সহিদুল আলম স্বপন

সংখ্যাটি পড়ুন। একবার নয়, বারবার। ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২ হাজার ২৫০ কোটি। মাত্র এক বছরে বৃদ্ধির হার সাড়ে ৪১ শতাংশ। সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন এই সংখ্যাগুলো ছুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের সামনে শীতল নিষ্ঠুরতায়, নির্বিকার পরিসংখ্যানের ভাষায়। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরে যে কান্না লুকিয়ে আছে, যে বঞ্চনার ইতিহাস পাতায় পাতায় জমে আছে, তা কোনো ব্যালেন্সশিটে লেখা নেই।
এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি রাজনৈতিক অভিযোগনামা। একটি জাতির বিরুদ্ধে, তার ভেতর থেকে বেড়ে ওঠা লুটেরা শ্রেণির বিরুদ্ধে এবং সেই লুটকে নীরবে আশ্রয় দেওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
পরিসংখ্যানের ভেতরে লুকানো রাজনীতি
সংখ্যার ওঠানামাটি লক্ষ্য করুন। ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল সর্বোচ্চ প্রায় ৮৭ কোটি ফ্রাঁ। ২০২২ সালে তা হঠাৎ নেমে আসে ৫ কোটি ৫২ লাখে। ২০২৩ সালে তলানিতে ঠেকে মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখে। তারপর ২০২৪ সালে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে ৫৮ কোটিতে এবং ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে ছাড়িয়ে যায় ৮৩ কোটি।
কোনো বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই এই গ্রাফের পাঠোদ্ধার করতে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে এই সংখ্যার সম্পর্ক এতটাই সুস্পষ্ট যে, এটি প্রায় একটি নির্লজ্জ স্বীকারোক্তির মতো। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অর্থের গতিপথও পরিবর্তিত হয়। পুরনো লুটেরারা ক্ষমতা হারানোর আগেই অর্থ সরিয়ে নেয়, নতুন ক্ষমতাধরেরা নতুন পথে নতুন অর্থ পাঠাতে শুরু করে। এই চক্রটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি ভয়াবহ, প্রায় অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এই চক্রটি ভাঙার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সুইস আমানতের এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে, পরিবর্তনের ঢেউ রাজনীতির উপরিভাগ স্পর্শ করলেও অর্থপাচারের শিকড় এখনো অটুট। নতুন বোতলে পুরনো মদ, এই হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে পুরনো রসিকতা, যে রসিকতায় হাসির বদলে রক্তক্ষরণ হয়।
হিমশৈলের চূড়া: প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিসংখ্যান নিজেই একটি অসম্পূর্ণ সত্য। ব্যাংকটি স্বীকার করে যে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যদি দ্বিতীয় কোনো দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বা শেল কোম্পানির আড়ালে অর্থ গচ্ছিত রাখেন, তাহলে তা এই পরিসংখ্যানে আসে না। সোনা বা অন্য মূল্যবান সম্পদও এই হিসাবের বাইরে। অর্থাৎ, আমরা যে সংখ্যাটি দেখছি, সেটি হিমশৈলের কেবল দৃশ্যমান চূড়া।
গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির প্রতিবেদনগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যায় বিভিন্ন পথে। সুইজারল্যান্ড সেই বিশাল অর্থপ্রবাহের কেবল একটি গন্তব্য। বাকি অর্থ ছড়িয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের আবাসন বাজার থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ট্যাক্স হেভেন পর্যন্ত।
পাচারের পথগুলোও বহুমুখী ও সুপরিকল্পিত। হুন্ডি, ট্রেড ইনভয়েস ম্যানিপুলেশন, শেল কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এবং ক্রমশ বিস্তৃত হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির জগৎ–এই সব পথে প্রতিনিয়ত বিপুল অর্থ দেশের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে। ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে ব্যবহার করে অর্থপাচার বাংলাদেশে এতটাই পরিচিত প্রবণতা যে, এটি প্রায় একটি সমান্তরাল অর্থনীতির রূপ নিয়েছে। এই কাজ এত সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হয় যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রায়ই ধরতে পারে না। আর যখন ধরতে পারে, তখনো রাজনৈতিক সংযোগের দেয়াল টপকে বিচার পৌঁছায় না।
দক্ষিণ এশিয়ার যৌথ ক্ষত
এই বেদনা কেবল বাংলাদেশের একার নয়। ২০২৫ সালে ভারতীয়দের সুইস আমানত সামান্য কমে ৩২৩ কোটি ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ২৩ কোটি ফ্রাঁর বেশি। তিনটি দেশ মিলিয়ে কেবল সুইজারল্যান্ডেই গচ্ছিত প্রায় ৪৩০ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এই তিনটি দেশেরই কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির গর্ব করলেও দেশটিতে এখনো বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বাস। পাকিস্তান আইএমএফের কাছে বারবার ঋণের ভিক্ষা করছে। বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এই তিন দেশের ধনী ও ক্ষমতাবান শ্রেণির অর্থ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সুইস আল্পসের শীতল ছায়ায়। এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র নয় এটি একটি সভ্যতার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ।
পশ্চিমের দ্বিচারিতা: পাঠদাতা ও আশ্রয়দাতা একই মুখোশে
এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা, একদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও আর্থিক স্বচ্ছতার পাঠ দেয়। অন্যদিকে, সেই একই দেশগুলো থেকে পাচার হওয়া কালো অর্থ তাদের নিজেদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাদরে গ্রহণ করে। শর্ত দেয় ঋণের, কিন্তু ঋণগ্রহীতার লুটেরাদের অর্থও রাখে নিজের তিজোরিতে।
এই দ্বিচারিতা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি সুচিন্তিত কাঠামো। উন্নত বিশ্বের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্র দেশের পাচার হওয়া অর্থ থেকে সুদ, ফি এবং বিনিয়োগের সুবিধা নেয়। আর সেই দরিদ্র দেশগুলো একই সময়ে আইএমএফের কঠোর শর্তের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে। একটি হাত ঋণ দেয়, আরেকটি হাত সেই ঋণের সুদের চেয়ে বেশি অর্থ লুটেরাদের কাছ থেকে গ্রহণ করে। আধুনিক বিশ্বে এর চেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস আর কমই আছে।
প্রতিশ্রুতির কবরখানা
পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বিবৃতি দিয়েছে, তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। কারণ একটাই–যারা এই অর্থ পাচার করেছে, তারা প্রায়ই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকে এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরও তাদের একটি অংশ নতুন কাঠামোর সঙ্গে মিলে যায়। পাচারকারীর বিচার করতে গেলে অনেক সময় নিজেদের দলের লোককেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়–এই রাজনৈতিক সাহস বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের সামনে এই সুযোগ ছিল। কিন্তু সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুইজারল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় তথ্য বিনিময় চুক্তি, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটির সক্রিয় ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার প্রকৃত সক্ষমতা। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো এই কাজে কতটা আন্তরিক ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পুরো কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সিস্টেমকে জবাবদিহির আওতায় না আনলে এই লড়াই কাগজেই থেকে যাবে।
আঞ্চলিক ঐক্য: সম্ভাবনা ও বাধা
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উচিত এই বিষয়ে একটি আঞ্চলিক ঐকমত্য গড়ে তোলা। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যদি একত্রে সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্য ট্যাক্স হেভেন দেশগুলোর ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে একটি সম্মিলিত আর্থিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা এই স্বপ্নকে কঠিন করে তোলে। ভারত-পাকিস্তানের দশকের পর দশকের অবিশ্বাস, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন এই পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। অথচ লুটেরারা কিন্তু জাতীয়তার বেড়া মানে না। তারা একসঙ্গে পাচার করে, একসঙ্গে আশ্রয় নেয়। কেবল যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারাই বিভক্ত থাকে।
শেষ কথা: আত্মসম্মানের লড়াই
যে অর্থ সুইস তিজোরিতে নিরাপদে ঘুমাচ্ছে, সেই অর্থের প্রতিটি ফ্রাঁর পেছনে হয়তো আছে কোনো গার্মেন্টকর্মীর না পাওয়া অর্থ, কোনো কৃষকের জমি হারানোর বেদনা, কোনো সরকারি প্রকল্পের কমিশনের কালো অর্থ। এই হিসাব হয়তো কখনো পুরোপুরি মেলানো যাবে না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত প্রতিটি ফ্রাঁর পেছনে আছে একটি দেশের মানুষের বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।
সুইস ব্যাংকের পরিসংখ্যান একটি নির্মম আয়না। সেই আয়নায় আমাদের রাষ্ট্রের মুখ দেখা যাচ্ছে বিবর্ণ, ক্ষতবিক্ষত, লুণ্ঠিত। এই অভিযোগনামার বিচার না হলে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না, দক্ষিণ এশিয়া তার বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে না।
লুটেরাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি জাতির আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই। এই লড়াইয়ে পরাজয় মানে শুধু অর্থ হারানো নয়; এর অর্থ একটি জাতির ভবিষ্যৎ হারানো।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ

সংখ্যাটি পড়ুন। একবার নয়, বারবার। ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২ হাজার ২৫০ কোটি। মাত্র এক বছরে বৃদ্ধির হার সাড়ে ৪১ শতাংশ। সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন এই সংখ্যাগুলো ছুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের সামনে শীতল নিষ্ঠুরতায়, নির্বিকার পরিসংখ্যানের ভাষায়। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরে যে কান্না লুকিয়ে আছে, যে বঞ্চনার ইতিহাস পাতায় পাতায় জমে আছে, তা কোনো ব্যালেন্সশিটে লেখা নেই।
এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি রাজনৈতিক অভিযোগনামা। একটি জাতির বিরুদ্ধে, তার ভেতর থেকে বেড়ে ওঠা লুটেরা শ্রেণির বিরুদ্ধে এবং সেই লুটকে নীরবে আশ্রয় দেওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
পরিসংখ্যানের ভেতরে লুকানো রাজনীতি
সংখ্যার ওঠানামাটি লক্ষ্য করুন। ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল সর্বোচ্চ প্রায় ৮৭ কোটি ফ্রাঁ। ২০২২ সালে তা হঠাৎ নেমে আসে ৫ কোটি ৫২ লাখে। ২০২৩ সালে তলানিতে ঠেকে মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখে। তারপর ২০২৪ সালে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে ৫৮ কোটিতে এবং ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে ছাড়িয়ে যায় ৮৩ কোটি।
কোনো বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই এই গ্রাফের পাঠোদ্ধার করতে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে এই সংখ্যার সম্পর্ক এতটাই সুস্পষ্ট যে, এটি প্রায় একটি নির্লজ্জ স্বীকারোক্তির মতো। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অর্থের গতিপথও পরিবর্তিত হয়। পুরনো লুটেরারা ক্ষমতা হারানোর আগেই অর্থ সরিয়ে নেয়, নতুন ক্ষমতাধরেরা নতুন পথে নতুন অর্থ পাঠাতে শুরু করে। এই চক্রটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি ভয়াবহ, প্রায় অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এই চক্রটি ভাঙার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সুইস আমানতের এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে, পরিবর্তনের ঢেউ রাজনীতির উপরিভাগ স্পর্শ করলেও অর্থপাচারের শিকড় এখনো অটুট। নতুন বোতলে পুরনো মদ, এই হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে পুরনো রসিকতা, যে রসিকতায় হাসির বদলে রক্তক্ষরণ হয়।
হিমশৈলের চূড়া: প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিসংখ্যান নিজেই একটি অসম্পূর্ণ সত্য। ব্যাংকটি স্বীকার করে যে, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যদি দ্বিতীয় কোনো দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বা শেল কোম্পানির আড়ালে অর্থ গচ্ছিত রাখেন, তাহলে তা এই পরিসংখ্যানে আসে না। সোনা বা অন্য মূল্যবান সম্পদও এই হিসাবের বাইরে। অর্থাৎ, আমরা যে সংখ্যাটি দেখছি, সেটি হিমশৈলের কেবল দৃশ্যমান চূড়া।
গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির প্রতিবেদনগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যায় বিভিন্ন পথে। সুইজারল্যান্ড সেই বিশাল অর্থপ্রবাহের কেবল একটি গন্তব্য। বাকি অর্থ ছড়িয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের আবাসন বাজার থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ট্যাক্স হেভেন পর্যন্ত।
পাচারের পথগুলোও বহুমুখী ও সুপরিকল্পিত। হুন্ডি, ট্রেড ইনভয়েস ম্যানিপুলেশন, শেল কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এবং ক্রমশ বিস্তৃত হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির জগৎ–এই সব পথে প্রতিনিয়ত বিপুল অর্থ দেশের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছে। ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে ব্যবহার করে অর্থপাচার বাংলাদেশে এতটাই পরিচিত প্রবণতা যে, এটি প্রায় একটি সমান্তরাল অর্থনীতির রূপ নিয়েছে। এই কাজ এত সূক্ষ্মভাবে পরিচালিত হয় যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো প্রায়ই ধরতে পারে না। আর যখন ধরতে পারে, তখনো রাজনৈতিক সংযোগের দেয়াল টপকে বিচার পৌঁছায় না।
দক্ষিণ এশিয়ার যৌথ ক্ষত
এই বেদনা কেবল বাংলাদেশের একার নয়। ২০২৫ সালে ভারতীয়দের সুইস আমানত সামান্য কমে ৩২৩ কোটি ফ্রাঁতে দাঁড়িয়েছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ২৩ কোটি ফ্রাঁর বেশি। তিনটি দেশ মিলিয়ে কেবল সুইজারল্যান্ডেই গচ্ছিত প্রায় ৪৩০ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এই তিনটি দেশেরই কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির গর্ব করলেও দেশটিতে এখনো বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বাস। পাকিস্তান আইএমএফের কাছে বারবার ঋণের ভিক্ষা করছে। বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এই তিন দেশের ধনী ও ক্ষমতাবান শ্রেণির অর্থ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সুইস আল্পসের শীতল ছায়ায়। এই বৈপরীত্য কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র নয় এটি একটি সভ্যতার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ।
পশ্চিমের দ্বিচারিতা: পাঠদাতা ও আশ্রয়দাতা একই মুখোশে
এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা, একদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও আর্থিক স্বচ্ছতার পাঠ দেয়। অন্যদিকে, সেই একই দেশগুলো থেকে পাচার হওয়া কালো অর্থ তাদের নিজেদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাদরে গ্রহণ করে। শর্ত দেয় ঋণের, কিন্তু ঋণগ্রহীতার লুটেরাদের অর্থও রাখে নিজের তিজোরিতে।
এই দ্বিচারিতা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি সুচিন্তিত কাঠামো। উন্নত বিশ্বের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্র দেশের পাচার হওয়া অর্থ থেকে সুদ, ফি এবং বিনিয়োগের সুবিধা নেয়। আর সেই দরিদ্র দেশগুলো একই সময়ে আইএমএফের কঠোর শর্তের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে। একটি হাত ঋণ দেয়, আরেকটি হাত সেই ঋণের সুদের চেয়ে বেশি অর্থ লুটেরাদের কাছ থেকে গ্রহণ করে। আধুনিক বিশ্বে এর চেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস আর কমই আছে।
প্রতিশ্রুতির কবরখানা
পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বিবৃতি দিয়েছে, তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। কারণ একটাই–যারা এই অর্থ পাচার করেছে, তারা প্রায়ই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকে এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরও তাদের একটি অংশ নতুন কাঠামোর সঙ্গে মিলে যায়। পাচারকারীর বিচার করতে গেলে অনেক সময় নিজেদের দলের লোককেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়–এই রাজনৈতিক সাহস বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের সামনে এই সুযোগ ছিল। কিন্তু সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুইজারল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় তথ্য বিনিময় চুক্তি, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটির সক্রিয় ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার প্রকৃত সক্ষমতা। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো এই কাজে কতটা আন্তরিক ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পুরো কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সিস্টেমকে জবাবদিহির আওতায় না আনলে এই লড়াই কাগজেই থেকে যাবে।
আঞ্চলিক ঐক্য: সম্ভাবনা ও বাধা
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উচিত এই বিষয়ে একটি আঞ্চলিক ঐকমত্য গড়ে তোলা। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যদি একত্রে সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্য ট্যাক্স হেভেন দেশগুলোর ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে একটি সম্মিলিত আর্থিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা এই স্বপ্নকে কঠিন করে তোলে। ভারত-পাকিস্তানের দশকের পর দশকের অবিশ্বাস, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন এই পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। অথচ লুটেরারা কিন্তু জাতীয়তার বেড়া মানে না। তারা একসঙ্গে পাচার করে, একসঙ্গে আশ্রয় নেয়। কেবল যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারাই বিভক্ত থাকে।
শেষ কথা: আত্মসম্মানের লড়াই
যে অর্থ সুইস তিজোরিতে নিরাপদে ঘুমাচ্ছে, সেই অর্থের প্রতিটি ফ্রাঁর পেছনে হয়তো আছে কোনো গার্মেন্টকর্মীর না পাওয়া অর্থ, কোনো কৃষকের জমি হারানোর বেদনা, কোনো সরকারি প্রকল্পের কমিশনের কালো অর্থ। এই হিসাব হয়তো কখনো পুরোপুরি মেলানো যাবে না। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত প্রতিটি ফ্রাঁর পেছনে আছে একটি দেশের মানুষের বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।
সুইস ব্যাংকের পরিসংখ্যান একটি নির্মম আয়না। সেই আয়নায় আমাদের রাষ্ট্রের মুখ দেখা যাচ্ছে বিবর্ণ, ক্ষতবিক্ষত, লুণ্ঠিত। এই অভিযোগনামার বিচার না হলে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না, দক্ষিণ এশিয়া তার বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে না।
লুটেরাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি জাতির আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই। এই লড়াইয়ে পরাজয় মানে শুধু অর্থ হারানো নয়; এর অর্থ একটি জাতির ভবিষ্যৎ হারানো।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ