Advertisement Banner

পেন্টাগনে অন্তর্দ্বন্দ্ব: মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিপজ্জনক নেতৃত্ব সংকট

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পেন্টাগনে অন্তর্দ্বন্দ্ব: মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিপজ্জনক নেতৃত্ব সংকট
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন এইচ-১বি ওয়ার্ক ভিসা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিয়মে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন সামরিক প্রতিশ্রুতির মাঝে মার্কিন পেন্টাগনে এমন একটি অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসে পড়েছে যা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বের ধরন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত লারা সেলিগম্যান, মার্কাস ওয়েইসগারবার ও মেরিডিথ ম্যাকগ্রোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেগসেথ ও সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকলের মধ্যকার বিরোধ কংগ্রেসের শুনানিতে প্রকাশ্য রূপ নেওয়ায় পেন্টাগনের ভেতরে এবং ট্রাম্পের কিছু মহলে সমালোচনার ঢেউ উঠেছে।

২০২৫ সালের শুরুতে পেন্টাগনে প্রথম দিন থেকেই ড্রিসকল ও হেগসেথের সম্পর্ক নড়বড়ে ছিল। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহকারী ড্রিসকল প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের অফিসে একটি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন–ভ্যান্স ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সৈনিকদের সাথে সাক্ষাৎ এবং সেনাবাহিনী সংস্কার বিষয়ে কথা বলার একটি সফর আয়োজনের উদ্যোগের বিষয়ে। হেগসেথ তখন গলা চড়িয়ে বলেন যে, তিনিই দায়িত্বে আছেন এবং ড্রিসকলকে তার নিজের সীমার মধ্যে থাকতে নির্দেশ দেন। বৈঠক হঠাৎ শেষ হয়ে যায়। এই ঘটনাটি ছিল একটি দীর্ঘ ও বিষাক্ত সম্পর্কের প্রথম পর্ব।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: রয়টার্স

এই উত্তেজনা বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয় যখন ড্রিসকল আইনপ্রণেতাদের সামনে সেনাবাহিনীর সাবেক শীর্ষ জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জের প্রতি তার পছন্দের কথা বলেন। ২ এপ্রিল ড্রিসকল যখন ছুটিতে ছিলেন তখন হেগসেথ জর্জকে সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদ থেকে সরিয়ে দেন। শুনানিতে চার তারকা জেনারেলের আকস্মিক বরখাস্ত নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে ড্রিসকল বলেন, “আমিও জেনারেল জর্জকে ভালোবাসি এবং তিনি একজন অসাধারণ নেতা।”

হোয়াইট হাউস বলেছে, হেগসেথের প্রতি প্রেসিডেন্টের আস্থা রয়েছে এবং ট্রাম্প তার পেন্টাগন পরিচালনায় সন্তুষ্ট। কিন্তু এই বিরোধের অস্বাভাবিক প্রকাশ্য রূপ এবং একটি যুদ্ধের মাঝে অত্যন্ত সম্মানিত একজন জেনারেলকে বরখাস্ত করার ঘটনা পেন্টাগনের ভেতরে এবং ট্রাম্পের কিছু মহলে হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন সমালোচনা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন সামরিক প্রতিশ্রুতির এই সময়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কাজে লাগাচ্ছেন?

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি জর্জকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধকালীন পরিবেশে সেনাবাহিনীকে একজন জ্যেষ্ঠ নেতা থেকে বঞ্চিত করার মতো খারাপ কাজ তিনি ভাবতে পারছেন না।

ড্রিসকল ও হেগসেথের সম্পর্ক শুরু থেকেই টানাপোড়েন ছিল। ২০২৫ সালের বসন্তে পেন্টাগন প্রধানের জন্য একের পর এক কেলেঙ্কারি আসতে থাকে। মার্চ ২০২৫-এ এক সাংবাদিক ফাঁস করেন যে, হেগসেথ জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সাথে একটি সিগন্যাল চ্যাটে গোপন যুদ্ধপরিকল্পনা শেয়ার করেছিলেন। পরের মাসে হেগসেথের তিনজন শীর্ষ সহকারীকে গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে পেন্টাগন থেকে বের করে দেওয়া হয়। সহকারীরা এ ধরনের অন্যায়ের কথা অস্বীকার করেছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দাখিল করা হয়নি।

পরিস্থিতির সাথে পরিচিত ব্যক্তিরা বলেছেন, হেগসেথ উদ্বিগ্ন ছিলেন যে ট্রাম্প তার জায়গায় নতুন লোক বসাতে ড্রিসকলের দিকে তাকাচ্ছেন। ড্রিসকলকে প্রশাসনজুড়ে ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তার পদে সুরক্ষিত বলে মনে করা হতো। উভয়ই ইয়েল ল স্কুলে একসাথে পড়েছেন। পদ গ্রহণের প্রায় সাথে সাথেই হেগসেথ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেন। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক মিলির সাথে সম্পর্ক ছিল এমন অফিসারদের বরখাস্ত বা কোণঠাসা করেন।

রুশ হামলায় বিধ্বস্ত ইউক্রেনের দোনেৎস্ক শহর। ছবি: রয়টার্স
রুশ হামলায় বিধ্বস্ত ইউক্রেনের দোনেৎস্ক শহর। ছবি: রয়টার্স

নভেম্বরে ট্রাম্প ড্রিসকলকে ইউক্রেনে পাঠান রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধে শান্তি আলোচনায় সাহায্য করতে। এটি একজন বেসামরিক সেবা নেতার জন্য অস্বাভাবিক কাজ ছিল যার দায়িত্ব সৈনিক প্রশিক্ষণ ও সজ্জিত করা, শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব নয়। এটি পেন্টাগনজুড়ে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয় কেন এই কাজের জন্য ড্রিসকলকে বেছে নেওয়া হলো, তার বস হেগসেথকে নয়। হেগসেথ সহযোগীদের বলেছিলেন, তিনি চান হোয়াইট হাউস আলোচনা থেকে ড্রিসকলকে সরিয়ে দিক। অল্পকাল পরে ড্রিসকলকে সাময়িকভাবে সেই উচ্চ-প্রোফাইলের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তার অনেক সংবাদমাধ্যম সম্পৃক্ততা বন্ধ করা হয়।

২০২৬-এর শুরুতে একটি পদোন্নতি তালিকা নিয়ে ড্রিসকল ও হেগসেথের মধ্যে আবার বিরোধ চরমে ওঠে। হেগসেথ ও তার সহকারীরা ড্রিসকলকে এক তারকা জেনারেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য নির্বাচিত উচ্চ-মর্যাদার তালিকা থেকে কয়েকজন কর্মকর্তার নাম বাদ দিতে বলেছিলেন– যার মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও নারী অফিসার এবং মিলির সাবেক মুখপাত্র কর্নেল ডেভ বাটলারও ছিলেন। ড্রিসকল বারবার সেনাবাহিনীর অফিসারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে অস্বীকার করেন। ফেব্রুয়ারির শুরুতে হেগসেথ ড্রিসকলকে তার অফিসে ডাকেন যা ১৫ মিনিটের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সাক্ষাৎ এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের উত্তপ্ত আলোচনায় পরিণত হয়। সেখানে হেগসেথ ড্রিসকলকে নির্দেশ দেন বাটলারকে বরখাস্ত করার। প্রায় এক সপ্তাহ পরে বাটলারের বরখাস্তের বিষয়টি প্রকাশ পায়।

এইসব ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি হয় যখন নিউইয়র্ক টাইমস পদোন্নতি তালিকা নিয়ে বিভেদের খবর করে। হেগসেথ ও তার সহকারীরা সন্দেহ করেন যে জর্জ খবরটি ফাঁস করেছেন এবং তার পদত্যাগ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হেগসেথ ২ এপ্রিল একটি সংক্ষিপ্ত ফোনকলে জর্জকে বরখাস্ত করেন। ওই সময় ড্রিসকল উত্তর ক্যারোলাইনায় পরিবারের সাথে ছুটিতে ছিলেন। কোনো সেনাবাহিনী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেই কোনো ব্যাখ্যা বা আগাম নোটিশ দেওয়া হয়নি।

ড্রিসকল আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, তিনি ও তার পরিবার সরাসরি উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে জর্জের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন যেখানে পুরো পরিবার তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। তার ৪২ বছরের সেবা, পার্পল হার্ট পদক, তার স্ত্রী প্যাটি, নাতি-নাতনি, সন্তানদের প্রতি ড্রিসকলের গভীর সম্মান প্রকাশ পায় তার আবেগঘন বক্তব্যে। হেগসেথ তার নিজের সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক সহকারী জেনারেল ক্রিস্টোফার লানেভেকে জর্জের ভারপ্রাপ্ত উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেন। হেগসেথ আরও দুজন জ্যেষ্ঠ সেনা অফিসারকে বরখাস্ত করেন।

কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ড্রিসকলের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন এবং জর্জের সাথে আচরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। হাইস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সদস্য স্টিভ ওম্যাক বলেছেন, সাবেক প্রধান সেনাপতি আমাদের সেনাবাহিনীর একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধি এবং তিনি যে পরিস্থিতিতে সেবা ছেড়েছেন সে বিষয়ে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। জর্জের বরখাস্তের কয়েকদিন পরে ড্রিসকল ওয়াশিংটন পোস্টে একটি বিরল বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সচিব হিসেবে পদত্যাগ বা ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই। তিনি হেগসেথের উল্লেখ করেননি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে রাখে। বিশ্বজুড়ে যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী নজিরবিহীন প্রতিশ্রুতির মুখে, সেই মুহূর্তে পেন্টাগনের শীর্ষ নেতৃত্বে এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও বিশ্বস্ত জেনারেলদের বরখাস্ত করার ধারা মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে কতটা দুর্বল করছে? অ্যাডমিরাল মন্টগোমারির ভাষায় যুদ্ধকালীন পরিবেশে সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ নেতাদের বঞ্চিত করা এবং একই সাথে সংস্কার ও রূপান্তরের চেষ্টা করার চেয়ে খারাপ দুটি কাজ একসাথে কল্পনা করা কঠিন।

সম্পর্কিত