Advertisement Banner

লুইস এনরিকের হাত ধরে ইতিহাসের পাতায় পিএসজি

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
লুইস এনরিকের হাত ধরে ইতিহাসের পাতায় পিএসজি
ছবি: সংগৃহীত

“গতবারের চেয়ে এবারের শিরোপা জয়টা বেশি অম্লমধুর। কারণ এবার আমাদের প্রতিপক্ষ আরও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।” চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আর্সেনালকে হারানোর পর এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে। আর্সেনাল এতে কিছুটা সান্ত্বনা পেতেই পারে। তবে ইউরোপ সেরা হওয়ার খুব কাছে গিয়ে আবারও খালি হাতে ফেরার যন্ত্রণা অনেকদিনই যে ভোগাবে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নদের। কারণ এবার আর ভাগ্য তাদের সুপ্রসন্ন হয়নি ।

রোববার ফাইনালে দুই দলের সামনেই হাতছানি ছিল ইতিহাস গড়ার। আর্সেনাল জিতলে মাত্র তৃতীয় ইংলিশ ক্লাব হিসেবে তারা একই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার গৌরব অর্জন করত। আর পিএসজির চোখ ছিল রিয়াল মাদ্রিদের পর প্রথম ক্লাব হিসেবে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতার।

১২০ মিনিটের ম্রিয়মাণ ফুটবলে অবশ্য দর্শকদের হতাশই করেছে দুই দল। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসের অন্যতম ‘বোরিং’ ম্যাচ বলেও অনেকেই উল্লেখ করেছেন। কারণ, আসরের সেরা দুই দলের লড়াইয়ে শুরু থেকেই ছিল না সেই গতি বা একে অন্যকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার মানসিকতা। ঢিমেতালে চলা ম্যাচে কাই হাভার্টজের গোলে আর্সেনাল প্রথমে লিড পেলেও উসমান দেম্বেলের পেনাল্টি থেকে করা গোলে সমতা টানে পিএসজি।

নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়েও চিত্রটা ছিল একই। গোল না করতে পারলেও একচেটিয়া প্রাধান্য দেখায় পিএসজি। প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে দলটি গোলের জন্য শট নেয় ২১টি। বিপরীতে আর্সেনাল গোলের জন্য নিতে পারে মাত্র ৭টি শট।

আর বল দখলে রাখার ক্ষেত্রে ভীষণ বাজে এক ম্যাচ খেলে আর্সেনাল বিব্রতকর এক রেকর্ডও গড়েছে। তাদের ২৪.৭% পজেশন রাখার রেকর্ড ২০০৩-০৪ মৌসুমের পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে সবচেয়ে বাজে। আর মিকেল আর্তেতার কোচিংয়ে এটি আর্সেনালের সবচেয়ে কম বল দখলে রাখার কীর্তি।

গোটা ম্যাচ জমজমাট না হলেও টাইব্রেকারে ছিল টানটান উত্তেজনা। পিএসজি প্রথম দুই শটে লক্ষ্যভেদ করলেও আর্সেনাল দ্বিতীয়টি মিস করে বসে। তবে অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় নুনো মেন্দেসের শট ঠেকিয়ে আর্সেনাল শিবিরে প্রাণ ফেরান গোলকিপার ডাভিড রায়া। এরপর দুই দলেরই পরের দুটি শট যায় জালে। তবে আর্সেনালকে কাঁদিয়ে বল আকাশে উঁচিয়ে মেরে বসেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার গাব্রিয়েল। ৪-৩ ব্যবধানে শেষ হাসি হাসে পিএসজি।

এর মধ্য দিয়ে আরও একবার তীরে এসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তরী ডুবেছে আর্সেনালের। নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ২০০৩-০৪ মৌসুমের পর আবারও ফাইনালে পরাজয়ই হয়েছে তাদের সঙ্গী। অধরাই থেকে গেছে ইউরোপ সেরা হওয়ার বাসনা।

বছর দুয়েক আগে তাদের জায়গায় ছিল পিএসজিও। তবে এনরিকের হাত ধরে বদলে যাওয়া দলটি টানা দুইবার এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে রিয়াল মাদ্রিদ টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ঘরে তুলেছিল। পিএসজির স্বপ্ন এখন সেই রেকর্ড স্পর্শের।

আর দুই মৌসুম ধরে দলটি যেভাবে খেলেছে এবং অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখিয়ে সেরাদের সেরা হয়েছে, তাতে তাদের পক্ষে এই রেকর্ড গড়া খুব সম্ভব। বিশেষ করে এনরিকে ডাগআউটে আছেন বলেই বড় স্বপ্ন দেখতেই পারে ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা। লিওনেল মেসি, নেইমার ও কিলিয়ান এমবাপেকে নিয়ে যা করতে পারেনি দলটি, প্রায় সাদামাটা দল নিয়ে টানা দুই আসরে সেটাই করে দেখাতে সমর্থ হয়েছেন তিনি।

এনরিকের জাদুর স্পর্শে একটা লম্বা সময় ধরে ‘কৃষকের লিগ’ বলে সবার হাসিঠাট্টার খোরাক হওয়া পিএসজি এখন ইউরোপসেরা দল, তাও পরপর দুইবার। দেম্বেলে, ভিতিনিয়া, খভিচা কাভারাতসখেলিয়ারা দেখিয়ে চলেছেন, দল হিসেবে খেলতে পারলে পিএসজি কতটা অপ্রতিরোধ্য হতে পারে।

তিনজনের কারোরই মেসি-নেইমার-এমবাপেদের তারকা খ্যাতি না থাকলেও আছে সঠিক সময়ে জ্বলে ওঠার রসদ। আর্সেনালের বিপক্ষে নিজ নিজ ভূমিকায় তিনজনই ছিলেন সফল, আর এটাই গড়ে দিয়েছে ব্যবধান।

ম্যাচের পর তাই দল নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পিএসজি কোচ এনরিকে, “আজকে হয়তো দুই দলই জেতার যোগ্য ছিল, কিন্তু পুরো মৌসুমে তারা যেভাবে খেলেছে, তাতে আমার কাছে মনে হয় শিরোপাটা আমাদেরই বেশি প্রাপ্য। আমরা খুব খুশি এবং আগামী বছর ফিরে আসব আবার চ্যাম্পিয়ন হতে। কঠিন? কিন্তু কেন নয়?”

এই টুর্নামেন্টে কোচ হিসেবে বার্সেলোনার হয়ে একবার এবং পিএসজির হয়ে দুইবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন এনরিকে। তিনি ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম কোচ, যিনি তিন বা তার বেশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তাই প্রশ্ন করা হয় তিনি কিংবদন্তি কিনা। এনরিকের ভাষায়, “আমি কিংবদন্তি কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবেন অন্যরা। আমি নিজেকে সেভাবে দেখি না। আমার কাজ পিএসজিকে বেশি বেশি শিরোপা জেতানো। আপাতত আমি একটু উদযাপন করতে চাই।”

অন্যদিকে রাজ্যের হতাশা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা আর্তেতা জানান প্রাপ্তির কথা, “আপনি যখন ফাইনাল পর্যন্ত অনেক ধারাবাহিক থাকবেন এবং শেষ পর্যন্ত হেরে যাবেন টাইব্রেকারে, সেটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। তবে দল নিয়ে আমি গর্বিত। খেলোয়াড়রা আমাকে অনেক আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে। আমরা একটা বড় শিরোপা জিতেছি এবং সবচেয়ে বড় শিরোপা হাতছাড়া করেছি। এটাও কম নয়।”

সম্পর্কিত