চরচা ডেস্ক

২০২২ সালে চ্যাটজিপিটির আত্মপ্রকাশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দুনিয়ায় এক বিশাল জোয়ার নিয়ে আসে। এর পাশাপাশি এআই খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুখ থেকে এক ভীতি জাগানিয়া সতর্কবার্তাও শোনা যায়-চাকরির বাজারে আসছে এক মহাবিপর্যয়।
বার্তাটি সাধারণ মানুষের মনে বেশ ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে। ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দশজন আমেরিকানের মধ্যে সাতজনই মনে করেন, এআই-এর কারণে মানুষের কাজ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিজের চাকরিটা হারানোর ভয়ে আছেন। বিশেষ করে কলেজ গ্র্যাজুয়েট কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের জন্য নতুন চাকরির তীব্র অভাব এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে অতীত আমাদের এই উদ্বেগে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। শ্রমবাজার সবসময়ই পরিবর্তনশীল। আজকের দিনের কোনো অফিস যদি ৫০ বছর আগের কোনো কর্মী দেখেন, তবে তিনি তা চিনতেই পারবেন না। আধুনিক ইতিহাসে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কখনোই মানুষের শ্রমের সামগ্রিক চাহিদাকে ধ্বংস করেনি। অর্থনৈতিক ঐতিহাসিকরা এখন ‘এঙ্গেলস পজ’-এর তীব্রতাকে এ তুলনায় কমই দেখেন।
এঙ্গেলস পজ শিল্প বিপ্লবের সময়কে বোঝায়-যখন উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় আয় দ্রুত বাড়লেও সাধারণ শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি দীর্ঘ সময় ধরে আগের মতোই ছিল। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এই ধারণাটি দিয়েছিলেন। তিনি ১৮৪০-এর দশকে ম্যানচেস্টারের বস্তির অবস্থা তুলে ধরে শ্রমিকদের দুর্দশার বর্ণনা করেছিলেন।
বর্তমানের শীর্ষ এআই মডেলগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য। মানুষ এক বছর আগে যা অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল কোডিংয়ের কাজ এগুলো এখন নিমেষেই সমাধান করতে পারে। এআই এজেন্টের সংখ্যা এখন দ্রুত হারে বাড়ছে। ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে এআই-এর পেছনে খরচ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, খ্যাতনামা এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর নিয়মিত বার্ষিক আয় আগামী জুনের শেষ নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
যদিও শ্রমবাজারের বর্তমান উপাত্তে এআই-এর কারণে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি, তবে এটি যেভাবে দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তাতে চাকরি হারানোর ভয়কে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াটা হবে হঠকারিতা। বর্তমান সমাজ হয়তো সম্পদ ও ক্ষমতার এক গভীর পুনর্বণ্টন এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্বাস, ‘কাজ সবসময়ই থাকবে’– কথাটি যতটা আশাব্যঞ্জক শোনায়, দীর্ঘমেয়াদে আসলে ততটা নয়। মডেল এবং রোবট যতই দক্ষ হয়ে উঠুক না কেন, বাজার হয়তো মানুষের শ্রমের কোনো না কোনো ব্যবহার খুঁজে নেবে। কিন্তু সেই কাজের মান কেমন হবে এবং সেখান থেকে কেমন মজুরি পাওয়া যাবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আমেরিকার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪ দশমিক ১ শতাংশ ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে খরচ হতো, যা ২০২৭ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে। যেহেতু এআই কোম্পানিগুলো জমি এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেবে, তাই মানুষের উপার্জিত ডলারের প্রকৃত মূল্য কমে যাবে। একসময় মোটরগাড়ির যুগে এসে ঘোড়া যেভাবে অকেজো হয়ে পড়েছিল, মানুষও হয়তো এআই-এর যুগে এসে অর্থনৈতিকভাবে ঠিক তেমনি মূল্যহীন হয়ে পড়তে পারে। সমস্ত আয় হয়তো গিয়ে জমা হবে পুঁজির মালিকদের পকেটে। যারা হয়তো প্রাকৃতিক সম্পদের একচেটিয়া ব্যবহার নিশ্চিত করে সেই অর্থ এআই ও রোবটের মাধ্যমে উৎপাদিত নানা পণ্যের পেছনে বিনিয়োগ করবে।

এই ভয়াবহ নৈরাজ্যের আশঙ্কা দেখেই সিলিকন ভ্যালির কর্তারা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং সম্ভবত একটি ‘সার্বজনীন মৌলিক আয়’-এর প্রয়োজন হবে। এটি এমন একটি সামাজিক কল্যাণ ধারণা, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান বা আয় নির্বিশেষে নিয়মিতভাবে সরকার থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নিঃশর্ত অর্থ পেয়ে থাকেন।
যদিও তা বাস্তবায়ন হওয়া এখনো অনেক দূরের কথা। তবে সরকারদের হয়তো এর আগেই পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ গণ-অসন্তোষ বা জনগণের ক্ষোভ উস্কে দেওয়ার জন্য কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার প্রয়োজন পড়ে না। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় চীনের প্রবেশের কারণে প্রায় ২০ লাখ আমেরিকান চাকরি হারিয়েছিলেন। আমেরিকার গতিশীল শ্রমবাজারে সাধারণত প্রতি মাসে যে পরিমাণ ছাঁটাই হয়, সেই তুলনায় এটি খুব বড় কিছু ছিল না। তবুও, এই ধাক্কা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করেছিল এবং ১৯৩০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করেছিল।
যে উচ্চপদস্থ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাজীবীরা আজ এআই-এর কারণে হুমকিতে পড়েছেন, চীনা প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কারখানার শ্রমিকদের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি। এমনকি অল্প কিছু কর্মী ছাঁটাই হলেও এই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে। নতুন ডেটা সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া চরম প্রতিরোধই ইঙ্গিত দেয় সামনে কী আসতে চলেছে। বহু মানুষের নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর বড় ধরনের আঘাত ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, এমনকি বিপ্লবের রূপ নিতে পারে।
এমতাবস্থায় সরকারের কী করা উচিত?
একটি উপায় হতে পারে এই পরিবর্তনের গতিকে ধীর করে দেওয়া। চীন তার কোম্পানিগুলোকে এআই গ্রহণ করতে উৎসাহিত করলেও, কর্মী ছাঁটাই করতে নিষেধ করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা পুঁজির ওপর উচ্চ কর এবং শ্রমের ওপর কম কর ধার্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিছু আন্দোলনকারী ডেটা সেন্টারগুলোর ওপর লেভি (বিশেষ কর) আরোপের দাবি তুলছেন। তবে প্রযুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করা মোটেও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এআই থেকে মানবজাতি বিপুল সুবিধা পেতে চলেছে। শুধু যে সম্পদ বাড়বে তা-ই নয়, রোগব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্যের মতো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের পথও সহজ হবে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডে যদি ‘লুডাইট’রা (যারা প্রযুক্তি বিরোধী ছিলেন) টেক্সটাইল মিলগুলোর স্বয়ংক্রিয়করণ বন্ধ করে দিত, তবে আজকের পৃথিবী অনেক পিছিয়ে থাকত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর কর্মীবাহিনীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে, শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলে চলবে না।
এর তুলনায় দ্বিতীয় ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। কর্মসংস্থান কমে গেলে যে আয় একসময় শ্রমিকদের হাতে যেত, তা তখন এআই কোম্পানি, চিপ নির্মাতা, ডেটা সেন্টার কিংবা এই সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্য অংশে অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে জমা হবে।
সুচিন্তিত কর সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র সেই অতিরিক্ত লাভের একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। একই সঙ্গে, সীমিত একটি পুঁজিধারী এলিট শ্রেণীর হাতে সম্পদ ও ক্ষমতা যাওয়া ঠেকাতে উত্তরাধিকার কর আরোপের যৌক্তিকতাও এখন আগের চেয়ে আরও জোরালো।

একই সময়ে সরকার শ্রমিকদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। পাবলিক ওয়েজ-ইন্সুরেন্স, যা চাকরি হারানোর পর হুট করে কমে যাওয়া আয়কে সামাল দেয়, তা শ্রমিকদের নতুন এবং ভালো সুযোগ খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। ডেনমার্কের সক্রিয় শ্রমবাজার নীতি বেকারত্বের অভিশাপ দূর করতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত, যেখানে রাষ্ট্র মানুষকে নতুন পেশা খুঁজে পেতে এবং প্রশিক্ষণ নিতে সরাসরি সাহায্য করে।
এআই থাকুক বা না থাকুক, এই পরিকল্পনাগুলো অর্থনীতিকে আরও দক্ষ এবং ন্যায়সঙ্গত করে তুলবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তিগত সংস্কারগুলো কি অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে পারবে? বর্তমানের পপুলিস্ট রাজনীতিতে টেকনোক্র্যাটিক (প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক) সংস্কার সহজে কেউ গিলতে চায় না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর কর্মীবাহিনীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে, শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলে চলবে না।
সে কারণেই কিছু চরম ও আমূল পরিবর্তনকারী ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে, যেমন–এআই ফার্মগুলোকে আংশিক জাতীয়করণ করা। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার একজন রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা এআই ব্যবসা থেকে নাগরিকদের জন্য একটি ‘ডিভিডেন্ড’ বা লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, যার ফলে স্থানীয় শেয়ারবাজার ৫% পড়ে যায়, যদিও পরে তিনি নিজের বক্তব্য গুটিয়ে নেন। আমেরিকাতেও রাজনীতিবিদরা ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের এআই কোম্পানির শেয়ার দেওয়ার বিষয়ে ফিসফাস করছেন।
অর্থনৈতিক পরিভাষায়, একটি সুপরিকল্পিত কর ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতে সরকারের অংশীদারত্বের মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। আর যেসব দেশের নিজস্ব কোনো এআই জায়ান্ট (যেমন গুগল, ওপেনএআই) নেই, তাদের বিদেশি কোম্পানির শেয়ার কেড়ে নেওয়ার বদলে করের ওপরই ভরসা করতে হবে।
এই একচেটিয়া মুনাফার পাহাড় ভাঙার লড়াইটা শুরুতেই করতে হবে, নতুবা এই পুঁজিপতিদের ক্ষমতা একসময় অজেয় হয়ে উঠবে। চাকরির মহাবিপর্যয় হয়তো এখনো পুরোপুরি আসেনি। কিন্তু সরকার যদি চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়ার জন্য বসে থাকে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতে দেরি করে, তবে ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। তাই শুরুটা এখনই করা শ্রেয়।
(লেখাটি দ্য ইকোনমিস্ট থেকে নেওয়া)

২০২২ সালে চ্যাটজিপিটির আত্মপ্রকাশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দুনিয়ায় এক বিশাল জোয়ার নিয়ে আসে। এর পাশাপাশি এআই খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুখ থেকে এক ভীতি জাগানিয়া সতর্কবার্তাও শোনা যায়-চাকরির বাজারে আসছে এক মহাবিপর্যয়।
বার্তাটি সাধারণ মানুষের মনে বেশ ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে। ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দশজন আমেরিকানের মধ্যে সাতজনই মনে করেন, এআই-এর কারণে মানুষের কাজ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিজের চাকরিটা হারানোর ভয়ে আছেন। বিশেষ করে কলেজ গ্র্যাজুয়েট কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের জন্য নতুন চাকরির তীব্র অভাব এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে অতীত আমাদের এই উদ্বেগে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। শ্রমবাজার সবসময়ই পরিবর্তনশীল। আজকের দিনের কোনো অফিস যদি ৫০ বছর আগের কোনো কর্মী দেখেন, তবে তিনি তা চিনতেই পারবেন না। আধুনিক ইতিহাসে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কখনোই মানুষের শ্রমের সামগ্রিক চাহিদাকে ধ্বংস করেনি। অর্থনৈতিক ঐতিহাসিকরা এখন ‘এঙ্গেলস পজ’-এর তীব্রতাকে এ তুলনায় কমই দেখেন।
এঙ্গেলস পজ শিল্প বিপ্লবের সময়কে বোঝায়-যখন উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় আয় দ্রুত বাড়লেও সাধারণ শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি দীর্ঘ সময় ধরে আগের মতোই ছিল। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এই ধারণাটি দিয়েছিলেন। তিনি ১৮৪০-এর দশকে ম্যানচেস্টারের বস্তির অবস্থা তুলে ধরে শ্রমিকদের দুর্দশার বর্ণনা করেছিলেন।
বর্তমানের শীর্ষ এআই মডেলগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য। মানুষ এক বছর আগে যা অনুমান করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল কোডিংয়ের কাজ এগুলো এখন নিমেষেই সমাধান করতে পারে। এআই এজেন্টের সংখ্যা এখন দ্রুত হারে বাড়ছে। ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে এআই-এর পেছনে খরচ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, খ্যাতনামা এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর নিয়মিত বার্ষিক আয় আগামী জুনের শেষ নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
যদিও শ্রমবাজারের বর্তমান উপাত্তে এআই-এর কারণে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি, তবে এটি যেভাবে দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তাতে চাকরি হারানোর ভয়কে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াটা হবে হঠকারিতা। বর্তমান সমাজ হয়তো সম্পদ ও ক্ষমতার এক গভীর পুনর্বণ্টন এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্বাস, ‘কাজ সবসময়ই থাকবে’– কথাটি যতটা আশাব্যঞ্জক শোনায়, দীর্ঘমেয়াদে আসলে ততটা নয়। মডেল এবং রোবট যতই দক্ষ হয়ে উঠুক না কেন, বাজার হয়তো মানুষের শ্রমের কোনো না কোনো ব্যবহার খুঁজে নেবে। কিন্তু সেই কাজের মান কেমন হবে এবং সেখান থেকে কেমন মজুরি পাওয়া যাবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আমেরিকার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪ দশমিক ১ শতাংশ ডেটা সেন্টারগুলোর পেছনে খরচ হতো, যা ২০২৭ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে। যেহেতু এআই কোম্পানিগুলো জমি এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেবে, তাই মানুষের উপার্জিত ডলারের প্রকৃত মূল্য কমে যাবে। একসময় মোটরগাড়ির যুগে এসে ঘোড়া যেভাবে অকেজো হয়ে পড়েছিল, মানুষও হয়তো এআই-এর যুগে এসে অর্থনৈতিকভাবে ঠিক তেমনি মূল্যহীন হয়ে পড়তে পারে। সমস্ত আয় হয়তো গিয়ে জমা হবে পুঁজির মালিকদের পকেটে। যারা হয়তো প্রাকৃতিক সম্পদের একচেটিয়া ব্যবহার নিশ্চিত করে সেই অর্থ এআই ও রোবটের মাধ্যমে উৎপাদিত নানা পণ্যের পেছনে বিনিয়োগ করবে।

এই ভয়াবহ নৈরাজ্যের আশঙ্কা দেখেই সিলিকন ভ্যালির কর্তারা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং সম্ভবত একটি ‘সার্বজনীন মৌলিক আয়’-এর প্রয়োজন হবে। এটি এমন একটি সামাজিক কল্যাণ ধারণা, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক তাদের কর্মসংস্থান বা আয় নির্বিশেষে নিয়মিতভাবে সরকার থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নিঃশর্ত অর্থ পেয়ে থাকেন।
যদিও তা বাস্তবায়ন হওয়া এখনো অনেক দূরের কথা। তবে সরকারদের হয়তো এর আগেই পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ গণ-অসন্তোষ বা জনগণের ক্ষোভ উস্কে দেওয়ার জন্য কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার প্রয়োজন পড়ে না। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় চীনের প্রবেশের কারণে প্রায় ২০ লাখ আমেরিকান চাকরি হারিয়েছিলেন। আমেরিকার গতিশীল শ্রমবাজারে সাধারণত প্রতি মাসে যে পরিমাণ ছাঁটাই হয়, সেই তুলনায় এটি খুব বড় কিছু ছিল না। তবুও, এই ধাক্কা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করেছিল এবং ১৯৩০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করেছিল।
যে উচ্চপদস্থ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাজীবীরা আজ এআই-এর কারণে হুমকিতে পড়েছেন, চীনা প্রতিযোগিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কারখানার শ্রমিকদের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি। এমনকি অল্প কিছু কর্মী ছাঁটাই হলেও এই প্রযুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে। নতুন ডেটা সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া চরম প্রতিরোধই ইঙ্গিত দেয় সামনে কী আসতে চলেছে। বহু মানুষের নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর বড় ধরনের আঘাত ব্যাপক বিশৃঙ্খলা, এমনকি বিপ্লবের রূপ নিতে পারে।
এমতাবস্থায় সরকারের কী করা উচিত?
একটি উপায় হতে পারে এই পরিবর্তনের গতিকে ধীর করে দেওয়া। চীন তার কোম্পানিগুলোকে এআই গ্রহণ করতে উৎসাহিত করলেও, কর্মী ছাঁটাই করতে নিষেধ করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা পুঁজির ওপর উচ্চ কর এবং শ্রমের ওপর কম কর ধার্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিছু আন্দোলনকারী ডেটা সেন্টারগুলোর ওপর লেভি (বিশেষ কর) আরোপের দাবি তুলছেন। তবে প্রযুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করা মোটেও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এআই থেকে মানবজাতি বিপুল সুবিধা পেতে চলেছে। শুধু যে সম্পদ বাড়বে তা-ই নয়, রোগব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্যের মতো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের পথও সহজ হবে। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডে যদি ‘লুডাইট’রা (যারা প্রযুক্তি বিরোধী ছিলেন) টেক্সটাইল মিলগুলোর স্বয়ংক্রিয়করণ বন্ধ করে দিত, তবে আজকের পৃথিবী অনেক পিছিয়ে থাকত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর কর্মীবাহিনীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে, শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলে চলবে না।
এর তুলনায় দ্বিতীয় ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। কর্মসংস্থান কমে গেলে যে আয় একসময় শ্রমিকদের হাতে যেত, তা তখন এআই কোম্পানি, চিপ নির্মাতা, ডেটা সেন্টার কিংবা এই সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্য অংশে অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে জমা হবে।
সুচিন্তিত কর সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র সেই অতিরিক্ত লাভের একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। একই সঙ্গে, সীমিত একটি পুঁজিধারী এলিট শ্রেণীর হাতে সম্পদ ও ক্ষমতা যাওয়া ঠেকাতে উত্তরাধিকার কর আরোপের যৌক্তিকতাও এখন আগের চেয়ে আরও জোরালো।

একই সময়ে সরকার শ্রমিকদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। পাবলিক ওয়েজ-ইন্সুরেন্স, যা চাকরি হারানোর পর হুট করে কমে যাওয়া আয়কে সামাল দেয়, তা শ্রমিকদের নতুন এবং ভালো সুযোগ খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। ডেনমার্কের সক্রিয় শ্রমবাজার নীতি বেকারত্বের অভিশাপ দূর করতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত, যেখানে রাষ্ট্র মানুষকে নতুন পেশা খুঁজে পেতে এবং প্রশিক্ষণ নিতে সরাসরি সাহায্য করে।
এআই থাকুক বা না থাকুক, এই পরিকল্পনাগুলো অর্থনীতিকে আরও দক্ষ এবং ন্যায়সঙ্গত করে তুলবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তিগত সংস্কারগুলো কি অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে পারবে? বর্তমানের পপুলিস্ট রাজনীতিতে টেকনোক্র্যাটিক (প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক) সংস্কার সহজে কেউ গিলতে চায় না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর কর্মীবাহিনীতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে, শুধু পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলে চলবে না।
সে কারণেই কিছু চরম ও আমূল পরিবর্তনকারী ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে, যেমন–এআই ফার্মগুলোকে আংশিক জাতীয়করণ করা। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার একজন রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা এআই ব্যবসা থেকে নাগরিকদের জন্য একটি ‘ডিভিডেন্ড’ বা লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, যার ফলে স্থানীয় শেয়ারবাজার ৫% পড়ে যায়, যদিও পরে তিনি নিজের বক্তব্য গুটিয়ে নেন। আমেরিকাতেও রাজনীতিবিদরা ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের এআই কোম্পানির শেয়ার দেওয়ার বিষয়ে ফিসফাস করছেন।
অর্থনৈতিক পরিভাষায়, একটি সুপরিকল্পিত কর ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতে সরকারের অংশীদারত্বের মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। আর যেসব দেশের নিজস্ব কোনো এআই জায়ান্ট (যেমন গুগল, ওপেনএআই) নেই, তাদের বিদেশি কোম্পানির শেয়ার কেড়ে নেওয়ার বদলে করের ওপরই ভরসা করতে হবে।
এই একচেটিয়া মুনাফার পাহাড় ভাঙার লড়াইটা শুরুতেই করতে হবে, নতুবা এই পুঁজিপতিদের ক্ষমতা একসময় অজেয় হয়ে উঠবে। চাকরির মহাবিপর্যয় হয়তো এখনো পুরোপুরি আসেনি। কিন্তু সরকার যদি চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়ার জন্য বসে থাকে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতে দেরি করে, তবে ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। তাই শুরুটা এখনই করা শ্রেয়।
(লেখাটি দ্য ইকোনমিস্ট থেকে নেওয়া)