বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতিতে বিপাকে ত্রিপুরা

তরুণ চক্রবর্তী
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতিতে বিপাকে ত্রিপুরা
ছবি: এআই জেনারেটেড

মানচিত্রে বাংলাদেশ যেমন ভারতের পেটের ভিতরে ঢুকে রয়েছে, তেমনি ত্রিপুরা রাজ্যটাও বাংলাদেশের পেটের ভেতর। মোট ১ হাজার ১৮ কিলোমিটারের সীমান্তের মধ্যে ৮৫৬ কিলোমিটারই বাংলাদেশের সঙ্গে। ৪০ লাখ জনবসতির এই ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্যটির বাঙালি বাসিন্দাদের প্রায় শতভাগেরই পূর্বপুরুষ সাবেক পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশের বাসিন্দা ছিলেন।

ত্রিপুরার মহারাজার কুমিল্লায় জমিদারি ছিল। কুমিল্লা শহরে যে হাঁস-মুরগির খামারটি রয়েছে, সেটি ছিল সংগীত শিল্পী শচীন দেববর্মণদের। শচীন কর্তারা ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য। কুমিল্লার বাড়িটিতে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে শচীন কর্তার সংগীত সাধনার স্মৃতি রয়েছে।

আসলে ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের আত্মিক যোগাযোগ ঐতিহাসিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে সবার আগে পাশে দাঁড়িয়েছিল ত্রিপুরা। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশ পাওয়ার আগেই ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন শরণার্থীদের জন্য। ত্রিপুরার মানুষ নিজেদের জনবলের থেকেও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। আসলে ত্রিপুরার মানুষের মনে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে ঐতিহাসিক ভালবাসা। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে এই ছোট্ট রাজ্যটির। অথচ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের হাত ধরে সবচেয়ে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল ত্রিপুরার। বহু বাংলাদেশি ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ট্রেনে বা বিমানে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কম খরচে যাতায়াত করতে পারতেন। বাংলাদেশের আটটি জেলার সদর থেকে ঢাকা নয়, আগরতলা কাছে। সেই সুবিধাটা তারা নিতেনও। কিন্তু এখন ভিসা জটিলতায় সবই অতীত।

ভারতে একমাত্র রাজধানী আগরতলাতেই আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর রয়েছে। বিমানবন্দরও জিরো পয়েন্ট থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। বিমান উড়লেই বাংলাদেশ। আগরতলা থেকে ভারতের আসাম ও বিহার হয়ে ট্রেনে বা সড়ক পথে কলকাতা যেতে লাগে প্রায় দুই দিন। দূরত্ব পাহাড়ি পথে ১ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার। আকাশ পথে মাত্র ৩২৭ কিলোমিটার। ঢাকা হয়ে গেলে ৫০০ কিলোমিটার। ত্রিপুরাসহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের আট রাজ্যেরই কোনো সমুদ্র বন্দর নেই। তাই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আগ্রহী ছিল ভারত। চুক্তিও হয়। অবকাঠামো তৈরি ও উদ্বোধন হলেও আজ সবই ধামাচাপা পড়ে আছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা নিতে ভারত সরকার ত্রিপুরার সাব্রুম ও বাংলাদেশের রামগড়ের মধ্যে ফেনী নদীর ওপর গড়ে তোলে মৈত্রী সেতু। ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার সেতুটির দক্ষিণে চট্টগ্রামের রামগড় আর উত্তরে ত্রিপুরার সাব্রুম। সেতু থেকে চট্টগ্রাম বন্দর মাত্র ৮০ কিলোমিটার। বহু সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখিয়ে ২০২১ সালের ৯ মার্চ মৈত্রী সেতুর উদ্বোধন করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, এটা উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার। স্বপ্ন অনেক ফেরি হলেও ১৩৩ কোটি রুপির এই সেতু এখনো ত্রিপুরার কোনো কাজে লাগেনি। তেমনি ত্রিপুরার শান্তিরবাজার রেলওয়ে স্টেশন থেকে বাংলাদেশের ফেনী জংশন রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত রেল সংযোগ পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর এবং কক্সবাজার গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত একটি রেল সংযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও আপাতত বিশবাঁও জলে।

ঠিক তেমনি, ২০২৩ সালে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উদ্বোধন করা আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগও কবে অপারেশনাল হবে তার উত্তর কারও জানা নেই। যোগযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে ভারতে ৫ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার, মোট ১২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার রেলপথ ভারতীয় অর্থায়নে নির্মাণ হয়। উদ্দেশ্য ছিল অনেক। ভারতের নিশ্চিন্তপুর ও বাংলাদেশের গঙ্গাসাগরে পরিকাঠামো কিন্তু তৈরি। লাভ কিছু হচ্ছে না। বরং জল বা পানি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে রেল লাইনে ঘাস জন্মাতে বেশি দিন লাগবে না।

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, ত্রিপুরার মানুষ কিন্তু বাংলাদেশিদের মন থেকে ভালোবাসেন। বাংলাদেশের মানুষও ত্রিপুরার অবদান ভোলেননি। সেটা দ্বিপাক্ষিক প্রথাগত বা ব্যক্তিগত বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসত। এখন সেটাও বন্ধের মুখে। ত্রিপুরা দিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাংলাদেশের অনুকূলেই ছিল। সীমান্ত হাটে গেলে দেখা যেত মানুষের উচ্ছ্বাস। উভয় পারের মানুষ উপভোগ করতেন বিনা পাসপোর্ট-ভিসার মেলামেশার সুবিধা। সব থমকে রয়েছে আজ। খুব কম মানুষ যাতায়াত করছেন। দুই পারেই ভিসার জন্য হাহাকার। কিন্তু সীমান্তে কড়া নজরদারি।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে আগরতলা শহরটাও যেন কেমন বদলে গিয়েছে। বিমানবন্দরে বাংলাদেশিদের ভিড় নেই বললেই চলে। বাজারে বাজারে ইলিশ বলতে কলকাতার। মাছ আসছে, কিন্তু কম। আগরতলা আন্তর্জাতিক স্থলবন্দরের কর্মকর্তা দেবাশিস নন্দী জানালেন, যাত্রী খুব কম হচ্ছে। পণ্য পরিবহণেও নিষেধাজ্ঞার ছোঁয়া লেগেছে। আগরতলা-ঢাকা, আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা বাস তো বহুকাল বন্ধ। বর্ডার হাট দুটিও বন্ধ রয়েছে। তবে সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের কুচকাওয়াজ সপ্তাহে দুদিন হচ্ছে। ভিড় করছেন দুপারের মানুষ। প্রতি শনি ও রোববার বিকেলে সূর্যাস্তের সময় আখাউড়া-আগরতলা সীমান্তে জাতীয় পতাকা অবনমনের সময় সামরিক অভিবাদন দেখতে ভিড় করা মানুষদের আবেগে কোনো খামতি নেই। বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ এবং বর্ডার সিকিওরিটি ফোর্সের অভিবাদন দেখতে হাজির হওয়া অনেকেই চোখের জলে প্রার্থনা করেন দুই দেশের সুসম্পর্কের। দুই পারের সাধারণ মানুষ কিন্তু চান ফের বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তা ফিরে আসুক। কিন্তু আখাউড়া থেকে ঢাকা, আগরতলা থেকে দিল্লির দূরত্বটা বোধহয় কম নয়!

দ্বিপাক্ষিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ কমলেও বিদ্যুৎ কিন্তু ত্রিপুরা থেকে নিয়মিত যাচ্ছে বাংলাদেশে। ত্রিপুরা সরকারের বিদ্যুৎ দপ্তরের জনসংযোগ আধিকারিক বিপুল ভৌমিক জানান, ভারত সরকারের নির্দেশেই এখনো বিদ্যুৎ রপ্তানি করা হচ্ছে। বকেয়া নিয়েও কোনো ঝামেলা নেই। ২০২৪ সালে প্রচুর বকেয়া জমলেও এখন বাংলাদেশ অগ্রিম অর্থ দিয়েই বিদ্যুৎ কেনে। ২০১৬ সাল থেকেই ভারত ত্রিপুরা থেকে বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)।

সম্পর্কিত