েছে তারল্য সংকট।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ চরচাকে বলেছেন, “বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাতে চামড়া খাতে অর্থ ছাড়তে অনাগ্রহী। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের এই অর্থসংকট না কাটলে কোরবানির চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।”
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে কাঁচা চামড়ার মৌসুমি বাজারের আকার প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি মৌসুমে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ২২৮ কোটি টাকা। আর বাস্তবে তা ১০০ কোটি টাকার নিচে বলে ধারণা করা যায়। অথচ বছর চারেক আগেও এই খাতে ব্যাংকঋণ ৪৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।
একাধিক আড়তদার জানিয়েছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আগের বকেয়া না পাওয়ায় তারাও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এই শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল প্রান্তে থাকা মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলোই শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাশুল দিচ্ছে।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) মহাসচিব হাজী টিপু সুলতান এ বিষয়ে চরচাকে বলেন, ‘‘বেচাকেনার টাকা নেই। আমাদের ১০০ কোটি টাকা ট্যানারি রেখে দিয়েছে। ট্যানারির লোকজন এই খাত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্যখাতে ব্যয় করে। গেম সব ট্যানারির হাতে।”
সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরেও কাটেনি সংকট
২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় সরকারের ঘোষণা ছিল, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। অথচ প্রকল্পটি শিল্প মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করেছে।
কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না। এই সনদ না থাকায় নাইকি, অ্যাডিডাস, এইচঅ্যান্ডএমের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশি ট্যানারি থেকে সরাসরি পণ্য কেনে না। ফলে চীনের মতো মধ্যস্বত্বভোগী বাজারে কম দামে ওয়েট-ব্লু বা সেমি-প্রসেসড চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। মূল্য সংযোজনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে।
এ সংকটের কারণে সম্ভাবনাময় চামড়া খাত সংকটের আবর্তেই রয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে একেবারে তৃণমূলে। কাঁচা চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বছর বছর আর্থিক মাশুল গোনাটাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ বৈশ্বিক বাজারে রয়েছে এ খাতের বড় সম্ভাবনা। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটের চলতি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক চামড়ার বাজার ছিল ৫৩ হাজার ১০৭ কোটি মার্কিন ডলারের। চলতি বছর এ বাজারের আকার দাঁড়াবে ৫৬ হাজার ৬২৩ কোটি মার্কিন ডলারে, যা ২০৩৪ সাল নাগাদ হবে ৯৮ হাজার ২৪২ কোটি ডলারের। এ বাজারে ৩৭ দশমিক ৩১ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে ইউরোপ।

এই ৫০ হাজার কোটিরও বেশি বড় বাজার এর মধ্যে ৬২ শতাংশেরও বেশি এখনো প্রাকৃতিক চামড়া। প্রতি বছর দেশে ঈদের সময় প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হয়। চীন ছাড়া এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে ভিয়েতনাম চামড়ার এই বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের চামড়ার বড় উৎস শূকর, কুকুর ও বিড়ালের চামড়া। পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বছরে এর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। এ দিয়েই তারা বৈশ্বিক চামড়ার বাজারের ৫ শতাংশের বেশি দখল করেছে বলে জানাচ্ছে ফরচুন বিজনেস ইনসাইট।
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ ছাড়াও বছরজুড়ে যে পরিমাণ গরু ও খাসির মাংস উৎপাদন হয় এবং এর ফলে যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া পাওয়া যায়, তা বর্গফুট বিবেচনায় সমকক্ষ না হলেও ভিয়েতনামের কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ এই বিপুল পরিমাণ চামড়া উৎপন্ন করলেও তা কাজে লাগাতে পারছে না। এর কারণ ঠিক কোথায়?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ চরচাকে বলেন, “সাভারের চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের এক দশক পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়নি। অথচ প্রকল্পটিকে কাগজে-কলমে সমাপ্ত ঘোষণা করে রাখা হয়েছে। এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো আমাদের থেকে সরাসরি পণ্য কিনছে না। ফলে চীনের মতো মধ্যস্বত্বভোগী বাজারে কম দামে চামড়া বিক্রি করে প্রতি বছর আমরা প্রায় ৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি সুযোগ হারাচ্ছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ হওয়ার আগে যদি সিইটিপি আপগ্রেড করা না হয়, তবে পুরো শিল্প খাত ১২ শতাংশ শুল্কের বড় ঝুঁকিতে পড়বে।”
সমাধানহীন সংকট ‘সিন্ডিকেট’
চামড়ার বাজারে ‘সিন্ডিকেট’-এর অভিযোগ বহু পুরনো। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ঈদের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বড় পাইকার ও আড়তদাররা সমন্বিতভাবে কম দামে বাজার খুলে দেন। কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার ভয়ে ছোট ব্যবসায়ীরা সেই দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে নির্দিষ্ট একটি চক্র নামমাত্র মূল্যে বিপুল পরিমাণ চামড়া কিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে ট্যানারি মালিকরা সাধারণত ভিন্ন যুক্তি দেন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিনিশড লেদারের দাম কমেছে, ডলার সংকট ও রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে এবং পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ক্রেতা হারিয়েছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে বেশি দামে কাঁচা চামড়া কেনার সামর্থ্য অনেক ব্যবসায়িরই নেই।
অথচ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু দেশের মোট রপ্তানিতে এই খাতের অংশ মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তুলনায় তৈরি পোশাক খাত একাই ৮৪ শতাংশ রপ্তানি আয় করছে। বাংলাদেশ যে বিপুল কাঁচামাল সরবরাহ করে, তার বিপরীতে এটি অনুল্লেখযোগ্য।
এদিকে বিশ্ববাজারে আরেকটি বিপদও আসছে। ভেগান লেদার ও সিনথেটিক বিকল্পের চাহিদা বছরে ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। ভিয়েতনাম ও ইতালি যেখানে কাঁচা চামড়া থেকে উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডেড পণ্যে রূপান্তর করছে, বাংলাদেশ সেখানে এখনো মূলত নিম্নমানের প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিতেই আটকে আছে। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স না থাকলে এই পিছিয়ে পড়া আরো ত্বরান্বিত হবে।
কাঠামোগত সংস্কার নেই, জোড়াতালিই ভরসা
চামড়া খাতে বিদ্যমান এসব সংকট অনেক দিন ধরেই চলছে। খাতটির সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা এর সমাধান নিয়েও বহুদিন ধরে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু সেসব পরামর্শ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। এর সমাধানে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
প্রতি বছর একই চক্র ঘুরে আসে–সরকার বৈঠক করে, দাম নির্ধারণ করে, ব্যাংকঋণ ঘোষণা করে। কিন্তু ঈদের পরের সপ্তাহে সেই একই চিত্র–ক্ষতিগ্রস্ত মৌসুমি ব্যবসায়ী, অবিক্রিত চামড়া। এই চক্র ভাঙতে হলে যা দরকার, তার তালিকা শিল্প বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্যে আছে–
এই পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রতি বছর কোরবানির ঈদ-পরবর্তী সপ্তাহটি একটাই বার্তা দেবে–দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পটি আরেকবারের মতো পিছিয়ে পড়ল। ক্ষতির বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘরে ফিরতে হচ্ছে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা আর এতিমখানাগুলোকে। অথচ কিছু কাঠামোগত সংস্কার করলেই খাতটির তৃণমূল থেকে প্রতিটি স্তরের ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে পারে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি কার্যকর করাটা শুধু এলডব্লিউজি সনদের জন্যই নয়, নিজেদের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঁচানোর জন্যও জরুরি। ফলে চামড়া শিল্পের কাঠামোগত সংস্কার আসলে দ্বিমুখী সুফল এনে দিতে পারে। একদিকে নদীসহ পরিবেশ দূষণ কমানো এবং অন্যদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি–দুটিই নির্ভর করছে এই কাঠামোগত সংস্কারের ওপর। আগেই বলা হয়েছে, চামড়া শিল্পে রয়েছে বিলিয়ন ডলারের বাজারের হাতছানি।

কোরবানির দ্বিতীয় দিনও পশু জবাই হয়েছে। অন্যবারের তুলনায় কম হলেও দুই দিনে পশু কোরবানি হয়েছে লাখ লাখ। আমলনামায় সাওয়াব হয়েছে, মাংসে মিটেছে প্রোটিনের ঘাটতি। কিন্তু চামড়া? গত কয়েক বছরের মতো এবারও এ খাতে একরাশ হতাশাই রয়ে গেছে। অথচ এ খাতে আছে বিলিয়ন ডলারের বাজারের সম্ভাবনা। কাঠামোগত সংস্কার না করে বারবার মৌসুমি দাওয়াই দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টার কারণেই এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। সেটা কেমন? দেখা যাক।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, পশু কেনাবেচার সাথে চামড়ার বাজারও দীর্ঘদিন ধরে ঈদ আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে আছে। তবে গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজার সবার আনন্দের পরিবর্তে ‘কারো আনন্দ কারো বিষাদে’ পরিণত হয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর পোস্তা মোড়ের চামড়ার বাজারে এমন চিত্রই দেখা গেল।
সরেজমিনে পুরনো সেই হতাশার দৃশ্যই সামনে এল। রিকশা কিংবা লরিতে বয়ে আনা কাঁচা চামড়া নিয়ে গভীর উদ্বগে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি তো দূরের কথা, ন্যায্য দামই মিলছে না। মসজিদ-মাদ্রাসা ও এতিমখানার পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খবরে দেখা গেছে, গরুর চামড়া মাত্র কয়েক শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ছাগলের চামড়া অনেক এলাকায় প্রায় অবিক্রিতই থেকে গেছে।
সরকার এ বছর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছিল। খাসির চামড়ায়ও কিছুটা দাম বাড়ানো হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত ১৩ মে সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে এই মূল্য ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ঈদের দিন সেই ঘোষিত দাম নিছক কাগুজে সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
চামড়া ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি মৌসুমি অস্থিরতা নয়। ব্যাংকঋণ সংকট, ট্যানারিতে নগদ টাকার ঘাটতি, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত ব্যর্থতা, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো–এই পাঁচ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সম্মিলিত ফলই আজকের সংকট।
সরকারের দাম, বাজার মানে না
প্রতি বছর ঈদের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জেলা প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ বৈঠকে চামড়ার দাম নির্ধারণ হয়। মাঠপর্যায়ে নজরদারির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। তবু বাস্তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দেখেন, পাইকার ও আড়তদাররা সমন্বিতভাবে সরকারি দরের অনেক নিচে চামড়া কেনে। বাজারের এই কাঠামোগত দুর্বলতার কেন্দ্রে রয়েছে তারল্য সংকট।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ চরচাকে বলেছেন, “বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাতে চামড়া খাতে অর্থ ছাড়তে অনাগ্রহী। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের এই অর্থসংকট না কাটলে কোরবানির চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।”
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে কাঁচা চামড়ার মৌসুমি বাজারের আকার প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি মৌসুমে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ২২৮ কোটি টাকা। আর বাস্তবে তা ১০০ কোটি টাকার নিচে বলে ধারণা করা যায়। অথচ বছর চারেক আগেও এই খাতে ব্যাংকঋণ ৪৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।
একাধিক আড়তদার জানিয়েছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আগের বকেয়া না পাওয়ায় তারাও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এই শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল প্রান্তে থাকা মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানা-মাদ্রাসাগুলোই শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাশুল দিচ্ছে।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) মহাসচিব হাজী টিপু সুলতান এ বিষয়ে চরচাকে বলেন, ‘‘বেচাকেনার টাকা নেই। আমাদের ১০০ কোটি টাকা ট্যানারি রেখে দিয়েছে। ট্যানারির লোকজন এই খাত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্যখাতে ব্যয় করে। গেম সব ট্যানারির হাতে।”
সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরেও কাটেনি সংকট
২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় সরকারের ঘোষণা ছিল, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। অথচ প্রকল্পটি শিল্প মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করেছে।
কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না। এই সনদ না থাকায় নাইকি, অ্যাডিডাস, এইচঅ্যান্ডএমের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশি ট্যানারি থেকে সরাসরি পণ্য কেনে না। ফলে চীনের মতো মধ্যস্বত্বভোগী বাজারে কম দামে ওয়েট-ব্লু বা সেমি-প্রসেসড চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। মূল্য সংযোজনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে।
এ সংকটের কারণে সম্ভাবনাময় চামড়া খাত সংকটের আবর্তেই রয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে একেবারে তৃণমূলে। কাঁচা চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বছর বছর আর্থিক মাশুল গোনাটাই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ বৈশ্বিক বাজারে রয়েছে এ খাতের বড় সম্ভাবনা। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটের চলতি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক চামড়ার বাজার ছিল ৫৩ হাজার ১০৭ কোটি মার্কিন ডলারের। চলতি বছর এ বাজারের আকার দাঁড়াবে ৫৬ হাজার ৬২৩ কোটি মার্কিন ডলারে, যা ২০৩৪ সাল নাগাদ হবে ৯৮ হাজার ২৪২ কোটি ডলারের। এ বাজারে ৩৭ দশমিক ৩১ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে ইউরোপ।

এই ৫০ হাজার কোটিরও বেশি বড় বাজার এর মধ্যে ৬২ শতাংশেরও বেশি এখনো প্রাকৃতিক চামড়া। প্রতি বছর দেশে ঈদের সময় প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হয়। চীন ছাড়া এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে ভিয়েতনাম চামড়ার এই বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের চামড়ার বড় উৎস শূকর, কুকুর ও বিড়ালের চামড়া। পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বছরে এর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। এ দিয়েই তারা বৈশ্বিক চামড়ার বাজারের ৫ শতাংশের বেশি দখল করেছে বলে জানাচ্ছে ফরচুন বিজনেস ইনসাইট।
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ ছাড়াও বছরজুড়ে যে পরিমাণ গরু ও খাসির মাংস উৎপাদন হয় এবং এর ফলে যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া পাওয়া যায়, তা বর্গফুট বিবেচনায় সমকক্ষ না হলেও ভিয়েতনামের কাছাকাছি হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ এই বিপুল পরিমাণ চামড়া উৎপন্ন করলেও তা কাজে লাগাতে পারছে না। এর কারণ ঠিক কোথায়?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ চরচাকে বলেন, “সাভারের চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের এক দশক পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়নি। অথচ প্রকল্পটিকে কাগজে-কলমে সমাপ্ত ঘোষণা করে রাখা হয়েছে। এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো আমাদের থেকে সরাসরি পণ্য কিনছে না। ফলে চীনের মতো মধ্যস্বত্বভোগী বাজারে কম দামে চামড়া বিক্রি করে প্রতি বছর আমরা প্রায় ৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি সুযোগ হারাচ্ছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ হওয়ার আগে যদি সিইটিপি আপগ্রেড করা না হয়, তবে পুরো শিল্প খাত ১২ শতাংশ শুল্কের বড় ঝুঁকিতে পড়বে।”
সমাধানহীন সংকট ‘সিন্ডিকেট’
চামড়ার বাজারে ‘সিন্ডিকেট’-এর অভিযোগ বহু পুরনো। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ঈদের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বড় পাইকার ও আড়তদাররা সমন্বিতভাবে কম দামে বাজার খুলে দেন। কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার ভয়ে ছোট ব্যবসায়ীরা সেই দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে নির্দিষ্ট একটি চক্র নামমাত্র মূল্যে বিপুল পরিমাণ চামড়া কিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে ট্যানারি মালিকরা সাধারণত ভিন্ন যুক্তি দেন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে ফিনিশড লেদারের দাম কমেছে, ডলার সংকট ও রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে এবং পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ক্রেতা হারিয়েছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে বেশি দামে কাঁচা চামড়া কেনার সামর্থ্য অনেক ব্যবসায়িরই নেই।
অথচ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু দেশের মোট রপ্তানিতে এই খাতের অংশ মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তুলনায় তৈরি পোশাক খাত একাই ৮৪ শতাংশ রপ্তানি আয় করছে। বাংলাদেশ যে বিপুল কাঁচামাল সরবরাহ করে, তার বিপরীতে এটি অনুল্লেখযোগ্য।
এদিকে বিশ্ববাজারে আরেকটি বিপদও আসছে। ভেগান লেদার ও সিনথেটিক বিকল্পের চাহিদা বছরে ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। ভিয়েতনাম ও ইতালি যেখানে কাঁচা চামড়া থেকে উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডেড পণ্যে রূপান্তর করছে, বাংলাদেশ সেখানে এখনো মূলত নিম্নমানের প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিতেই আটকে আছে। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স না থাকলে এই পিছিয়ে পড়া আরো ত্বরান্বিত হবে।
কাঠামোগত সংস্কার নেই, জোড়াতালিই ভরসা
চামড়া খাতে বিদ্যমান এসব সংকট অনেক দিন ধরেই চলছে। খাতটির সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা এর সমাধান নিয়েও বহুদিন ধরে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু সেসব পরামর্শ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। এর সমাধানে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
প্রতি বছর একই চক্র ঘুরে আসে–সরকার বৈঠক করে, দাম নির্ধারণ করে, ব্যাংকঋণ ঘোষণা করে। কিন্তু ঈদের পরের সপ্তাহে সেই একই চিত্র–ক্ষতিগ্রস্ত মৌসুমি ব্যবসায়ী, অবিক্রিত চামড়া। এই চক্র ভাঙতে হলে যা দরকার, তার তালিকা শিল্প বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই দিচ্ছেন। এগুলোর মধ্যে আছে–
এই পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রতি বছর কোরবানির ঈদ-পরবর্তী সপ্তাহটি একটাই বার্তা দেবে–দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পটি আরেকবারের মতো পিছিয়ে পড়ল। ক্ষতির বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘরে ফিরতে হচ্ছে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা আর এতিমখানাগুলোকে। অথচ কিছু কাঠামোগত সংস্কার করলেই খাতটির তৃণমূল থেকে প্রতিটি স্তরের ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে পারে। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি কার্যকর করাটা শুধু এলডব্লিউজি সনদের জন্যই নয়, নিজেদের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঁচানোর জন্যও জরুরি। ফলে চামড়া শিল্পের কাঠামোগত সংস্কার আসলে দ্বিমুখী সুফল এনে দিতে পারে। একদিকে নদীসহ পরিবেশ দূষণ কমানো এবং অন্যদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি–দুটিই নির্ভর করছে এই কাঠামোগত সংস্কারের ওপর। আগেই বলা হয়েছে, চামড়া শিল্পে রয়েছে বিলিয়ন ডলারের বাজারের হাতছানি।