Advertisement Banner

ঈদে ঢাকাবাসীর বিনোদন: প্রকৃতির টান নাকি রেস্টুরেন্টের আড্ডা?

ঈদে ঢাকাবাসীর বিনোদন: প্রকৃতির টান নাকি রেস্টুরেন্টের আড্ডা?
ছবি: চরচা

ঢাকা সিটির উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দিয়াবাড়ি একসময় ছিল কাশফুলে ঘেরা নির্জন প্রান্তর। দিনের বেলাতেও যেখানে মানুষের আনাগোনা ছিল সীমিত, সেই এলাকাই এখন রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মেট্রোরেল, নতুন সড়ক যোগাযোগ, লেকসাইড উন্নয়ন এবং কায়াকিংসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রমের কারণে ঈদের ছুটিতে এখানে দেখা গেছে হাজার মানুষের ঢল।

পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কিছুটা স্বস্তির সময় কাটাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন দিয়াবাড়িতে। লেকের ধারে হাঁটাহাঁটি, কায়াকিং, শিশুদের খেলাধুলা ও ছবি তোলার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রিয়াদ আরাফাত বলেন, “সারা বছর অফিসের কাজ আর যানজটের ভেতরেই সময় কেটে যায়। রেস্টুরেন্টে গেলে শুধু খাওয়া-দাওয়া হয়, কিন্তু এখানে এসে মনে হয় সত্যিকারের একটু মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি। সব সময় চার দেয়ালের মধ্যে থাকতে থাকতে এক ধরনের একঘেয়েমি চলে আসে।”

দিয়াবাড়িতে ঘুরে দেখা যায়, এখানে আসা দর্শনার্থীদের বড় একটি অংশ স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের সদস্য। তাদের অনেকেই মনে করেন, বিনোদন মানেই ব্যয়বহুল খাবার নয়; বরং পরিবারকে সময় দেওয়া, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা এবং সন্তানদের নিয়ে খোলা পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো।

দর্শনার্থী গোলাম মহিউদ্দিন বলেন, “রেস্টুরেন্টে গিয়ে কয়েক হাজার টাকা খরচ করার চেয়ে এখানে এসে পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে বেশি ভালো লাগে। খোলা বাতাস আছে, বাচ্চারা খেলতে পারে, মনটাও ভালো হয়ে যায়।”

তবে রাজধানীর অন্য একটি চিত্রও রয়েছে। উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেগুলোতেও ভিড় বেশি থাকে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে রেস্টুরেন্ট এখন শুধু খাবারের জায়গা নয়; বরং আড্ডা, ছবি তোলা এবং অবসর কাটানোর একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।

উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট। ছবি: চরচা
উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট। ছবি: চরচা

উত্তরার এক রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রাকিব আহমেদ বলেন, “ঈদের ছুটিতে বসার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। অনেকেই মূলত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং ছবি তুলতে আসেন। খাবারের পাশাপাশি এখন রেস্টুরেন্টের পরিবেশও বড় আকর্ষণ।”

তার ভাষ্য, অনেক গ্রাহক আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেস্টুরেন্টের ইন্টেরিয়র দেখে আসেন। সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড ও ছবি তোলার সুযোগ থাকলে সেই জায়গার জনপ্রিয়তাও বাড়ে।

রেস্টুরেন্টে সময় কাটাতে আসা এক তরুণী সানজিদা শায়লা বলেন, “স্পেশাল দিনগুলোতে বাইরে যেতে না পারলে মন খারাপ হয়। আবার রোদে পুড়ে কোথাও ঘুরতেও ভালো লাগে না। তাই রেস্টুরেন্টে এসে সময় কাটাই, ভালো ছবি তুলি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করি তাতেই মন ভালো হয়ে যায়।’’

এই তরুণী আরো বলেন, “খাওয়ার পাশাপাশি ছবি তোলাও এখন আউটিংয়ের অংশ হয়ে গেছে। অনেক সময় আমরা জায়গা নির্বাচন করি পরিবেশ ও ইন্টেরিয়র দেখে। ছবির তোলার মতো উপযুক্ত না হলে আবার আশেপাশের অন্য রেস্টুরেন্টে চলে যাই।’’

উত্তরার আরেকটি রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সারাদিনের ব্যস্ততার পর আরাম করে বসে গল্প করা, নতুন ধরনের খাবার খাওয়া এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোই আমাদের কাছে বিনোদন। এসি পরিবেশে বসে কয়েক ঘণ্টা গল্প করাও এক ধরনের স্বস্তি।”

তবে অনেকেই মনে করছেন, রাজধানীতে উন্মুক্ত বিনোদন স্থানের অভাব মানুষকে ক্রমেই রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিক স্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলিফ বিন সাঈফ বলেন, “ঢাকায় পার্ক, খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে কিংবা শপিংমলকেই বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে।”

অন্যদিকে, দিয়াবাড়ির কায়াকিং জোনে টঙ্গী থেকে ঘুরতে আসা এক শিক্ষার্থী সাজ্জাদ নাঈম বলেন, “ঢাকার মধ্যে এত বড় খোলা জায়গা খুব কম পাওয়া যায়। এখানে এসে অন্তত মনে হয় শহরের চাপটা কিছুটা কমে যায়।”

দিয়াবাড়ির উন্মুক্ত লেকের পাড়। ছবি: চরচা
দিয়াবাড়ির উন্মুক্ত লেকের পাড়। ছবি: চরচা

ঈদের ছুটিতে দিয়াবাড়ির উন্মুক্ত লেকের পাড় আর উত্তরার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টগুলোর এই বিপরীত চিত্র আসলে ঢাকার সমসাময়িক বিনোদন সংস্কৃতিরই দুই পিঠ। যান্ত্রিক এই নগরে একদিকে যেমন মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের অন্তহীন আকুতি একটু খোলা বাতাস আর প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়ার, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে বিনোদনের সংজ্ঞা হয়ে উঠছে নান্দনিক ইনডোর পরিবেশ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। তবে বাস্তবতা হলো, মানুষের এই রেস্টুরেন্টমুখী হওয়া কেবলই পছন্দের বিষয় নয়, বরং রাজধানীতে পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের তীব্র সংকটের এক অনিবার্য ফল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে তাই দিয়াবাড়ির মতো আরও বেশি উন্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্রের বিকাশ যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন চেনা রেস্টুরেন্টের চেনা আড্ডার টেবিলও। এই দুইয়ে মিলেই অবয়ব পাচ্ছে ঢাকাবাসীর নতুন উৎসব-সংস্কৃতি।

সম্পর্কিত