Advertisement Banner

আষাঢ়ে মেঘের দূত

নজরুল জাহিদ
নজরুল জাহিদ
আষাঢ়ে মেঘের দূত
ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

আটমাস অতিক্রান্ত; আর মাত্র চারমাস পরেই সাজার মেয়াদ শেষ। তারপরই সে তার প্রিয়ার কাছে ফিরতে পারবে। এতদিন সহ্য করতে পারলেও আজ এই আষাঢ়ের প্রথম দিনে বিরহজ্বালা এমন তীব্র হয়ে উঠল কেন? কেন মন এমন উচাটন আর শরীর এতটা স্পর্শলোভী হয়ে উঠল যে, প্রিয়তমাকে বার্তা পাঠানোর জন্যে মেঘের শরণ নিতে হলো?

প্রশ্নটা এখানে রেখে, আসুন একটু গল্পের পেছন থেকে ঘুরে আসি।

আপনারা জানেন, হিমালয় অঞ্চলে তুষারশুভ্র কৈলাস পর্বতে স্ফটিকের প্রাসাদ ও রত্নখচিত অট্টালিকায় পরিপূর্ণ এক পৌরাণিক নগরী ছিল। উদ্যান, পদ্মপুকুর, পুষ্পবৃক্ষ এবং বহমান ঝর্ণাধারা দ্বারা পরিবেষ্টিত সেই নগরীর নাম অলকপুরী। চন্দ্রালোক ও স্বর্গীয় দীপ্তিতে উদ্ভাসিত, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অপরূপ সামঞ্জস্যে ভরা, সেই নগরীতে যক্ষদের বাস। যক্ষরা ধনসম্পদে সমৃদ্ধ। সৌন্দর্য, সঙ্গীত আর প্রেম তাদের নিত্য সাথী। সেখানে বিচ্ছেদের বেদনা নেই। দুঃখকষ্ট নেই। এখানকার মানুষেরা যক্ষ নামে পরিচিত।

এই নগরীর শাসকের নাম কুবের। যদিও তিনি শাসন করেন অনেকটা একজন রাজার রাজ্য শাসনের মতোই। তবু তিনি ঠিক আমাদের আজকের রাজনৈতিক অর্থের ‘রাজা’ নন, বরং একজন দৈব সার্বভৌম শাসক। তিনি ধনপতি এবং অলকপুরী তথা যক্ষ জগতের অধিপতি।

এখানকার এক সাধারণ দম্পতি, কতদিন ধরে তারা বিবাহিত, তাদের সন্তান আছে কি না, তাদের বয়স কত–এসব জানা যায় না। তবে নিশ্চিতভাবে যা জানা যায়, তা হলো–যৌবনের উচ্ছ্বাসে ভরপুর কামজ ও প্রেমজ আনন্দময় জীবন তাদের। লেখক তাদের কোনো নাম দেননি। পুরুষটিকে কেবল ‘যক্ষ’ আর নারীটিকে ‘যক্ষপ্রিয়া’ বলে ডেকেছেন। নাম দিলে তাদের চিরকালীন বিরহবেদনা আর দুর্নিবার মিলনাকাঙ্ক্ষা কেবল দুজন ‘ব্যক্তি’র গল্প হয়ে দাঁড়াত হয়তো। তাই সর্বনামে ডেকে তাদেরকে সর্বকালের প্রতীক্ষাকাতর বিরহী প্রেমিক আর প্রেমিকা করে তুলেছেন।

এই যক্ষ কুবেরের অফিসে চাকরি করে। মোটামুটি উচ্চপদে। কিন্তু পত্নী বা কান্তা বা দয়িতা যক্ষপ্রিয়ার সাথে প্রেম ও গার্হস্থ্য সুখে মগ্ন থাকায় সে প্রায়ই কর্তব্যে অবহেলা করে। আজকাল নতুন বিয়ের পর যেমন অফিসে ঢুকতে লোকেদের বিলম্ব ঘটে, কাজে ভুলভাল হয়, যক্ষের ক্ষেত্রেও অমন ঘটছিল। ফলে কুবের রাগ করে তাকে এক বছরের জন্য নির্বাসন দিয়ে দিল। ‘যক্ষপ্রিয়া’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, অলকপুরী থেকে বহুদূরে, রামগিরি পাহাড়ে গিয়ে তাকে এক বছর বাস করতে হবে। মানে দাঁড়াল, “যে নারীর জন্য আমার কাজে অবহেলা, যাও এবার তার থেকে একবছর দূরে গিয়ে থাকো!”

ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত
ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

তা-ই হলো।

যক্ষ তার প্রিয়াকে রেখে নির্বাসনে আছে। ভালো লাগে না একাকী জীবন। অতি ক্লেশে তবু আট মাস পার হলো। তারপর, আজকের মতো, এক আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে আকাশের দিকে তাকিয়ে যক্ষের মনটা বড় চঞ্চল হয়ে উঠল। সে দেখল, একটা ঘনমেঘ নিচু হয়ে নেমে আসছে রামগিরি পর্বতের উপর। যেন দাঁত দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকা নতদেহ হাতি। আর এই দৃশ্য, এই নরম মাটিতে হাতির দাঁতের প্রথিত হওয়ার কল্পনা, যক্ষের মনকে আর্দ্র ও যৌনকাতর করে তুললো। এমন দৃশ্যে আসঙ্গসংশ্লেষে থাকা সুখীজনের চিত্তও ব্যাকুল হয় আর ইচ্ছুকজন দূরে রেখে দীর্ঘদিনের যৌনতাবঞ্চিত যক্ষের মন তো আর্দ্র হবেই!

বৃষ্টি হবো হবো করছে–এমন ভারী ঘন মেঘের নাম পুষ্করাবর্ত মেঘ। সেদিনের মেঘটিও ছিল এমন। এই বুঝি ঝরঝর করে ঝরে পড়বে। সেই জলভারাক্রান্ত কামনামদির মেঘের সামনে দাঁড়িয়ে যক্ষ ভাবল, আমি যেমনই থাকি, আসন্ন বর্ষায় রতিবঞ্চিতা প্রিয়ার পক্ষে একা থাকা কঠিন। তাই মেঘটিকে ডেকে কুরচি ফুলের অর্ঘ্য দিল, আর একটি বার্তা যক্ষপ্রিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে বলল।

কেন বর্ষার প্রারম্ভে এই যৌনকাতরতা, কেন কুরচি ফুলের অর্ঘ্য, মেঘকে এই কাজে রাজি করতে কী কী ‘লোভ’ দেখানো হলো, যেতে পথে মেঘকে কোন কোন নদী পার হতে হবে, সেই সব নদীরা কেন বিশেষভাবে আবেদনময়ী আর কেন অশেষভাবে সম্ভাবনাময়, কেন মেঘকেই বার্তাবাহক হিসেবে যোগ্য মনে হলো, মেঘের কাছে পাঠানো মেসেজের কোড বা ওটিপি কী ছিল, যাতে যক্ষপ্রিয়া বোঝে এটা তার স্বামীই দিয়েছে–এবং বিবিধ বিষয়ে অনেক কথা আছে। স্থানাভাবে কেবল দুটি কথা বলি।

বর্ষা ঋতু সেই যুগে কর্মহীন বাণিজ্যহীন ছিল। প্রবাসী পুরুষরা তাই বর্ষার আগেই ঘরে ফিরে আসত। তাদের নারীরা তখন অপেক্ষায় থাকত। এক বর্ষায় না এলে আরেক বছর তাদের অপেক্ষা করতে হতো। তখন তো ক্যালেন্ডার ছিল না। জ্যৈষ্ঠের শেষে আষাঢ়ের শুরুতে ঘন মেঘের উড়ে আসতে দেখে নারীরা বুঝে নিত ‘আজ আমার শ্যামরাই আসিতে পারে…’ তারা প্রস্তুতি নিত; ‘কুঞ্জ সাজাতো।’ যক্ষও বুঝেছিল এমন ‘আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে’ নিশ্চয় যক্ষপ্রিয়ার প্রতীক্ষা কাতরতার শীর্ষে পৌঁছাবে, ফলে এখনই সময়!

ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত
ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

কিন্তু সে কেন বুঝল না যে, অচেতন মেঘ সচেতন মানুষের মতো বার্তাবাহক হতে পারে না? হ্যাঁ, দেড় হাজার বছর আগে মেসেঞ্জার বা ইমেইল বা চিঠি ছিল না। কিন্তু, কারণ সেটা না। কারণ হলো–যক্ষ নির্বাসনের আট মাসে প্রণয়ের অষ্টদশায় উপনীত হয়েছিল। আমরা জানি, প্রণয়ের দশটা দশা আছে–

১। চক্ষুপ্রীতি: চোখের দেখায় ভালো লাগা

২। মনঃপ্রীতি: মনের মিলন স্থাপিত হওয়া বা মন থেকে চাওয়া

৩। সঙ্গসংকল্প: প্রিয়া বা প্রিয়কে কাছে পাওয়ার বাসনা

৪। অনিদ্রা: আশা পূর্ণ না হলে ঘুম টুটে যাওয়া

৫। কৃশতা: খাবারে অভক্তি আসাতে শুকিয়ে যাওয়া

৬। অবসাদ: মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া

৭। হ্রীত্যাগ: লজ্জা ত্যাগ, মানে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে যাচ্ছেতাই করা

৮। উন্মাদ: মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা

৯। মূর্ছা: প্রিয়ার বিহনে সংজ্ঞা হারানো

১০। মৃত্যু: ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন

যক্ষের অষ্টদশাপ্রাপ্ত হয়েছিল, তাই সে মেঘকেই বার্তাবাহক মনে করেছে। তাই সে মেঘকে অনুনয় করে বলছে যে, মেঘ, তুমি তাকে বলো, “তোমার সহচর দূরে রয়েছে, প্রতিকূল পথ তার পথ রুদ্ধ করে আছে, আর মাত্র কয়েক মাস অপেক্ষা করো; শরৎ এলে অভিশাপ শেষ হবে, আমরা আবার একসঙ্গে হব।”

এই সময় একটা মজার ঘটনাও ঘটে। তার মনে হয়েছে–আচ্ছা, মেঘ তো যাবে বার্তা নিয়ে। কিন্তু যদি যক্ষপ্রিয়াকে চিনতে না পারে। ঠিকানার পাশাপাশি চেহারারও বর্ণনা দেওয়া দরকার। তাই যক্ষ বলছে, হে জলদ, তুমি কেমন করে চিনবে, তাকে শুনে নাও তার সৌন্দর্যের বিবরণ...

তন্বী শ্যামা শিখরিদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী

মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভিঃ

শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং

যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিবাদ্যেব ধাতুঃ

হালকা গড়নের যুবতী যার গায়ের রং কাঞ্চন বা হালকা স্বর্ণালী বা শ্যামলা। তার দাঁত চিকন। ঠোঁট যেন পাকা বিম্বফলের (তেলাকুচা) মতো লাল। ক্ষীণ কোমরে গভীর নাভি; চোখে আছে চমকে ওঠা চঞ্চল হরিণের চাহনি। স্তনজোড়া নিজেদের ভারে কিছুটা নুইয়ে আছে। ভারী নিতম্বের কারণে তার চলন ঈষৎ ধীর ও মন্দলয়ের। এমন রূপের প্রতিমা এজন্যই প্রকৃষ্ট যে, সে হলো স্রষ্টার প্রথম ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

লেখক: গবেষক ও অধিকারকর্মী

সম্পর্কিত