রিতু চক্রবর্ত্তী

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের অধিকার ও লড়াইয়ের স্বীকৃতির দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে প্রাণ হারান ১০-১২ জন শ্রমিক। শ্রমিকদের সেই রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগই বিশ্বে প্রথমবার শ্রমিক শ্রেণির অধিকারের ভিত্তি স্থাপন করে।
তবে এই স্বীকৃতি সহজে আসেনি। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে রেমন্ড লাভিনে ১৮৯০ সাল থেকে দিনটি পালনের প্রস্তাব করেন। ১৮৯১ সালে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং ১৯০৪ সালে আমস্টারডামে সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১ মে ‘বাধ্যতামূলক কাজ না করার’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এভাবেই দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামের পথ ধরে ১ মে বিশ্বজুড়ে মে দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কেবল একদিনের আন্দোলন নয়, বরং শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের এক চিরন্তন প্রতীক।
শ্রমিক দিবস অবশ্য আজকের দিনে এসে সর্বজনীনই বলা যায়। সাধারণ শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন হোক বা শ্রম শোষণ করা হোক–তাতে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী, তারাই অনেক ক্ষেত্রে এর আয়োজক। কিন্তু প্রশ্ন হলো–
এই এত বছর পরে এসে শ্রমিকের অধিকার কতটা অর্জিত হলো?
প্রথমেই আসি বৈশ্বিক পরিস্থিতে। শ্রম অধিকার সূচক বা লেবার রাইটস ইনডেক্স ২০২৪-এর তথ্যমতে, পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ এমন সব দেশে থাকেন, যেখানে শ্রম আইন অনুযায়ী ভালো পরিবেশে কাজ করার সুযোগ খুব কম বা একেবারেই নেই।
পরিসংখ্যান বলছে, যারা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছেন (একেবারেই কাজের সুযোগ নেই) এবং যারা সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছেন (সব সুযোগ-সুবিধা পান), তাদের সংখ্যা প্রায় সমান–যথাক্রমে ৪% এবং ৪.৫৭%। তবে পৃথিবীর বিশাল একটি অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই এমন দেশে বাস করেন, যেখানে কাজের পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা মাঝারি মানের। সহজ কথায়, তারা ভালো কাজের খুব সীমিত বা মোটামুটি সুযোগ পান।
| ন্যায্য বেতন | ৫৬ |
| কাজের সঠিক সময় | ৮০ |
| চাকরির নিশ্চয়তা | ১০০ |
| পরিবারকে সময় দেওয়া | ৬০ |
| মাতৃত্বকালীন সুবিধা | ০ |
| সংগঠন করার অধিকার | ৪০ |
| শিশু ও জোরপূর্বক শ্রম | ২৫ |
| সবার সাথে সমান ব্যবহার | ১০০ |
| সামাজিক সুরক্ষা | ৪০ |
| নিরাপদ কাজের পরিবেশ | ৪০ |
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সার্বিক বিবেচনায় দেখলে অনেকেই বলবে বেশ ভালো। কারণ এই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গড় স্কোর ৭৫। জিপিএর ভাষায় এ গ্রেড। কিন্তু মাতৃত্বকালীন, শিশু ও জোরপূর্বক শ্রম, সামাজিক সুরক্ষা, সংগঠন করার অধিকার, নিরাপদ কাজের পরিবেশ–এই বিভাগগুলো দেখলেই বোঝা যায় অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি প্রায় সি গ্রেডের কাছাকাছি।
শ্রম আইনের ৪৫ ও ৪৭ ধারা অনুযায়ী, একজন নারী শ্রমিক মোট ১৬ সপ্তাহ (১১২ দিন) মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার অধিকারী। এর মধ্যে সন্তান প্রসবের আগে ৮ সপ্তাহ এবং পরে ৮ সপ্তাহ।
শ্রম আইনের ৪৬ ও ৪৭ ধারা অনুযায়ী, ছুটিতে যাওয়ার ঠিক আগের তিন মাসে ওই নারী শ্রমিক যে গড় মজুরি পেতেন, তাকে সেই হারে পুরো মজুরি (১০০%) প্রদান করতে হয়। অর্থাৎ, এটি বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ নয়; বরং পূর্ণ বেতনের সমান।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন আর্থিক সুবিধার পুরো টাকা সরাসরি মালিককে পরিশোধ করতে হয়। কোনো বিমা বা সরকারি তহবিল থেকে এই টাকা দেওয়া হয় না।
বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর ৩৭(ঙ) বিধি এবং শ্রম আইনের মূল ধারা অনুযায়ী, কোনো নারী শ্রমিককে তার গর্ভাবস্থার কারণে বা ছুটির সময়ে ছাঁটাই বা বরখাস্ত করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এটি নারী শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

কিন্তু শ্রম অধিকার সূচকে মাতৃত্বকালীন সুবিধার স্কোর শূন্য।
এ তো গেল শুধু মাতৃত্বকালীন সুবিধার কথা। অন্যান্য অনেক বিভাগেই বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তার কারণ আছে। এমনকি বিদ্যমান শ্রম আইন ও আইএলও কনভেনশনও শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। এই বিষয়ে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ মাহা মির্জা বলেছিলেন, আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ না হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ‘ক্ল্যাসিক এক্সাম্পল’।
তাছাড়া বিদ্যমান শ্রম আইনেও রয়ে গেছে বড়সড় ফাঁক। যেমন সংগঠন করার অধিকারের ক্ষেত্রে সংবিধান সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো কারখানার ২০ শতাংশ শ্রমিক না হলে তারা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারে না।
বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার আইন কতটা সুরক্ষা দেয়, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। শুধু রানা প্লাজার ঘটনায়ই এখনো পর্যন্ত ১৪ টি মামলা ঝুলে আছে।
অবশ্য স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসেও শ্রমিককে যখন তার ন্যায্য অধিকার আদায়ে মার খেতে হয়, তখন এই আলাপগুলোই কতটা গুরুত্ব রাখে, সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের অধিকার ও লড়াইয়ের স্বীকৃতির দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে প্রাণ হারান ১০-১২ জন শ্রমিক। শ্রমিকদের সেই রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগই বিশ্বে প্রথমবার শ্রমিক শ্রেণির অধিকারের ভিত্তি স্থাপন করে।
তবে এই স্বীকৃতি সহজে আসেনি। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে রেমন্ড লাভিনে ১৮৯০ সাল থেকে দিনটি পালনের প্রস্তাব করেন। ১৮৯১ সালে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং ১৯০৪ সালে আমস্টারডামে সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১ মে ‘বাধ্যতামূলক কাজ না করার’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এভাবেই দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামের পথ ধরে ১ মে বিশ্বজুড়ে মে দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কেবল একদিনের আন্দোলন নয়, বরং শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের এক চিরন্তন প্রতীক।
শ্রমিক দিবস অবশ্য আজকের দিনে এসে সর্বজনীনই বলা যায়। সাধারণ শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন হোক বা শ্রম শোষণ করা হোক–তাতে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী, তারাই অনেক ক্ষেত্রে এর আয়োজক। কিন্তু প্রশ্ন হলো–
এই এত বছর পরে এসে শ্রমিকের অধিকার কতটা অর্জিত হলো?
প্রথমেই আসি বৈশ্বিক পরিস্থিতে। শ্রম অধিকার সূচক বা লেবার রাইটস ইনডেক্স ২০২৪-এর তথ্যমতে, পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ এমন সব দেশে থাকেন, যেখানে শ্রম আইন অনুযায়ী ভালো পরিবেশে কাজ করার সুযোগ খুব কম বা একেবারেই নেই।
পরিসংখ্যান বলছে, যারা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছেন (একেবারেই কাজের সুযোগ নেই) এবং যারা সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছেন (সব সুযোগ-সুবিধা পান), তাদের সংখ্যা প্রায় সমান–যথাক্রমে ৪% এবং ৪.৫৭%। তবে পৃথিবীর বিশাল একটি অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষই এমন দেশে বাস করেন, যেখানে কাজের পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধা মাঝারি মানের। সহজ কথায়, তারা ভালো কাজের খুব সীমিত বা মোটামুটি সুযোগ পান।
| ন্যায্য বেতন | ৫৬ |
| কাজের সঠিক সময় | ৮০ |
| চাকরির নিশ্চয়তা | ১০০ |
| পরিবারকে সময় দেওয়া | ৬০ |
| মাতৃত্বকালীন সুবিধা | ০ |
| সংগঠন করার অধিকার | ৪০ |
| শিশু ও জোরপূর্বক শ্রম | ২৫ |
| সবার সাথে সমান ব্যবহার | ১০০ |
| সামাজিক সুরক্ষা | ৪০ |
| নিরাপদ কাজের পরিবেশ | ৪০ |
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সার্বিক বিবেচনায় দেখলে অনেকেই বলবে বেশ ভালো। কারণ এই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গড় স্কোর ৭৫। জিপিএর ভাষায় এ গ্রেড। কিন্তু মাতৃত্বকালীন, শিশু ও জোরপূর্বক শ্রম, সামাজিক সুরক্ষা, সংগঠন করার অধিকার, নিরাপদ কাজের পরিবেশ–এই বিভাগগুলো দেখলেই বোঝা যায় অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি প্রায় সি গ্রেডের কাছাকাছি।
শ্রম আইনের ৪৫ ও ৪৭ ধারা অনুযায়ী, একজন নারী শ্রমিক মোট ১৬ সপ্তাহ (১১২ দিন) মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার অধিকারী। এর মধ্যে সন্তান প্রসবের আগে ৮ সপ্তাহ এবং পরে ৮ সপ্তাহ।
শ্রম আইনের ৪৬ ও ৪৭ ধারা অনুযায়ী, ছুটিতে যাওয়ার ঠিক আগের তিন মাসে ওই নারী শ্রমিক যে গড় মজুরি পেতেন, তাকে সেই হারে পুরো মজুরি (১০০%) প্রদান করতে হয়। অর্থাৎ, এটি বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ নয়; বরং পূর্ণ বেতনের সমান।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন আর্থিক সুবিধার পুরো টাকা সরাসরি মালিককে পরিশোধ করতে হয়। কোনো বিমা বা সরকারি তহবিল থেকে এই টাকা দেওয়া হয় না।
বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর ৩৭(ঙ) বিধি এবং শ্রম আইনের মূল ধারা অনুযায়ী, কোনো নারী শ্রমিককে তার গর্ভাবস্থার কারণে বা ছুটির সময়ে ছাঁটাই বা বরখাস্ত করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এটি নারী শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

কিন্তু শ্রম অধিকার সূচকে মাতৃত্বকালীন সুবিধার স্কোর শূন্য।
এ তো গেল শুধু মাতৃত্বকালীন সুবিধার কথা। অন্যান্য অনেক বিভাগেই বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তার কারণ আছে। এমনকি বিদ্যমান শ্রম আইন ও আইএলও কনভেনশনও শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। এই বিষয়ে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ মাহা মির্জা বলেছিলেন, আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ না হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ‘ক্ল্যাসিক এক্সাম্পল’।
তাছাড়া বিদ্যমান শ্রম আইনেও রয়ে গেছে বড়সড় ফাঁক। যেমন সংগঠন করার অধিকারের ক্ষেত্রে সংবিধান সংগঠিত হওয়ার অধিকার দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো কারখানার ২০ শতাংশ শ্রমিক না হলে তারা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারে না।
বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার আইন কতটা সুরক্ষা দেয়, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। শুধু রানা প্লাজার ঘটনায়ই এখনো পর্যন্ত ১৪ টি মামলা ঝুলে আছে।
অবশ্য স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসেও শ্রমিককে যখন তার ন্যায্য অধিকার আদায়ে মার খেতে হয়, তখন এই আলাপগুলোই কতটা গুরুত্ব রাখে, সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায়।