পর্ব-২
ফজলুল কবির

দেশে ধর্ষণের মতো ঘটনা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে–বললে কি ভুল বলা হবে? মনে হয় না। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টি হয়তো বোঝা যাবে। পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও তোলা দরকার যে, ধর্ষণ বা এ ধরনের ঘটনা আলোড়ন তোলার পর বিচারের দাবির নামে যেসব প্রস্তাব আসছে–তা কি অনেকটা লোকরঞ্জনবাদে আক্রান্ত?
দুটি প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজা যাক। শুরুতে একটু পরিসংখ্যানে চোখ বোলানো যাক। বেশি সূত্র নয়, শুধু একটি সূত্রেই আমরা চোখ রাখার চেষ্টা করব। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, সংক্ষেপে আসক। আসক প্রতি মাসে এবং বছর শেষে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সার্বিক প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন নিয়ে আলাদা অংশ থাকে।
আসকের প্রতিবেদনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিভিন্ন মাধ্যমে আসা খবর ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮১৩ জন নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। একই বছর ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয় ১৮৩ নারী ও কন্যা শিশু। এর মধ্যে ২৮৭ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচে, আর ১২ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ১৮৮। এর মধ্যে মাত্র ৫৫৩টি ঘটনায় মামলা হয়েছিল।
২০১৪ সালে মোট ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬২৬ ও ৮১। এর মধ্যে ১৮ বছরের নিচে ১৯৬ ও ১২ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১৩৪। ছয় বছরের কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ৩৫। ২০১৫ সালে এমন ঘটনা ঘেটেছে মোট ৮৪৬টি। ১২ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ১৬৩। আর ৬ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ৫৩। পরের বছর এমন ঘটনা ঘটেছে ৭৮৯টি। ২০১৭ সালে ৯২২, ২০১৮ সালে ৮৩২, ২০১৯ সালে ১৬৩৭, ২০২০ সালে ১৯৫৩, ২০২১ সালে ১৬১৪, ২০২২ সালে ১০৯৪, ২০২৩ সালে ৭০৩, ২০২৪ সালে ৫১০, ২০২৫ সালে ৯৩২।
আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এমন ঘটনা ঘটেছে ১৬২টি। এর মধ্যে ১৮ বা তারচেয়ে কমবয়সীর সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে ১২ বা তারচেয়ে কমবয়সীর সংখ্যা ৪৩। আর ছয় বা তারচেয়ে কমবয়সী শিশুর সংখ্যা ১১।
এই প্রতিটি বছরই ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১৮ বছর তো বটেই ১২ বছর এমনকি ৬ বছর বা তারচেয়ে কমবয়সী কন্যাশিশুরা। ২০২৪ সালের মধ্যভাগ থেকে দেশ উত্তাল এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ হিসাবটি নেই। এ ছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্র যেহেতু বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রস্তুত করে, সেহেতু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার বহু ঘটনার নাগাল এসব প্রতিবেদনে আসা সম্ভব নয়।
এই যখন হাল, তখন বলতেই হয় যে, ধর্ষণের মতো অপরাধের এক ধরনের স্বাভাবিকীকরণ ঘটে গেছে এই দেশে। এই তালিকায় কে নেই! ৮০ বছরের নারী থেকে ২ বছরের শিশু পর্যন্ত। সর্বশেষ যে ঘটনা নিয়ে দেশের মানুষ আরেকবারের মতো জেগে উঠল, কথা বলতে শুরু করল, বিচারের দাবি জানাল, প্রতিবাদ করল, সে ঘটনায়ও ভুক্তভোগীর বয়স মাত্র ৭। নতুন করে চমকানোর কিছু নেই। কারণ, তালিকার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখলেই বুঝবেন যে, এমন হরহামেশাই হচ্ছে। প্রায় নিত্য। এমনকি এমন প্রতিবাদও প্রায় নিয়মিত বিরতিতে হচ্ছে। এবারের ঘটনার আগের ঘটনার দিকে তাকালেও দেখা যাবে–প্রবল প্রতিবাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক রীতিমতো উত্তপ্ত। একই তরিকায় সাজা ঘোষণা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, অপরাধ, অপরাধের ধরন, নৃশংসতা, এমনকি প্রতিক্রিয়া ও বিচারহীনতা একই আছে। বদল বলে কিছু নেই। ‘বদল’ শব্দটাই যেন অভিধানে আশ্রয় নিয়ে রেখেছে, মাঝেমধ্যে নিতান্ত জেরবার হয়ে মানুষের মুখে একটুখানি জায়গা করে নেওয়ার জন্য, যা কিনা আবার ধরনে আনুষ্ঠানিক। বিবৃতি হচ্ছে, ভুক্তভোগীর জন্য অশ্রু বিসর্জন হচ্ছে, অপরাধীর পিণ্ডি চটকানো হচ্ছে, কবিতা লেখা হচ্ছে, প্রতিবাদী কবিতার আসর ডাকা হচ্ছে, মানববন্ধন হচ্ছে, সভা, সেমিনার হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে, স্কেচ হচ্ছে, চিত্রকলা, শিল্পকলা, স্লোগান ইত্যাকার–যা যা হওয়ার সবই হচ্ছে। সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ডিপি বদল থেকে শুরু করে বাগ্বিতণ্ডা থেকে শুরু করে ব্লক ও আনফ্রেন্ড সব হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ, মতামত লেখা, ভিডিও, টক–শো এসব কোনো কিছুই বাদ নেই। তারপর দীর্ঘ দম। এত কি আর পারা যায়! যায় না। অবশেষে প্রতিবাদীরা নজর ঘোরায়। কিন্তু সমাধান? সে দূর অস্তই থেকে যায়।
কেন? এই এত এত প্রতিবাদ, এত এত ধর্ষণবিরোধী মানুষ, এত এত সোচ্চার কণ্ঠ কোথায় হেরে যাচ্ছে তবে? দেশের সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে প্রশাসন, প্রভাবশালী রাজনীতিক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী, কবি ও কেরানি–সবাই যদি ধর্ষণবিরোধী হয়, তবে পরিসংখ্যানের খাতায় ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা–এগুলো করছে কে?
এ প্রশ্নের দুটি উত্তর হতে পারে। এক, সমাজের নানা স্তর থেকে উঠে আসা এই সব ধর্ষণবিরোধী কণ্ঠ আসলে সমাজে কোনো প্রভাবই রাখে না। অথবা দুই, এই ধর্ষণবিরোধী কণ্ঠস্বরগুলোর একটা বড় অংশই মেকী, ভুয়া। এসব কণ্ঠ ও উচ্চারণ ভাঁওতা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রথমটিকে সত্য মানবার কোনো সুযোগ কি আছে? সামাজিক থেকে সংবাদমাধ্যম যেখানেই তাকানো যাক–একটা বড় অংশ যদি ধর্ষণবিরোধী হয়, তাহলে তাদের প্রভাব তো সামাজিক পরিসরে থাকার কথা। নেই কেন? এখানেই দ্বিতীয় বিকল্পটি বাস্তব এবং ভয়ঙ্কর রকম সত্য হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, যারা প্রকাশ্যে ধর্ষণবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন, পুরনো পন্থায় এমনকি অপরাধীকে শূলে চড়ানোর মতো শাস্তির বিধান দিচ্ছেন রাগত বা নির্লিপ্তভাবে, তাদের অনেকেই আসলে সময়ের প্রয়োজনে এই ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য যথাযথ মুখোশটি পরে নিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার জমানায় ভাইরাল একটি বিষয়ের সঙ্গে থাকবার লোভে নিজের পোশাকটি বদলে নিয়েছেন। এটা অনেকটা এই সেদিনের–‘কী রাগ করলা’র মতো ভাইরাল বিষয় ছাড়া তাদের কাছে আর কিছুই নয়। এটা যে সবাই বুঝেশুনে করছেন, এমন হয়তো নয়। হয়তো অনেকেই নিজের অজান্তে ধর্ষণবিরোধী অবস্থানটি নিয়ে স্রোতের সঙ্গে থাকতে চাইছেন।
বিষয়টা আর কিছুই নয়, লোকরঞ্জনবাদ, ইংরেজিতে পপুলিজম। ধর্ষণের সমর্থন যদি পপুলার হয়, এবং তাতে সোশ্যাল এলগরিদমের সায় থাকে–এদের অনেকেই হয়তো সেই স্রোতেও গা ভাসাবেন। আর এই প্রবণতা আমাদের দাবি বা আন্দোলন বা প্রতিবাদগুলোকে যত বড় দেখায়–আদতে তা তত বড় হয়ে ওঠে না। বড় হয় না বলেই বছরে অন্তত চার–পাঁচবার তোলপাড় তুলেও আদতে কিছুই বদলায় না। না হলে সমাজের নানা স্তর থেকে উঠে আসা এসব কণ্ঠের উৎস হিসেবে থাকা ব্যক্তিটিই তো তার তার অঞ্চলের বা তার তার পরিসরে একটা সুস্থ পরিবেশ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারত। সেই ভূমিকা যে নেই, তা আসকের প্রতিবেদন বা সংবাদপত্রের পাতামাত্রই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এক কথায় লোকরঞ্জনবাদ বা পপুলিজম আছে বলেই ধর্ষণের মতো অপরাধ ও তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বাস্তব ও ভার্চ্যুয়াল পরিসরে একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে। এমন আলাপ যদি আপনার মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, তবে আয়নার সামনে দাঁড়ান, নিজের চর্চা ও ভাবনার দিকে পূর্ণ চোখে তাকান।
চলবে...
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

দেশে ধর্ষণের মতো ঘটনা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে–বললে কি ভুল বলা হবে? মনে হয় না। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টি হয়তো বোঝা যাবে। পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও তোলা দরকার যে, ধর্ষণ বা এ ধরনের ঘটনা আলোড়ন তোলার পর বিচারের দাবির নামে যেসব প্রস্তাব আসছে–তা কি অনেকটা লোকরঞ্জনবাদে আক্রান্ত?
দুটি প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজা যাক। শুরুতে একটু পরিসংখ্যানে চোখ বোলানো যাক। বেশি সূত্র নয়, শুধু একটি সূত্রেই আমরা চোখ রাখার চেষ্টা করব। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, সংক্ষেপে আসক। আসক প্রতি মাসে এবং বছর শেষে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সার্বিক প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন নিয়ে আলাদা অংশ থাকে।
আসকের প্রতিবেদনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিভিন্ন মাধ্যমে আসা খবর ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮১৩ জন নারী ও কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। একই বছর ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয় ১৮৩ নারী ও কন্যা শিশু। এর মধ্যে ২৮৭ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচে, আর ১২ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ১৮৮। এর মধ্যে মাত্র ৫৫৩টি ঘটনায় মামলা হয়েছিল।
২০১৪ সালে মোট ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬২৬ ও ৮১। এর মধ্যে ১৮ বছরের নিচে ১৯৬ ও ১২ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১৩৪। ছয় বছরের কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ৩৫। ২০১৫ সালে এমন ঘটনা ঘেটেছে মোট ৮৪৬টি। ১২ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ১৬৩। আর ৬ বা তারচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল ৫৩। পরের বছর এমন ঘটনা ঘটেছে ৭৮৯টি। ২০১৭ সালে ৯২২, ২০১৮ সালে ৮৩২, ২০১৯ সালে ১৬৩৭, ২০২০ সালে ১৯৫৩, ২০২১ সালে ১৬১৪, ২০২২ সালে ১০৯৪, ২০২৩ সালে ৭০৩, ২০২৪ সালে ৫১০, ২০২৫ সালে ৯৩২।
আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এমন ঘটনা ঘটেছে ১৬২টি। এর মধ্যে ১৮ বা তারচেয়ে কমবয়সীর সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে ১২ বা তারচেয়ে কমবয়সীর সংখ্যা ৪৩। আর ছয় বা তারচেয়ে কমবয়সী শিশুর সংখ্যা ১১।
এই প্রতিটি বছরই ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১৮ বছর তো বটেই ১২ বছর এমনকি ৬ বছর বা তারচেয়ে কমবয়সী কন্যাশিশুরা। ২০২৪ সালের মধ্যভাগ থেকে দেশ উত্তাল এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ হিসাবটি নেই। এ ছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্র যেহেতু বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রস্তুত করে, সেহেতু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার বহু ঘটনার নাগাল এসব প্রতিবেদনে আসা সম্ভব নয়।
এই যখন হাল, তখন বলতেই হয় যে, ধর্ষণের মতো অপরাধের এক ধরনের স্বাভাবিকীকরণ ঘটে গেছে এই দেশে। এই তালিকায় কে নেই! ৮০ বছরের নারী থেকে ২ বছরের শিশু পর্যন্ত। সর্বশেষ যে ঘটনা নিয়ে দেশের মানুষ আরেকবারের মতো জেগে উঠল, কথা বলতে শুরু করল, বিচারের দাবি জানাল, প্রতিবাদ করল, সে ঘটনায়ও ভুক্তভোগীর বয়স মাত্র ৭। নতুন করে চমকানোর কিছু নেই। কারণ, তালিকার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখলেই বুঝবেন যে, এমন হরহামেশাই হচ্ছে। প্রায় নিত্য। এমনকি এমন প্রতিবাদও প্রায় নিয়মিত বিরতিতে হচ্ছে। এবারের ঘটনার আগের ঘটনার দিকে তাকালেও দেখা যাবে–প্রবল প্রতিবাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক রীতিমতো উত্তপ্ত। একই তরিকায় সাজা ঘোষণা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, অপরাধ, অপরাধের ধরন, নৃশংসতা, এমনকি প্রতিক্রিয়া ও বিচারহীনতা একই আছে। বদল বলে কিছু নেই। ‘বদল’ শব্দটাই যেন অভিধানে আশ্রয় নিয়ে রেখেছে, মাঝেমধ্যে নিতান্ত জেরবার হয়ে মানুষের মুখে একটুখানি জায়গা করে নেওয়ার জন্য, যা কিনা আবার ধরনে আনুষ্ঠানিক। বিবৃতি হচ্ছে, ভুক্তভোগীর জন্য অশ্রু বিসর্জন হচ্ছে, অপরাধীর পিণ্ডি চটকানো হচ্ছে, কবিতা লেখা হচ্ছে, প্রতিবাদী কবিতার আসর ডাকা হচ্ছে, মানববন্ধন হচ্ছে, সভা, সেমিনার হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে, স্কেচ হচ্ছে, চিত্রকলা, শিল্পকলা, স্লোগান ইত্যাকার–যা যা হওয়ার সবই হচ্ছে। সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ডিপি বদল থেকে শুরু করে বাগ্বিতণ্ডা থেকে শুরু করে ব্লক ও আনফ্রেন্ড সব হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ, মতামত লেখা, ভিডিও, টক–শো এসব কোনো কিছুই বাদ নেই। তারপর দীর্ঘ দম। এত কি আর পারা যায়! যায় না। অবশেষে প্রতিবাদীরা নজর ঘোরায়। কিন্তু সমাধান? সে দূর অস্তই থেকে যায়।
কেন? এই এত এত প্রতিবাদ, এত এত ধর্ষণবিরোধী মানুষ, এত এত সোচ্চার কণ্ঠ কোথায় হেরে যাচ্ছে তবে? দেশের সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার থেকে শুরু করে প্রশাসন, প্রভাবশালী রাজনীতিক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী, কবি ও কেরানি–সবাই যদি ধর্ষণবিরোধী হয়, তবে পরিসংখ্যানের খাতায় ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা–এগুলো করছে কে?
এ প্রশ্নের দুটি উত্তর হতে পারে। এক, সমাজের নানা স্তর থেকে উঠে আসা এই সব ধর্ষণবিরোধী কণ্ঠ আসলে সমাজে কোনো প্রভাবই রাখে না। অথবা দুই, এই ধর্ষণবিরোধী কণ্ঠস্বরগুলোর একটা বড় অংশই মেকী, ভুয়া। এসব কণ্ঠ ও উচ্চারণ ভাঁওতা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রথমটিকে সত্য মানবার কোনো সুযোগ কি আছে? সামাজিক থেকে সংবাদমাধ্যম যেখানেই তাকানো যাক–একটা বড় অংশ যদি ধর্ষণবিরোধী হয়, তাহলে তাদের প্রভাব তো সামাজিক পরিসরে থাকার কথা। নেই কেন? এখানেই দ্বিতীয় বিকল্পটি বাস্তব এবং ভয়ঙ্কর রকম সত্য হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, যারা প্রকাশ্যে ধর্ষণবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন, পুরনো পন্থায় এমনকি অপরাধীকে শূলে চড়ানোর মতো শাস্তির বিধান দিচ্ছেন রাগত বা নির্লিপ্তভাবে, তাদের অনেকেই আসলে সময়ের প্রয়োজনে এই ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য যথাযথ মুখোশটি পরে নিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার জমানায় ভাইরাল একটি বিষয়ের সঙ্গে থাকবার লোভে নিজের পোশাকটি বদলে নিয়েছেন। এটা অনেকটা এই সেদিনের–‘কী রাগ করলা’র মতো ভাইরাল বিষয় ছাড়া তাদের কাছে আর কিছুই নয়। এটা যে সবাই বুঝেশুনে করছেন, এমন হয়তো নয়। হয়তো অনেকেই নিজের অজান্তে ধর্ষণবিরোধী অবস্থানটি নিয়ে স্রোতের সঙ্গে থাকতে চাইছেন।
বিষয়টা আর কিছুই নয়, লোকরঞ্জনবাদ, ইংরেজিতে পপুলিজম। ধর্ষণের সমর্থন যদি পপুলার হয়, এবং তাতে সোশ্যাল এলগরিদমের সায় থাকে–এদের অনেকেই হয়তো সেই স্রোতেও গা ভাসাবেন। আর এই প্রবণতা আমাদের দাবি বা আন্দোলন বা প্রতিবাদগুলোকে যত বড় দেখায়–আদতে তা তত বড় হয়ে ওঠে না। বড় হয় না বলেই বছরে অন্তত চার–পাঁচবার তোলপাড় তুলেও আদতে কিছুই বদলায় না। না হলে সমাজের নানা স্তর থেকে উঠে আসা এসব কণ্ঠের উৎস হিসেবে থাকা ব্যক্তিটিই তো তার তার অঞ্চলের বা তার তার পরিসরে একটা সুস্থ পরিবেশ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারত। সেই ভূমিকা যে নেই, তা আসকের প্রতিবেদন বা সংবাদপত্রের পাতামাত্রই সাক্ষ্য দিচ্ছে। এক কথায় লোকরঞ্জনবাদ বা পপুলিজম আছে বলেই ধর্ষণের মতো অপরাধ ও তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বাস্তব ও ভার্চ্যুয়াল পরিসরে একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে। এমন আলাপ যদি আপনার মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, তবে আয়নার সামনে দাঁড়ান, নিজের চর্চা ও ভাবনার দিকে পূর্ণ চোখে তাকান।
চলবে...
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা