রাশেদুর রহমান

আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন আলোচিত-সমালোচিত জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ।
হঠাৎ বলা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। কয়েক বছর আগে স্ট্রোক করার পর তার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। এর পর থেকে প্রায়ই তার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যেত। এখন থেকে সেই খবরও আর পাওয়া যাবে না। তিনি আমাদের ছেড়ে একেবারেই চলে গেলেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৬৮-৬৯ সালের উত্তাল সময়ে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ((ডাকসু) ভিপি। সেই সময়ের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি ছাত্র সমাজের নেতৃত্বের প্রথম কাতারে চলে এসেছিলেন।
ওই সময় আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ৬ দফার সঙ্গে ছাত্রদের দাবি যুক্ত করে ১১ দফা দাবিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের দুই অংশসহ ৪টি ছাত্র সংগঠন সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছিল। ডাকসুর ভিপি হিসেবে সেই পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তোফায়েল আহমেদ।
সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচি ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানে রুপ নেয়। এই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল অভিযুক্তকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
একই বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভার আয়োজন করেছিল। সেই জনসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আর এই ঘোষণা দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ। এর মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ওই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা। এরপর জাতীয় পর্যায়েও তার একটা অবস্থান তৈরি হয়। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে অংশ নিয়ে তিনি জয়ী হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তোফায়েল আহমেদ যুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধকালে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ; এই বাহিনী মুজিব বাহিনী হিসেবে বহুল পরিচিত পেয়েছিল) নামে একটি পৃথক বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালে এই বাহিনীর কর্মকাণ্ড বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এই বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব নিযোগ করেছিলেন। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশে বহুল আলোচিত রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অনানুষ্ঠানিকভাবে (আনঅফিশিয়াল) প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তোফায়েল আহমেদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। পরে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করে বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তোফায়েল আহমেদ গ্রেপ্তার হন। তারপর প্রায় তিন বছর তিনি জেলে ছিলেন। জেলে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। পরে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন তিনি। তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার ব্যাপক একটা প্রভাব ছিল। দলের বাইরে জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী একজন রাজনীতিক ছিলেন। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বের প্রথম সারিতে ছিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৬ বছর পর ১৯৮১ সালে তার বড় মেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। সে সময় তাকে যারা দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ অন্যতম ছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা-কর্মীদের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তোফায়েল আহমেদ রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে চেষ্টা করেননি। শেখ হাসিনা নিজেও একাধিকবার তার বক্তব্যে এই ধারণা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া ১৫ আগস্ট উপলক্ষে শেখ হাসিনা তার ‘বেদনায় ভরা দিন’ নামে লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদের পাশাপাশি দলের যাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের নামও ছিল।
শোনা যায়, এ বিষয় নিয়ে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক ক্রমশ শীতল হয়ে পড়েছিল। তারপরও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে, তোফায়েল আহমেদ ওই সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত দলে তার প্রভাব অক্ষুণ্ন ছিল।
পরবর্তী সময়ে তোফায়েল আহমেদের এই প্রভাব কমতে শুরু করে; বিশেষত, ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদায় নেওয়ার পর থেকে। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতিতে সংস্কারের কথা বলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপাসন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন দুই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়ার পর ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র আলোচনা জোরদার হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের কিছু নেতার অভিযোগ–সেই সময় তোফায়েল আহমেদ তিন সিনিয়র নেতাকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন। সংস্কারপন্থী বাকি তিন নেতার দুজন ছিলেন প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আবদুর রাজ্জাক। আরেকজন ছিলেন আমির হোসেন আমু।
অন্যদিকে বিএনপিতে আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ কয়েকজন নেতাও তাদের দলে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত এক-এগারোর সরকার সেই সংস্কার ও দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কিন্তু এর ফলে তোফায়েল আহমেদ দলে চিহ্নিত হন সংস্কারপন্থী হিসেবে। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই আ্ওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোট এবং অনেক আসন পেয়ে বিজয়ী হয়। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন।
এর পর টানা চার মেয়াদ (সাড়ে ১৫ বছর) আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ মাত্র একবার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন। কারণ, ২০০৮ সালের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়ে গিয়েছিল।
তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে শোনা যায়, এর ফলে দলীয় রাজনীতিতে তিনি আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ফলে উপদেষ্টামণ্ডলির সদস্য এবং পরে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হলেও দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য করা হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণে উপদেষ্টামণ্ডলি ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। এই পরিস্থিতি তোফায়েল আহমেদ আর সামলে উঠতে পারেননি। এসব ঘটনায় তার মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল। তারপরও তিনি আদর্শ থেকে সরেননি এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগেই ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএসসি পাস করেন।
কলেজজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ১৯৬২ সালে ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ যা ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিত) গঠিত হয়। এই বাহিনী পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ–চারটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। তোফায়েল আহমেদ বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চলের প্রধান ছিলেন।
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে তার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। একই বছর বাকশালের যুব সংগঠন জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।
তোফায়েল আহমেদ মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমে ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ, ২০১৪ দশম জাতীয় সংসদ, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ এবং ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি তোফায়েল আহমেদ। তবে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করলে সেই সরকারে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ দফা সরকার গঠন করে। শেষ দুই সরকারে স্থান পাননি তিনি। অবশ্য ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে মাত্র ৭ মাসের মাথায় আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ দফা সরকারের পতন হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন। দুই দফায় তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রী হিসেবে সফলও ছিলেন। নিজের দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে সর্বক্ষেত্রে আলো ছড়িয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও অংশ তিনি।
তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে জীবনের শেষ দুই দশক তিনি কোণঠাসা ছিলেন। এ কারণে তিনি নিজেকে অবহেলিত মনে করতেন। তারপরও তিনি আদর্শচ্যুত হননি। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই ছিলেন।
২০২১ সালে তিনি তার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তোফায়েল আহমেদ ফাউন্ডেশনে দান করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফাউন্ডেশনটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে।
এমন এক সময়ে চলে গেলেন তোফায়েল আহমেদ, যখন তার দল আওয়ামী লীগ গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চরম সংকটে রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ তার কাজের মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। বিদায়ী অভিবাদন তাকে।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন আলোচিত-সমালোচিত জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদ।
হঠাৎ বলা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। কয়েক বছর আগে স্ট্রোক করার পর তার শরীরের একাংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। এর পর থেকে প্রায়ই তার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যেত। এখন থেকে সেই খবরও আর পাওয়া যাবে না। তিনি আমাদের ছেড়ে একেবারেই চলে গেলেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৬৮-৬৯ সালের উত্তাল সময়ে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ((ডাকসু) ভিপি। সেই সময়ের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি ছাত্র সমাজের নেতৃত্বের প্রথম কাতারে চলে এসেছিলেন।
ওই সময় আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ৬ দফার সঙ্গে ছাত্রদের দাবি যুক্ত করে ১১ দফা দাবিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের দুই অংশসহ ৪টি ছাত্র সংগঠন সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছিল। ডাকসুর ভিপি হিসেবে সেই পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তোফায়েল আহমেদ।
সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচি ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানে রুপ নেয়। এই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল অভিযুক্তকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
একই বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভার আয়োজন করেছিল। সেই জনসভায় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। আর এই ঘোষণা দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ। এর মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ওই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা। এরপর জাতীয় পর্যায়েও তার একটা অবস্থান তৈরি হয়। ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে অংশ নিয়ে তিনি জয়ী হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তোফায়েল আহমেদ যুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধকালে গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ; এই বাহিনী মুজিব বাহিনী হিসেবে বহুল পরিচিত পেয়েছিল) নামে একটি পৃথক বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালে এই বাহিনীর কর্মকাণ্ড বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এই বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব নিযোগ করেছিলেন। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশে বহুল আলোচিত রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ অনানুষ্ঠানিকভাবে (আনঅফিশিয়াল) প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তোফায়েল আহমেদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। পরে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত করে বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তোফায়েল আহমেদ গ্রেপ্তার হন। তারপর প্রায় তিন বছর তিনি জেলে ছিলেন। জেলে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। পরে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন তিনি। তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার ব্যাপক একটা প্রভাব ছিল। দলের বাইরে জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী একজন রাজনীতিক ছিলেন। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বের প্রথম সারিতে ছিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৬ বছর পর ১৯৮১ সালে তার বড় মেয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। সে সময় তাকে যারা দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ অন্যতম ছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা-কর্মীদের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তোফায়েল আহমেদ রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে চেষ্টা করেননি। শেখ হাসিনা নিজেও একাধিকবার তার বক্তব্যে এই ধারণা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া ১৫ আগস্ট উপলক্ষে শেখ হাসিনা তার ‘বেদনায় ভরা দিন’ নামে লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদের পাশাপাশি দলের যাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের নামও ছিল।
শোনা যায়, এ বিষয় নিয়ে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক ক্রমশ শীতল হয়ে পড়েছিল। তারপরও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে, তোফায়েল আহমেদ ওই সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত দলে তার প্রভাব অক্ষুণ্ন ছিল।
পরবর্তী সময়ে তোফায়েল আহমেদের এই প্রভাব কমতে শুরু করে; বিশেষত, ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদায় নেওয়ার পর থেকে। ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতিতে সংস্কারের কথা বলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপাসন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন দুই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়ার পর ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র আলোচনা জোরদার হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের কিছু নেতার অভিযোগ–সেই সময় তোফায়েল আহমেদ তিন সিনিয়র নেতাকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন। সংস্কারপন্থী বাকি তিন নেতার দুজন ছিলেন প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও আবদুর রাজ্জাক। আরেকজন ছিলেন আমির হোসেন আমু।
অন্যদিকে বিএনপিতে আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ কয়েকজন নেতাও তাদের দলে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত এক-এগারোর সরকার সেই সংস্কার ও দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কিন্তু এর ফলে তোফায়েল আহমেদ দলে চিহ্নিত হন সংস্কারপন্থী হিসেবে। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই আ্ওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোট এবং অনেক আসন পেয়ে বিজয়ী হয়। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন।
এর পর টানা চার মেয়াদ (সাড়ে ১৫ বছর) আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ মাত্র একবার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন। কারণ, ২০০৮ সালের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়ে গিয়েছিল।
তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে শোনা যায়, এর ফলে দলীয় রাজনীতিতে তিনি আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ফলে উপদেষ্টামণ্ডলির সদস্য এবং পরে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হলেও দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য করা হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণে উপদেষ্টামণ্ডলি ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। এই পরিস্থিতি তোফায়েল আহমেদ আর সামলে উঠতে পারেননি। এসব ঘটনায় তার মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল। তারপরও তিনি আদর্শ থেকে সরেননি এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগেই ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএসসি পাস করেন।
কলেজজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ১৯৬২ সালে ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ যা ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিত) গঠিত হয়। এই বাহিনী পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ–চারটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। তোফায়েল আহমেদ বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চলের প্রধান ছিলেন।
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে তার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। একই বছর বাকশালের যুব সংগঠন জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।
তোফায়েল আহমেদ মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথমে ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ, ২০১৪ দশম জাতীয় সংসদ, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ এবং ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি তোফায়েল আহমেদ। তবে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করলে সেই সরকারে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে বিতর্কিত নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ দফা সরকার গঠন করে। শেষ দুই সরকারে স্থান পাননি তিনি। অবশ্য ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে মাত্র ৭ মাসের মাথায় আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ দফা সরকারের পতন হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন। দুই দফায় তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রী হিসেবে সফলও ছিলেন। নিজের দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে সর্বক্ষেত্রে আলো ছড়িয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও অংশ তিনি।
তোফায়েল আহমেদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব-কোন্দলের কারণে জীবনের শেষ দুই দশক তিনি কোণঠাসা ছিলেন। এ কারণে তিনি নিজেকে অবহেলিত মনে করতেন। তারপরও তিনি আদর্শচ্যুত হননি। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই ছিলেন।
২০২১ সালে তিনি তার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তোফায়েল আহমেদ ফাউন্ডেশনে দান করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফাউন্ডেশনটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে।
এমন এক সময়ে চলে গেলেন তোফায়েল আহমেদ, যখন তার দল আওয়ামী লীগ গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চরম সংকটে রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ তার কাজের মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। বিদায়ী অভিবাদন তাকে।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক