ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন
পার্থ প্রতীম দাস

গত ৪ মার্চ বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি একটি ভিডিও পোস্ট করে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের মোবাইল ফোনটি উঁচিয়ে ধরে দর্শকদের দেখান যে, কীভাবে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কনটেন্টের মাধ্যমে টাকা আয় হচ্ছে।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই নেতা দেখান, লাখ লাখ বার দেখার পর কেবল একটি ছবি থেকেই তার আয় হয়েছে ৩৩০ ডলার। তিনি আরেকটি ভিডিও দেখান, যা থেকে আয় হয়েছে ৪০ ডলার এবং জানান, কেবল মার্চের প্রথম দুদিনেই তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৯ ডলার আয় হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটাইজেশন নীতি ও স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণকারী নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর মনিটাইজেশন আর্কাইভ অনুযায়ী, হাসনাতের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
তবে হাসনাতের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় ছিল না।
মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের আরও অন্তত ১৩টি ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে সক্রিয় রয়েছে। অথচ মেটার নিজস্ব নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি কর্মকর্তা তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে টাকা আয় করতে পারবেন না।
এই অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে তিনজন মন্ত্রীর পেজ ও প্রোফাইলও রয়েছে। ডিসমিসল্যাব আরও দেখেছে, এই ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টি থেকে পোস্ট করা ভিডিওতে বিজ্ঞাপন চলছে। এমনকি নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর অন্তত দুটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নামে খোলা আরও ২২টি আনভেরিফায়েড (ভেরিফায়েড নয় এমন) ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচন প্রচারের সময় ফেসবুকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছিল।
মেটার নিজস্ব মনিটাইজেশন নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি সংস্থাগুলো তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য যোগ্য নয়।
মেটা কীভাবে মনিটাইজেশনের জন্য অ্যাকাউন্ট যাচাই-বাছাই করে, তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক যোগ্যতা বিষয়ক নিয়মগুলো সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করে কি না, এবং যে প্ল্যাটফর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের রয়েছে, সেই প্ল্যাটফর্মের সাথে তাদের এমন আর্থিক সম্পর্ক থাকা উচিত কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এসব তথ্য।
মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা থেকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে কোম্পানির মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত থাকা পেজ ও প্রোফাইলগুলো শনাক্ত করা যায়। মেটা জানায়, এই তালিকায় সেইসব পাবলিশারের নাম থাকে, যারা মনিটাইজেশনের জন্য আবেদন করেছে এবং তাদের ‘পার্টনার মনিটাইজেশন পলিসি’ মেনে চলে। এই তালিকা মেটার ‘ব্র্যান্ড সেফটি অ্যান্ড সুইটেবিলিটি সেন্টার’ থেকে প্রকাশ্যে ডাউনলোড করা যায়।
ডিসমিসল্যাব এই তালিকার একটি আর্কাইভও ব্যবহার করেছে, যা রক্ষণাবেক্ষণ করে ‘হোয়াট টু ফিক্স’। কখন কোনো অ্যাকাউন্ট মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে, কোন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে এবং সেগুলো এখনও সক্রিয় আছে, নাকি পরে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে–এই সবই এই আর্কাইভে রেকর্ড করা হয়।

‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর তথ্যমতে, পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় কোনো অ্যাকাউন্টের নাম থাকার অর্থ হলো—সেটি একটি নির্দিষ্ট তারিখে মেটার মনিটাইজেশন সিস্টেমে প্রবেশ করেছে এবং কোম্পানির অনুমোদন প্রক্রিয়া পার করেছে।
মেটার পার্টনার মনিটাইজেশন নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচিত এবং নিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা, বর্তমান রাজনৈতিক প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, নিবন্ধিত রাজনৈতিক কমিটি এবং সরকারি সংস্থা ও দপ্তরগুলো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য নয়।
মেটা ২০১৭ সাল থেকে ভিডিও কনটেন্ট নির্মাতাদের ইন-স্ট্রিম অ্যাড এবং রিলস অ্যাড প্রোগ্রামের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ দিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটি এর পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর ফলে নির্মাতারা ছবি ও টেক্সট থেকেও আয়ের সুযোগ পায়। মেটা এই নতুন প্রোগ্রামের নাম দেয় ‘কনটেন্ট মনিটাইজেশন’। পুরোনো ইন-স্ট্রিম অ্যাড এবং রিলস অ্যাড প্রোগ্রামগুলো ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেগুলোকে কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের সাথে একীভূত করা হয়।
বর্তমানে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামটি কেবল আমন্ত্রণের ভিত্তিতে পাওয়া যায়। নির্মাতারা এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। তবে কেবল মেটা থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া অ্যাকাউন্টগুলোই এতে যোগ দিতে পারে। এর অর্থ হলো, ডিসমিসল্যাব কর্তৃক চিহ্নিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা কেবল নিজেরাই ফেসবুক থেকে আয় করতে চাননি, বরং মেটা নিজে থেকেই তাদের অ্যাকাউন্টগুলোকে মনিটাইজেশন সিস্টেমে যুক্ত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
যদিও মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় নাম থাকার মানে এই নয় যে, অ্যাকাউন্টটি নিশ্চিতভাবেই সক্রিয়ভাবে টাকা আয় করছে। তবে এটি নির্দেশ করে যে, মেটা অ্যাকাউন্টটিকে মনিটাইজেশনের জন্য অনুমোদন দিয়েছে এবং অ্যাকাউন্টটির অর্থ আয়ের সক্ষমতা রয়েছে।
ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী অন্তত ১৩ জন রাজনীতিকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাধীন সময়সীমার মধ্যে এই সবগুলো অ্যাকাউন্টই মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে সক্রিয় ছিল।
এর মধ্যে সাতটি অ্যাকাউন্ট বর্তমান সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সংসদ সদস্যদের। পাঁচটি অ্যাকাউন্ট প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের এবং একটি অ্যাকাউন্ট একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের।
এই অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে তিনজন ক্যাবিনেট সদস্যের পেজ বা প্রোফাইল রয়েছে: শিল্প, বাণিজ্য, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত; এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
ডিসমিসল্যাব আরও দেখেছে, গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর অন্তত দুজন সংসদ সদস্যের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে। লালমণিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজিব প্রধানের ভেরিফায়েড প্রোফাইলটি ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তালিকাভুক্ত হয়। চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের ভেরিফায়েড প্রোফাইলটি তালিকাভুক্ত হয় চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি; অর্থাৎ, নির্বাচনের ঠিক আগের দিন।
এই ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার রয়েছে পটুয়াখালী-২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের। তার ভেরিফায়েড পেজে ১৭ লাখেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে। পেজটির ক্যাটাগরি হিসেবে ‘রাজনীতিক’ উল্লেখ রয়েছে, বায়োতে তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে এবং এর ট্রান্সপারেন্সি সেকশনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই পেজটির জন্য দায়ী। দলটি ২০২৫-২৬ সালে এই পেজ থেকে আটটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের খরচও পরিশোধ করেছে।

‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, শফিকুল ইসলামের পেজটি ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে মেটার ইন-স্ট্রিম অ্যাড প্রোগ্রামের অংশ ছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে রিলস-এর বিজ্ঞাপন চালু করা হয় এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পেজটি ফেসবুকের কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দেয়। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাকালে অ্যাকাউন্টটি মনিটাইজেশনে সক্রিয় ছিল।
ডিসমিসল্যাব শফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করে তার ভেরিফায়েড পেজে মনিটাইজেশন সক্রিয় আছে কি না, তা জানতে চায়। তিনি জানান, তার আইটি টিম অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করার কারণে তাকে বিষয়টি চেক করে দেখতে হবে। তিনি আরও জানান, তার জানামতে তিনি ফেসবুক থেকে কোনো আয় করেন না।
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, হাসনাত আব্দুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয় এবং ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল বাদ পড়ে। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাকালে অ্যাকাউন্টটি মেটার বর্তমান পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় আর ছিল না, যা নির্দেশ করে এটি আর মনিটাইজেশনে সক্রিয় নেই।
তবে হাসনাতের সাথে সম্পৃক্ত অন্য দুটি পেজ মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় রয়ে গেছে।
এর একটি হলো–নির্বাচনী প্রচারের পেজ ‘হাসনাত ফর কুমিল্লা-৪’, যেটির ফলোয়ার সংখ্যা ১২ লাখ। এই পেজ ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল তালিকায় যুক্ত হয়। নির্বাচনী প্রচারের সময় এই পেজ থেকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালানো হয়েছিল।
হাসনাতের সাথে যুক্ত আরেকটি ভেরিফায়েড পেজ ‘জবাবদিহিতা’, যা চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল তালিকায় যুক্ত হয়। ৩ লাখের বেশি ফলোয়ার থাকা এই পেজ হাসনাতের নির্বাচনী এলাকার আর্থিক বরাদ্দ ও ব্যয়-সংক্রান্ত পোস্ট পাবলিশ করতে ব্যবহার করা হয়।
এই তথ্যগুলো বলছে, হাসনাতের ফেসবুক থেকে আয়ের কথা প্রকাশ্যে আসার পর মেটা তার ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে মনিটাইজেশন সরিয়ে নিলেও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত অন্য পেজগুলো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য হিসেবে রয়ে গেছে।
ডিসমিসল্যাব হাসনাত আব্দুল্লাহর এক সহযোগীর মাধ্যমে এবং সরাসরি তার ফোনে প্রশ্ন পাঠিয়ে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডিসমিসল্যাব সংসদ সদস্যদের ওই ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখেছে। ১৩টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টির ভিডিওতেই বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণা দল অ্যাকাউন্টগুলোর ভিডিও ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করে এমন কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে, যেখানে ভিডিওর আগে, মাঝে বা নিচে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। যেহেতু দর্শকের অবস্থান, ডিভাইস, সময় ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনের প্রদর্শন ভিন্ন হতে পারে, তাই গবেষণা দল এই বিজ্ঞাপনগুলো থেকে অ্যাকাউন্টগুলো কত টাকা আয় করছে, তার প্রমাণ হিসেবে দেখেনি। মেটার অ্যাডভার্টাইজিং সিস্টেম এই মনিটাইজড অ্যাকাউন্টগুলোর কনটেন্টে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন পরিবেশন করছে কি না, তার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
বিজ্ঞাপনগুলো বিভিন্ন ফরম্যাটে দেখা গেছে। কিছু ছিল ‘মিড-রোল অ্যাড’, যা ভিডিও চলার মাঝে দেখায়। অন্যগুলো ভিডিওর নিচে সিঙ্গেল-ইমেজ (একক ছবি) বিজ্ঞাপন হিসেবে দেখা গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জিলানীর পোস্ট করা একটি ভিডিওর নিচে হরলিক্স-এর বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। যশোর-৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলীর একটি ভিডিওতে রুচি সসের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে।
ডিসমিসল্যাব নীলফামারী-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুস সাত্তারের একটি ভিডিওর মাঝে সেনসোডাইন টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. খালেদ হোসেন মাহবুবের ভিডিওতে সানসিল্ক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন চলতে দেখেছে।
এই নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনগুলো সম্ভবত দর্শকের অবস্থান বা ব্রাউজিং আচরণের ওপর ভিত্তি করে মেটার অ্যালগরিদম দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল, যার অর্থ–একই ভিডিও বিভিন্ন দর্শককে ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে।

মেটার এই নিয়ম প্রয়োগের বিষয়টি সবার জন্য সমান ছিল না। ডিসমিসল্যাব এমন একটি ঘটনা খুঁজে পেয়েছে, যেখানে একজন নির্বাচনী প্রার্থীকে শনাক্ত করার পর তার মনিটাইজেশন বাতিল করেছিল। ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মেঘনা আলম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর, ১৫ ফেব্রুয়ারি তার মনিটাইজেশন পুনরায় চালু হয় এবং ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাধীন সময়েও তা সক্রিয় ছিল।
মেঘনা আলম ডিসমিসল্যাবকে জানান, মেটা তাকে একটি নোটিফিকেশন পাঠিয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল–রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য মনিটাইজেশন সীমিত করা হয়েছে।
কিন্তু ডিসমিসল্যাব অন্যান্য প্রার্থী ও নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের খুঁজে পেয়েছে, যাদের অ্যাকাউন্ট এমন কোনো বাধার সম্মুখীন হয়নি। ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা তাসনিম জারার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৭৬ লাখ ফলোয়ার রয়েছে। ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ২০২০ সালের জুলাই থেকে মনিটাইজড এবং পুরো নির্বাচনজুড়ে এটি সক্রিয় ছিল।
নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্য হওয়া অন্য ১৩ জন রাজনীতিকের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে। এই রাজনীতিকেরা নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের অ্যাকাউন্টগুলোর মনিটাইজেশন বাতিল করার কোনো রেকর্ড পায়নি ডিসমিসল্যাব।
ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নামে খোলা অন্তত ২২টি আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টও খুঁজে পেয়েছে।
যেহেতু এই অ্যাকাউন্টগুলো ভেরিফায়েড নয়, তাই ডিসমিসল্যাব এগুলোকে ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদাভাবে বিবেচনা করেছে। তবে বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্টে এমন কিছু সূচক ছিল, যা নির্দেশ করে সেগুলো রাজনীতিকদের বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে। নয়টি অ্যাকাউন্টের ক্যাটাগরি ‘রাজনীতিক’ বা ‘রাজনৈতিক দল’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। এর সবগুলোই নিয়মিত সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের কনটেন্ট পোস্ট করত এবং ১০টি অ্যাকাউন্ট থেকে ফেসবুক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন (নির্বাচনী প্রচারসহ) চালানো হয়েছিল।
এর মধ্যে ১৩টি অ্যাকাউন্ট বিএনপির সংসদ সদস্যদের নামে খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামে একটি প্রোফাইল ছিল, যার ফলোয়ার সংখ্যা ৪৪ হাজারের বেশি।
ডিসমিসল্যাব পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলমের নামে দুটি আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট (একটি প্রোফাইল ও একটি পেজ) খুঁজে পেয়েছে। তার নামে কোনো ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ বা প্রোফাইল পাওয়া যায়নি। প্রোফাইলটিতে ৪৬ হাজার এবং পেজটিতে ৫৭ হাজার ফলোয়ার ছিল। দুটি অ্যাকাউন্টই মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিছু আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের পর মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছে। গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম এবং নওগাঁ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম ধলুর ফেসবুক পেজ যথাক্রমে চলতি বছরের ১২ মার্চ ও ২০ এপ্রিল যুক্ত হয়। দুটি তারিখই তারা সংসদ সদস্য হওয়ার পরের। রফিকুল ইসলামের পেজ থেকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারের সময় ২৩টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালানো হয়েছিল।
ডিসমিসল্যাব পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের নামে খোলা আটটি অ্যাকাউন্ট পেয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের জহিরুল ইসলাম, ফরিদপুর-১ আসনের মো. ইলিয়াছ মোল্লা এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনের মো. আবু তালেবের নামে থাকা অ্যাকাউন্টগুলো থেকে নির্বাচনী প্রচারের সময় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছিল। কুষ্টিয়া-৩ আসনের মুফতি আমির হামজার নামে থাকা আরেকটি অ্যাকাউন্টে ৮ লাখের বেশি ফলোয়ার ছিল।
ডিসমিসল্যাব আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলোকে ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদা রাখলেও ডিসমিসল্যাব কর্তৃক পর্যালোচিত রেকর্ড অনুযায়ী–এই ২২টি আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের সবকটিই নির্বাচনের সময় নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সংক্রান্ত তথ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী, প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট বা তাদের পক্ষে প্রচারকারী ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন, তবে ডিজিটাল প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্ল্যাটফর্মের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি এবং ইমেইল অ্যাড্রেসসহ শনাক্তকরণ তথ্য জমা দিতে হবে। একই নিয়ম অনুযায়ী, কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন, বুস্টিং এবং স্পনসরশিপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের ব্যয় নির্বাচনী ব্যয় রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেটার আরও শক্তিশালী যাচাইকরণ প্রয়োজন।
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর নির্বাহী পরিচালক ভিক্টোরিয়া রিও বলেন, মনিটাইজেশনের জন্য অ্যাকাউন্ট অনুমোদন করার আগে মেটার আরও কঠোর পরীক্ষা চালানো উচিত, বিশেষ করে যখন কোনো অ্যাকাউন্ট রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল বা সরকারি কর্মকর্তার সাথে যুক্ত থাকার লক্ষণ দেখায়।
রিও ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “মেটার বিজনেস পার্টনার যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি আমূল উন্নত করা উচিত।”
সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের নামে খোলা আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য হওয়া উচিত কি না–জানতে চাইলে রিও বলেন, মেটার উচিত অ্যাকাউন্টের চারপাশের সামগ্রিক প্রমাণগুলো বিবেচনা করা।
ডিসমিসল্যাব এই দৃশ্যমান নীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মেটার সাথে যোগাযোগ করেছে। মেটার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদনটি আপডেট করা হবে।
এই অনুসন্ধানের তথ্যগুলো ‘স্বার্থের সংঘাত’-সংক্রান্ত উদ্বেগও তৈরি করে। সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীরা প্রযুক্তি নীতি, কর ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ বা বিজ্ঞাপনের নিয়মাবলী প্রণয়ন বা পর্যালোচনার সাথে জড়িত থাকতে পারেন। এই ধরনের কর্মকর্তাদের মেটার প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেওয়া মানে কোম্পানির সাথে এমন ব্যক্তিদের একটি আর্থিক সম্পর্ক তৈরি হওয়া, যারা একে নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থানে রয়েছেন।
একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কোনো কোম্পানির প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ উপার্জন করার পাশাপাশি সেই কোম্পানিকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন–তা জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
তবে তিনি বলেন, “নির্বাচিত রাজনীতিকদের তাদের কনটেন্ট মনিটাইজ করার সুযোগ থাকা উচিত। একজন রাজনীতিবিদও দেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে অন্যরা যে সুযোগ পায়, সেই সুযোগগুলো সবার জন্য সমানভাবে থাকা উচিত।”
শফিকুল অবশ্য বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুক থেকে আয় করতে চান না এবং তার আইটি টিমকে সেই অনুযায়ী নির্দেশনা দিয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এর মাধ্যমে মেটা এমন আইন ও নীতিনির্ধারণের পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে এবং সমতা ও ন্যায্যতার নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, মেটার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরও বাড়ছে।’’
লেখক: ম্যানেজার রিসার্চার, ডেটা অ্যান্ড টেক, ডিসমিসল্যাব

গত ৪ মার্চ বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি একটি ভিডিও পোস্ট করে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের মোবাইল ফোনটি উঁচিয়ে ধরে দর্শকদের দেখান যে, কীভাবে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কনটেন্টের মাধ্যমে টাকা আয় হচ্ছে।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই নেতা দেখান, লাখ লাখ বার দেখার পর কেবল একটি ছবি থেকেই তার আয় হয়েছে ৩৩০ ডলার। তিনি আরেকটি ভিডিও দেখান, যা থেকে আয় হয়েছে ৪০ ডলার এবং জানান, কেবল মার্চের প্রথম দুদিনেই তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৯ ডলার আয় হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটাইজেশন নীতি ও স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণকারী নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর মনিটাইজেশন আর্কাইভ অনুযায়ী, হাসনাতের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
তবে হাসনাতের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় ছিল না।
মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের আরও অন্তত ১৩টি ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে সক্রিয় রয়েছে। অথচ মেটার নিজস্ব নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি কর্মকর্তা তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে টাকা আয় করতে পারবেন না।
এই অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে তিনজন মন্ত্রীর পেজ ও প্রোফাইলও রয়েছে। ডিসমিসল্যাব আরও দেখেছে, এই ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টি থেকে পোস্ট করা ভিডিওতে বিজ্ঞাপন চলছে। এমনকি নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর অন্তত দুটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নামে খোলা আরও ২২টি আনভেরিফায়েড (ভেরিফায়েড নয় এমন) ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচন প্রচারের সময় ফেসবুকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছিল।
মেটার নিজস্ব মনিটাইজেশন নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি সংস্থাগুলো তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য যোগ্য নয়।
মেটা কীভাবে মনিটাইজেশনের জন্য অ্যাকাউন্ট যাচাই-বাছাই করে, তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক যোগ্যতা বিষয়ক নিয়মগুলো সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করে কি না, এবং যে প্ল্যাটফর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের রয়েছে, সেই প্ল্যাটফর্মের সাথে তাদের এমন আর্থিক সম্পর্ক থাকা উচিত কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এসব তথ্য।
মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা থেকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে কোম্পানির মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত থাকা পেজ ও প্রোফাইলগুলো শনাক্ত করা যায়। মেটা জানায়, এই তালিকায় সেইসব পাবলিশারের নাম থাকে, যারা মনিটাইজেশনের জন্য আবেদন করেছে এবং তাদের ‘পার্টনার মনিটাইজেশন পলিসি’ মেনে চলে। এই তালিকা মেটার ‘ব্র্যান্ড সেফটি অ্যান্ড সুইটেবিলিটি সেন্টার’ থেকে প্রকাশ্যে ডাউনলোড করা যায়।
ডিসমিসল্যাব এই তালিকার একটি আর্কাইভও ব্যবহার করেছে, যা রক্ষণাবেক্ষণ করে ‘হোয়াট টু ফিক্স’। কখন কোনো অ্যাকাউন্ট মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে, কোন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে এবং সেগুলো এখনও সক্রিয় আছে, নাকি পরে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে–এই সবই এই আর্কাইভে রেকর্ড করা হয়।

‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর তথ্যমতে, পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় কোনো অ্যাকাউন্টের নাম থাকার অর্থ হলো—সেটি একটি নির্দিষ্ট তারিখে মেটার মনিটাইজেশন সিস্টেমে প্রবেশ করেছে এবং কোম্পানির অনুমোদন প্রক্রিয়া পার করেছে।
মেটার পার্টনার মনিটাইজেশন নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচিত এবং নিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা, বর্তমান রাজনৈতিক প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, নিবন্ধিত রাজনৈতিক কমিটি এবং সরকারি সংস্থা ও দপ্তরগুলো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য নয়।
মেটা ২০১৭ সাল থেকে ভিডিও কনটেন্ট নির্মাতাদের ইন-স্ট্রিম অ্যাড এবং রিলস অ্যাড প্রোগ্রামের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ দিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কোম্পানিটি এর পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর ফলে নির্মাতারা ছবি ও টেক্সট থেকেও আয়ের সুযোগ পায়। মেটা এই নতুন প্রোগ্রামের নাম দেয় ‘কনটেন্ট মনিটাইজেশন’। পুরোনো ইন-স্ট্রিম অ্যাড এবং রিলস অ্যাড প্রোগ্রামগুলো ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেগুলোকে কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের সাথে একীভূত করা হয়।
বর্তমানে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামটি কেবল আমন্ত্রণের ভিত্তিতে পাওয়া যায়। নির্মাতারা এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। তবে কেবল মেটা থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া অ্যাকাউন্টগুলোই এতে যোগ দিতে পারে। এর অর্থ হলো, ডিসমিসল্যাব কর্তৃক চিহ্নিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা কেবল নিজেরাই ফেসবুক থেকে আয় করতে চাননি, বরং মেটা নিজে থেকেই তাদের অ্যাকাউন্টগুলোকে মনিটাইজেশন সিস্টেমে যুক্ত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
যদিও মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় নাম থাকার মানে এই নয় যে, অ্যাকাউন্টটি নিশ্চিতভাবেই সক্রিয়ভাবে টাকা আয় করছে। তবে এটি নির্দেশ করে যে, মেটা অ্যাকাউন্টটিকে মনিটাইজেশনের জন্য অনুমোদন দিয়েছে এবং অ্যাকাউন্টটির অর্থ আয়ের সক্ষমতা রয়েছে।
ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী অন্তত ১৩ জন রাজনীতিকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাধীন সময়সীমার মধ্যে এই সবগুলো অ্যাকাউন্টই মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে সক্রিয় ছিল।
এর মধ্যে সাতটি অ্যাকাউন্ট বর্তমান সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সংসদ সদস্যদের। পাঁচটি অ্যাকাউন্ট প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের এবং একটি অ্যাকাউন্ট একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের।
এই অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে তিনজন ক্যাবিনেট সদস্যের পেজ বা প্রোফাইল রয়েছে: শিল্প, বাণিজ্য, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত; এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
ডিসমিসল্যাব আরও দেখেছে, গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর অন্তত দুজন সংসদ সদস্যের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছে। লালমণিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজিব প্রধানের ভেরিফায়েড প্রোফাইলটি ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তালিকাভুক্ত হয়। চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের ভেরিফায়েড প্রোফাইলটি তালিকাভুক্ত হয় চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি; অর্থাৎ, নির্বাচনের ঠিক আগের দিন।
এই ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার রয়েছে পটুয়াখালী-২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের। তার ভেরিফায়েড পেজে ১৭ লাখেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে। পেজটির ক্যাটাগরি হিসেবে ‘রাজনীতিক’ উল্লেখ রয়েছে, বায়োতে তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে এবং এর ট্রান্সপারেন্সি সেকশনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই পেজটির জন্য দায়ী। দলটি ২০২৫-২৬ সালে এই পেজ থেকে আটটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের খরচও পরিশোধ করেছে।

‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, শফিকুল ইসলামের পেজটি ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে মেটার ইন-স্ট্রিম অ্যাড প্রোগ্রামের অংশ ছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে রিলস-এর বিজ্ঞাপন চালু করা হয় এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পেজটি ফেসবুকের কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দেয়। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাকালে অ্যাকাউন্টটি মনিটাইজেশনে সক্রিয় ছিল।
ডিসমিসল্যাব শফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করে তার ভেরিফায়েড পেজে মনিটাইজেশন সক্রিয় আছে কি না, তা জানতে চায়। তিনি জানান, তার আইটি টিম অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করার কারণে তাকে বিষয়টি চেক করে দেখতে হবে। তিনি আরও জানান, তার জানামতে তিনি ফেসবুক থেকে কোনো আয় করেন না।
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, হাসনাত আব্দুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয় এবং ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল বাদ পড়ে। ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাকালে অ্যাকাউন্টটি মেটার বর্তমান পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় আর ছিল না, যা নির্দেশ করে এটি আর মনিটাইজেশনে সক্রিয় নেই।
তবে হাসনাতের সাথে সম্পৃক্ত অন্য দুটি পেজ মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় রয়ে গেছে।
এর একটি হলো–নির্বাচনী প্রচারের পেজ ‘হাসনাত ফর কুমিল্লা-৪’, যেটির ফলোয়ার সংখ্যা ১২ লাখ। এই পেজ ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল তালিকায় যুক্ত হয়। নির্বাচনী প্রচারের সময় এই পেজ থেকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালানো হয়েছিল।
হাসনাতের সাথে যুক্ত আরেকটি ভেরিফায়েড পেজ ‘জবাবদিহিতা’, যা চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল তালিকায় যুক্ত হয়। ৩ লাখের বেশি ফলোয়ার থাকা এই পেজ হাসনাতের নির্বাচনী এলাকার আর্থিক বরাদ্দ ও ব্যয়-সংক্রান্ত পোস্ট পাবলিশ করতে ব্যবহার করা হয়।
এই তথ্যগুলো বলছে, হাসনাতের ফেসবুক থেকে আয়ের কথা প্রকাশ্যে আসার পর মেটা তার ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে মনিটাইজেশন সরিয়ে নিলেও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত অন্য পেজগুলো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য হিসেবে রয়ে গেছে।
ডিসমিসল্যাব হাসনাত আব্দুল্লাহর এক সহযোগীর মাধ্যমে এবং সরাসরি তার ফোনে প্রশ্ন পাঠিয়ে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডিসমিসল্যাব সংসদ সদস্যদের ওই ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে কি না, তাও পরীক্ষা করে দেখেছে। ১৩টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টির ভিডিওতেই বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণা দল অ্যাকাউন্টগুলোর ভিডিও ম্যানুয়ালি পরীক্ষা করে এমন কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে, যেখানে ভিডিওর আগে, মাঝে বা নিচে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। যেহেতু দর্শকের অবস্থান, ডিভাইস, সময় ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপনের প্রদর্শন ভিন্ন হতে পারে, তাই গবেষণা দল এই বিজ্ঞাপনগুলো থেকে অ্যাকাউন্টগুলো কত টাকা আয় করছে, তার প্রমাণ হিসেবে দেখেনি। মেটার অ্যাডভার্টাইজিং সিস্টেম এই মনিটাইজড অ্যাকাউন্টগুলোর কনটেন্টে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন পরিবেশন করছে কি না, তার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
বিজ্ঞাপনগুলো বিভিন্ন ফরম্যাটে দেখা গেছে। কিছু ছিল ‘মিড-রোল অ্যাড’, যা ভিডিও চলার মাঝে দেখায়। অন্যগুলো ভিডিওর নিচে সিঙ্গেল-ইমেজ (একক ছবি) বিজ্ঞাপন হিসেবে দেখা গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জিলানীর পোস্ট করা একটি ভিডিওর নিচে হরলিক্স-এর বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। যশোর-৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলীর একটি ভিডিওতে রুচি সসের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে।
ডিসমিসল্যাব নীলফামারী-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুস সাত্তারের একটি ভিডিওর মাঝে সেনসোডাইন টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. খালেদ হোসেন মাহবুবের ভিডিওতে সানসিল্ক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন চলতে দেখেছে।
এই নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনগুলো সম্ভবত দর্শকের অবস্থান বা ব্রাউজিং আচরণের ওপর ভিত্তি করে মেটার অ্যালগরিদম দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল, যার অর্থ–একই ভিডিও বিভিন্ন দর্শককে ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে।

মেটার এই নিয়ম প্রয়োগের বিষয়টি সবার জন্য সমান ছিল না। ডিসমিসল্যাব এমন একটি ঘটনা খুঁজে পেয়েছে, যেখানে একজন নির্বাচনী প্রার্থীকে শনাক্ত করার পর তার মনিটাইজেশন বাতিল করেছিল। ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মেঘনা আলম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর, ১৫ ফেব্রুয়ারি তার মনিটাইজেশন পুনরায় চালু হয় এবং ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনাধীন সময়েও তা সক্রিয় ছিল।
মেঘনা আলম ডিসমিসল্যাবকে জানান, মেটা তাকে একটি নোটিফিকেশন পাঠিয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল–রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য মনিটাইজেশন সীমিত করা হয়েছে।
কিন্তু ডিসমিসল্যাব অন্যান্য প্রার্থী ও নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের খুঁজে পেয়েছে, যাদের অ্যাকাউন্ট এমন কোনো বাধার সম্মুখীন হয়নি। ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা তাসনিম জারার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৭৬ লাখ ফলোয়ার রয়েছে। ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভ অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ২০২০ সালের জুলাই থেকে মনিটাইজড এবং পুরো নির্বাচনজুড়ে এটি সক্রিয় ছিল।
নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্য হওয়া অন্য ১৩ জন রাজনীতিকের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে। এই রাজনীতিকেরা নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের অ্যাকাউন্টগুলোর মনিটাইজেশন বাতিল করার কোনো রেকর্ড পায়নি ডিসমিসল্যাব।
ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নামে খোলা অন্তত ২২টি আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টও খুঁজে পেয়েছে।
যেহেতু এই অ্যাকাউন্টগুলো ভেরিফায়েড নয়, তাই ডিসমিসল্যাব এগুলোকে ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদাভাবে বিবেচনা করেছে। তবে বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্টে এমন কিছু সূচক ছিল, যা নির্দেশ করে সেগুলো রাজনীতিকদের বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে। নয়টি অ্যাকাউন্টের ক্যাটাগরি ‘রাজনীতিক’ বা ‘রাজনৈতিক দল’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। এর সবগুলোই নিয়মিত সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের কনটেন্ট পোস্ট করত এবং ১০টি অ্যাকাউন্ট থেকে ফেসবুক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন (নির্বাচনী প্রচারসহ) চালানো হয়েছিল।
এর মধ্যে ১৩টি অ্যাকাউন্ট বিএনপির সংসদ সদস্যদের নামে খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামে একটি প্রোফাইল ছিল, যার ফলোয়ার সংখ্যা ৪৪ হাজারের বেশি।
ডিসমিসল্যাব পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলমের নামে দুটি আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট (একটি প্রোফাইল ও একটি পেজ) খুঁজে পেয়েছে। তার নামে কোনো ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ বা প্রোফাইল পাওয়া যায়নি। প্রোফাইলটিতে ৪৬ হাজার এবং পেজটিতে ৫৭ হাজার ফলোয়ার ছিল। দুটি অ্যাকাউন্টই মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিছু আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের পর মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছে। গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম এবং নওগাঁ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম ধলুর ফেসবুক পেজ যথাক্রমে চলতি বছরের ১২ মার্চ ও ২০ এপ্রিল যুক্ত হয়। দুটি তারিখই তারা সংসদ সদস্য হওয়ার পরের। রফিকুল ইসলামের পেজ থেকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারের সময় ২৩টি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালানো হয়েছিল।
ডিসমিসল্যাব পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের নামে খোলা আটটি অ্যাকাউন্ট পেয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের জহিরুল ইসলাম, ফরিদপুর-১ আসনের মো. ইলিয়াছ মোল্লা এবং ঝিনাইদহ-৪ আসনের মো. আবু তালেবের নামে থাকা অ্যাকাউন্টগুলো থেকে নির্বাচনী প্রচারের সময় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছিল। কুষ্টিয়া-৩ আসনের মুফতি আমির হামজার নামে থাকা আরেকটি অ্যাকাউন্টে ৮ লাখের বেশি ফলোয়ার ছিল।
ডিসমিসল্যাব আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলোকে ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদা রাখলেও ডিসমিসল্যাব কর্তৃক পর্যালোচিত রেকর্ড অনুযায়ী–এই ২২টি আনভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের সবকটিই নির্বাচনের সময় নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সংক্রান্ত তথ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী, প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট বা তাদের পক্ষে প্রচারকারী ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন, তবে ডিজিটাল প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্ল্যাটফর্মের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি এবং ইমেইল অ্যাড্রেসসহ শনাক্তকরণ তথ্য জমা দিতে হবে। একই নিয়ম অনুযায়ী, কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন, বুস্টিং এবং স্পনসরশিপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের ব্যয় নির্বাচনী ব্যয় রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেটার আরও শক্তিশালী যাচাইকরণ প্রয়োজন।
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর নির্বাহী পরিচালক ভিক্টোরিয়া রিও বলেন, মনিটাইজেশনের জন্য অ্যাকাউন্ট অনুমোদন করার আগে মেটার আরও কঠোর পরীক্ষা চালানো উচিত, বিশেষ করে যখন কোনো অ্যাকাউন্ট রাজনীতিক, রাজনৈতিক দল বা সরকারি কর্মকর্তার সাথে যুক্ত থাকার লক্ষণ দেখায়।
রিও ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “মেটার বিজনেস পার্টনার যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি আমূল উন্নত করা উচিত।”
সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের নামে খোলা আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য হওয়া উচিত কি না–জানতে চাইলে রিও বলেন, মেটার উচিত অ্যাকাউন্টের চারপাশের সামগ্রিক প্রমাণগুলো বিবেচনা করা।
ডিসমিসল্যাব এই দৃশ্যমান নীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মেটার সাথে যোগাযোগ করেছে। মেটার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদনটি আপডেট করা হবে।
এই অনুসন্ধানের তথ্যগুলো ‘স্বার্থের সংঘাত’-সংক্রান্ত উদ্বেগও তৈরি করে। সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীরা প্রযুক্তি নীতি, কর ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ বা বিজ্ঞাপনের নিয়মাবলী প্রণয়ন বা পর্যালোচনার সাথে জড়িত থাকতে পারেন। এই ধরনের কর্মকর্তাদের মেটার প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেওয়া মানে কোম্পানির সাথে এমন ব্যক্তিদের একটি আর্থিক সম্পর্ক তৈরি হওয়া, যারা একে নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থানে রয়েছেন।
একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কোনো কোম্পানির প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ উপার্জন করার পাশাপাশি সেই কোম্পানিকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারেন–তা জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
তবে তিনি বলেন, “নির্বাচিত রাজনীতিকদের তাদের কনটেন্ট মনিটাইজ করার সুযোগ থাকা উচিত। একজন রাজনীতিবিদও দেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে অন্যরা যে সুযোগ পায়, সেই সুযোগগুলো সবার জন্য সমানভাবে থাকা উচিত।”
শফিকুল অবশ্য বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুক থেকে আয় করতে চান না এবং তার আইটি টিমকে সেই অনুযায়ী নির্দেশনা দিয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এর মাধ্যমে মেটা এমন আইন ও নীতিনির্ধারণের পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে এবং সমতা ও ন্যায্যতার নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয়, মেটার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরও বাড়ছে।’’
লেখক: ম্যানেজার রিসার্চার, ডেটা অ্যান্ড টেক, ডিসমিসল্যাব